মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

সপ্তাশেষে গেঁওখালি

  • 129
  •  
  •  
    129
    Shares

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

শীত চলে গিয়েছে প্রায়। ফুরফুরে ঠান্ডা। এখনই সেই সময়, যখন মাথার ওপর নীল আসমান পাঠায় সুদূরের নিমন্ত্রণ, বাতাসে জেগে ওঠে মন ব্যাকুল করা বাঁশির সুর। পেট্রোল ডিজেলের গন্ধকে উপেক্ষা করে নাকে আসে নলেন, পাটালি, পিঠের মিষ্টি সুবাস। আগুন গোলা সূর্যের তেজ এখন অনেক নরম।  সেই নরম রোদে সেঁকতে সেঁকতে কমলালেবুর কোয়ায় জিভ জারিয়ে নিতে নিতে বেরিয়ে পড়া যায় যে কোনও জায়গায়। দরকার নেই, তার জন্য কোনও নির্দিষ্ট ছক বা পরিকল্পনা। হোক না একটু বেহিসেবি ঘোরা, কর্ম বাস্তব জীবন থেকে কয়েক ঘণ্টার কর্মহীন কল্পজীবনে বিচরণ। আজকের বিচরণ ক্ষেত্র হোক পূর্ব মেদিনীপুরের গেঁওখালি।

গেঁওখালি নামটা ভারি মিষ্টি। এটা কোনও গ্রাম নয়। এটা আসলে নাটশাল মৌজা বা গ্রামের মধ্যে অবস্থিত এক গঞ্জ। এর অবস্থান রূপনারায়ণ ও হুগলি নদীর সঙ্গমস্থল। অপরূপ গেঁওখালি এক নদীবন্দরও বটে। কলকাতা বন্দর থেকে দূর দেশে পাড়ি দিচ্ছে বড় বড় জাহাজ গেঁওখালির ওপর দিয়ে। দুই নদীরের সঙ্গমস্থলে তিন জেলা মুখোমুখি – মেদিনীপুর (গেঁওখালি), হাওড়া (গাদিয়াড়া) আর দক্ষিণ ২৪ পরগণা (নুরপুর)।

গাদিয়াড়ার অন্য পারেই গেঁওখালি যেন পটে আঁকা ছবি। খেয়াঘাট পেরিয়ে বেশ চওড়া লাল মোরামের রাস্তা। পায়ে পায়ে অথবা একটা রিকশা নিয়ে গেঁওখালির রাস্তায় চক্কর মারা যায় অনায়াসে। বাসস্ট্যান্ড থেকে দু’কিলোমিটার দূরে হুগলি নদীর তীরে নির্মিত হয়েছে হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির জলসরবরাহ প্রকল্প। ভেতরে রয়েছে বিশাল বিশাল সুন্দর জলাধার। ঝাউয়ের ছায়ায় বনভোজনের এক আদর্শ জায়গা। আনন্দের খবর যে, পিকনিক করতে গেলে এখানে কোনও প্রবেশমূল্য লাগে না। সাধারণের কাছে এটা পি এইচ ই-এর মাঠ নামে পরিচিত। এরই পাশে গঙ্গার ধারে হলদিয়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৯৯৪ সালে ত্রিবেণী সঙ্গম টুরিস্ট কমপ্লেক্স বানিয়েছে। ফুলবাগান সহ টুরিস্ট কমপ্লেক্সটা এখানকার মুখ্য আকর্ষণ। বাংলোর বারান্দায় বসে জাহাজের আসা যাওয়া, ঢেউয়ের দোলা, দলবেঁধে সাদা বকের ওড়াউড়ি, জেলেদের মাছধরা, নদীর বুকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এক কথায় অসাধারণ। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মন চলে যাবে সুদূর অতীতে, প্রায় তিনশো বছর আগে।

কলকাতা পত্ত্নের আগে থেকে এই গঞ্জ এলাকা ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এর একটা মূল কারণ হল সেই আমলে গেঁওখালির সঙ্গে হিজলি বন্দরের এক নিবিড় যোগাযোগ ছিল।

