বাবা-মা বাড়ির শিক্ষক হলে, শিক্ষকরাও স্কুলের বাবা-মা! ‘এক্সচেঞ্জ অফার’-সহ বার্তা দিলেন সৌনক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    এক্সচেঞ্জ অফার। অর্থাৎ পুরনো জিনিস বদলে নতুন জিনিস কেনার সুযোগ। কিন্তু পুরনো জিনিসের মতোই কি পুরনো মানুষ, পুরনো স্মৃতি, পুরনো সম্পর্কেরাও বাতিল হয়ে যায়? সেসবও কি তখন নতুনের রঙে বদলে ফেলা যায়? নাকি নবীন-প্রবীণ দুইয়ের মেলবন্ধনেই সৃষ্টি হয় নতুন দিনের আলো।

    “যে পথ দিয়ে চলে এলি, সে পথ এখন ভুলে গেলি —
    কেমন করে ফিরবি তাহার দ্বারে, মন মন রে আমার।”

    রবি ঠাকুরের লাইনগুলো মনে পড়ে ?

    যারা আমাদের ছোট থেকে বড় করে তোলেন, যাদের জন্যই আমরা মানুষের মতো মানুষ হই আমরা কি তাঁদের ঋণ মনে রাখি? আদৌ ঋণস্বীকার করি? মানুষ হওয়ার ঋণ পূরণ যদিও হয় না। তবু যে বাবা-মা কিংবা স্কুলের শিক্ষক আমাদের এককালের আদর্শ ছিলেন, যাঁদের জন্যই আমরা বড় হই, অনেক সময়েই তাঁদের আমরা আর সময় দিই না পরে।

    আমরা কর্মজীবনে প্রবেশ করে ফোন করেও জিজ্ঞেস করি না “স্যার, কেমন আছেন?”

    সেই প্রাণের টান হারিয়ে যায়। কিন্তু কখনও কখনও রক্তের সম্পর্কের থেকে ভালবাসা ও স্নেহের সম্পর্ক বড় হয়ে ওঠে। আরও বেশি ভরসার হয়ে ওঠে। সে রকমই এক সহজ সুন্দর অনাবিল গল্প বলেছে ‘এক্সচেঞ্জ অফার’ ছবিটি। পরিচালক সৌনক মিত্র।

    সৌনক বলছিলেন, “আমি অনেক দিনই বিজ্ঞাপন ফিল্ম বানিয়েছি। এবার শর্ট ফিল্ম বানালাম, সেই ছোট গল্প বলার নস্ট্যালজিয়া থেকে। আমরা বাঙালিরা তো তপন সিনহা, সত্যজিৎ রায়, হৃষিকেশ মুখার্জীর ছবি দেখে বড় হয়েছি। সেই ভাবনা থেকেই আমার চেষ্টা ছিল মৌলিক চিত্রনাট্য ও মৌলিক গল্প নিয়ে ছবি করার। যাতে ছোট গল্পের রেশ থাকবে, শেষে একটা মন ভাল করা বার্তা থাকবে।”

    সৌনকের ছবির ভাষা হিন্দি। কিন্তু ছবির বেশিরভাগ অংশ সৌনক নির্বাক রেখেছেন পরীক্ষামূলক ভাবে। মনযোগ দিয়ে এ ছবিটা দেখলে অনেকেরই চোখে জল এসে যাবে। সৌনকের কথায়, “আজকাল একটা ট্রেন্ড এসেছে বাংলা ছবিতে, সেমি-পর্ন বা হাফ-ন্যুড ছবি বানানো। যেগুলোর ভিউ প্রথম দিকে বেশি হয় কিন্তু পরে আর এগোয় না। বাঙালির এত সমৃদ্ধ সাহিত্য ভাণ্ডার, যেখানে এককালে বাংলা ছবির গল্প হিন্দিতে হত, সেখানে বাঙালির এই অবস্থা কেন হল?”

    এসবের মধ্যেও এই ‘এক্সচেঞ্জ অফার’ ছবিটা মানুষ দেখে পুরনো সংস্কৃতি ফিরে পাচ্ছেন বহু মানুষ সেটাই শৌনকের প্রাপ্তি বলে জানালেন তিনি। তাঁর মতে, ছবি হবে তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’র মতো। যা রিকশাচালকেরও যেমন ভাল লাগবে তেমনি সমাজের কোনও উচ্চস্তরের মানুষেরও ভাল লাগবে।

    ‘এক্সচেঞ্জ অফার’ ছবির বার্তা হল, আমরা বাবা-মার প্রতি যে দায়িত্ব পালন করি, সেই কর্তব্য আমরা স্কুলের শিক্ষকদের জন্যও করতে পারি। করা উচিত। কিন্তু আমরা সেটা করি না। কেউ যদি করে, সেই বার্তা দেওয়ার জন্যই এই ছবিটা করা। মানুষের ভাল লেগেছে এ ছবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

