বৃহস্পতিবার, জুন ২০

চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ যেন এক বিষণ্ণ নাবিক

হিরণ মিত্র

চিত্রী রবীন্দ্রনাথ এক বিষণ্ণ নাবিক যাঁর হাতে কোনও দিক নির্ণয় যন্ত্র ছিল না। উত্তাল সমুদ্র, ঝোড়ো সমুদ্র, দিগন্ত রেখা দেখা যায় না, ঝাপসা চারিদিক, মাঝে মাঝে সূর্যেররশ্মি, তীব্র আলো ফেলে, জলের প্রান্তে, সিঁধিয়ে যায় সেই আলো, একেবারে তলদেশে। অজানা গহ্বর, অজানা বিচিত্র দর্শন প্রাণী জল ঘুরে ফিরে পরখ করছে। খুঁজছে আলোর উৎস। প্রবালের গায়ে ঠিকরে পড়ছে আলো, কত লক্ষ বছরের বিস্ময়,সাঁতরে বেড়াচ্ছে, বিচিত্র আকৃতি। চিত্রী রবীন্দ্রনাথ, জল বিহারে, রঙ তুলি কালিকলমে ভেবে যান, এঁকে যান, খুঁজে পান, প্রাক-ইতিহাস কাহিনী।

তখন কথা ছিল না। জীবনের শেষ দিকে এসে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের বেড়া ডিঙিয়ে ঢুকে পড়তে চাইলে অনাবিষ্কৃত তৃণভূমি। কখনও কারও পা পড়েনি। একমাত্র সম্বল, আঁকার সরঞ্জাম ছাড়া, অমোধ বিষণ্ণতা, বিষাদ। বিষাদের তৃণভূমি। অবন, নন্দলালের কাছে পাঠ নিতে গেলেন, দৃশ্যের পাঠ। মন সায় দিল না। ফিরে এলেন ওই তৃণভূমে। দেখলেন কত বিবিধ ছায়া, কারুকাজ, বেদনা অন্তর জুড়ে। কিন্তু কে ছায়া নির্মাণ করছে তার কোনও হদিশ নেই। অবাক হলেন। মজে গেলেন। সেই ছায়া, ক্রমশ দীর্ঘায়ত হল, এতটাই দীর্ঘ সময় ও আকারে, অন্তর ছড়িয়ে গেল,জীবনের শেষ দশ বছর চলল পরিক্রমা।

কালো, কমলা, হলুদ, ঘন সবুজ, খয়েরি, কখনও ঘন নীল পাক খেতে লাগলো অন্তরীক্ষে। তাকিয়ে দেখলেন। কখনও চোখে পড়ল, কখনও মেঘের আড়ালে সরে গেল তারা। কেউ এসে ছবিগুলো ভালো বললে, কালো রঙ ঢেলে দিতে। আসলে কালো মেঘ ছেয়ে যেত, কখনও নামত অঝোরে বিষণ্ণতার কথা। বৃষ্টি পড়লে মন কেমন করে যেমন।

আরও পড়ুন : কে তুমি? পেল না উত্তর

সূর্য যখন পাটে যায় দিনান্তে কমলা রঙে রাঙিয়ে ওঠে ভুবন, কবি দেখলেন গাছের কালো ছায়া তাদের দিকে তাকিয়ে। পাতার ফাঁকে ফাঁকে কমলা আলো চোখে ঠিকরে পড়ছে। কিন্তু বিষণ্ণতা সমস্ত গাছের শরীর দিয়ে বেয়ে নামছে।

মানুষের মুখ, তাদের চোখের চাহনি, পলক না পড়া তাকিয়ে থাকা, ছোট ছোট রেখার জালে দৃশ্য ধরা পড়তে চাইতো। রবীন্দ্রনাথ, আপন চালে, খেয়ালে, নির্মাণে ঢুকে পড়তেন, কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই। যার থেকে কথা ওঠে উনি ছবি আঁকতেন না,ছবি ওঁকে আঁকত। এই ঘটনা বিংশ শতাব্দীতে, ভারতীয় চিত্র আঙিনার সম্পূর্ণ এক অজানা সংবাদ। তাই দীর্ঘ সময় লেগেছে, চিত্রী রবীন্দ্রনাথকে এই আঙিনায় প্রতিষ্ঠা করতে। ইতিহাসের বিস্তারে ঢুকছি না, কিন্তু এই দৃশ্য ভুবন আমাদের যেমন বিষণ্ণ করে, তেমনই বিস্ময় জাগায়।

চিত্রী রবীন্দ্রনাথের হাজারও ভঙ্গি, হাজারও দৃশ্য-কল্পনা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আমি দেখতে পাই দিকনির্ণয় যন্ত্রবিহীন উত্তাল সমুদ্র ভ্রমণে নিমজ্জিত। এটা ভাবলে ভুল হবে উনি দিক হারিয়েছিলেন, তীর খুঁজে পাচ্ছেন না। উনি নিজেকে এমন অজানায় ভাসাতেই ভালোবেসেছিলেন। পাড় খোঁজার আগ্রহ ছিল না।

অজানাকে আবিষ্কার। যেন ভাস্কো দা গামা কালিকটে তরী ভেড়ানোর বদলে পৌঁছে গেলেন অন্য এক কল্পরাজ্যে।

গভীর অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পেল নানা দৃশ্য অলঙ্কার। কবিতা কাটাকাটি করতে করতে হয়ে উঠল বিচিত্র ছবি, কারুকাজ।

সেই কারুকাজ অদেখা। বিষণ্ণ।

 হিরণ মিত্র ছবি আঁকেন। 

Leave A Reply