মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

পাকিস্তান চলে রিকশাওয়ালা! দু’দেশের মৈত্রীর স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্যাডেলে চাপ সত্যেন দাসের

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

“জঙ্গি সংগঠনগুলো একের পর সন্ত্রাস চালাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদীদের কিন্তু কোনও ধর্ম হয় না। তারা মানবতার শত্রু। আমি মনে করি পাকিস্তানেও আমার মতো প্রচুর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ রয়েছে। তারা সন্ত্রাস চায় না। তারা যুদ্ধও চায় না। যুদ্ধ হলে তো শেষমেশ সাধারণ মানুষের তুমুল ক্ষতি। তাই শান্তির বার্তাই একমাত্র পথ বলে আমার মনে হয়।”

এই কথাগুলো যিনি বলছেন, তিনি কোনও রাষ্ট্রনেতা নন। তিনি তেমন কোনও পরিচিত বিদগ্ধ বিশিষ্ট জনও নন। তিনি শান্তির মুখপাত্র হিসেবেও কোনও স্বীকৃতি পাননি কোথাও। সেই অর্থে বলতে গেলে, তিনি সমাজের নিচু তলার, খেটে খাওয়া এক অতি সাধারণ মানুষ। পেশায় রিকশা চালক। আর নেশায়, অভিযাত্রী। তিনি সত্যেন দাস। গড়িয়ার টালির চালের ঘরে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে কোনও রকমে দিন গুজরান করেন। ২০১৪ সালে, কেবল অভিযানের নেশায়, রিকশা নিয়েই সপরিবার পাড়ি দিয়েছিলেন লাদাখ। তখনই শিরোনামে এসেছিলেন তিনি। এবং জানিয়েও ছিলেন, শান্তির বার্তা নিয়ে দেশদেশান্তরে ঘুরতে চান তিনি।

কিন্তু এমন শান্তি তো অনেকেই চান। সত্যেনবাবু আলাদা কোথায়?

সত্যেনবাবু আলাদা তাঁর আবেগে। তাঁর চেষ্টায়। তাঁর বিশ্বাসে। সেই আবেগ আর বিশ্বাসে ভর করেই এবার পাকিস্তান পাড়ি দিচ্ছেন সত্যন দাস। রিকশা নিয়ে ওয়াঘা বর্ডার পেরিয়ে পৌঁছবেন লাহোর। প্রচার করবেন শান্তির বার্তা। মানুষকে বোঝাবেন, সবুজ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই।

লাদাখ অভিযানে সত্য়েন দাস।

যদিও সত্যেনবাবুর এই অভিযানের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে আজ থেকে বছর খানেক আগেই। ২০১৪ সালে লাদাখ অভিযান সেরে আসার পরে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে দেনা চোকাতে। সময় লেগেছে পয়সাকড়ি জোগাড় করতে। তার পরেই ভেবেছেন পাকিস্তানের কথা। আর এর মধ্যেই ঘটে গিয়েছে পুলওয়ামায় ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী জঙ্গিহামলা। শহিদ হয়েছেন ৪৪ ভারতীয় সেনা। এর পরে ভারতীয় বায়ুসেনার প্রত্যাঘাতে গুঁড়িয়ে গিয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোটের জইশ জঙ্গি শিবির।

সব মিলিয়ে টানটান পরিস্থিতি দু’দেশের রাজনীতিতে। সীমান্তে মুহুর্মুহু চলছে গুলির লড়াই। এই পরিস্থিতিতে সত্যেনবাবু বলছেন, সব ঠিক থাকলে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই পাড়ি দেবেন পাকিস্তান। মৈত্রীর বার্তা নিয়ে সামিল হবেন এক অভূতপূর্ব অভিযানে।

কী মনে হচ্ছে, এই অবস্থায় ভিসা পাবেন? প্রশ্ন করতেই এল উত্তরে। উত্তরে খানিক বিস্ময়ের ছাপ। “মৈত্রীর বার্তা নিয়ে সে দেশে যাব, দেবে না ভিসা! তা হলে আর কাকে দেবে?” এই তুমুল অস্থির সময়ে মৈত্রীর প্রস্তাব রাখার জন্য করা ভিসার আবেদন যে নাকচ হতে পারে, তা বিশ্বাসই করেন না সত্যেন।

পাকিস্তানে গিয়ে কী ভাবে এই মৈত্রীর বার্তা দেবেন সত্যেনবাবু? তিনি জানালেন, লাহোরে পৌঁছে, রিকশা রেখে, করাচি যাবেন তিনি। দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে। “আমি ওঁর খেলার খুবই ভক্ত ছিলাম। ওঁর এক জন অনুরাগী হিসেবে ওঁকে বলব, দেশ থেকে সন্ত্রাস দূর করতে, শান্তি ফিরিয়ে আনতে। ওঁকে বলব, দু’দেশই লড়ছে খাবারের জন্য, স্বাস্থ্যের জন্য, শিক্ষার জন্য। আমি দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষ। বেঁচে থাকার এই লড়াই আমায় রোজ লড়তে হয়। তাই আমি চাই, সেই লড়াইটাই জোরদার হোক। বড়জোর লড়াই হোক ক্রিকেটের মাঠে, ব্যাটবল নিয়ে। সীমান্তে কামান দেগে নয়। প্রতিবেশী দেশের এক জন সাধারণ ভক্ত হিসেবে আমার কথা নিশ্চয় শুনবেন উনি।”– সরলতম বিশ্বাসে কথাগুলো বলে চলেছেন সত্যেন।

