রবিবার, আগস্ট ১৮

কোন্ অচেনার ধারে

অংশুমান কর

“চোখের জলের হয় না কোনও রঙ, তবু কত রঙের ছবি আছে আঁকা”— এই গানটা বাজত পুজো প্যান্ডেলে তখন যখন আমাদের একটু একটু পাখা গজাচ্ছে, কবিতা-ছবি-গান সবই বেশ বুঝে গেছি এই রকম একটা ধারণা দৃঢ়মূল হয়ে গেঁথে যাচ্ছে মনে। তো, সেই সময়ে, কিশোরকুমারকে মনে হত মাচার গায়ক, ওঁর বাংলা গানগুলোর লিরিককে মনে হত ‘ন্যাকা ন্যাকা’।  ‘চোখের জলের হয় না কোনও রঙ’ এই গানটি প্রথম শুনেও আমার ঠিক এই রকম একটি ধারণাই হয়েছিল।  বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য ভেঙে পড়ে এইসব ভুলভাল ধারণা। আজ বুঝি, কত বড় সত্য লুকিয়ে আছে এই কথাগুলোর মধ্যে; বুঝি যে, কিশোরকুমারের ঈষৎ নির্লিপ্ত অনায়াস গায়কি কীভাবে ছুঁয়ে দিয়েছে সেই  সত্যের অঙ্গবস্ত্র।

#

সত্যিই, রঙহীন চোখের জলের মধ্যে লুকোনো থাকে কতই না রঙ, কতই না সংবেদ, কতই না অভিজ্ঞান! অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এসে আজ মনে হয় আমিও তো বর্ণহীন অশ্রুর স্তরে স্তরে কত বিচিত্র রঙের ছবিই না আঁকা থাকতে দেখেছি! এর মধ্যে দু’একটি অশ্রুপাতের ছবি একেবারে গেঁথে গেছে মনের মধ্যে। বাবার মৃতদেহ নিয়ে মধ্যরাত্রে বাড়ি ঢোকার সময় যে আর্তচিৎকার এসেছিল মায়ের কণ্ঠ চিরে, সেই চিৎকার আর মাত্র চুয়াল্লিশ বছরের এক নারীর দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারে ঝরতে থাকা অশ্রু আজও খ্যাপা ষাঁড়ের মতো আমায় তাড়া করে ফেরে। সেইদিন আমি শান্ত ছিলাম, কিন্তু এখন যখনই মনে পড়ে যায় ওই দৃশ্য, আমি শুনতে পাই সেই বুক ফাটা কান্না; কাজ ভুলে যাই, পথ হারাই, হিসেবের জীবনে ফিরে আসতে সময় লাগে। তবে দু’একবার এভাবে ভবিষ্যতে নয়, অশ্রুপাত আমাকে পতনের বর্তমানেই বিহ্বল আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল।  তখন সদ্য এম এ পাশ করে যোগ দিয়েছি বরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে। চলছে এইচ এস পরীক্ষার ইনভিজিলেশন ডিউটি। একদিন আমার ডিউটি পড়ল মেয়েদের একটি ঘরে। গুটিকতক মেয়ে, আমি তাদের পাহারাদার। আমার সঙ্গে কোনও শিক্ষক সহকর্মী নেই, আছেন এক মহিলা অশিক্ষক সহকর্মী।  তিনি সই করতে পারবেন না, কিন্তু আমাকে সঙ্গ দেবেন। তো, সেই সহকর্মী কী একটি কাজে দোতলার সেই ঘরটি থেকে নেমে গেছেন নীচের অফিস-ঘরে।  পাহারাদার হিসেবে আমি তখন একা, অরক্ষিত। দেখলাম, একদম সামনের বেঞ্চে বসে দু’টি মেয়ে কথা বলে চলেছে নিরন্তর। প্রায় একই রকম দেখতে দু’টি মেয়ে, মনে হচ্ছিল যমজ। নিষেধ করলাম কথা বলতে। সেকেন্ড কয়েক চুপ। তারপর আবার শুরু হল কথা। চলতেই থাকল গুনগুন। রাগ উঠে গেল মাথায়। কিচ্ছু না বলে ওই দুই ছাত্রীর একজনের খাতা কেড়ে নিলাম।  মেয়েটি কিছুই বলল না।  চুপচাপ বসে রইল। শুধু চোখ দিয়ে অবিরল ঝরতে লাগল জল। আমি থতমত। কী করব, কী করা উচিত বুঝেই উঠতে পারছিলাম না।  এদিকে সময় যেতে লাগল। আমি মনে মনে চাইছিলাম যে, মেয়েটি একবার বলুক, ‘স্যার, খাতাটা দিন’, অমনি, তক্ষুনি, দিয়ে দেব খাতা। কিন্তু, সে মেয়ে কিছুই বলে না। শুধু তার চোখের জলে লাগে জোয়ার। একটি সতেরো-আঠেরো বছরের মেয়ের অশ্রুর যে এই রকম শক্তি থাকতে পারে, বুঝতেই পারিনি আগে। কোথায় আমি তার খাতা একটুখানিকের জন্য কেড়ে নিয়ে, তাকে জব্দ করব ভেবেছিলাম, উলটে স্রেফ কেঁদেই সে আমাকে জব্দ করেছিল। সে যাত্রা ওই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন আমার সেই অশিক্ষক সহকর্মী।

