মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

সাতরঙা জেলিপথে সফরের ঘোঁতননামা

পল্লবী মজুমদার

দীর্ঘসূত্রতা বরাবরের সঙ্গী হলে যা হয় আর কি… ছবিটা দেখে উঠতেই এত দেরি। তারপর ভাবনার জাল। এবং কি বোর্ডে আঙুল ঠোকবার আলিস্যি। অধিকাংশ সময়েই যেটা কাটিয়ে ওঠা যায় না। কিন্তু চোখ বুজলেই বা না বুজলেও যদি একটা কালো সুতো দিয়ে ঝোলানো মোটা কাচের চশমার কথা মনে পড়ে, আর মনে পড়ে একটা ছোপধরা কালচিটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁ করা মুখ বেয়ে লালাঝরা ঘোঁতনকুমারের অপটু হাতে চুল আঁচড়ানো… তখন মাথার ব্যামোবিলাসিতাকে চড়থাপ্পড় কষানো ছাড়া উপায় থাকে না যে!

হলে গিয়ে ছবি দেখা প্রায় বন্ধ। মাঝেমধ্যে তবু দেখে ফেলি এক দুটো। তেমন করেই লোকমুখে শুনে দেখতে গেলাম রেনবো জেলি। নামের সঙ্গে মানিকবাবুর বাংলা গপ্পের নামের মিলটা বড্ড কানে লাগছিল। তাও গেলাম। দেখাই যাক না, পানসি কতদূর যায়! ছোটদের ছবি, ছোটদের নিয়ে ছবি, ছোটদের নিয়ে বড়দের ছবি, ছোট-বড়দের ছবি সবের সংখ্যাই এত হাতেগোনা এই আকালের দিনে, যে ঘোঁতনকুমারের রামধনু রূপকথা চাক্ষুষ করবার লোভ সামলানো দায় হল।

আর রবিবারের ফুলহাউস মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে দেখলাম, এটা আদতে কোনও একটা ছবি নয়। এ একটা পথ। কখনও পাকদণ্ডী, কখনও মোরামঢালা, কখনও বা হাইওয়ে আবার কখনও খোয়াই! অনেক দূর থেকে আসছে। চড়াই ভাঙতে গিয়ে পড়ে ব্যথা পাচ্ছে, উতরাইতে হুড়হুড় করে নামতে গিয়ে হিহি করে হাসতে হাসতে চিৎপাত, ফের উঠে পিছনপানে দেখে নেওয়া, কতটা এলাম? চেনা চেনা খোয়া ওঠা হোঁচট, চেনা মানুষের সঙ্গে আচমকা দেখা, তারপর লাল টুকটুক গ্যাস বেলুন আর সুতো বাঁধা পিজবোর্ডের মুটুক। ন্যাড়া ছাদে প্যাস্টেলের রঙ আর পাশের ছাদে ফুলছাপ ফ্রক-দুই বিনুনির মিষ্টি গলায় “ঘোঁতনদা”!!

গন্ডারিয়া এখানে ডাকু নয়। ঘোঁতনের দুষ্টু মামা। ঘোঁতনকুমার নিজে একটু যেমন তেমন, কিন্তু কেমন কেমন নয় মোটেই! বাজার করতে জানে, মাছের ঝোল রাঁধতে জানে, ভাত ফোটাতে জানে, চা বানাতে জানে, ছবি আঁকতে জানে, রঙিন মাছ পোষে, উড়োজাহাজ দেখতে তরতর করে সিঁড়ি বায়, বমি টমি করে ফেলে আবার মাকে গুলও দেয়! তবে কিনা ওই বাপ-মা মরা ছেলে আর লেখাপড়ায় তেমন মাথা নেই বলে গন্ডারিয়া ঘোঁতনকুমারের ইশকুল ছাড়িয়ে তাকে কাজের লোক বানিয়ে রেখেছে। হলে হবে কী? ঘোঁতনার সাহস তো সাঙ্ঘাতিক! মামার পাওনাদার কাবলে কে ভাগিয়ে দেয় ঢপচপ দিয়ে, কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ে না! তা সে পাড়ার ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ন হোক বা মাঝরাতের পরি ধর! কে ভাই তুমি? আমার বাড়িতে আমাকেই হুল? ঘোঁতনা কি বেচারা নাকি? রাজপুত্তুর হবে একদিন। হুঁহুঁ বাওয়া, মামা বলেছে। আঠারো হলেই অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা! কিন্তু কী ভাবে?

