ঋষি কাপুরের ঠিক কী হয়েছিল, কবে থেকে ভুগছিলেন ক্যানসারে, কত দীর্ঘ লড়াই করেও মানতে হল হার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁর ঠিক কী অসুখ হয়েছে, কতটা হয়েছে, কোন পথে চিকিৎসা চলেছে– এ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে সব মহলেই। কারণ যে কোনও কারণেই হোক, প্রথম থেকেই তাঁর পরিবারের তরফে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে তাঁর অসুস্থতার কথা। কিন্তু শেষ কয়েক মাসে পরিষ্কার হয়ে যায়, ক্যানসারেই ভুগছিলেন তিনি। একটি সূত্রের খবর, ব্লাড ক্যানসার অর্থাৎ লিউকোমিয়া হয়েছিল তাঁর। আজ, বৃহস্পতিবার চলে গেলেন চিরঘুমে।

    প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা ঋষি কাপুরের এই প্রয়ান আরও একবার জনমানসে প্রশ্ন তুলল, ঠিক কীভাবে মারা গেলেন তিনি।

    ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই হঠাৎই ‘গুজব’ শোনা গেছিল, আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ঋষি কাপুর। বেশ কিছু পেজ থ্রি সংবাদ মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, ক্যানসার হয়েছে তাঁর। কিন্তু সবটাই তখনও ‘গুজব’ বা জল্পনার পর্যায়ে ছিল। এরকম সিরিয়াস বিষয় নিয়ে যতক্ষণ না পরিবারের তরফে কিছু জানানো হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস না করাই সচেতনতার পরিচয়।

    কিন্তু এর পরেই সেই সেপ্টেম্বরের একেবারে শেষে ঋষি কাপুর নিজে টুইট করে জানিয়েছিলেন, তিনি চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যাচ্ছেন। ফের হাওয়া লাগে গুজবের পালে। তবে কেউ চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্ক যাওয়ার মানেই যে তাঁর ক্যানসার হয়েছে, এটাই বা কেন ধরে নেওয়া হবে! সে কথাও পরে বলেছেন ঋষি নিজেও। তিনি তাঁর টুইটারে লিখেছিলেন, “আপনারা অযথা জল্পনা করবেন না। আমি স্রেফ চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যাচ্ছি।”

    এর পরে অক্টোবরের সাত তারিখে একটি ভিডি পোস্ট করেছিলেন ঋষি। নিউ ইয়র্কে ব্যস্ত ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের সেই ভিডিওয় তাঁর সঙ্গে দেখা গেছিল পুরনো বন্ধু ও অভিনেতা অনুপম খেরকেও। ভিডিওতে নিজেদের ‘কেয়ার ফ্রি’ বা ‘খের ফ্রি’ বলে মজাও করেছিলেন ঋষি। এই ভিডিও দেখে প্রায় সকলেই স্বস্তি পান। ভেবে নেন, সত্যিই ঠিক আছেন অভিনেতা।

    ক’দিন পরে ফের দুশ্চিন্তা। কারণ আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আসে একটি ছবি। সেই ছবিতে ঋষির সঙ্গে রয়েছে সোনালি বেন্দ্রে এবং নীতু কাপুরও। আর ছবির সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় হলো ঋষির চুলের রং। একটা অদ্ভুত সাদা শেড এসে গিয়েছে কাপুর খানদানের অন্যতম হ্যান্ডসাম এই সদস্যের চুলে। ছবি ভাইরাল হতেই নানা প্রশ্ন উঁকি মারতে শুরু করে ভক্তদের মনে। চিকিৎসার প্রভাবেই কি এমনটা হয়েছে? এ প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই।

    অক্টোবরের ৯ তারিখে ফের এই দুশ্চিন্তার জবাব দেন ঋষি কাপুর নিজেই। তিনি আবারও টুইট করে জানিয়েছিলেন, চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও কারণ নয়, চুলের রঙের এই বদলের কারণ তাঁর আগামী ছবি। পরিচালক হিতেশ ভাটিয়ার সিনেমার জন্য ইতিমধ্যেই শ্যুটিং শুরু করেছেন ঋষি কাপুর। আর ছবির চরিত্রের জন্যই চুলের রং বদল করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু শ্যুটিং চলার মাঝেই চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে।

    Here is why Rishi Kapoor's hair has suddenly turned grey ...স্বস্তি মিললেও, প্রশ্ন থেকেই যায়। ঠিক কতটা অসুস্থ হলে, শ্যুটিং চলতে চলতেই নিউ ইয়র্কে চিকিৎসা করাতে ছুটতে হয়েছে অভিনেতাকে! অভিনেতার ও তাঁর পরিবারের তরফে যতই বারবার আশ্বস্ত করা হোক, কাঁটা থেকে গেছিল সেই ২০১৮ থেকেই। আর তা যে অমূলক ছিল না, আদতেই যে তিনি সেই তখন থেকেই ক্যানসারের মতো মারণ রোগের শিকার হয়েছিলেন, সে সত্য সামনে আসে আরও পরে।

    ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি, বছরের প্রথম দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় সুখী পরিবারের একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন ঋষি কাপুরের স্ত্রী নীতু কাপুর। ‘হ্যাপি ফ্যামিলি’-র সেই ফ্রেমে নীতু ও ঋষির সঙ্গে ছিলেন রণবীর, তাঁর বোন ঋদ্ধিমা। হাজির ছিলেন আলিয়া ভাটও। ইনস্টাগ্রামে ওই ছবি শেয়ার করে সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন নীতু। সেইসঙ্গে লিখেছিলেন, “আগামী দিনে ক্যানসার যেন কেবল একটা রাশিরই নাম হয়।”

    Hope in Future Cancer is Only a Zodiac Sign': Neetu Kapoor Hints ...নীতু কাপুরের এই পোস্টের পরেই তীব্র হয়েছিল গুঞ্জন। ঋষির নিউ ইয়র্ক ছোটা চিকিৎসার জন্য, আর তার পরেই নীতুর এই পোস্ট– অনেকেই এক রকম নিশ্চিতই হয়ে গিয়েছিলেন, ক্যানসারেই আক্রান্ত হয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা। যদিও এর পরেও সংবাদমাধ্যমের সামনে কিছুতেই কোনও মন্তব্য করেনি কাপুর পরিবার। এমনকি ঠিক কীসের চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্ক যেতে হয়েছে, তাও বলেননি তাঁরা।

    কিন্তু জানুয়ারি মাসের গোড়ায় এই ছবির পরে গুঞ্জনের তীব্রতা বাড়ায় ভাইয়ের অসুস্থতার খবর নিয়ে মুখ খুলেছিলেন ঋষির দাদা রণধীর কাপুর নিজে। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে রণধীর বলেন, “আমি বেশি কিছু জানি না। তবে এটা জানি যে ঋষি ভাল আছে। খুব তাড়াতাড়িই দেশে ফিরবে ও। যাঁর যা ইচ্ছে বলুন। আমরা সবাই ঋষির দেশে ফেরার জন্যই এখন অপেক্ষা করছি।”

    ইতিমধ্যে নিউ ইয়র্কে চিকিৎসা চলাকালীন সোনালী বেন্দ্রে, তাঁর স্বামী গোল্ডি বেহল, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, জাভেদ আখতার, অনুপম খের, শাহরুখ খানের মতো সিনেমা জগতের তারকারা তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন। প্রত্যেকের সঙ্গে হাসিমুখে ছবিও তোলেন ঋষি। এমনকী হলিউডের নামকরা অভিনেতা রবার্ট ডি নিরোর সঙ্গেও দেখা হয়েছিল বর্ষীয়ান এই অভিনেতার। প্রত্যেকেই ঋষিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন যাতে তিনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেন।

    তবে নিজের অসুস্থতার বিষয়ে ঋষি প্রথম মুখ খোলেন জানুয়ারি মাসের ২৬ তারিখে। তিনি বলেছিলেন, “আমার চিকিৎসা চলছে। আশা করছি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠব আমি। ঈশ্বর চাইলে জলদিই বাড়িও ফিরব।” তিনি এ-ও জানিয়েছিলেন, তাঁর চিকিৎসা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। আর এই সময়ে ধৈর্য রাখা খুবই প্রয়োজন। তবে শান্ত ভাবে ধৈর্য রাখা যে অভিনেতার স্বভাবে নেই, তাও জানিয়েছিলেন ঋষি কাপুর। তবে এর পাশাপাশি অভিনেতা বলেন, আপাতত এখন আর নতুন কোনও ছবি নিয়ে ভাবছেন না তিনি। ঋষির কথায়, “এখন একদম রিফ্রেশ হয়ে রিল‍্যাক্সড সময় কাটাচ্ছি। এই ব্রেকটা বোধহয় আমার থেরাপির কাজ করবে।”

    সাধারণের কাছে তখনও স্পষ্ট নয় তাঁর অসুখ, অসুখের ধরন বা তীব্রতা।

    রহস্যের জট প্রথম খোলে মে মাসে। স্বয়ং ঋষি কাপুর জানিয়ছিলেন, ক্যানসার থেকে মুক্ত হয়েছেন তিনি! তবে বাকি রয়েছে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। সেটা শেষ হতে এখনও মাস দুয়েক সময় লাগবে। তার পরেই দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছিলেন বি-টাউনের বর্ষীয়ান অভিনেতা ঋষি কাপুর। এই প্রথম কার্যত নিশ্চিত হওয়া গেছিল, গত কয়েক মাস ধরে ক্যানসারেই ভুগছেন তারকা, চিকিৎসা চলছিল নিউ ইয়র্কে। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের কথা জানার পরে অনেকেই ভেবেছিলেন, তাহলে হয়তো লিউকোমিয়া অর্থাৎ ব্লাড ক্যানসারই হয়েছে ঋষি কাপুরের।

