মাথায় হাত রেখে যখন পূর্ণ আশীর্বাদ করতেন সৌমিত্র কাকু, মনে হত ঈশ্বর মাথায় হাত দিলেন: ঋতুপর্ণা

১৫,৫১৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

‘দীর্ঘ, বড় দীর্ঘ ছিলো শীত,
রুক্ষ, বড়ো রুক্ষ ছিলো পথ-ও,
তবুও তোকে আনতে গিয়ে একা,
সয়েছি বুকে রক্তঝরা ক্ষত।’

‘বাহ, ভারি সুন্দর ছন্দের হাত তো তোমার!’ পারমিতাকে বলেছিলেন মণিমামা।
আজ মণিমামার বিদায়ে বিষাদে বিষণ্ণ পারমিতা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিতর্পণে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। শুনলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘তুমুল, সে কি তুমুল ছিল ঝড়,
বুক ছমছম গহীন কালো রাত,
কোথাও খুঁজে পাইনি কুটো খড়,
একলা পথে ধরেনি কেউ হাত।
এখন তোর ডালিম গালে রোদ,
দেখে পলক ফেলতে ভুলে যাই,
অনেক পথ এখনও চলা বাকী,
তা হোক, তবু আর তো একা নই।’

সুজাতা গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘আত্মজ’ কবিতাই পাঠ করেছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’ ছবিতে। এই কবিতাই আবার ঋতুপর্ণা পারমিতাকে আবৃত্তি করে শোনান সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
সৌমিত্র এবং ঋতুপর্ণা দুজনেই একাধারে আর্ট ছবি এবং বাণিজ্যিক ছবি করে গেছেন সদর্পে। এই দুই ধারাতেই তাঁদের ছবির সংখ্যা অনেক। কাজ করেছেন একসঙ্গে বহু ছবিতে।
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত শোনালেন তাঁর সৌমিত্র কাকুকে ঘিরে নানা গল্প…

‘যখন খুব কাছের মানুষ কেউ চলে যায়, মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। আমারও অবস্থা ঠিক সেরকমই আজ। আর কি ভাবে এই শোক সামলাবো সেটাও বুঝতে পারছিনা। মনটা অনেকদিন ধরেই খারাপ ছিল সৌমিত্র কাকু অসুস্থ ছিলেন। এই লম্বা জীবনের সফরে তিনি অনেকবারই অসুস্থ হয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই অনেক কঠিন অসুখের ভেতর থেকে আমাদের হাসিয়ে ফিরে এসেছেন। কিন্তু আজকে একেবারেই নিরাশ হয়ে গেলাম।

‘শেষ চিঠি’ তেই প্রথম দেখা
————–
পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগে যখন অভিনয় করতে এলাম সেই দিন থেকেই সৌমিত্র কাকুর আদরের স্পর্শ পেয়েছি। এত ভালোবাসা,আবেগ,শিক্ষা জানিনা খুব একটা অন্য কারো কাছে পেয়েছি কিনা। কত বছর ধরে দেখেছি সৌমিত্র কাকুকে। তাঁর একটা বয়স থেকে আরেকটা বয়সে পৌঁছনো অবধি। আমি ছোট থেকে বড় হওয়া অবধি। এ যেন এক অদ্ভুত সম্পর্ক।

আমার প্রথম সেই নবাগতা হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে আসা, সেই শুরুটা হয়েছিল মনে আছে, আমি ‘শ্বেত পাথরের থালা’র সাথেসাথে একটা ছবি করেছিলাম ‘শেষ চিঠি’ নামে, তনুজা আন্টি আর সৌমিত্র কাকুর সঙ্গে। আমার জন্য সেটা একটা সাঙ্ঘাতিক অভিজ্ঞতা ছিল। শিশির মজুমদার পরিচালক ছিলেন। তখন সৌমিত্র কাকু আরো ইয়ং। আমি পরবর্তীকালে যখন সৌমিত্র কাকুর সঙ্গে আরও কাজ করেছি তখন আমি বলতাম যে এত হ্যান্ডসাম ম্যান আমি আমার লাইফে দেখিনি।’

