শুক্রবার, মে ২৪

বিশ্বকে আলো দেখালেন যিনি, তাঁর বাড়িই আজ অন্ধকারে! পাহাড়ি এক মানুষের অনন্য রবীন্দ্রপ্রেম

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কী রকম যেন থমথম করছিল বাড়িটা, বাইরে থেকে। যেন সকলে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে, পাহাড়ের কোলে,মূল রাস্তা থেকে খানিকটা নেমে, যেন ছোট্ট এক উপত্যকায় এক রাশ বিষণ্ণতা নিয়ে রয়ে গিয়েছে সে। স্মৃতির ভারে প্রণত, সময়ের দ্বারে আনত। অনেকটা শূন্যতা বুকে নিয়ে একটা কাঠামো জেগে আছে একরাশ সবুজের মাঝখানে।

উঠোন পেরোতে পেরোতেই কানে ভেসে এল রবিঠাকুরের গানের লাইন “তুমি জানো না, আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে, আমি…”। ভাবলাম, কোনও পর্যটক হয়তো আবেগে গেয়ে উঠেছেন। তাঁরই এককালীন বাড়িতে এসে, তাঁর রোজকার ব্যবহারের জিনিসপত্র দেখতে দেখতে তাঁরই গান দু’কলি গুনগুনিয়ে ওঠা আশ্চর্য কী! তবে গানের উচ্চারণে একটু জড়তা আছে। ঠিক ভাঙা বাংলা বলা যায় না, আবার বাংলাটাকে খুব সুস্পষ্টও বলা যায় না।

কৌতূহল হল, কে গাইছেন জানার। অচিরেই জানা হল। না, কোনও পর্যটক নন। তিনি পেশায় কেয়ারটেকার। দার্জিনিঙের মংপু-তে রবীন্দ্রনাথের যে বাড়ি রয়েছে, সেই বাড়ির কেয়ারটেকার, শিশির রাহুত। বংশানুক্রমে দেখভাল করছেন বাড়িটির, সযত্নে আগলে রাখছেন রবিঠাকুরের বৃদ্ধবয়সের স্মৃতিগুলি। আর সেই সঙ্গে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে গেয়ে যাচ্ছেন একটার পর একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত। নিখুঁত সুর, সামান্য ভাঙা উচ্চারণ। কিন্তু খাদ নেই আবেগে। তাঁর সঙ্গে গোটা বাড়িটি ঘুরে দেখার পরে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, এই স্থানীয় নেপালি মানুষটির বুকের ভিতর যে ভাবে রবীন্দ্রনাথ বাস করেন, সে রবীন্দ্রনাথকে এখনও বহু বাঙালির ছুঁয়ে দেখা হয়নি।

শিশির রাহুত

মংপুর রবীন্দ্রভবনের ঠিক পাশেই, এক সময়ের জমজমাট সরকারি কুইনাইন ফ্যাক্টরি ১১ বছর ধরে বন্ধ। শিশির ওই ফ্যাক্টরিরই কর্মচারী। মানে ওই খাতায়-কলমে। কাজ তো কিছুই নেই। গোটা দিনটাই কাটে রবিঠাকুরের এই পুরনো বাড়িতে। ধোয়ামোছা, সাফসাফাই, দেখভাল– সব একা হাতে সামলান। বেতন? সরকারি ভাবে কিছুই মেলে না। পর্যটকদের ‘উপহার’ই ভরসা।

শিশির জানালেন—২০১৬ সাল থেকে এই বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে দিনের আলো নিভলেই মিশকালো অন্ধকারে ডুবে যায় রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটা। শিশির ঘুরে ঘুরে দেখাতে শুরু করেন, কেমন করে আধুনিকতার প্রলেপ লেগেছে ঘরের দেওয়ালে, কিন্তু মূল্যবান ফটোগুলো নষ্ট হয়ে যেতে বসলেও, কারও খেয়াল নেই। দেখালেন, ঐতিহ্যের লাল রং মুছে নীল সাদাও করা হয়েছে!

শিশির বলছিলেন, “সারা পৃথিবীকে চেতনার আলো দেখিয়েছেন এই মানুষটা। সারা পৃথিবীর কাছে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেছেন। আর সেই মানুষটার জন্য একটু আলোর ব্যবস্থা করা যায় না! বিকেল গড়ালেই প্রেতপুরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে বাড়িটা।”– গলায় ঝরে পড়ে অভিযোগ, ক্ষোভ, একটু হয়তো কান্নাও।

তবে দিনের বেলাটুকু বড্ড মনোরম। চোখকে আরাম দেওয়া এই পাহাড়ি বাড়িটার চত্বরে পা রাখলে যেন আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। সেই কাঠের মেঝে, ফায়ারপ্লেস, কবির ব্যবহার করা চেয়ার, রঙ তুলি ইজেল, বিশেষ ভাবে বানানো খাট, নিজে হাতে আঁকা ছবি, বাড়ির সামনের সবুজ ঘাসের লন, ক্যামেলিয়া ফুলের ঝাড়– মায়া যেন জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে।