দেখে নিন সত্যেন দাসের লাদাখ অভিযানের কিছু দৃশ্য।

কিন্তু লাদাখ অভিযান যতই সফল হোক। দু’দেশের কূটনীতি কি এতই সহজ! যদি এ সব কিছুই না শোনেন ইমরান খান? “তা হলেও কোনও ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। আমি খুব সাধারণ মানুষ। আমার সবটুকুই খুব সাধারণ। হয়তো স্বপ্নগুলোই একটু অসাধারণ। এই স্বপ্ন সফল যদি না-ও হয়, তা হলেও কোনও ক্ষতি হবে না তো। করলামই না হয়, আমার মতো করে ছোট্ট একটু চেষ্টা।”– মাটির ছাপ ধরা পড়ে সত্যেনের গলার স্বরে। এ স্বরে যতটা প্রত্যয় আছে, ততটাই সারল্য আছে। নেই কোনও লাভ-ক্ষতির হিসেব।

সত্যেনবাবু বলছিলেন, এ দেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বচ্ছ ভারত অভিযান চালাচ্ছেন। ও দেশে ইমরান খানও ‘গ্রিন পাকিস্তান’ প্রকল্প নিয়েছেন। তা হলে দু’দেশই যখন একই রকম দেশ চান, তা হলে যুদ্ধ কীসের নিজেদের মধ্যে?

পুলওয়ামার ঘটনায় তীব্র দুঃখ পেয়েছেন সত্যেন। যারা এই নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে ঘৃণা করেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের এতে কোন দোষ দেখছেন না তিনি। তাঁর কথায়, “দু’দেশেই গরিব খেটে খাওয়া মানুষ আছেন। যুদ্ধ হলে সব চেয়ে অসহায় তাঁরাই হবেন। দু’দেশেরই সেনা মারা যাবেন, যাঁরা কারও না কারও ঘরের মানুষ, কারও বাবা, কারও ছেলে, কারও স্বামী। তাঁদের কথা ভেবেই আমার এই যাত্রা।”

তাই ২০৭৭ কিলোমিটার পথ তিনি পাড়ি দেবেন শুধু শান্তিকে সম্বল করেই। তাঁর মৈত্রী যাত্রার স্মারক হিসেবে লাহোরেই তিনি রেখে দেবেন তাঁর রিকশা। তাঁর শান্তির বার্তা জড়িয়ে সেটি রয়ে যাবে সেখানেই। তার পরে মৈত্রী এক্সপ্রেসে করে ফিরবেন নিজের শহরে। কী বলছেন, সত্যেনের স্ত্রী এবং মেয়ে? “ওরা সব সময় আমার পাশে থাকে। কিন্তু এই বার পাকিস্তান নামটাই এদের ভয়ের কারণ। আর ওদের এই ভয়ই আমার জেদ আরও বাড়াচ্ছে। আমি যাবই। শত্রুদেশে বন্ধুত্বের হাত আমি বাড়াবই। আমার দিক থেকে এটুকু আমি করবই।”– অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসে তাঁর এই কথাগুলি। পরতে পরতে ফুটে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত সারল্য।

তবে বাইরের জগৎ মোটেই এত সরল নয়। তাই বাধা আসছে। আসছে ঠাট্টা-মজা। অনেকেই অট্টহাস্যে উড়িয়ে দিচ্ছেন সত্যেনের এই শান্তির অলীক যাত্রা। ব্যঙ্গ করছেন, ‘শান্তির দূত’ বলে। পরিচিত প্রবাদের মাধ্যমে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বড়বড় রাষ্ট্রনেতারা যেখানে সমস্যা মেটাতে পারেননি, সেখানে সত্যেন দাসের এই যাত্রা হাসির খোরাক ছাড়া আর কিছুই নয়।

যে লড়াই সহজ নয়।

হবে না-ই বা কেন। তাঁর জলপাই উর্দির বদলে আছে রংচটা লুঙ্গি। বিমানের টিকিটের বদলে আছে গীতাঞ্জলি মেট্রো স্টেশন থেকে রামগড় রুটে চালানো ভাঙাচোরা রিকশা। এই দিয়ে কি আর ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা মেটে! হয়তো মেটে না। কিন্তু আরও অনেক সাধারণ মানুষ, যাঁরা যুদ্ধ নয়, শান্তির পৃথিবী দেখতে চেয়েছেন, সন্ত্রাসবাদ নিকেশ করে সবুজশ্য়ামল পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন, তাঁদের কাছে সত্যেনের এই লডা়ইয়ের কোনও তুলনা নেই। আনত কুর্নিশ জানাচ্ছেন তাঁরা সত্যেনের স্বপ্নকে।

বছরের বাকি সময়ে রিকশা চালিয়ে হাতেগোনা উপার্জন। পাশে থেকেছেন বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীরা। পাশে থেকেছে পরিবার, স্থানীয় ক্লাব। সাধারণ বহু মানুষ এগিয়ে এসেছেন সত্যেনের এই অভূতপূর্ব অভিযানে সাহায্য করতে। সত্যেনের আশা, এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না।
Shares

Comments are closed.