বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবেন, প্রমিস ডে-তে সবুজ অঙ্গীকার দম্পতির

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি— নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” …এই লাইন যখন কবি সুকান্ত লিখেছিলেন, তখন বোধ হয় জানতেন না, এ পৃথিবী এক দিন সত্যিই শিশুর বাসযোগ্য থাকবে না আর। জানতেন না, এ পৃথিবীতে এক দিন শ্বাস নেওয়াই মুশকিল হবে, মুশকিল হবে ভেজালমুক্ত খাবার খেয়ে বড় হওয়া। এবং সেই সঙ্গে এটাও জানতেন না, তাঁর লিখে যাওয়া সেই দৃঢ় অঙ্গীকার রক্ষার জন্য কেউ ব্যয় করে দেবেন গোটা জীবনটাই!

সেবাস্তিয়াও সালগাদো এবং লেলিয়া দেলুইজ় ওয়ানিক সালগাদো– ব্রাজ়িলের এই দম্পতি এই অঙ্গীকারই করেছিলেন আজ থেকে প্রায় দু’দশক আগে, ১৯৯৮ সালে।

তখন সবে মাথা চারা দিচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের দৈত্য। বিশ্ব জুড়ে সে ক্ষয়ক্ষতি শুরু করে দিলেও, তার দাপট তখনও অতটা মারাত্মক ভাবে সামনে আসেনি। মুখে মুখে আলোচনারও বিষয় হয়ে ওঠেনি সেটা। কিন্তু সালগাদো দম্পতি এই বিষয়টি অনুভব করেছিলেন অন্য ভাবে।

ব্রাজ়িলের মিনাস গেরাইস এলাকায় জঙ্গল ঘেঁষে বাড়ি তাঁদের। চোখের সামনে দেখেছিলেন, বাড়ি-লাগোয়া রেন ফরেস্টের ঘনত্ব কেমন কমে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। শুরু হয়েছিল নির্বিচারে গাছ কাটা। সেই সঙ্গে প্রকোপ বেড়েছিল দাবানলের। “চোখের সামনে দেখলাম, ছোটোবেলায় যে সব পশু-পাখি প্রায়ই দেখতে পেতাম, তারা আর আসছে না আশপাশে। বুঝতে পারছিলাম, ওরা ঘরহারা হচ্ছে, মরে যাচ্ছে। কিন্তু ঝড়ের গতিতে শেষ হয়ে যাওয়া অরণ্য কী ভাবে ফিরিয়ে দেব ওদের!”– বলছিলেন পেশায় ফোটোগ্রাফার সেবাস্তিয়াও সালগাদো।

বদলের ছবি।

ঠিক করেছিলেন, যদি কিছু করতেই হয়, তা হলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অরণ্য ফিরিয়ে দেবেন বন্যপ্রাণীদের। কথায় বলে, সদিচ্ছা থাকলে সঙ্গীর অভাব হয় না। সেবাস্তিয়াওরও হল না। আর এ সঙ্গী নিছক কোনও সঙ্গী নন, একেবারে জীবনসঙ্গী। সেবাস্তিয়াওর স্বপ্নের হাত ধরলেন তাঁর স্ত্রী লেলিয়া।”ফেলে আসা ছোটোবেলা নিয়ে ও ভীষণ আক্ষেপ করত। ও যে আজ সফল ফোটোগ্রাফার, তার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল, ছোটোবেলায় ওর বাড়ি-লাগোয়া এই রেনফরেস্টের। এত দ্রুত সব কিছু বদলেছে, ও তাল মেলাতে পারেনি। আচমকা অনেক প্রাণীও হারিয়েছে, যারা ওর বন্ধুর মতো ছিল। এই হারিয়ে যাওয়া জঙ্গল নিয়ে আক্ষেপ করতে করতে আমি ওকে ভেঙে পড়তেও দেখেছি অনেক বার। তখনই ঠিক করেছিলাম, ওর পাশে দাঁড়াব।”– বলেন লেলিয়া।

লেলিয়াই প্রস্তাব দেন, নতুন করে জঙ্গল তৈরি করার। সকলের, এমনকী সেবাস্তিয়াওরও মনে হয়েছিল, এ প্রস্তাব কার্যকর করা অসম্ভব। পরিসংখ্যান বলছে, ১০০ শতাংশের মধ্যে মাত্র .৫ শতাংশ অরণ্য বেঁচে আছে। তাকে কী করে আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব!

