বৃহস্পতিবার, জুন ২০

পাহাড়ে পেমবাজি সঙ্গে থাকলে বিপদ ধার ঘেঁষত না

পর্বতারোহণে এক ধাক্কায় বেশ এগিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এমন আরোহী প্রায় বিরল, যাঁর কোনও না কোনও বড় মাপের আরোহণে সঙ্গী হননি দার্জিলিঙের পেমবা শেরপা। সেই পেমবা শেরপাই এখন কারাকোরামের সাসের কাংরি অভিযানে গিয়ে, ক্রিভাসের অতলে নিখোঁজ। কী বলছেন রাজ্যের পর্বতারোহীরা? পেমবা শেরপার সহযোগিতায় নুন, চ্যাঙাবাং, ব্ল্যাক পিক-সহ আরও কিছু অভিযানে সামিল হওয়া তরুণ পর্বতারোহী, কৃষ্ণনগরের রোহিত মজুমদার ভাগ করে নিলেন তাঁর অভিজ্ঞতা।

রোহিত মজুমদার

পেমবাজি। এই নামটার অনেক রূপ। শেরপা, শিক্ষক, বন্ধু, সব রূপই বড় ভাল। পাহাড়ে চড়ার সময়ে যতটা দায়িত্বশীল এবং পেশাদার, অন্য সময়ে ঠিক ততটাই বন্ধু মনোভাবাপন্ন। সেই সঙ্গে খুবই বিশ্বস্ত এবং উচ্চমানের ক্লাইম্বার।

পাহাড়ে দেখেছি, কোনও দায়িত্ব কখনও ওঁর উপরে চাপিয়ে দিতে হয়নি। নিজে থেকেই ঘাড়ে নিতেন সমস্ত খুঁটিনাটির দায়িত্ব। যেন নিজের পরিবারের কাউকে নিয়ে পাহাড়ে চড়ছেন। অভিযানের শুরু থেকে শেষ অবধি সবটাই দেখে নিতেন নিখুঁত ভাবে। এমনকী নেপাল থেকে আরোহীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও কিনে নিয়ে আসতেন। খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল, আরোহীদের দেখেই বুঝে যেতেন, কার কতটা ক্ষমতা। লোড ফেরির জন্য লোড ডিস্ট্রিবিউশন করার সময়ে এক বার মাথা তুলে দেখতেন, কে দাঁড়িয়ে আছে। বলতেন, ‘‘ওহ! রোহিত ভাই, দো প্যাকেট অউর দে দো! কৌশিক ভাই,  চার প্যাকেট অউর লেলো।’’ কোনও দিনও মনে হয়নি, এর থেকে বেশি আরও কিছু নিতে পারতাম অথবা বেশি লোড হয়ে গিয়েছে। পেমবাজি লোড ডিসট্রিবিউট করার পরে কোনও দিনও এক বিন্দু লোড কমাতে হয়নি। পরের ক্যাম্পে পৌঁছনো অবধি বুঝে যেতাম, আর দিলে হয়তো পৌঁছতামই না। চোখে দেখেই কী করে যে সব বুঝে যেতেন জানি না। কিন্তু, ‘রোহিত ভাই’ ডাকটা আর হয়তো শুনতে পাব না।

আরও পড়ুন: রেখেছো শেরপা করে, আরোহী করোনি!

মানুষটাকে প্রথম দেখি ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে, জোংরি গোয়েচা লা ট্রেকের সময়। আমাদের গাইড ছিলেন পাসাং দাজু (পেমবাজির দাদা)। আমি ইয়াকসমের ট্রেকার্স হাটের বাইরের বেঞ্চগুলোয় বসেছিলাম। হঠাৎ দেখি এক জন স্থানীয় মানুষ হাসতে হাসতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। নিজে থেকেই দু’হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে পরিচয় দিলেন, ‘‘আমি পেমবা শেরপা’’। চোখের সামনে এক জন এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্নপূর্ণা, থলয়সাগরের মতো শৃঙ্গ জয় করা এক জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু নিজের স্বভাবসিদ্ধ হাসি দিয়ে পেমবাজি মন কেড়ে নিয়েছিলেন। ওই উচ্চতার একটা মানুষ যে অতটা সহজ, সাধারণ হতে পারেন ভাবতে পারিনি।