    এর পরে আরও বিস্তারিত ভাবে নিজের কথা জানান ঋষি কাপুর। বলেন, “প্রায় আট মাস আমার চিকিৎসা চলেছে। আমার মতো একজন অধৈর্য মানুষের পক্ষে লড়াইটা সহজ ছিল না। ধন্যবাদ আমার পরিবার এবং অনুরাগীদের যাঁরা সবসময় আমার পাশে ছিলেন। ওঁদের প্রার্থনা আর ভালোবাসাতেই আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি।“

    ঋষি জানিয়েছিলে, ক্যানসারের বিরুদ্ধে এই কঠিন লড়াইয়ের তাঁকে পাহাড়ের মতো ঢাল হয়ে সবসময় সবকিছু থেকে রক্ষা করেছেন স্ত্রী নীতু। আর ছেলে-মেয়ে রণবীর এবং ঋদ্ধিমা ছিলেন সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য তাঁর ইন্সপিরেশন। তাঁর কথায়, “নীতু আমার খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ভীষণ খেয়াল রাখত। আর আমার ছেলেমেয়ে তো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমার সঙ্গে লড়াইটা লড়েছে। ঋদ্ধিমা মাঝে মাঝেই নিউ ইয়র্ক এসে আমার সঙ্গে দেখা করে যেত।” তবে শুধু পরিবার নয়, নিজের ফ্যানদের কথাও বারবার বলেছিলেন ঋষি। ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন সকলকেই।

    গত বছর সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে, পাক্কা ১১ মাস ১১ দিন পর অবশেষে দেশে ফিরেছিলেন ঋষি কাপুর। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নীতু সিং। মুম্বই এয়ারপোর্টে নেমেই পাপারাৎজির দিকে তাকিয়ে একগাল হাসি নিয়ে পোজও দিয়েছিলেন তাঁরা। তার আগে ঋষি টুইট করেছিলেন, “১১ মাস ১১ দিন পর দেশে ফিরছি। সকলকে ধন্যবাদ।”

    p5gt6bdoতবে সবকিছুর পরেও ঋষির কী অসুখ হয়েছিল তখন অবশ্য তা জানা যায়নি। মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন গোটা কাপুর খানদান।

    তার পরে কয়েক দিন ভাল থাকলেও, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে খবর মেলে শ্বাসকষ্ট ও জ্বর নিয়ে দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে অভিনেতাকে। সেখান থেকে সেরে উঠে মুম্বইয়েও ফেরেন তিনি। এমনকি চলতি লকডাউনে টুইটও করেছিলেন ঋষি। লিখেছিলেন, “আমায় ভুল বুঝবেন না। ডাক্তার, নার্স, পুলিশ–সকলেই কঠোর পরিশ্রম করছেন। বহু মানুষ ঘরবন্দি থেকে একঘেয়ে হয়ে পড়ছেন। হতাশাও কাজ করছে তাঁদের মধ্যে। প্রত্যেককে ‘রিল্যাক্স’ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।”

    এখানেই থামেননি ঋষি। তিনি অর্থনীতির দিকটিও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, “রাজ্যগুলির এখন রাজস্ব আদায় দরকার। মদের দোকান থেকে রাজস্বের একটা বড় অংশ আয় করে রাজ্যগুলি। এই পরিস্থিতিতে সেটাও মাথায় রাখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বহু জায়গায় তো ব্ল্যাকে মদ বিক্রি হচ্ছে। তাহলে দোকান খুলতে দিতে আপত্তি কী!”

    ঋষির এই ধরনের টুইট দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, সত্যিই হয়তো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছেন অভিনেতা। কিন্তু কিন্তু গত ২ এপ্রিল থেকে আর টুইট করেননি অভিনেতা। সেদিনই শেষ বার্তা দেন, করোনার বিরুদ্ধে সকলে এখজোট হয়ে লড়ার জন্য। খবরও মেলেনি তাঁর শরীর-স্বাস্থ্যেরও। গত রাতে হঠাৎই আবার শ্বাসকষ্ট হয় তাঁর। ভর্তি করতে হয় মুম্বইয়ের এইচএন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন হাসপাতালে।

    এই বার আর ফিরলেন না সদাহাস্যময় মানুষটি। এখনও তাঁর পরিবারের তরফে কিছু জানানো হয়নি, ঠিক কী হয়েছিল অভিনেতার, কোন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। মুখ খোলেননি কোনও চিকিৎসকও। দীর্ঘদিন চেষ্টার পরেও মাত্র ৬৭ বছর বয়সে মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে শোকবিহ্বল সকলেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More