রাম মন্দির, কতটা কৃতিত্ব নরেন্দ্র মোদীর?

ভূমি পুজোর প্রধান পুরোহিতের ভূমিকা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূল ফোকাসটাই ছিল তাঁর উপরে। এটা খুবই স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, অযোধ্যায় এই রাম মন্দির তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে কতটা কৃতিত্ব নরেন্দ্র মোদীর? ব্যক্তি নয়, মোদী সরকারেরই বা কতটা কৃতিত্ব?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

পিনাকপাণি ঘোষ

ভূমি পুজো হয়ে গেছে। এবার মন্দির নির্মাণ তো হবেই। সেই অর্থে বুধবারই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ছিল রামজন্মভূমি আন্দোলনের বিজয় দিবস। এটা ঠিক যে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিনেই জয় মিলে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরেও কিছুটা পথ চলা বাকি ছিল বলে সঙ্ঘ পরিবারের অনেকেই মন্দির তৈরির সূচনা না হওয়া পর্যন্ত ‘বিজয়’ শব্দটা ব্যবহার করতে চাননি। এর কারণ হিসেবে তাঁদের বক্তব্য ছিল, আদালতে জয় নয়, গোড়া থেকেই এই আন্দোলনের স্লোগান ছিল– ‘মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে।’

ভূমি পুজোর প্রধান পুরোহিতের ভূমিকা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূল ফোকাসটাই ছিল তাঁর উপরে। এটা খুবই স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, অযোধ্যায় এই রাম মন্দির তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে কতটা কৃতিত্ব নরেন্দ্র মোদীর? ব্যক্তি নয়, মোদী সরকারেরই বা কতটা কৃতিত্ব?

না, এমন কোনও প্রশ্ন ওঠেনি সঙ্ঘ পরিবারের অন্দরে। কিন্তু কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আগেই যেন জবাবটা অনুষ্ঠান স্থলেই শুনিয়ে দিয়েছেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। মনে করিয়ে দিয়েছেন বিশ-ত্রিশ বছরের আন্দোলনের কথা। মনে করিয়ে দিয়েছেন বালাসাহেব দেওরসের কথা, লালকৃষ্ণ আডবাণীর কথা। মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফোকাসে নরেন্দ্র মোদী থাকলেও অযোধ্যা জয়ের পিছনে অনেক বলিদানের কথা। ছোট্ট বক্তৃতার মধ্যেই স্মরণ করিয়েছেন অশোক সিংঘল, মহন্ত পরমহংসদাসের কথা। বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভূমি পুজোর সমারোহে ‘সুক্ষ্ম’ রূপে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা কেউই ইতিহাসে উপেক্ষিত নন।

সোমনাথ থেকে অযোধ্যা। ১৯৯০

এই কথাগুলি মনে করিয়ে দিতেই যেন মঞ্চে উঠেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। বক্তৃতায় যেটুকু কথা বলেছেন তার বেশিটাই ছিল অতীতকে স্মরণ করানো। কৃতিত্বের ভাগ যে অনেকটাই আরএসএস-এর সেটা চির স্মরণীয় করে রাখতেই সম্ভবত নিজেদের প্রচার বিমুখ বলা সংগঠন চেয়েছে ভূমি পুজোর ফলক-এ নরেন্দ্র মোদীর পরেই লেখা থাকুক সঙ্ঘ প্রধান মোহনরাও ভাগবতের নাম। আর সেটাই হয়েছে।

করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে আরএসএস। নাগপুরের সদর দফতর থেকে এক ভিডিও বার্তায় মোহন ভাগবতই বলেছিলেন, করোনা কালে ‘কার্যক্রম’ বন্ধ থাকবে কিন্তু ‘কাজ’ বন্ধ থাকবে না। সেই নির্দেশ মেনে চলতি বছরে আরএসএসের প্রধান দুই বার্ষিক অনুষ্ঠান ‘গুরুপূর্ণিমা’ ও ‘রাখিপূর্ণিমা’ পালন বড় আকারে পালন হয়নি। কিন্তু খোদ সঙ্ঘপ্রধানই অযোধ্যার ঐতিহাসিক ‘কার্যক্রম’-এ যোগ দিলেন। আর সেই যোগ দেওয়াটা যেন দেশ ও বিশ্বের কাছে সঙ্ঘের ‘কৃতিত্ব’ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, এই জয় আরএসএস-এর। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আরএসএসের একজন স্বয়ংসেবক। প্রাক্তন প্রচারক।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২।

একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ২০১৪ কিংবা ২০১৯ কোনও লোকসভা নির্বাচনেই কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির প্রচারে ‘রামমন্দির’ ছিল না। ৩৭০ ধারা বিলোপের কথাও ছিল না। কিন্তু আরএসএসের পুরনো দুই দাবি পূরণ করে কার্যত গুরুদক্ষিণাই দিয়েছেন সঙ্ঘের প্রাক্তন প্রচার‌ক নরেন্দ্র মোদী। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপির পরাজয়ের পরে অনেকেই বলেছিলেন, হিন্দুত্বের লাইন থেকে সরে আসাই ছিল হারের কারণ। সেই সময়ে জোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় সেই লাইন নেওয়া সম্ভবই ছিল না বাজপেয়ীর পক্ষে। তাই অপেক্ষা করতে হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের জন্য। শক্তিশালী সরকারের জন্য। আর এই শক্তিশালী সরকারের স্বপ্নটা দেখেছিলেন বালাসাহেব দেওরস।