আরও পড়ুন: ব্লগ: সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে…

#

চোখের জলের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ আমাকে পরেও করতে হয়েছে। যেমন, পৃথিবীর আর সব কিছু আমি সহ্য করতে পারি, কিন্তু আমার মেয়ের চোখে জল আমি আজও সহ্য করতে পারি না। আজ পর্যন্ত ওকে আমি বকেছি হাতে গুনে দু’তিনবার।  তবে ওকে প্রথম বকা দেওয়ার দৃশ্যটি  আমি ভুলতে পারি না কিছুতেই। তখন আমি পড়াই ঝাড়গ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজে। থাকি ওই কলেজ সংলগ্ন কোয়াটার্সেই। মেয়ের বয়স তখন মাস আটেক। একদিন সকালে দেখি, আমার বেশ জরুরি কিছু কাগজপত্র টেনে নিয়ে বসে, তিনি মনের সুখে একটি ঢাকনা-ভাঙা কলম নিয়ে তার ওপর আঁকিবুকি কাটছেন। ওই বয়সের শিশুরা ভাষার কতটুকু বোঝে জানি না, কিন্তু যেই মৃদু একটা ধমক দিয়ে তাকে বলেছি, ‘কী হচ্ছে কী’, ব্যাস, অমনি তার কলম থেমে যায়, গুম মেরে বসে থাকে সে, নড়েও না, চড়েও না, আর কয়েক সেকেন্ড পরে তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা মুক্তোর দানা।  সেই দুর্লভ মুক্তোর দানাটি নিয়ে আমি তখন কী করি বুঝেই উঠতে পারছি না! আমার ওপর সে আমার মেয়ের প্রথম অভিমান— সে তো এক অতিজাগতিক অনুভূতি, এক অমূল্য প্রাপ্তি। কিন্তু, অন্যদিকে আবার আমারই এক ধমকে জন্ম নিয়েছে ওই স্বচ্ছ মুক্তো— তাই ঠিক কী উপায়ে যে আদর করব ওই কোহিনূরের— বুঝেই উঠতে পারছিলাম না। শেষমেশ, কষ্ট আর আনন্দের এক যুগ্ম অনুভূতিতে সে অভিমানকে আমি বরণ করেছিলাম। সে মুক্তোর দানাটিকে করপুটে নিয়ে, তুলে রেখেছিলাম স্মৃতির সিন্দুকে। মাঝে মাঝে আজ সস্তা ন্যাকামোর উল্টোদিকে সে মুক্তোটিকে রাখি, নেড়েচেড়ে দেখি, পবিত্রতায় অবগাহন করি।

আরও পড়ুন: ব্লগ: পরীর দেশে বন্ধ দুয়ার দিই হানা

#

কেউ কেউ অবশ্য বলতে পারেন যে, অশ্রুপাত আসলে এক পাশুপত, যুক্তি-বুদ্ধির অভাব ঢেকে দেয় এই মহা অস্ত্র, যে কোনও পাথরহৃদয়কেও মুহূর্তে বধ করতে পারে । মনে আছে যে, জীবনে প্রথম যে একাঙ্ক নাটকটি লিখেছিলাম, তার শেষে ছিল নায়ক-নায়িকার বিচ্ছেদ আর অশ্রুপাত। একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল এই নাটক, কিন্তু বিচারকদের একজন আমাকে বলেছিলেন, ‘শেষে দর্শক ভোলাবার জন্য অশ্রুর সাহায্য নিতে হল?’ কথাটি ভুলিনি।  শিল্পকর্মে অশ্রুপাত যে কখনও কখনও অশ্লীল হতে পারে— বুঝেছিলাম সে কথাও। ঈষৎ লজ্জিতও হয়েছিলাম। যেমন ইলেভেনে পড়ার সময় লজ্জিত হতাম আমাদের পাড়াতুতো এক কাকিমাকে নিয়ে। তখন এত চ্যানেলের সমাহার ছিল না। সে শুধু দূরদর্শনের দিন। সন্ধেবেলা, শনিবারে সম্ভবত, পুরোনো বাংলা সিনেমা দেখানো হত। আর সিনেমা দেখতে বসে ওই কাকিমার দু’চোখ জুড়ে নামত বন্যা। যে কোনও চরিত্রের সামান্য কষ্টে বা অপমানে উতলা হত তাঁর হৃদয়। সিনেমা হলে অন্যদের সামনেও কেঁদে ফেলতেন তিনি। কী যে লজ্জা লাগত সেইসব মুহূর্তে! তাঁকে নিয়ে পাড়ার অন্য কাকিমা-জেঠিমারা হাসি-ঠাট্টা করতেন। টিকা-টিপন্নি কাটতেন। সেসব শুনতে শুনতে বুঝতে পারতাম যে, অশ্রুপাত কখনও কখনও সত্যিই বেশ লজ্জার, হয়তো বা অশ্লীলও। যুক্তিলব্ধ এই জ্ঞান আহরণ করা সত্ত্বেও আমার লেখাতে বারেবারে ফিরে ফিরে এসেছে অশ্রুপতন। যত বয়সে বেড়েছে এই সত্যও বুঝেছি যে, অশ্রু জীবনের এক অনিবার্য প্রয়োজন। মাঝে মাঝে আমার এটাও মনে হয় যে, অশ্রু আসলে বৃষ্টি। যতদিন এই পৃথিবীতে অশ্রুপাত হবে, ততদিন মানবজমিন পতিত থাকবে না। অন্যের বেদনায় দু’ফোঁটা চোখের জল যাঁরা ঝরিয়ে ফেলেন, তাঁরা আসলে কৃষিকাজের দেবদেবী, তাঁদের অশ্রুপাতে মানবজমিন হয় সুজলা-সুফলা। আজ তাই ওই কাকিমাকে  প্রণাম করতে ইচ্ছে করে। নত হতে ইচ্ছে করে ওঁর অনুভূতির তীব্রতার কাছে। তবে, অন্যের বেদনায় সকলে তো কাঁদতে পারেন না।  কখনও কখনও তো প্রিয়জনের মৃত্যুর পরে তাই অশ্রুপাতের জন্য ভাড়া করতে হয় লোক। কান্নাও বাঁধা থাকে সুরে; তৈরি হয় গান। কোথাও কোথাও অবশ্য, প্রিয়জনের বিয়োগের মতো কোনও বেদনাবিধুর পরিস্থিতি ব্যতীতই তৈরি হত কান্নার গান।  অশ্রু সেসব গানে জীবনের নানা অনুভূতি প্রকাশেরই এক স্বচ্ছ মাধ্যম, যেন ওপিঠের পারদবিহীন আয়না।

