রবিবার, অক্টোবর ২০

দুঃস্বপ্নের প্রহর কাটিয়ে হাসপাতালে রুদ্র-রমেশ, কুন্তল ও বিপ্লব চিরঘুমে তুষারেই

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

না-ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন দুই সহ-আরোহী কুন্তল কাঁড়ার ও বিপ্লব বৈদ্য। ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনও রকমে ক্যাম্প-টু অবধি নামতে পেরেছিলেন বাকি দুই আরোহী রুদ্রপ্রসাদ হালদার ও রমেশ রায়।  শেষমেশ শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করে কাঠমাণ্ডু আনা হয় তাঁদের। হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে দু’জনেরই। ফ্রস্ট বাইটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাত ও পায়ের আঙুল। রমেশ রায় স্নো-ব্লাইন্ডনেসেও আক্রান্ত। মানসিক ভাবেও যে তুমুল ক্ষতবিক্ষত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরশু, বুধবার কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গ ছুঁয়ে নামছিল তাঁদের পাঁচ বাঙালি পর্বতারোহীর দলটি। কুন্তল ছাড়া বাকি চার সদস্য অর্থাৎ রুদ্রপ্রসাদ, রমেশ, বিপ্লব ও সাহাবুদ্দিন সামিট করতে পেরেছিলেন। সামিটের খুব অল্প নীচেই অসুস্থ হয়ে পড়েন কুন্তল, ফুরিয়ে যায় তাঁর অক্সিজেনও।

জানা গিয়েছে, বিপত্তির শুরু সেই থেকেই। একটি সূত্রের খবর, ১৪ তারিখ অর্থাৎ মঙ্গলবার রাতে ক্যাম্প ফোর থেকে বেরোনোর পরে সামিট মার্চ শুরুর সময় থেকেই খানিক পিছিয়ে পড়েন কুন্তল। শারীরিক ভাবে যথেষ্ট ফিট ছিলেন না তিনি। কুন্তল ধীরে চলায়, গোটা টিমই খানিক পিছিয়ে পড়ে। নষ্ট হয় অমূল্য কয়েক ঘণ্টা।

১৫ তারিখ সকালে রুদ্রপ্রসাদ, রমেশ, বিপ্লব ও সাহাবুদ্দিন সামিট করে নীচে নামতে শুরু করেন। ওই দিনই বেলা এগারোটা কুড়ি নাগাদ ব্রিটেনের একটি পর্বতারোহী দল তথা ‘মিশন পসিবেল’ কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট করে নির্মল পুর্জার নেতৃত্বে। তাঁরা সামিট করে নামতে শুরু করার ঘণ্টা তিনেকের মাথায় বিপ্লবকে দেখতে পান অসুস্থ অবস্থায় এবং উদ্ধার করে নীচে নামানোর চেষ্টা শুরু করেন। ৮৪৫০ মিটার উচ্চতায় ছিলেন বিপ্লব। দেড়শো মিটার মতো নীচে নামার পরে একই অবস্থায় পাওয়া যায় কুন্তলকে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কাঞ্চনজঙ্ঘার সামিট মার্চ পর্বতারোহণের জগতে অন্যতম কঠিন ও দীর্ঘ পথ বলে মনে করা হয়। শেষ অবধি শক্তি ধরে রাখা বেশ কঠিন বলেই জানিয়েছেন অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা। সেই সঙ্গে সমস্যা হয়, অক্সিজেনেরও। কারণ হিসেবমতো যতটা অক্সিজেন লাগার কথা, তার চেয়ে দু’টি বা একটি সিলিন্ডার বেশি রাখলেও, অনেক সময়েই হিসেবের চেয়ে বেশি সময় লাগায় অক্সিজেনের খামতি ঘটে আরোহীদের। ঠিক সেটাই হয়েছিল হাওড়ার কুন্তল কাঁড়ার ও বেলেঘাটার বিপ্লব বৈদ্যর সঙ্গে।