কী ভাবে রাজপুত্র হয় ঘোঁতনরা? পাশের বাড়ির পপিন্সরা রাজকন্যে হয়ে ওঠে? সে এক লম্বা রাস্তা। কতদিন ধরে কত লম্বাআআআ একটা পথ পেরিয়ে হাঁটছে ঘোঁতন! সেই কোন কালে কালো মাস্টার নৌকো নিয়ে জোয়ারের জলে ভেসে ঢুকে পরেছিল চাঁদের পেরিস্তানে! পরিস্থান নয় কিন্তু! পেরিস্তান! আমারও ছিল। ঘোঁতনেরও আছে।  লুকনো আস্তানা। চাঁদ সেখানে কাচের বয়ামে লুকিয়ে রাখত টিপিনের মুড়ির মো আর বিস্কুট। কালো মাস্টার খিদের মুখে একবারে সব খেয়ে নিত আর তারপর জোগাও তাকে বেলায় বেলায় খাবার। লুচি-ছক্কা, কলা পাঁউরুটি, কান্তা কেবিনের মাংস ভাত… ন্যাংলা প্যাংলা চাঁদ হয়ে উঠত কালো মাস্টারের“ওস্তাদ”! চাঁদের বন্ধু কিনা মহাশক্তিধর বিশে আর তার ইয়াব্বড় কুকুর সিংহ! আর তারপর একদিন ফুশ! কালো মাস্টার চাঁদকে বড় করে দিয়ে রূপকথার গ্যাস বেলুনে চড়ে হাত নেড়ে ধাঁ! মাস্টারের হাত ধরে আমি বুড়ো হতে হতে হঠাৎ দেখি ঘোঁতনা ব্যাটা পরি মাস্টারের হাত ধরেছে! কেবল টংলিং টংলিং করে মালগাড়ির বদলে এখন উড়োজাহাজের শব্দ! মন্দ কি? বলি পথ কি কম? ঘোঁতনের হাওয়াই চটির শব্দ শোনা যায়…!

বুরুন যেবার অঙ্কে তেরো পেল, আমিও পেলুম। মার্জিনাল আই কিউ টিউ অত জানা ছিল না। কেবল মাথায় ঘুরত“বুরুন তুমি অঙ্কে তেরো”, “বুরুন তুমি অঙ্কে তেরো”… গোঁসাইবাগানে পাওয়া গেল নিধিরামকে। ঢাল তলোয়ার না থাকলেও সর্দারি কিছু কম নয়! বুরুন ফিশফিশ করে নিধিদাকে ডাকে আর হিরো হয়ে যায়! আমিও হয়ে যাই। অঙ্কে তেরো তো কি? সে তো ষষ্ঠী চোরও ডাকাত দল খুলবার স্বপ্ন দেখে! আমিও দেখি!  ডাকাতের দল হলে ষষ্ঠী ইলিশ মাছ আর কাটোয়ার ডাঁটা রোজ নাকি খাবে… পড়ে পড়ে আমার জিভের জলে পেট ঢাক! আমার হবে ডাকাত দল আর ঘোঁতনকুমার হবে রাজকুমার? হায় রে!

ঘোঁতনা কিন্তু হাল ছাড়ে না। কণ্ঠও ছাড়ে না মোটে।  ঝাপসা আয়না আর মোটা কাচের মধ্যে দিয়ে স্বপ্ন বুনতে বুনতে পথটায় চলতে থাকে স্রেফ। রাজপুত্র হতেই হবে! ঘোঁতন কাজ করে, মার খায়, পড়ে গিয়ে গাল কেটে যায়, বমি করে, অনাদিদার দোকানে বসে পাঁউরুটি চিবোয়, যেমন আমরা সবাই চিবোই! কিম্বা মার খাই, কিম্বা বমি করি! ঘোঁতনের পরিপিসি কিন্তু মোটেই স্নো হোয়াইটের পরি নয়! সাতদিনে সাত রঙে সাত স্বাদের রান্না খাইয়ে সে গন্ডারিয়ার পেট থেকে বের করে নিতে চায় অর্ধেক রাজত্বের গোপন কথা! মুহূর্তের অসাবধানে গন্ডারিয়া মুকুল আর পরিপিসি নকল হাজরা! ছুঁচের মতো টর্চের আলো গন্ডারিয়ার চোখে ফেলে হিপনোটাইজ করে পরি ধর জেনে ফেলে রাজপাটের পাসওয়ার্ড মোটেই নেই গন্ডারিয়ার হাতে!! ঘোঁতনকে সে বোকা বানাচ্ছিল!

এবার উপায়? পথটা যেন কখন হয়ে যায় গোয়ানার জঙ্গল! সেখেনে আচমকা নাকু-গামার ছোট্ট প্লেন ভেঙে পড়ে পাইলট হামিদ কাকু জখম। ভীষণকায় সেই করাল জঙ্গল হেঁটে পেরোয় নাকু আর গামা। ঘোঁতনকুমারের মতোই পায়ের ছাল উঠে, জোঁক ছাড়াতে ছাড়াতে, বিষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে চলাচল চলাচল। মাইমার দেওয়া টিপিনকারি ভর্তি খাবার হারিয়ে গাছের বিচে কলা, মেটে আপেল, শাঁকালু আর পকেট ভরা ক্যাডবেরি ভরসা করে পাড়ি দেয় ওরা। তবু পৌঁছতেই হবে নাকুগামাকে! আমাকেও! ঘোঁতনকেও! ওই যে সেই পথটার কথা বললুম? ভরসা থাকুক মালদা ঝালদা শেয়ালদা আর বর্ধমানে, ভরসা থাকুক জংশনে আর গাঁয়ের ছোট্ট ইস্টিশনে!