আরও পড়ুন : ব্লগ ব্লগ : প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম

#

এই লেখা শেষ করি এমন এক অশ্রুপাতের কথা দিয়ে যা ব্যাখ্যাতীত, অন্তত আমার কাছে। এই অশ্রু আমি প্রথম দেখেছিলাম কবি নির্মল হালদারের চোখে। তখন বারো ক্লাসের পড়া শেষ করে সদ্য পা রেখেছি পুরুলিয়ায়।  নির্মলদার সহজিয়া জীবনের আকর্ষণে অন্য অনেকের মতোই আমিও ভিড়ে গিয়েছি তাঁর গুণমুগ্ধদের দলে। তখনই প্রথম দেখি এক তরুণ কবির লেখা পড়ে নির্মলদা কাঁদছেন। অঝোরধারে জল ঝরছে তাঁর কপোল বেয়ে। পরেও দেখতাম ভালো গান শুনতে শুনতেও তিনি কেঁদে ফেলছেন। আমি একটু অবাকই হতাম তখন, এই অশ্রুপাতের কারণ বুঝতে পারতাম না।  ফিসফিস করে একদিন আমার কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে আমার এক বন্ধু বলেছিল যে, এটা একটা রোগ। কালে কালে এই রোগের শিকার যে হব আমিও তা সেদিন ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। কিন্তু আজ বেশ অনেক বছর ধরেই নির্মলদার রোগটি ধরেছে আমায়। এই তো কিছুদিন আগে বাসে করে কলকাতা থেকে ফিরছি। শুনছি জর্জ বিশ্বাসের “যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি”। যেই ওঁর আকাশের মতো কণ্ঠ ছুঁয়ে দিল ওই শব্দগুলোকে যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম ভুলিয়ে দিল তারে, আবার কোথা চলতে হবে গভীর অন্ধকারে”, অমনি কী যে হল, দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল জলের ধারা। সহযাত্রিণী আমাকে এই অবস্থায় দেখে কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, এদিকে আমি তখন ফোঁপাতে শুরু করেছি। গান থামলে আমার কান্নাও থামল। আমি সহযাত্রিণীকে প্রশ্ন করার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছে নিলাম অশ্রু। এই রকম আমার প্রায়ই হয় ভালো কবিতার লাইন পড়লে, নাটকের সংলাপ বা দৃশ্যের মাঝে, সিনেমার নিঃস্তব্ধতার মুখোমুখি হয়ে। কেন যে হয়, আজও ঠিক বুঝি না! যা আমি পারি না তা অন্য কেউ করে দিল— এই জয়ের আনন্দে, নাকি যা আমি পারলাম না তা অন্য কেউ করে দিল এই পরাজয়ের অনুভূতিতে, তা আজও স্পষ্ট নয় আমার কাছে। এইসব মুহূর্তে  আমার সব হিসেব-নিকেশ কেমন যেন গুলিয়ে যায়, মনে হয় যেন অনুভূতির এমন এক ভূখন্ডে গিয়ে পড়ছি যা আমার সম্পূর্ণ অচেনা। মনে হয়, “আমার তরী ছিল চেনার কূলে, বাঁধন যে তার গেল খুলে; তারে হাওয়ায় হাওয়ায় নিয়ে গেল কোন্‌ অচেনার ধারে”।

জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।  

Comments are closed.