“স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় নাট্যকারদের মধ্যে মনোজ মিত্র অন্যতম ৷ তাঁর নাটকে স্বাধীনতা- উত্তর ভারতবর্ষের সমাজ সমস্যা , সমাজ মনস্তত্ব , ব্যক্তির সমকালীন ও চিরকালীন সংকট নানা ভঙ্গিমায় প্রকাশ পেয়েছে ৷ শুধু বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র্য নয় , আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও তার স্বতন্ত্রতা লক্ষণীয় ৷ তাঁর নাটক শুধু নাটক নয় , সাহিত্য পাঠেরও স্বাদ দেয় ৷ সংলাপে যেমন রয়েছে নাট্যগুণ , তেমনি রয়েছে সাহিত্যের গুণ ৷ বিশেষ ‘ইজম’ নয় , মানবিকতাবোধেই তাঁর নাটকের সেরা হাতিয়ার ৷”

তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘সাজানো বাগান ‘ এবং পরবর্তীতে সেই নাটক থেকেই নির্মিত ছবি ‘বাঞ্ছারামের বাগান ‘ এখনও বাঙালি দর্শকের কথায় ফিরে ফিরে আসে। এই সমস্ত কিছু নিয়েই মনোজ মিত্রর সঙ্গে কথা বললেন জয়ন্ত সিনহা মহাপাত্র


আপনি তো কলেজে পড়াকালীন গল্প লিখতেন শুনেছি ৷ নাটক লিখতে শুরু করলেন কীভাবে ?

আমার প্রথম রচিত নাটক ‘মৃত্যুর চোখে জল’৷ মৌলিক নাটক৷ নাটকটি পার্থপ্রতিমের পরিচালনায় ‘সুন্দরম’-এর প্রযোজনায় থিয়েটার সেন্টার একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পায়৷  সালটা ১৯৫৯ ৷ নাটক লিখব কখনও ভাবিনি৷ প্রথমে অভিনয় ও গল্প লিখতাম৷ হঠাৎ করে রাতে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে লিখে ফেলি নাটকটা  যার একটা শব্দও পরে বদলাইনি৷

প্রথম  দিকে আপনি তো বেশ কয়েকটা সিরিয়াস নাটক লিখেছেন৷ পরের দিকে সিরিও-কমিকের দিকে ঝুঁকলেন কেন ?

হ্যাঁ , একটা পর্যায়ে বেশ কয়েকটা সিরিও-কমিক বা হাসির নাটক লিখেছি৷ আবার ‘অশ্বত্থামা’-র মতো সিরিয়াস নাটকও লিখেছি৷ আসলে সব জিনিসকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার একটা প্রবণতা আমার আছে৷ দেখবে, আমার নাটকের চরিত্ররা কেউ অবাস্তব নয়, তারা বরং অতিবাস্তব৷ এই জায়গা থেকেই কৌতুকের আমদানি৷ তাছাড়া অবহেলিত, জরাগ্রস্থ মানুষ আছে৷ তারা আপাততুচ্ছ৷ কিন্তু কখনওসখনও তারা অতি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে৷ আর তখনই একটা কৌতুকের সৃষ্টি হয়৷ ‘সাজানো বাগান’, ‘কেনারাম বেচারাম’, ‘পরবাস’ নাটকে এঁদের পাবে৷

আপনার বিখ্যাত নাটক ‘সাজানো বাগান’৷ ‘মৃত্যুর চোখে জল’ নাটকের বৃদ্ধ বঙ্কিম আপনার খুব চেনা৷ আপনার ঠাকুরদার আদলে৷ ‘সাজানো বাগান’-এর বৃদ্ধ বাঞ্ছাও কি বাস্তবে দেখা চরিত্র ?