সে সময়কার গেঁওখালির প্রাকৃতিক দৃশ্য ছিল অসাধারণ কারণ তখন গেঁওখালির পাশেই ছিল সমুদ্র। উনিশ শতকের শেষ দিকে ওড়িশা থেকে কলকাতা যেতে হলে জলপথে গেঁওখালি হয়ে যেতে হত। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭৩ সালে কাটা হিজলি টাইডাল ক্যানালের এক প্রান্ত ছিল কালীনগরের রসুলপুর নদীতে আর অন্য প্রান্ত ছিল গেঁওখালিতে। মাঝে হলদি নদী।

১৮৮৮ সালে খ্রিস্টান মিশনারি যাজক উইলিয়াম কেরি এই নদীপথেই এসেছিলেন গেঁওখালিতে ধর্মপ্রচার করতে। এছাড়া ব্যবসা বাণিজ্যও চলত এই নদীপথের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ পূর্ব রেলপথ হওয়ায় জলপথের ব্যবহার কমে যেতে শুরু করে। অব্যবহৃত থাকার কারণে হিজলি টাইডাল ক্যানাল বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। ফলে গঞ্জের রমরমাও কমে যেতে শুরু করে। তবে অতীত স্মৃতি বহন করে চলেছে সোম ও শুক্রবারের হাট। সকাল থেকে বারোটা পর্যন্ত চলে। শহুরে মানুষজনের কাছে গ্রামীন হাট একটা উপরি পাওনা। জাহাজের ভগ্নাবশেষ দেখতে গেলে গেঁওখালিতে যাওয়া যায়। চড়াতে পড়ে আছে অসংখ্য ভাঙা জাহাজের খোল।

এখানে আসাটা বেশ সহজ। ধর্মতলার সিএসটিসির বাস গুমটি থেকে নূরপুর ঘণ্টা দেড়েকের পথ। নূরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে সামান্য দূরে লঞ্চঘাট। লঞ্চে করে আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গেঁওখালি। এছাড়া ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, কুলপি, নামখানা প্রভৃতি জায়গা থেকেও সরকারি, বেসরকারি বাস যোগাযোগ রয়েছে নূরপুরের সঙ্গে। আবার অন্য ভাবে, মেচেদা থেকে বাসে মহিষাদল হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে গেঁওখালি সহজেই পৌঁছানো যায়।

ভিড়ভাট্টা, কোলাহল বাদ দিয়ে গেঁওখালি এখনও বেশ নিরিবিলি। উদার প্রকৃতি, অসংখ্য পাল তোলা নৌকার আনাগোনা, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, নদীর ধার ধরে হাঁটা সব মিলিয়ে গেঁওখালি নিটোল এক স্বপ্ন। এই স্বপ্নকে ছুঁতে চাইলে থাকতে হবে ত্রিবেণী সঙ্গম টুরিস্ট লজে। এটার পরিচালনা করে লিংকেজ টুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলস। কলকাতায় অফিস রয়েছে। সেখান থেকেই বুকিং করা হয়। কলকাতার এত কাছে কম খরচে স্বল্প অবসর কাটানোর আদর্শ জায়গা হল গেঁওখালি। যোগাযোগের দূরভাষ নম্বর – ০৩৩-২২৬৪৭৯৯৯। চলভাষ – ৯৮৩০১৫২১৬৯।

মীরপুর

গেঁওখালি থেকে মাইল দুয়েক দূরে রয়েছে এক বিদেশি পল্লি। গ্রাম বাংলায় ঘুরতে গিয়ে যদি হঠাৎ করে এরকম একট জায়গার সন্ধান পাওয়া যায় সেটা উপরি পাওনা বলেই মনে হয়। গ্রামটি আদ্যন্ত পর্তুগিজদের, তার অন্য নাম ফিরিঙ্গি পাড়া বা ফিরিঙ্গি পল্লি। পশ্চিমবঙ্গে এরকম গ্রাম বিরল বলা যেতে পারে।