লেলিয়া জেদ ধরলেন। চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই, ক্ষতি নেই শুরু করতেও। .৫ থেকে শুরু করে হয়তো ১০০-তে পৌঁছনো যাবে না, কিন্তু ৫০-এও যদি পৌঁছনো যায়, তাই বা কম কী!– এই ছিল লেলিয়ার যুক্তি।

পরিবর্তন।

১৯৯৮ সালে একটা ছোট্ট সংগঠন তৈরি করে, শুরু হল ক্রাউড ফান্ডিং। ‘ইনস্টিটিউটো টেরা’ নামের সেই সংগঠনের তরফে আবেদন করা হল, গাছের চারা অথবা চারা কেনার টাকার। সালগাদো দম্পতিকে অবাক করে, এগিয়ে এলেন অনেকেই। মরে যাওয়া, শুকনো, রুক্ষ জমিতে সবুজ চারা পোঁতা শুরু হল একটা একটা করে।

না, এক রাতে কিছুই হয়নি। হয়নি এক বছরেও। তবে কয়েক বছরে যখন চারা গাছের সংখ্যাটা কয়েক হাজারে পৌঁছল, তখনই পরিবর্তন টের পেতে লাগলেন সকলে। বেশ কিছু পাখি ফিরে এল, ফিরে এল বহু পশু। সব চেয়ে বড় কথা, গোটা এলাকার আবহাওয়া আবার আগের মতো বদলে যেতে শুরু করল।

দেখুন সেই বদল।

Amazing 20-year reforestation project of 2 million trees in Brazil

Just like we can destroy our planet, we can also choose to restore it ?. And that is what this Brazilian couple did! ?Thank you Instituto Terra for your amazing work

BrightVibes এতে পোস্ট করেছেন শুক্রবার, 8 ফেব্রুয়ারি, 2019

“পৃথিবী শ্বাস নিতে পারছে না। অক্সিজেনের অভাবে দগ্ধে মরছে। আর অক্সিজেন উৎপাদনের এক ও একমাত্র সমাধান হল গাছ। তাই এ ছাড়া আর অন্য কোনও উপায় নেই আমাদের বাঁচার। আমাদের আরও অনেক বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, এক একটা জায়গা বেছে ঝাঁকে ঝাঁকে বীজ ফেলতে হবে। পৃথিবী নিজেই তৈরি করে নেবে তার হারিয়ে যাওয়া অরণ্য।”– ২০ বছর পরে ২০ লক্ষ গাছের পিতৃত্ব ধারণ করে এ কথা বলছিলেন সেবাস্তিয়াও সালগাদো। বলছিলেন, “প্রকৃতির কথা শুনতে হবে আমাদের। এই প্রকৃতির জন্যই আমরা আছি। তাকে কোনও প্রতিদান দিতে না পারলে তো আমাদের জীবনই বৃথা!”

সালগাদো দম্পতির তৈরি ইনস্টিটিউটো টেরায় এখন কয়েক হাজার সদস্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছে। জঙ্গলের পরিধির ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে তাঁদের হাত ধরে। পাঁচ হাজার বিঘা এলাকা জুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রেনফরেস্ট আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে, আগের মতোই। পরিসংখ্যান বলছে, ৯০ শতাংশ অরণ্য তৈরি হয়ে গেছে। বাকি ১০ শতাংশ কেবল সময়ের অপেক্ষা।

জঙ্গলে ফিরে আসা বাসিন্দারা।

১৭২ রকমের পাখি, ৩৩ রকমের স্তন্যপায়ী, ১৫ রকমের উভচর, ১৫ রকমের সরীসৃপ, আর ২৯৩ রকমের গাছ আবার ফিরে এসেছে সে অরণ্যে। ফিরে এসেছে বেশ কয়েকটি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীও।

‘দাও ফিরে সে অরণ্য’ বলে যখন সারা বিশ্ব হাহাকার করছে, তখন এই দু’টো মাত্র মানুষই শুধু ভালবাসার জোরে, জেদের জোরে, স্বপ্নের জোরে এ পৃথিবীকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রস্তুত করছে প্রতি মুহূর্তে।

১১ ফেব্রুয়ারি, ভালবাসা-সপ্তাহের প্রমিস ডে-তে আমরা যেন আরও এক বার মনে করে নিতে পারি, নবজাতকের কাছে আমাদের করণীয় দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা। আমরা যেন মনে রাখতে পারি, প্রকৃতিকে তার উজাড় করা সম্পদের কণামাত্র হলেও ফিরিয়ে দিতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

Shares

Comments are closed.