শচীন স্মৃতি ফিরিয়ে শারজার মরু ঝড়ে নায়ক স্যামসনই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অশোক মালহোত্রা

শারজা মানেই বহু স্মৃতির ভিড়। শারজা মানেই মিয়াঁদাদের সেই ছয় শেষ বলে চেতন শর্মার বোলিংয়ে। শারজা মানে শচীন তেন্ডুলকরের সেই মরুঝড়। বোলার ছিলেন শ্যেন ওয়ার্ন। সেই ওয়ার্ন মঙ্গলবারও মাঠে ছিলেন শারজায়, রাজস্থান দলের মেন্টর হিসেবে। শচীনের স্মৃতি ফিরল, আবারও। তবে একজন অনামী ভারতীয় ব্যাটসম্যানের হাত ধরে, সে সঞ্জু স্যামসন।

আহা! কী দারুণ ব্যাটিং, যেন বাইপাসের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। তার নামের পাশে ৭৪ রান একটা সংখ্যা মাত্র, কিন্তু এই ব্যাটিংয়ের মধ্যে অনেক আত্মবিশ্বাস, অনেক সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে ও। এনগিডি, চাওলা, চাহারদের স্কুল বোলারের স্তরে নামিয়ে ছেলেখেলা করেছে ফুটবলের শহর তিরুবন্ততপূরমের এই ২৫ বছরের ডানহাতি উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। তাঁকে হয়তো স্মিথরা যোগ্য সহায়তা করেছে, কিন্তু স্যামসনের এই ইনিংসও বহুদিন মনে রাখবে ক্রিকেট প্রেমীরা। আমার মনে হয় ঋষভ পন্থের থেকে চোখ সরিয়ে এই ছেলেটিকে আমরা যদি গ্রুমিং করতে পারি, তা হলে দেশের ক্রিকেটের ভাল হবে।

শারজার এই মাঠ দেখে মনে হয়েছে বাকি দুটি মাঠের থেকে রান ওঠে বেশি। শারজা বরাবরই রানের খনি। তবুও একটা দল ২১৭ রানের লক্ষ্যমাত্রা রাখলে বিপক্ষ দলের কাজটি কঠিন হয়ে যায়। তাই হয়েছে সুপার কিংসের। তারা শেষ করল ২০০ রানে, তাদের হার ১৬ রানে।

চেন্নাইয়ের দলগঠনেই পরিষ্কার তারা রক্ষ্মণাত্মক ক্রিকেট খেলছে। না হলে ধোনির মতো বিগহিটার কেন এই ম্যাচেও সাত নম্বরে নামবে। আগেরদিন কুরান খেলে দিয়েছে বলে প্রতি ম্যাচে তাই হবে, কেন বলল? ধোনির নামা উচিত চার নম্বরে, তা হলে চেন্নাইয়ের রাশ নিজেদের হাতে থাকবে। কারণ ধোনির মতো ব্যাটসম্যান ক্রিজে বেশিক্ষণ কাটানো মানে বিপক্ষের নাভিশ্বাস উঠবে। ধোনি থিতু হয়ে পরে বিগ শট মারতে পারবে, এটাই তো কৌশল হওয়া উচিত ছিল।

স্যামসনের সেই ঝোড়ো ইনিংস বহুদিন মনে থাকবে।

চেন্নাই দলে ভাই স্যাম কুরান, আর রাজস্থান দলে দাদা টম কুরান। শেষদিকে কেদারের উইকেট নিয়ে জয় আরও মসৃণ করেছে। তবে স্মিথদের দলের সেরা বোলার হরিয়ানার লেগস্পিনার রাহুল তেওটিয়া। শেষ ওভারে ফাফ ডু প্লেসির কাছে মার খেলেও তিন উইকেট পেয়েছে ৩৭ রানে।

চেন্নাইয়ের ব্যাটিংকে যে একটা পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, তার নাম ফাফ ডু প্লেসি। দক্ষিণ আফ্রিকার সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে দশ হাজার রানের মালিক যেভাবে শেষদিকে খেলে গেল, তাতে পিচে জুজু আছে, কেউ বলবে না। কিন্তু ধোনি আগে এলে ডু প্লেসি আরও আগে মারকুটে হতে পারত। এটাই চেন্নাই ক্যাপ্টেনকে বুঝতে হবে। সেরা অস্ত্র লুকিয়ে রাখলে চলবে না, কারণ এটা তো ২০ ওভারের ক্রিকেট।

ফাফের ব্যাটিংয়েও সেই মরু ঝড়। শেষমেশ রাজস্থানের শিরশিরানি করে ৩৭ বলে ৭২ রান করে থামলেন জোফরার বলে, না হলে এই ম্যাচ বেরিয়ে গেলে কিছু করার থাকত না। ধোনিও তো ২৯ রান করল মাত্র ১৭ বল খেলে। তার মধ্যে তিনটি ছয়, খেলা শেষে নিশ্চয়ই আফশোস করবে ম্যাচের এই কৌশলে।