আরএসএস-এর তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক মধুকর দত্তাত্রয় দেওরস বালাসাহেব নামেই পরিচিত সঙ্ঘ পরিবারে। কলকাতা থেকে প্রচারক জীবন শুরু করা দেওরসই রামমন্দির আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর আমলেই সঙ্ঘ রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জনসঙ্ঘকে সমর্থন জানানো থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি গঠন সবই দেওরসের আমলে। জানা যায়, আটের  দশকের গোড়ার দিকে এলাহাবাদে সঙ্ঘের প্রচারক বৈঠক হচ্ছিল। তারই ফাঁকে দেওরস জিজ্ঞাসা করেন, “শুনছি, অযোধ্যায় রামলালার মন্দিরে তালা লাগানো পড়ে আছে?” উত্তরে ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা প্রচারক ‘হ্যাঁ’ বলতেই দেওরস প্রশ্নের আকারে ছুঁড়ে দেন নির্দেশ– “কত দিন তালা লাগানো থাকবে?”

বালাসাহেব দেওরস।

সেটাই ছিল শুরু। বুধবার সেই কথা মনে করিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, আন্দোলন শুরু করার আগেই দেওরসজি বলে দিয়েছিলেন যে, এই আন্দোলনের জন্য কুড়ি-তিরিশ বছর সময় লাগবে। তিনি বলেন, “দেওরসজির কথা শুনে কোমর বেঁধেই বিশ-ত্রিশ বছর লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। তাঁর সেই কথার পর আজ ত্রিশ তম বছরের শুরু। কী অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ!” ছ’বছরের নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে ভূমি পুজোর স্বপ্ন সাকার হলেও এই মন্দিরের ভিত যে কুড়ি-তিরিশ বছরের লড়াই সেটাই যেন স্মরণ করালেন মোহন ভাগবত।

১৯৭৩ থেকে ১৯৯৩। কুড়ি বছর সঙ্ঘপ্রধান ছিলেন দেওরস। জরুরি অবস্থার সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে আন্দোলন দিয়েই শুরু হয় তাঁর কার্যকাল। তাঁর সময়েই সঙ্ঘের প্রথম সারির প্রচারক হিসেবে উত্থান মোহন ভাগবত থেকে নরেন্দ্র মোদীদের। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যার বিতর্কিত সৌধ ভাঙার ইতিহাস হয়তো অনেকের মনে আছে। কিন্তু তার আগে একের পর এক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশজুড়ে রাম-ভক্তি গড়ে তুলেছিলেন দেওরস। কারণ, রাম কোনও কালেই গোটা দেশে সমান জনপ্রিয় ছিলেন না। এই বাংলায় তো নয়ই। করসেবা, রামরথ যাত্রা, রাম কলস যাত্রা, রাম শিলা পূজন এমন অনেক কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন তিনি। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসেন। তার পরেই অযোধ্যার রাম মন্দির নির্মাণের দাবি গোটা দেশের কাছে পরিচিত হয়। একদিন তা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে।

ইতিহাস এটা জানে যে, তখন গোটা দেশের খুব কম জায়গাতেই শক্তি ছিল বিজেপির। কিন্তু দেওরসের নির্দেশে আরএসএস স্বয়ংসেবকরাই কখনও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নামে, কখনও বজরঙ্গ দলের নামে রামমন্দির আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আবার তাঁরাই আড়াল থেকে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির কাজ করেছেন। দেওরস চেয়েছিলেন, সঙ্ঘ নয়, রাষ্ট্রশক্তিতে অংশগ্রহণ হোক সঙ্ঘ-শক্তির। তিনি সেটা দেখেও গিয়েছিলেন। প্রথম বাজপেয়ী সরকারের শপথের এক মাস পরে মৃত্যু হয় তাঁর।

সেই অর্থে আজ বিজেপি দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে ওঠাটাও ছিল বালাসাহেব দেওরসেরই স্বপ্ন। তাঁর আগে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ না নিয়েও রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতায়নের হওয়ার ভাবনা আসেনি আরএসএস-এর মধ্যে। এটা নিশ্চিত যে বিজেপির আজকের শক্তিশালী চেহারার জন্য নরেন্দ্র মোদীর কৃতিত্বও কম নয়। সেই স্বীকৃতিও বুধবার দিয়েছেন মোহন ভাগবত। সঙ্ঘের কৃতিত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোদীকে নিয়ে গর্বও প্রকাশ করেছেন। সরাসরি নাম না নিয়েও ভাগবত বলেছেন, এই মন্দির নি‌র্মাণ আত্মনির্ভর ভারত গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেবে। আর সেই ভারত গঠনের দায়িত্ব যাঁর কাঁধে সেই ‘সমর্থ’ হাতেই হল সূচনা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More