শিশিরবাবু ধরলেন, ‘দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ও পারে, আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে…’ কী অসামান্য প্রতিটা শব্দের সুরেলা কারুকার্য! কোথা থেকে শিখলেন এমন সুন্দর করে! জিজ্ঞেস করে ফেলি। জানান, শুনে শুনেই শিখেছেন। এ শেখায় যতটা আবেগ, ততটাই যেন গর্ব মিশে রয়েছে। বাঙালি না হয়েও রবি ঠাকুরকে এমন করে আত্মস্থ করতে পারা যে বড় সহজ নয়, তা জেনে গিয়েছেন শিশির।

দেখুন, মংপুর রবীন্দ্রভবনে শিশিরবাবুর কথা-গানের ভিডিও।

শিশিরের কাছেই জানা যায়, ১৯৩৮ সালে কবিগুরু যখন কালিম্পং বেড়াতে আসেন, তখনই তাঁকে মংপুতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা, রবীন্দ্রভক্ত লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী। তাঁর ডাকেই কবিগুরু প্রথম মংপুতে আসেন, ১৯৩৮ সালের ২১ মে। তারপর ১৯৩৯ সালে আসেন আরও দু’বার। আর শেষ বা চতুর্থ বার আসেন, ১৯৪০ সালে। প্রতি বারই তিনি এখানে এক মাস বা দু’মাস করে থেকেছেন। থেকেছেন এই বাড়িতেই। ১৯৪০ সালে কবিগুরু তাঁর জন্মদিনও এই ভবনেই পালন করেছিলেন। শিশির মনে করিয়ে দিলেন, রবি ঠাকুর ‘ওই মালতীলতা দোলে’ গানিটি লিখেছিলেন এই বাড়ির বারান্দায় বসেই, বাগানের মালতীলতার দিকে চোখ রেখেই। এই বাড়িতে থাকা অবস্থায় তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘ছেলেবেলা’, ‘নবজাতক’, ‘জন্মদিন’।

১৯৪৪ সালের ২৮ মে, এই ভবনটিকে রবীন্দ্রস্মৃতিভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকেই এটি রবীন্দ্রভবন। একতলা ঘরের মেঝে কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি। দেওয়াল পাকা হলেও, টিনের ছাউনির নিচে আবার কাঠ দিয়ে সিলিং করা। ঠান্ডা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই এভাবে গড়া হয়েছিল বাড়িটি। বাড়ির সামনে সুন্দর সবুজ বাগান। বাগানে কবিগুরুর একটি আবক্ষমূর্তি, ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি।

শিশির জানালেন, যে চার বার রবীন্দ্রনাথ এই ভবনে এসেছিলেন, তারও পরে পাঁচ নম্বর বার কালিম্পং থেকে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর ওষুধপত্র-সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর আসতে পারেননি। ফিরে গিয়েছিলেন কলকাতায়। কবিগুরুর সেই ওষুধ এখনও গুছিয়ে রাখা হয়েছে এই ভবনে।

শিশির দেখালেন ওষুধের সেই কৌটাগুলো। দেখালেন কবিগুরুর বারান্দায় বসার চেয়ারটি। এই চেয়ারে বসেই সামনের হিমালয়ের বরফ-আচ্ছাদিত পাহাড়ের অপরূপ শোভা দেখতেন কবিগুরু। চেয়ারটি সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে এখন। চেয়ারের সামনে কবিগুরুর ছবি। ছবির সামনে ফুলদানি, নানা ফুল দিয়ে সাজানো। জ্বলছে ধূপকাঠি। আর পেছনের দেয়ালে একটি বিরাট তাম্রলিপি। বাংলা, হিন্দি আর নেপালি ভাষায় লেখা রয়েছে কবিগুরুর কথা। শিশির জানালেন, এটি তৈরি করে দেন মৈত্রেয়ী দেবী। বারান্দার ডান পাশেই কবির রিডিংরুম বা লেখাপড়ার ঘর। কবিগুরু যে নারকেলের ছোবড়া ও চামড়া দিয়ে তৈরি বিশেষ কুশনটি ব্যবহার করতেন, তা-ও রয়েছে চেয়ারের ওপর।