একটা গোটা মানুষ দেখে গল্প, উপন্যাস, নাটকে চরিত্র গড়ে উঠে না৷ আমার কোনও চরিত্রই এভাবে গড়ে ওঠে না৷ বাঞ্ছাও নয়৷ নানা মানুষের টুকরো জীবন অভিজ্ঞতায় একটি চরিত্র গড়ে ওঠে৷ বাঞ্ছাও তাই৷ আমরা ওপারে ফেলে আসা খুলনা জেলার বাসিন্দা৷ মনে হয়েছিল, হয়তো সেই ছোট্ট গ্রামে দেখেছি বাঞ্ছারামকে৷ শৈশবে ঠাকুরমার কাছে শুনেছি গাঁয়ের একটা বাগান ঘিরে ভূত-প্রেতের গল্পগাছা৷ এক বৃদ্ধ সে বাগানে চালা বেঁধে থাকত, হাঁটতে পারত না৷ মাটিতে বসে বসে চলত৷ তার নাম ছিল বাঞ্ছারাম৷

‘বাঞ্ছারামের বাগান’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নির্মল কুমার, মনোজ মিত্র ও দীপঙ্কর দে

বাঞ্ছারাম তো পরে সিনেমায় এল৷ অভিজ্ঞতা কেমন?

খুব ভালো৷ উপভোগ করেছিলাম৷ সিনেমায় প্রথম কাজ৷ তারপর তপনদার সঙ্গে অনেক ছবি করেছি৷ এ ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয় করার কথা ছিল৷ শেষপর্যন্ত সেটা হয়নি৷

বাঞ্ছারামের বাগান রিলিজের পর কোনও বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে? 

হ্যাঁ, সালটা ১৯৮৩-৮৪ হবে৷ কলেজ থেকে মাইনে নিয়ে ট্যাক্সি করে ফিরছি৷ সঙ্গে ছিল ‘সুন্দরম’-এর কিছু টাকা৷ ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে৷ উল্টোডাঙার মুচিপাড়ার কাছে একদল ছেলে ট্যাক্সিটা ঘিরে ধরল৷ রাস্তায় ওরা ফুটবল খেলছিল৷ একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিতে বলে৷ আমি সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়ি৷ ওরা ট্যাক্সিটা নিয়ে চলে যায়৷ ব্যাগটা রয়ে যায় ট্যাক্সিতে৷ আমার মাথায় হাত৷ ওখানে শেডের তলায় দাঁড়িয়ে আছে কিছু ছেলে৷ ঘটনাটা ওদের বলি৷ কেউ ভ্রুক্ষেপ করল না৷ ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ তখন সাড়া ফেলেছিল৷ নিজের পরিচয় দিয়ে বলি, ‘আমি মনোজ মিত্র৷ বাঞ্ছারামের বাগানটা আমারই লেখা৷ আমি অভিনয়ও করেছি৷’ যেই না বলা, ম্যাজিকের মতো কাজ৷ চল্লিশ মিনিটের মধ্যে আর জি কর হাসপাতাল থেকে ওই ট্যাক্সি নিয়ে ছেলেগুলো হাজির৷ ব্যাগটা ওরকমই ছিল৷

শুনেছি উত্তমকুমার মামলা করেছিলেন ?

সে এক বিষাদময় ঘটনা ৷ ঠিক ছিল আশির জানুয়ারি থেকে শুটিং হবে৷ শীতকাল৷ উত্তমকুমার ডেট দিলেন মার্চে৷ তপন সিংহ দীপঙ্করকে নিলেন৷ উত্তমকুমার আদালতে মামলা করলেন৷ তপনবাবু মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি নন৷ শীতের সর্ষেফুল যে থাকবে না৷ তিন মাস অপেক্ষা করলে প্রযোজক ধীরেশ চক্রবর্তীর আর্থিক ক্ষতি হত৷ উত্তমকুমার ভাবতে পারেননি যে তপন সিংহ শুটিংয়ের ডেট পিছোবেন না৷ উত্তমকুমার ওই মামলায় হেরে গিয়েছিলেন৷ 

‘বাঞ্ছারামের বাগান’ চলচ্চিত্রের শ্যুটিং–এ ক্যামেরা বন্দি করার আগে দৃশ্যটি অভিনেতাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন পরিচালক তপন সিংহ

উত্তমকুমারের কোন চরিত্র করার কথা ছিল?

ভূত-জমিদার ছকড়ি আর তার ছেলে নকড়ি— দুটো চরিত্রই করার কথা ছিল৷ তপনবাবু বিশ্বাস করতেন হাসির চরিত্রে উত্তমকুমারের জুড়ি নেই৷

আপনার চান্স হল কীভাবে?