‘এই শার্টটা তোমার কোন গার্লফ্রেন্ড দিয়েছে?’
————–
রঙীন রঙীন শার্টস পরতেন সৌমিত্র কাকু। তাতে আরও হ্যান্ডসাম লাগত। আমি বলতাম, এই শার্টটা তোমার কোন গার্লফ্রেন্ড দিয়েছে? আর আমাকে এসেই বলতেন ‘দেখো এটা আমায় জার্মানি থেকে পাঠিয়েছে আমার জার্মানির গার্লফ্রেন্ড।’ এরকম সম্পর্ক ছিল। মজা করতেন, হাসতেন।

মিষ্টি সে পিছুডাক শুনতে যে পায়
—————
কত আলোচনা করতেন সেটে, যেখান থেকে কত কিছু জানতে পারতাম। দরাজ গলায় সেটে কবিতা বলতেন। কিছুদিন আগে আমরা শ্যুটিং করছিলাম ‘বসু পরিবার’। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর অপর্ণা সেন, ওঁনাদের দুজনের কথোপকথন শুনছিলাম। কেউ জীবনানন্দ কেউ রবীন্দ্রনাথ বলছেন। কি অপূর্ব অনুভূতি সেসব মণিমুক্তময় সময় কাটানো।

এত কাজ করেছি একসঙ্গে কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব বুঝে পারছিনা। ‘পারমিতার একদিন’ আমাদের তিন জনের একটা ল্যান্ডমার্ক কাজ যেটা আজও মানুষ বলে। ‘পারমিতার একদিন’ এরপর আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,অপর্ণা সেন আর আমি, এই আমরা তিনজন আবার একসঙ্গে হলাম ‘বসু পরিবার’ ছবিতে।

সৌমিত্র কাকু আর সন্ধ্যা রায়ের সাথে ‘আরোহণ’ বলে একটা ছবি করেছিলাম। সেও এক অসাধারন অভিজ্ঞতা। ‘দেবীপক্ষ’ তেও ওঁনারা আমার বাবা মায়ের ভূমিকায়।

বেলা শুরুর গান
————
যে ছবিটা বাংলা ছবির ইতিহাস বদলে দিয়েছিল ‘বেলা শেষে’। সেখানে বাবা মেয়ের দৃশ্য গুলো মানুষের চোখে ভাসে। আমার মনে হয় সৌমিত্রকাকুর সঙ্গে আমার শেষের স্মৃতিটা রয়ে গেল ‘বেলা শুরু’ ছবি দিয়ে। কদিন বাদেই মুক্তি পাবে ‘বেলা শুরু’ ছবিটা। সেখানেও বলতে পারি আমার আর সৌমিত্র কাকুর দৃশ্য বাংলা ছবির নজির হয়ে থাকবে। বাবা-মেয়ের যে অদ্ভুত সম্পর্ক ও তাঁর বিস্তার।

এই বাংলার মাটিতে মাগো জন্ম আমায় দিও
————-
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েও উনি বাংলাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতেন। তাই বাঙালীর কৃষ্টি,গর্ব,বাঙালীর প্রেম,বাংলা ভাষা,বাংলা কবিতার প্রতিষ্ঠান ছিলেন উনি। বাংলা ভাষার চির উত্তরণ উনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর কথায়,লেখায়,অভিনয়,ছবি আঁকায়,কবিতায় বাংলা ভাষাকে কোন শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ওঁনার মধ্যে একটা খুব সুন্দর মানুষ ছিল।
মাথায় হাত রেখে যখন পূর্ণ আশীর্বাদ করতেন অনুভব করতাম ঈশ্বরের মতো একজন ব্যক্তিত্ব মাথায় হাত দিলেন।
তুমি যেখানেই থেকো ভালো থেকো। অনেক কষ্ট পেয়ে চলে গেলে। তোমার সব কষ্ট দূর হয়ে যাক। যেখানে চলে গেলে সুস্থ থেকো। ভালো থেকো। প্রণাম।

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More