এরকম প্রত্যন্ত জায়গায় এরকম একটা পাড়া গড়ে ওঠার পেছনের কারণ আছে। মহিষাদলের রাজারা পর্তুগিজ গোলন্দাজদের নিয়ে এসেছিলেন বর্গীদের আক্রমণ রোখার জন্য। মীরপুরে কিছু নিষ্কর জমি দিয়ে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দেন। গ্রামে রোম্যান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট দুই সম্প্রদায়ই আছে। ফলে তাদের আলাদা চার্চ ও আছে।

ক্যাথলিক ৮৫ টা পরিবার রয়েছে। গ্রামের কেন্দ্রে রয়েছে তাদের গির্জা। সুন্দর বাগান দিয়ে ঘেরা। গির্জাটির মাথায় লেখা রয়েছে – ‘দুঃখীজনের সান্তনাদায়িনী মারিয়ার গির্জা।’ কলকাতার মহামান্য ধর্মপাল ড. এল টি পিকাচিএস ১৯৭৫ সালের ২০ এপ্রিল গির্জাটির উদ্বোধন করেন। গ্রামবাসীদের পদবিই কেবল খ্রিস্টান। কিন্তু চালচলন, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক, সংস্কৃতি সবই বাঙালিয়ানায় ভরপুর। পর্তুগালের কোনও পর্তুগিজ আর নেই, রয়ে গিয়েছে তাদের রক্ত নিয়ে তাদের বংশধররা।

নাটশালা

জায়গাটা অত্যন্ত প্রাচীন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উৎখননের ফলে এখানে তাম্রলিপ্ত সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। আঠারো শতকেও রূপনারায়ণের তীরে নাটশালের জঙ্গল জুড়ে ছিল হিংস্র ও ভয়ংকর জন্তু-জানোয়ার। চিতাবাঘ, বুনোকুকুর, বুনো মোষ, হরিণ আর বিষধর সাপেদের অবাধ চলাফেরা। জঙ্গল এলাকায় বুনো মোষের অত্যাচার এত বেড়ে যায় যে কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত আমলারা গভর্নরের কাছে বারবার আবেদন জানান। ১৭৯১ সালে তমলুকের পাশে নাটশালে বেশ বড় একটা গঞ্জ গড়ে ওঠে।

বর্তমান নাটশালা রূপনারায়ণের পারে শান্ত নিরিবিলি এলাকা। গেঁওখালি থেকে দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। নদীর ধারে অনাবিল প্রকৃতির মাঝে সুন্দর পরিবেশে গড়ে উঠেছে নাটশাল শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম।  এখানকার একটা অন্যতম দর্শনীয় স্থান। স্বামী প্রেমানন্দ এখানে ১৯১৫ সালে এসেছিলেন এবং ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি, তিনদিন, এখানে ছিলেন। সেই বছরই এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয়। আশ্রমের ভেতরে চমৎকার রামকৃষ্ণ মন্দির আছে। রামকৃষ্ণদেবের মূর্তিটাও ভারি সুন্দর। পাশে রয়েছে শিবমন্দির। ফুল, ফল ও সবজির বাগান দিয়ে ঘেরা এই আশ্রম একটা স্কুলেরও পরিচালনা করে। পরিবেশটা এত মনোরম যে থেকে যেতে ইচ্ছে করে। থাকার ব্যবস্থার জন্য রয়েছে শান্তিধাম অতিথি ভবন। কিছু নিয়ম কানুন মেনে, আগে থেকে অনুমতি নিয়ে এলে তবেই থাকা যায়। বছরের যে কোনও সময়েই এখানে আসা যেতে পারে। ২০১৫ সালে রামকৃষ্ণদেবের ১৮০তম জন্মজয়ন্তী ও আশ্রমের শতবর্ষে একসঙ্গে পালন করা হয়েছে।

থাকার জন্য আশ্রমের দূরভাষ – ০৩২২৪২৮৯৬৩৩ এবং চলভাষ – ৯৯৩৩৬৯৮৪৭৬।

Comments are closed.