আমি তপনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাঞ্ছারাম কে করছেন?’ উনি বললেন, ‘কে করলে ভালো হয়?’ তারপর বললেন, ‘হিন্দি হলে রাজকাপুরকে নিতাম৷’ আমি বললাম, ‘আর বাংলায়?’ তপনবাবু বললেন, ‘একজন আছে, তবে তার আগ্রহ কতটা আছে বুঝতে পারছি না৷ তাকে না পেলে ও ছবি আমি করব না৷’ তারপর বললেন, ‘আপনিই  বাঞ্ছারাম হচ্ছেন৷’ 

আচ্ছা, ‘সাজানো বাগান’-এর গল্পটা শুনেছি রানিগঞ্জ কলেজে পড়ানোর সময় মাথায় এসেছিল৷ একটু বলবেন? 

রানিগঞ্জ ত্রিবেণীদেবী ভালোটিয়া কলেজে আমার সহকর্মী ছিলেন হিন্দি সাহিত্যের অধ্যাপক নারায়ণ পাণ্ডে৷ তিনি লোকসাহিত্যের গবেষক৷ পাণ্ডেজির দেশ-বিদেশের অজস্র লোকগাথা, উপকথা, নীতিকথার বিপুল সম্ভার৷ ‘সাজানো বাগান’-এর মরতে মরতে না মরা বুড়োর গল্পটা আমি এখানেই কোনও একটা কাহিনির মধ্যে পাই ৷ 

‘চাক ভাঙা মধু’-ও তো এরকম কোনও একটা সূত্র ধরে লেখা৷ 

ঠিক সূত্র নয়৷ প্রস্তুতি ছিলই৷ সত্তর সালের কাছাকাছি কোনও এক কাগজে সংবাদ বেরিয়েছিল, ‘ওঝার বাড়িতে বিষ ঝাড়তে এসে সর্পদংশনে মৃত্যু৷’ তারপরই নাটকটা লিখি৷

‘চাক ভাঙা মধু’ নাটকের শেষে বাদামির সড়কির আঘাতে অশুভের বিনাশের  ছবি দেখানো হয়েছে৷ সেই অশুভ শক্তির তো আজও অবসান হল না৷ 

না৷ ‘চাক ভাঙা মধু’-তে জোতদার ছিল৷ এখন নেতারা৷ ছোট-বড় নেতারা কম এক্সপ্লয়েট করল এত বছর ধরে!

আপনার নাটক নানা বিষয়কে অবলম্বন করে লেখা৷ কিন্তু সব শেষে একটা শুভবোধ লক্ষ্য করা যায়৷ এটা কি আপনি সচেতনভাবে করেন ?

এটা আমার অস্থি-মজ্জায়৷ ভারতীয় দর্শনের একেবারে শেষ কথা৷ অঋত মানে অসত্য, ঋত মানে সত্য৷ সত্য শিব সুন্দরের সর্বদা জয় হয়৷ এটা আমার ভেতরের বিশ্বাস৷

‘বাঞ্ছারামের বাগান’ চলচ্চিত্রের পোস্টার

আর গাছপালা, পশু-পাখি…

আমার নাটকে গাছপালা, পশুপাখিও কম নেই৷ ভারতীয় দর্শনে সবটা নিয়েই ভুমণ্ডল৷ পৃথিবীও গাছপালা, পশুপাখি সব নিয়েই৷ আমার সঙ্গে গাছের যেমন সম্পর্ক আছে, তেমনি গৃহপালিত পশুটারও আছে৷ 

তাই ‘কাক চরিত্র’-এ কাক, ‘রঙের হাট’-এ ব্ল্যাকি, করুণাবাবা…

 ‘মেষ ও রাক্ষস’-এ মেষ, ‘নৈশভোজ’-এ জোড়া শেয়াল, ‘গল্প হেকিমসাহেব’-এ গাধা৷ এরা সব এসেছে বিশেষ চেহারায় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে৷ আরে বাবা, পৃথিবীকে থিয়েটারে ধরতে হলে গাছপালা, পশুপাখি সব কিছু নিয়ে ধরতে হবে৷