রুদ্রপ্রসাদের বন্ধু এবং সোনারপুর আরোহী ক্লাবের সদস্য চন্দন বিশ্বাস জানান, ওই দিন বেলা ১১:৪৩-এ লাস্ট লোকেশন পাওয়া গিয়েছিল দলের সঙ্গে থাকা জিপিএস যন্ত্রের। তখন সামিট থেকে ৪৩ মিটার নীচে ছিলেন অভিযাত্রীরা। তার আগের লোকেশন ছিল চার ঘণ্টা আগে, সকাল ৭:৪৩ মিনিটে৷ এর পরে কোনও রকম আপডেট ছিল না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। মনে করা হচ্ছিল জিপিএস ট্র্যাকার ডিভাইসের চার্জ শেষ হয়ে গেছে কিংবা কোনও ভাবে পড়ে গিয়েছে সেটি।

আরও পড়ুন: হিমালয়ে মৃত্যুমিছিল! মাকালু ও এভারেস্টে প্রাণ হারালেন এক সেনা-সহ দুই ভারতীয় আরোহী

বেলা তিনটে নাগাদ ওই যন্ত্র থেকে এসওএস বার্তা আসে রুদ্রপ্রসাদের তরফে। ৮২৭১ মিটারে তখন অবস্থান করছিল যন্ত্র। অর্থাৎ নির্মল পুর্জা যেখানে পেয়েছিলেন বিপ্লব ও কুন্তলকে, সেই জায়গা থেকে খুব বেশি দূরে ছিলেন না তিনি। সেই এসওএস বার্তায় জানানো হয়, কুন্তল অত্যন্ত অসুস্থ। এখুনি উদ্ধার না করলে বাঁচানো যাবে না। উদ্ধার প্রয়োজন বিপ্লবেরও। খানিক পরে ফের জানানো হয়, টাকার চিন্তা না করে যেন উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়। নইলে দু’টো প্রাণই বাঁচানো যাবে না।

বার্তা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় ওঁদের আরোহণ আয়োজক সংস্থা ‘পিক প্রোমোশন’ এবং উদ্ধারকারী সংস্থা ‘গ্লোবাল রেসকিউ’-এর সঙ্গে। একটি সূত্রের দাবি, গ্লোবাল রেসকিউয়ের তরফে খবর পেয়েই ব্রিটেনের পর্বতারোহী দল এবং ‘মিশন পসিবেল’ প্রোজেক্টের দলনেতা নির্মল পুর্জা উদ্ধার কাজ শুরু করেন কুন্তল ও বিপ্লবের। নির্মল পুর্জার ফেসবুক পোস্টে জানা যায়, তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা কী ভাবে শেষমেশ ব্যর্থ হয়। নিজেদের সব অক্সিজেন দিয়ে দেওয়ার পরেও, দুই মৃতপ্রায় আরোহী কুন্তল ও বিপ্লবকে কয়েকশো মিটার নামাতে পারলেও, শেষ রক্ষা হয়নি শেষমেশ। আট হাজার মিটারের ওপরেই প্রাণ হারান কুন্তল ও বিপ্লব– দু’জনেই।

নির্মল পুর্জার আক্ষেপ, তিনি ১৫ তারিখ অর্থাৎ বুধবার রাত পর্যন্ত একাধিক বার নীচের ক্যাম্প থেকে সাহায্য চেয়ে পাঠালেও পাননি। তিনি লিখেছেন, প্রায় ৫০ জন আরোহী ওই সময়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে থাকলেও, তাঁর বার্তা পেয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। এলে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হতো দু’জনকেই। ১৬ তারিখ সকালে কুন্তল ও বিপ্লব দু’জনেই মারা যান বলে জানিয়েছেন নির্মল পুর্জা। হাই অলটিটিউড সিকনেসের একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছে পালমোনারি ইডিমায় (ফুসফুসে জল জমে যাওয়া) আক্রান্ত হয়েছিলেন তাঁরা।

আরও পড়ুন: কুন্তল-বিপ্লবকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেছিলেন বিখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুর্জা! তার পর…