স্টিভ স্মিথ (৪৭ বলে ৬৯), সঞ্জু স্যামসন (৩২ বলে ৭৪) ও জোফরা আর্চার (৮ বলে ২৭) এই তিন রাজস্থান ক্রিকেটার কীরকম বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছে, আমি সেই আলোচনায় পরে আসছি। আমি প্রথম প্রশ্নটি করতে চাই চেন্নাই সুপার কিংসের দলনায়ক ও ফ্রাঞ্চাইজি কর্তাদের। সত্যিই কী তারা চাপে রয়েছেন? না হলে জস হ্যাজেলউড এবং ইমরান তাহিরের মতো দুইজন বিশ্বখ্যাত বোলার ড্রেসিংরুমে বসে রয়েছেন, তাদের কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না?

গতবারের সেরা স্পিনার ছিল ইমরান, ওই ছেলেটি ডাগআউটে বসে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে, দেখতেও খারাপ লাগে। তা হলে তো ভাল পারফরম্যান্সের কোনও মানেই থাকল না। হ্যাজেলউড সদ্য সেরা ফর্ম দেখিয়েছে ওয়ান ডে সিরিজে, তাকে ব্যবহারের কেন ফায়দা নেব না? ভাবতেই খারাপ লাগছে, যে দলের ক্যাপ্টেন এম এস ধোনির মতো কিংবদন্তি, তার দলে এমন সিদ্ধান্ত মানা যায় না।

এই দলগঠনের পুরো ফায়দা নিয়েছে রাজস্থান। তাদের কেউ এত গুরুত্বই দেয়নি। বেন স্টোকস নেই, বাটলার খেলতে পারল না। স্টিভ স্মিথ খেলতে পারবে কিনা সেই নিয়ে সংশয় ছিল। তারপরেও এমন বড় স্কোর (২১৬/৭) অবাক করার মতোই বিষয়।

অবাক অবশ্য লাগবে না, যেরকম খেলেছে রাজস্থান রয়্যালসের তিন ব্যাটসম্যান। স্মিথ অভিজ্ঞতায় পূর্ণ, দেখলেই মনে হয় চ্যাম্পিয়ন। বরফশীতল স্নায়ু নিয়ে দারুণ শুরু করেছে। যার মধ্যে চারটি বাউন্ডারি ও একইসংখ্যক ওভার বাউন্ডারি মেরেছে।

আরও একজনের কথা বলতেই হবে, আমার তো মনে হয় চলতি আইপিএলের আবিষ্কার হতে চলেছেন সঞ্জু স্যামসন। আমি মাঠে থাকলে ইনিংস শেষে ওর হাতটা একবার দেখতে চাইতাম কোনও ধাতব রয়েছে কিনা, নয়টি ছক্কা মেরেছে, তাও আবার এনগিডি, চাওলার মতো বোলারদের। কাউকে রেহাই দেয়নি। স্যামসনের ব্যাটিং আতঙ্ক মনে হয় চেন্নাইয়ের বোলাররা রাতেও দেখবে! দানবের মতো ব্যাটিং করে ১৯ বলে ৫০ রান করেছে, তখনই নামের পাশে ছয়টি ছক্কা ও একটি চার। কোনও ব্যাটসম্যান ছয়েই করেছেন ৫৪ রান, আর চার মেরে সেটি নিয়ে গিয়েছে ৫৮ রানে, বহুদিন পরে এমন দেখলাম, যেখানে তার মোট রানই ৭৪।

আরও একজনের কথা না বললেই নয়, সে জোফরা আর্চার। আট বলে ২৭, চারটি ছয় ওরকম ইনিংস সব ব্যাটসম্যান স্বপ্নে দেখে, ওটাই কী সহজে খেলে দিল ছেলেটা।

আর্চারের ওই মেজাজই সারা ম্যাচে দেখিয়ে গেল রাজস্থানের ছেলেরা। যে দলটিকে কেউ পাত্তাই দেয়নি, তারাই প্রথম ম্যাচে বুঝিয়ে দিল লম্বা রেসের ঘোড়া। তারপর ওই দলে মেন্টর হিসেবে যোগ দিয়েছে শ্যেন ওয়ার্ন, ওর দেহের ভাষাও সংক্রামিত হয়েছে ছেলেদের মধ্যে। এই জয়ে সেটাই আরও একবার প্রমাণ হল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর : টসে জিতে প্রথম ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত চেন্নাইয়ের।
রাজস্থান রয়্যালস ২১৬/৭। স্যামসন ৭৪, স্মিথ ৬৯, আর্চার ২৭, স্যাম কুরান ৩/৩৩।
চেন্নাই সুপার কিংস : ২০০/৬।  ডু প্লেসি ৭২, ওয়াটসন ৩৩, ধোনি ২৯,  তেওটিয়া ৩/৩৭। রাজস্থান রয়্যালস জয়ী ১৬ রানে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More