আপনি তো বেশ কয়েকটা নাটক পুরাণ, ইতিহাসকে অবলম্বন করে লিখেছেন…

হ্যাঁ, পুরাণ আমাকে সবসময় বেশি টানে৷ পুরাণে কল্পনা বিস্তারের সুযোগ বেশি৷ ইতিহাসে তা নেই৷ ঘটনার স্থানিক ও কালিক বাধ্যবাধকতা আছে৷ এটা আমার ভালো লাগে না৷ তাই দেখবে, ঐতিহাসিক নাটকের বেলায় আমি ব্যক্তি বা বিশেষ ঘটনাকে এড়িয়ে সময়টাকে ধরতে চেয়েছি৷ ‘ছায়ার প্রাসাদ’, ‘দেবী সর্পমস্তা’, ‘গল্প হেকিমসাহেব’-এ সময় হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় চরিত্র৷ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা অনেক নাটকেই আমি পুরাণকে ব্যবহার করেছি৷  ‘তক্ষক’, ‘অশ্বত্থামা’, ‘মেষ ও রাক্ষস’, ‘যা নেই ভারতে’, ‘ভেলায় ভাসে সীতা’…

নাটকের তো মঞ্চেই মুক্তি৷ কিন্তু আপনার নাটক ভীষণভাবে পাঠযোগ্য৷ বিশেষ করে মঞ্চ নির্দেশনা এত ডিটেল যে মনে হয় গল্প-উপন্যাস পড়ছি৷ এটা কি আপনি সচেতনভাবেই করেছেন?

হ্যাঁ, তা করেছি৷ সেটা যদি না করা যায় তাহলে তো লেখাটাই হয় না৷ আমি চাইলেও আমার নাটকটা তো কেউ বার্নাড শ-এর মতো ডানদিকে দরজা, বাঁদিকে দরজা… সেভাবে তো কেউ করবে না৷ আমি তো অ্যাকচুয়ালিটির বর্ণনা দেব৷ বাস্তবে যে ছবিটা দেখছি তার বর্ণনা দিয়ে যাব৷ সেটা অ্যান ইন্ডিকেশন টু দ্য ক্যারেক্টার… নির্দেশক তো হুবহু ওটা না করতে পারেন৷ 

‘সাজানো বাগান’ নাটকের একটি দৃশ্য

আপনি তো একসময় গল্প লিখেছেন৷ এখন আর গল্প-উপন্যাস লিখতে ইচ্ছে করে না? 

না, করে না৷ গল্প লেখার অভ্যাসটাই আমাকে নাটক লিখতে সাহায্য করেছে৷ আমার উদ্দেশ্যই তো নাটক লেখা৷ তাতেই বেশি আনন্দ পাই৷ কারণ দ্যাখো, উপন্যাসকার যা দেখছেন তাই লিখছেন৷ কিন্তু নাটককে আর একটা ফরম্যাটে তা ধরতে হচ্ছে৷ অন্য একটা জায়গায় তার নাটকীয়তা আবিষ্কার করতে হচ্ছে৷ চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব খুঁজতে হচ্ছে৷ এটা কিন্তু উপন্যাসকারের দায় নয়৷ উপন্যাসকার তো টেনে লিখে যায়৷ উপন্যাসে কাহিনি থাকে কিন্তু নাটকে আমাকে সব ধরনের দ্বন্দ্ব ধরতে হয়৷ চরিত্রের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য ধরতে হয়৷ থিয়েটার একজন লোককে একটা পৃথক খেলার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়৷ তার মূল দ্বন্দ্ব, গৌণদ্বন্দ্ব, স্বভাববৈচিত্র— সব ফুটে ওঠে৷ একটা মানুষ স্থানভেদে এক একরকম৷ শ্যামবাজারে একরকম, পার্ক স্ট্রিটে একরকম, বাসের মধ্যে একরকম, ট্রামের মধ্যে আর একরকম৷ এসব জায়গা কভার করে মানুষটাকে ধরতে হয়৷

আমার শেষ প্রশ্ন, আপনি কী দলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন?

ভোট দিই৷ তবে কোনও দলীয় রঙের প্রতি দায়বদ্ধতা বা আনুগত্য নেই৷