অভিজ্ঞ আরোহীরা অবশ্য বলছেন, কাঞ্চনজঙ্ঘার কঠিন ও দীর্ঘ সামিট পুশের পরে খুব কম আরোহীরই শরীর সম্পূর্ণ ফিট থাকে, ফের উদ্ধারকাজের জন্য ওপরে ওঠার মতো। গড়পড়তা অভিযাত্রীদের বেশির ভাগই বিধ্বস্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। নির্মল পুর্জা ও তাঁর দল সাত মাসে ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গ ছোঁয়ার কঠিনতম অভিযানে বেরিয়েছেন। কাঞ্চনজঙ্ঘার ঠিক আগেই কয়েকটি শৃঙ্গ ছোঁয়া হয়ে গিয়েছে তাঁদের। ফলে তাঁর ও তাঁর দলের সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস বাকিদের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

রুদ্রপ্রসাদ ও রমেশ এখনও ট্রমায় রয়েছেন। এই বিষয় নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে পারেননি। তবে প্রাথমিক ভাবে এটাই জানা গিয়েছে, নিজেদের সাধ্যের অতিরিক্ত চেষ্টা করার পরেই তাঁদের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি কুন্তল ও বিপ্লবকে উদ্ধার করার। তাঁদের অক্সিজেনও ফুরিয়ে এসেছিল। চটজলদি এসওএস পাঠান রুদ্রপ্রসাদ। উদ্ধারের জন্য সতর্কবার্তা পাঠান। রমেশের শারীরিক শক্তিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ওই দিন অর্থাৎ বুধবার তিনিও কোনও রকমে ধুঁকতে ধুঁকতে ক্যাম্প ফোরে পৌঁছন রাত দশটায়।

অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা বলছেন, আট হাজার মিটার উচ্চতায় প্রকৃতি এতই প্রতিকূল থাকে, কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো একটা শৃঙ্গ আরোহণের পরে অভিযাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এতই বিধ্বস্ত থাকে, যে ওই মুহূর্তে কী করা উচিত, তার আন্দাজ সমতল থেকে পাওয়া অসম্ভব। ঘটনাক্রম যে দিকে ইঙ্গিত করছে, সহ-অভিযাত্রীদের ‘ছেড়ে নেমে চলে আসা’র মতো ঘটনাকে দায়ী করা হলেও, ওই পরিস্থিতিতে ওই সিদ্ধান্ত না নিলে বাংলা হয়তো দু’জনের জায়গায় চার জন বা পাঁচ জন অভিযাত্রীকে হারাত।

(বাঁ দিক থেকে) বিপ্লব, কুন্তল, রুদ্রপ্রসাদ, রমেশ।

দলের পঞ্চম সদস্য, শেখ সাহাবুদ্দিন শারীরিক ভাবে তুলনামূলক সুস্থ থাকায়, তিনি বেসক্যাম্পে নেমে যান বৃহস্পতিবারই। ক্যাম্প টু-তে থেকে যান অসুস্থ রুদ্রপ্রসাদ ও রমেশ। শুক্রবার ক্যাম্প টু থেকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয় তাঁদের দু’জনকে।

ইতিমধ্যেই কাঠমাণ্ডু পৌঁছেছেন সোনারপুর আরোহী ক্লাবের দুই সদস্য চন্দন বিশ্বাস ও রাহুল হালদার। হাওড়ার পর্বতারোহণ ক্লাবের তরফে পৌঁছেছেন পর্বতারোহী মলয় মুখোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুবকল্যাণ দফতরের পর্বতারোহণ শাখার মুখ্য উপদেষ্টা দেবদাস নন্দীও। বিপ্লব ও কুন্তলের দেহ উদ্ধার করে নামানোর ব্যাপারে সরকারি স্তরে ব্যবস্থা করছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন…

শেরপা নেই, আবহাওয়া খারাপ! উদ্ধারকাজ নিয়ে টানাপড়েন, তুষাররাজ্যেই কি হারিয়ে গেলেন দীপঙ্কর!

Comments are closed.