    তবে হিন্দিতে কেন ছবিটি করলেন সৌনক? তাঁর উত্তর, “ছবির যে ভাবনা সেটা কোনও আঞ্চলিক ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বব্যাপী এই ভাবনা প্রযোজ্য। বাংলার দর্শককে ঐ সস্তার জিনিস নিয়ে মাতামাতি করার থেকে আগে বেরোতে হবে। তবেই বাংলায় ভাল কন্টেন্ট পাওয়া যাবে। তাছাড়া কেন অবাঙালি প্রযোজকদের কাছে তো সবই বিকিয়ে যাচ্ছেষ নিজেদের মৌলিক চিন্তায় ভালো গল্প হোক, যাতে এই বাংলা সাহিত্য না জানা খবরদারি করা প্রযোজকদের একঘরে করা যায় ভালো ছবির স্বার্থে। বাংলা ভাষা নিয়ে তখনই জোর দিয়ে ভাবা যাবে।”

    ছবির মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন প্রখ্যাত বলিউড থিয়েটার অভিনেতা এম কে রায়না। ইনিই সেই অভিনেতা, যিনি যৌবনে ’27 Down’ ছবিতে রাখী গুলজারের নায়ক। যে ছবিটি তখনকার দিনে পুরস্কারপ্রাপ্ত। এমকে রায়ান কে ‘তারে জমিন পর’ ছবিতে দেখে সৌনক পছন্দ করেন।

    Hindi theatre | Irfinity

    পরিচালক বললেন “ছবিতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিবকুমারের চরিত্রে আমি অনুপম খের এবং এমকে রায়নার কথা ভাবি। কিন্তু অনুপম খের অনেক বেশি চেনা মুখ অনেক বেশি ব্যবহৃত হয়েছেন। ওঁর একটা কমেডি ইমেজও আছে, যেটা এরকম একাকীত্বে থাকা মানুষের সঙ্গে মেলাতে একটু অসুবিধা হতে পারে দর্শকদের। তাই মূলধারার কাজে কম ব্যবহৃত এমকে রায়ানকেই ভাবি শেষমেশ।”

    ছবির আর একটি চরিত্রে রয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনতা সুরেন্দ্র রাজন, যিনি বেশিরভাগ সময় হিমালয়ে থাকেন আজকাল। তিনি কাজ করেছেন এ ছবিতে একজন ভৃত্যের ভূমিকায়। কিন্তু তিনি বাড়ির অভিভাবকের মতো। শিক্ষক শিবকুমারের ছেলেবেলায় এই ছেলেটি কাজের লোক হিসেবে তাঁদের বাড়ি আসে। দু’জনে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এখন বিপত্নীক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিবকুমারের ছেলে বৌমা থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। তাই শিবকুমারের বন্ধু অভিভাবক এখন এই ভৃত্যই। যে রোলটি সুচারু ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সুরেন্দ্র রাজন।

    ছবির আর একটি গুরত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন তাহির সাব্বির। ধরমা প্রোডাকশানের কাজের ফাঁকে এই ছবিটি হাতছাড়া করেননি তিনি। এবং দুই বর্ষীয়ান অভিনেতার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন। এছাড়াও আরিয়ান, রোশনি ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীরা কাজ করেছেন।

    সুন্দর গল্প বলার গুণে সমৃদ্ধ ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘ফটিকচাঁদ’, ‘সফেদ হাতি’র মতো ছবি আমরা দেখেছি। ঠিক সেরকম মৌলিক সুন্দর সহজ গল্প বলেও যে এ যুগে ভাল ছবি বানানো যায়, করে দেখালেন পরিচালক সৌনক মিত্র।

    ছবিতে শিবকুমার একটি কম্পিউটার ব্যবহার করেন ছেলের স্মৃতি হিসেবে। একদিন তিনি কবিতা লিখছিলেন কম্পিউটারে, কিন্তু হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় সেটা। ছেলেকে জানান। ছেলে ল্যাপটপ কিনে পাঠাতে চান। কিন্তু তাতে রাজি হন না বৃদ্ধ বাবা। কারণ শিবকুমার মনে করেন, তিনি ও তাঁর ছেলে ঋষভের মধ্যেকার একমাত্র সংযোগসূত্র এই পুরনো কম্পিউটার। তাই কম্পিউটার সারাতে আসেন অমিত বলে একজন। কিন্তু অমিত আর শিবকুমারের মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক জন্ম নেয়। সেই সম্পর্কের গল্পই বলছে ‘এক্সচেঞ্জ অফার’।

    ছবির সংলাপ লিখেছেন বিনয় শুক্লা। চিত্রগ্রহণে বরুণ মুখোপাধ্যায়। আন্তর্জাতিক এই ছবিটি দেখা যাচ্ছে ইউটিউব, হটস্টার, আমাজন প্রাইম, এম এক্স প্লেয়ার প্ল্যাটফর্মে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More