বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

রিকশাতেই অ্যাম্বুল্যান্স! চালাবেন সেই লাদাখ যাওয়া রিকশাওয়ালা, সত্যেন দাস

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

তিনি রিকশা নিয়ে লাদাখ গিয়েছিলেন, মনে আছে? গড়িয়া এলাকার রিকশাচালক, বারুইপুরের সত্যেন দাস। তাঁর অভিযান নিয়ে তথ্যচিত্রও হয়েছিল পরে। রিকশা নিয়ে লাদাখ যাওয়ার কীর্তি তাঁর ঝুলিতেই প্রথম। সেই মানুষটিই এবার রিকশা নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরবেন, আনাচকানাচে গিয়ে মানুষকে সাহায্য করবেন। তবে যে সে রিকশা নয়। রিকশার মধ্যেই তৈরি অ্যাম্বুল্যান্স! যার পোশাকি নাম, গ্রামীণ সেবাযান।

গোবরডাঙার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এই অ্যাম্বুল্যান্সটি তুলে দেওয়া হয়েছে সত্যেন দাসের হাতে। ছোট্ট সেই তিনচাকার অ্যাম্বুল্যান্সে থাকবে ফার্স্ট এইড, অক্সিজেন-সহ কিছু জরুরি পরিষেবাও। বারুইপুর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু গ্রাম্য এলাকা আছে, যেখানে রাস্তা সরু ও কাঁচা হওয়ার কারণে গাড়ি বা অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে পারে না। সে ক্ষেত্রে রোগীকে কোনও রকমে মেন রোড পর্যন্ত আনতে পারলে, তবেই হাসপাতালে পৌঁছনো সম্ভব হয়। সেটা করতে গিয়ে অনেক সময়েই দেরি হয়ে যায়, অনেক সময়ে ওইটুকু পথ পেরোতে রোগীর সমস্যা বেড়েও যায়। তাদের জন্যই এই গ্রামীণ সেবাযান নিয়ে সদাসর্বদা প্রস্তুত থাকবেন সত্যেন দাস।

তিনচাকার এই যানটি সত্যেনের রুটিরুজির উৎস তো বটেই, সেই সঙ্গে এই যান যেন জড়িয়ে গেছে সত্যেনের জীবনে। তাই তিনি ইচ্ছে মতো রিকশা করেই কখনও বেরিয়ে পড়েছেন পুরীর পথে, কখনও দক্ষিণ ভারতে। এমনকী এই রিকশা নিয়েই দু-দু’বার পাড়ি দিয়েছেন লাদাখের বন্ধুর পথে!

তাঁর সেই ঐতিহাসিক অভিযানকে সিনেমার ফ্রেমে ধরেছেন চিত্রপরিচালক। সে সিনেমার নাম, ‘লাদাখ চলে রিকশাওয়ালা’।

তবে বিশেষ কোনও রেকর্ড গড়ার জন্য বা অ্যাডভেঞ্চার দুনিয়ায় মাইলফলক স্থাপনের উদ্দেশে যে এই অভিযান করেছেন সত্যেন, তা নয়। তিনি সবটাই করেছেন মনের আনন্দে। কখনও পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্ব উষ্ণায়ন রোখার বার্তা, কখনও প্রচার করেছেন বিশ্ব মানবিকতা। সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রিকশা চালিয়ে পাকিস্তান যাওয়ারও পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসা-গোলযোগে আটকে রয়েছে সে পরিকল্পনা। দুই বাংলার মিলনসূত্র হিসেবে যেতে চান ওপার বাংলাতেও।

অভাবের সংসার সত্যন দাসের। টালির চালের ঘরে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে কোনও রকমে দিন গুজরান করেন। ২০১৪ সালে, অভিযানের আবেগে রিকশা নিয়েই সপরিবার পাড়ি দিয়েছিলেন লাদাখ। তখনই শিরোনামে এসেছিলেন তিনি। এবং জানিয়েও ছিলেন, শান্তির বার্তা নিয়ে দেশদেশান্তরে ঘুরতে চান তিনি।

কিন্তু এমন শান্তি তো অনেকেই চান। সত্যেনবাবু আলাদা কোথায়?

সত্যেনবাবু আলাদা তাঁর আবেগে। তাঁর চেষ্টায়। তাঁর বিশ্বাসে। সেই আবেগ আর বিশ্বাসে ভর করেই এবার পাকিস্তান পাড়ি দিচ্ছেন সত্যন দাস। রিকশা নিয়ে ওয়াঘা বর্ডার পেরিয়ে পৌঁছবেন লাহোর। প্রচার করবেন শান্তির বার্তা। মানুষকে বোঝাবেন, সবুজ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই।

এমন মানুষের হাতে গ্রামীণ সেবাযানের দায়িত্ব তুলে দিয়ে খুশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্ণধাররা। তাঁরা জানিয়েছেন, এই রিকশা-অ্যাম্বুল্যান্সটি যোগ্য মানুষের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। সত্যেন দাসের চেয়ে বেশি যোগ্য আর কেউ হতে পারতেন না।

সত্যেনও তাঁর নতুন ভূমিকায় খুশি। বললেন, “রিকশা চালাতে আমি ভালবাসি খুব। শুধু পেটের দায়ে নয়, এমনিও চালিয়ে ঘুরে বেড়াই কত জায়গা। এবার যদি সেই রিকশা চালিয়েই কিছু মানুষের উপকারে আসতে পারি, প্রাণ বাঁচাতে পারি কারও, তা হলে তার চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে!”

সত্যেনের গ্রামীণ সেবাযানের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন গ্রামের মানুষরাও। কোনও বিপদে পড়লে মেন রোজ অবধি পৌঁছতেই অনেকটা সময় চলে যেত। এবার সেই সমস্যার সমাধান হবে। একটা ফোনেই হাজির হবে অ্যাম্বুল্যান্স, একেবারে দোরগোড়ায়। হলই বা রিকশা-অ্যাম্বুল্যান্স, তাই বা কম কী!

Comments are closed.