২০১৪ সালের মাউন্ট নুন অভিযানের সময় প্রথম বার মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম তাঁর দায়িত্ববোধ। আমার প্রথম অভিযান ছিল সে বার। ক্যাম্প ১ যাওয়ার রাস্তায় একটা আইস ওয়াল পড়ে। আগস্টের অভিযান বলে বরফ ছিল না ওয়ালে। কোর্সের পরে প্রথম বার ওয়ালে ক্লাইম্ব করব, তা-ও আবার লোড নিয়ে। প্রথম বার কৌশলটা ঠিক আয়ত্ত করতে পারছিলাম না এবং শরীরে জোর দিয়ে কাজটা করতে গিয়ে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। তখন এগিয়ে এলেন পেমবাজি। প্রথমে বকা দিলেন, বললেন ‘‘কেয়া রোহিত ভাই, কোর্সমে কেয়া কিয়া থা।’’ খুব লজ্জিত ভাবে বললাম, ‘‘ইতনি উঁচায়ি মে স্যাক লেকে ক্লাইম্ব নেহি কিয়ে থে।’’

আরও পড়ুন: তুষার-গহ্বরে তিন দিন নিখোঁজ পেমবা, আশার আলো ক্ষীণ

আমার হতভম্ব অবস্থা দেখে পেমবাজি নিজের সেফটি খুলে আমারটায় ক্লিপ ইন করলেন। জ়ুমারের খাঁজে বরফ জমে যাওয়ায় জ়ুমার স্লিপ করছিল দু’জনেরই। আমার স্যাকে লোড, আমি নিজেই তখন একটা লোড। পেমবাজির পিঠেও লোড। তা-ও বললেন, ‘‘ম্যায় পুল কারুঙ্গা অউর আপ উপার পুশ কারিয়ে।’’ এমন ভাবেই পুরো লোড নিয়ে আমায় আইস ওয়ালটায় চড়িয়েছিলেন।

কোনও দরকার ছিল না সেটা করার। আমায় নেমে যেতে বলতে পারতেন। কিন্তু নিজে হাতে ধরিয়ে আমায় কাজটা শিখিয়ে দেন প্রথম বারেই। দ্বিতীয় দিন লোড ফেরি করার সময়, যখন নিজে থেকে ক্লাইম্ব করতে পেরেছিলাম ওই একই ওয়াল, সবার প্রথম পেমবাজির কাছে গিয়ে জানিয়েছিলাম লজ্জা লজ্জা মুখ করে। খুব মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন। তার পর থেকে এক দিনের জন্যেও পেমবাজিকে বকার সুযোগ দিইনি। যদিও প্রত্যেক মুহূর্তে চোখে চোখে রাখতেন আমাদের। যেমন রাস্তাই হোক না কেন, কোনও দিনও আমাদের একা ছাড়েনি। সবসময় পুরো দল নিয়েই ক্যাম্পে ফিরতেন। সেই বার সামিট হয়নি আমার।

এবারেও তো শুনলাম সকলেই একসঙ্গে ফিরছিলেন। কেউ ওঁকে একটু চোখে চোখে রাখতে পারলেন না!

২০১৫-তে আবার যখন ওই একই শৃঙ্গ মাউন্ট নুনে অভিযানে যাই, সামিট মার্চের রাতে আমার হাতের গ্লাভসটা ঠিক ভাবে না থাকায় সব আঙুল প্রায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। পেমবাজি কে বলাতে উনি নিজের হাতের গ্লাভস খুলে দিয়ে দিলেন, আর আমার পাতলা গ্লাভসটা নিজে পরলেম। কোনও দরকার ছিল না তো! আঙুল ফ্রস্টবাইটে গেলে আমার যেত, পেমবাজির নিজের আঙুল বিপদে ফেলার কী দরকার ছিল। কিন্তু এটাই ছিল ওই মানুষটার পরিচয়। নিজের থেকে বেশি অন্যের খেয়াল রাখতেন উনি। নিজের পরিবারের মানুষ মনে করতেন সকলকে। সে দিন মনে হয়েছিল, পেমবাজি পাশে থাকা মানে কোনও বিপদ নেই আমার।