রিডিংরুমের পাশেই কবির শোয়ার ঘর। রয়েছে এখানে তাঁর ব্যবহৃত একটি কাঠের খাট। খাটের ওপরে এখনও পাতা কবিগুরুর ব্যবহার করা তোশক, বিছানা, চাদর। বেডরুমের পাশে শৌচালয়। শৌচালয় লাগোয়া পোশাক বদলানোর ঘর। সেই যুগেও কংক্রিট দিয়ে বানানো হয়েছি বাথটাব, যার পরিকল্পনা ও ডিজ়াইন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে! শিশির খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝাচ্ছিলেন, বাথটাবে কেমন করে গরম জল আর ঠান্ডা জল মেশার ব্যবস্থা করেছিলেন রবি ঠাকুর। দেখাচ্ছিলেন, মাথা রাখার জন্য কেমন আলাদা করে উঁচু ঢালাই রয়েছে সেই টাবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৈরি করা বাথটাবের খুঁটিনাটি বোঝাচ্ছেন শিশির।

বাড়ির পেছনে ছিল রান্নাঘর। এখন সেই রান্নাঘর আর নেই। রাহুত দেখালেন কবিগুরুর উপাসনার ঘরটিও। উপাসনা ঘরের পেছনে রয়েছে বিশাল এক পাহাড়ি গাছ। কবিগুরু নিজে এই গাছের নাম দিয়েছিলেন সপ্তপর্ণী গাছ।

শিশির রাহুত বললেন, সে সময় রাস্তা তৈরি হয়নি এত ভাল। কবিগুরু রাম্ভি পর্যন্ত ট্রেন ও গাড়িতে করে আসতেন। তার পরে রাম্ভি থেকে কবিগুরুকে মংপুতে আনা হতো পালকিতে। পালকির সর্দার ছিলেন শিশির রাহুতের ঠাকুরদাদা ভীমলাল রাহুত।

শিশিরের ঠাকুরদাদা কাঁধে করে বহন করেছিলেন বিশ্বকবিকে, আর শিশির রাহুত তাঁকে বহন করছেন অন্তরে। এ এক অদ্ভুত উত্তরাধিকার অর্জন করে নিয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথকে কখনও চোখে দেখেননি, পড়েননি তেমন বইপত্রও। শুধু শুনেছেন। রবিঠাকুরের কথা, গান, স্মৃতি– এ সব কেবল শুনেছেন বারবার।

কিন্তু মংপুর রবীন্দ্রভবনের আনাচকানাচ এই মানুষটির সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে বারবারই যেন মনে হচ্ছিল, রবীন্দ্রনাথকে একেবারে কাছ থেকে দেখেছেন শিশির। হয়তো এখনও রোজ দেখেন! রবি ঠাকুর যেন তাঁর নিজের কেউ, আত্মার আত্মীয়। দেওয়ালে টাঙানো ফোটোগুলো দেখানোর সময়ে যে ভাবে ফোটোর মানুষগুলোর পরিচয় জানাচ্ছিলেন, একটি বারও মনে হচ্ছিল না, তাঁরা কেউ তাঁর অচেনা, অদেখা! তারই ফাঁকে খোলা গলায় গেয়ে উঠলেন — ‘এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে, আমি কুড়িয়ে নিয়েছি, তোমার চরণে দিয়েছি, লহো লহো করুণ করে।’

শিশিরের গান গাওয়ার একটা নিজস্ব ভঙ্গিমা আছে। তিনি মাথা কাত করে, চোখ বুজে গেয়ে চলেন। যেন ভেতর থেকে অনুভব করছেন প্রতিটা শব্দ, যেন অনুভব করছেন, রবিঠাকুরের কলমে সেই শব্দগুলো জন্ম দেওয়ার দৃশ্যপট।

সে দৃশ্যপটকে সাফসুতরো রাখতে সকাল সকাল রবীন্দ্রভবনে চলে আসেন শিশির। ঝকঝকে করে তোলেন নিজের মতো। তার পরে দুয়ার খুলে দেন। শুরু হয় পর্যটকদের আনাগোনা। তাঁদের কাছে শিশির তুলে ধরেন তাঁর প্রাণের ঠাকুরকে।

ঘরে অসুস্থ স্ত্রী আছেন। মেয়ে কালিম্পঙের কলেজে পড়েন। ছেলে ক্লাস নাইনে। শিশিরের পরে কি রবীন্দ্রভবনের দায়িত্ব নেবে তাঁর ছেলে বা মেয়ে? উত্তর নেই বাবার কাছে। হাসেন তিনি। অপূর্ব সে হাসি। যেন রবীন্দ্রনাথই তাঁকে বলে গিয়েছেন এ ভাবেই হাসতে হাসতে বাঁচতে হয়।

দিনের আলো ফুরিয়ে আসে। ভবন বন্ধ করার তোড়জোড় শুরু করেন শিশির। পাহাড়ি পথে হেঁটে ফিরতে হবে বাড়ি। মূল ফটকের শেষ তালাটা দেওয়ার পরেও গুনগুন করে ওঠেন, “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধেরও সাধনা, মম বিজন গগন বিহারী, আমি আমার মনের মাধুরী মিশায়ে……

Shares

Comments are closed.