ও পথেই চলেছিল বোগি রুমু আর ঝগড়ু! ভুলো কুকুরকে খুঁজতে খুঁজতে মনে মনে গপ্পে গপ্পে দুমকার কাঁচা সড়কে! কিম্বা পানু? সে একদম ঘোঁতনেরই বয়সি। বাস থেকে পড়ে গিয়ে শিরদাঁড়া জখম হয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি। তাতে কি? গুপি আছে, বড় মাস্টার আছে, ভজুদা আছে! আর আছে রামকানাই! সন্ধেবেলা সে পানুদের জন্যে মাছের কচুরি, মাংসের সিঙাড়া, মেটুলির ঘুগনি এইসব করে দেয়! খেতে খেতে চলে উড়ান! আহহ… ওরা মহাকাশযান বানাবে, চাঁদে যাবে। গুপির জম্মদিনে পানু উপহার দেয় বই। চাঁদের যাত্রী। ভিতরে লেখা, “চাঁদের যাত্রীকে জন্মদিনে চাঁদের যাত্রী দিলাম। ইতি চাঁদের যাত্রী।” কেমন? বেশ হল না? ঘোঁতনের তো আস্ত বৈজ্ঞানিক বাবাই ছিলেন রোবট আর গবেষণার খাতা টাতা নিয়ে! সে কি চাঁদের যাত্রী না হয়ে যায়?

ঠিক যেমন ভূতনাথকাকা! পাতালঘরের রহস্যভেদ হতে নানা হতেই চলে গেল ভিকের দেশে। মহাকাশযানে চড়ে ঘুমপাড়ানি বাজনা বাজিয়ে। কার্তিক কত করে ডাকলে, থাকলে না। সবাই কি মাটিতে থাকে? তাহলে গ্যাসবেলুন হবে কে? পপিন্সকে সাতরঙা মিঠাই এনে খাওয়াবে কে? পরিপিসির বর্মিবাক্সের সিরাপ-রহস্য খুঁজবে কে? সাতরঙে রামধনু জেলি আর সাতরঙা মনের রঙবদল… একি শুধু আজকের কথা? একি ঘোঁতনের কথা কেবল? বাক্সভর্তি হাতাচামচ নিয়ে এসে বাড়িভরা ধাড়িলোককে রান্নার জাদুতে ভুলিয়ে এ অসম্ভব কবেই সম্ভব করেছে ধনঞ্জয়! কৃষ্ণা দিদিমণির চোখ থেকে ঝরে পড়া মুক্তোদানা অলোক দাদাবাবুর মুঠোয় ভরে কেমন ভোরের সোঁদা আলোয় গ্যাসবেলুনটি হয়ে গিয়েছিল সে! সেই কত্তোওওও লম্বা পথ চলে আজ ঘোঁতন এসেছে আমাদের কাছে। কতদিন পর। ওরে ঘোঁতন ফিরে চা! মোদের নাচন দেখে যা!আমাদের বাড়ির অভাগা ঘোঁতনগুলোর জন্যে মিছেই মলাটছেঁড়া বইগুলো জমিয়ে রেখেছি এদ্দিন ধরে। ওদের মোবাইল, ল্যাপটপ, আইপ্যাডের ফাঁক গলে ওরা ওগুলো ছুঁয়েও দেখবে না জানি। তবু রেখে দিয়েছি। কতসব সিনেমা নাকি হচ্ছে আজকাল, আমাদের ছেলেবেলা নিয়ে! তাতে ঠেসে ভরা মেয়েদের জানলায় উঁকি দেওয়া, পকেটে প্রেমপত্তর দেওয়া, গালাগাল দেওয়া আর সিগারেট খেয়ে বড়ো হবার গপ্পো! কেবল আমাদের কালো মাস্টার, গুপে, নেপো, পাঁচুমামা, নাথু, বদ্যিনাথ, হাবুলের গপ্পোগুলোই ফাঁকি পড়ে যায়! ওরাও তো সেই কবেএএএএ থেকে অন্তহীন এক পথ চলেছে… ছেলে-বেলা নয়, মেয়ে-বেলা নয়… আমাদের শিশু-বেলার রোদ্দুর-পথ! আমাদের সকালবেলার সফেদ আলো বেহানবেলার গোলাপি আলোয় পালটে যেতে দেখার চুপকথা-পথ! আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধোঁয়াটে সীমানা এক কলমের আঁচড়ে এলোমেলো করে দেওয়ার জলকামান-পথ! সে পথেই পা ফেলে ফেলে এসেছে ঘোঁতন… হাতে তার সূর্যের সাতরঙ আর লাল টুকটুক গ্যাস বেলুন! ফুশ হয়ে উড়ে যাসনে ঘোঁতন, তোকে যে আমাদের বড্ড দরকার। মাক্কালি!!

Shares

Leave A Reply