আরও পড়ুন: পাহাড়ে একটা ভুলই হয়তো শেষ ভুল, শিখিয়েছিলেন পেমবাজি

২০১৬ চ্যাঙাবাং অভিযানের সময়ে আবার অন্য একটা রূপ দেখেছিলাম মানুষটার। দেখেছিলাম, তাঁর শারীরিক ক্ষমতা। সে বার সবার লোডই একটু বেশি দেওয়া হয়েছিল। এক দিন বিকেলে দেখি পেমবাজি পরের দিনের লোড গোছাচ্ছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করে ফেলি, ইস বার কিতনা লোড হ্যায় আপকা, ২৫-৩০ কেজি? আমায় আবার সেই মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ‘‘রোহিত ভাই ইস বার জ়াদা হ্যায়, ৪০-৪৫ কেজি।’’ আমি কী বলব কিছু বুঝতে পারিনি। আমাকে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পেমবাজি বলে উঠলেন, ‘‘বড়ে ভাইয়াকো (দাদা, পাসাং শেরপা) লোড থোড়া কম দিয়ে, ইসি লিয়ে তো মেকআপ করনা পড়েগা।’’ আমি আরও অবাক হয়ে শুধু একটা হাসি দিয়ে চলে এলাম ওখান থেকে। কী বলব কিছু বুঝতে পারছিলাম না। ওই মানুষটার আরও কত পরিচয় পাব। আর কত নতুন ভাবে দেখব।

২০১৭ মাউন্ট ব্ল্যাক অভিযানে যা ঘটেছিল, সেই সময় যে পরিচয় পেমবাজি চিনিয়েছিলেন আমাদের, তা অন্য কোনও মানুষ দিতে পারবেন কি না জানি না। একটা ল্যান্ড স্লাইড জোন পেরিয়ে যাওয়ার সময় আবার ধস নামে। আমাদের এক জন আরোহী মাঝে ফেঁসে যায়। অন্য এক জন আর একটু পিছনে বিপদে পড়ে যান। পেমবাজি সেখানে দাঁড়িয়ে নিমেষের মধ্যে ঠিক করে নিলেন কী করতে হবে। প্রথম মানুষটাকে উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না তখন, তাই তাঁর দিকে এগোননি। কিন্তু দ্বিতীয় জনকে টেনে একটা গাছের গুঁড়ির পিছনে ফেলে, একটা স্যাক তাঁর পিঠের উপর রেখে নিজে শুয়ে পড়েন, যাতে তাঁর কিছু না হয়। নিজের জীবনকে সামনে রেখে অন্যের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা মানুষ ছিলেন পেমবাজি। হয়তো ভগবান সে দিন পেমবাজিকে দেখেই বাকিদের বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তাই হয়তো আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল যে, পাহাড়ে পেমবাজি সঙ্গে থাকলে বিপদ ধার ঘেঁষত না।

আরও পড়ুন: ‘আরোহী’ দেবাশিসকে তিলে তিলে গড়েছে এই পেমবা শেরপাই

কিন্তু আজ কোথায় দাঁড়িয়ে রইলাম আমি, আমরা? ‘রোহিত ভাই’ ডাকটা, প্রতি মুহূর্তে হাসতে গিয়ে ছোট হয়ে যাওয়া চোখটা, নিজের মিষ্টি স্বভাব দিয়ে সবার মন জয় করে নেওয়ার স্বভাবটা, আর হয়তো ফিরে পাব না। কী হারালাম, সেটা হয়তো আমিই জানি আর জানেন, যাঁরা কাছ থেকে মানুষটাকে দেখেছিলেন।

পেমবাজির বাড়ি দার্জিলিঙে হলেও, উনি থাকতেন আমাদের মতো পাহাড়প্রেমী প্রত্যেকটা মানুষের মনে। খালি শুধু ঘর হয়নি, খালি হয়ে গিয়েছে আমাদের মনও।

Leave A Reply