জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন শুধুমাত্র তার অপরিসীম জীববৈচিত্র্যের জন্যই পৃথিবী বিখ্যাত নয়, সুন্দরবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশেষত ভারতীয় সুন্দরবনের জঙ্গল ঘেঁষা অঞ্চলে কয়েক লক্ষ মানুষের নিবিড় বসতি।   সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বোঝা যায় অঞ্চলটিতে মানুষের বসতি স্থাপনের ইতিহাস বেশ পুরনো।   প্রাচীন চিহ্নগুলি থেকে এ কথা অনুমান করা যায় যে অঞ্চলটি অতীতে বহুবার উত্থিত এবং নিমজ্জিত হয়েছে। তবে এখন আমরা সুন্দরবনে  যে বসতির চিহ্ন দেখি  তার ইতিহাস খুব বেশি হলে সাড়ে চারশ বছরের পুরনো। বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী প্রতাপাদিত্যের সময়কালে যশোরের দক্ষিণ অংশের গ্রামগুলোকে ঝড়ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যে বাঁধ নির্মাণের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল সেই সময়কালকে আমরা এখনকার সুন্দরবনের বসতি স্থাপনের সূচনাকাল হিসেবে ধরে নিতে পারি। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত সুন্দরবন  সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরা নিরন্তর লড়াই করে  চলেছেন  অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। এই লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার যেমন নদী বাঁধ এবং সমুদ্র বাঁধ, তেমনি এইসব অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের দুর্জয় সাহস, অকুতোভয় মনোভাব। প্রকৃতির সঙ্গে এই লড়াইতে মানুষ যে সবসময় জয়ী হয়েছে তা নয়।  সাম্প্রতিক অতীতে সুন্দরবনের মানচিত্র থেকে মুছে গেছে সুপরীভাঙা, লোহাচড়ার মতো দ্বীপ। আয়তনে  ছোট হতে হতে প্রায় ধ্বংসের মুখে আছে ঘোড়ামারা। গোটা পৃথিবী জুড়ে  ঘোড়ামারাকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। পৃথিবীর প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে এক বার না একবার ঘোড়ামারার কথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত অঞ্চল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খুব দ্রুত কমছে দ্বীপের আয়তন, সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে দ্বীপের অধিবাসীদের। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী যে ১০৯৫ টি বাড়ির ৫ হাজার ১৯৩ জন মানুষ ঘোড়ামারায় থাকতেন তাঁরা নিশ্চিত ভাবে এখন আর সকলে এই দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা নন, এঁদের খুঁজে নিতে হয়েছে অন্য কোনও বাসস্থান। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে  প্রকৃতির সঙ্গে অসম লড়াইয়ে হেরে যাওয়া বহু মানুষের সঙ্গে নাম লিখিয়েছেন এঁরাও। বহু চর্চিত এই ঘোড়ামারার কথা মনে রেখে আমরা আজ নজর দেব ভারতীয় সুন্দরবনের আরও দুটি গ্রামের দিকে, যে দুটি গ্রাম প্রায় ঘোড়ামারার মতোই প্রতিমুহূর্তে হারাচ্ছে তাদের স্থায়ী বাসস্থানের ভূমি। এখানেও বহু মানুষ প্রতিমুহূর্তে লড়ছেন টিকে থাকার লড়াই।

 ভারতীয় সুন্দরবনের দুটি গ্রামের একটি পাথরপ্রতিমা ব্লকের জি প্লট দ্বীপের দক্ষিণতম গ্রাম গোবর্ধনপুর, অন্যটি  নামখানা ব্লকের মৌসুনি দ্বীপের দক্ষিণতম গ্রাম বালিয়ারা। মানচিত্রের অবস্থান লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে দুটি দ্বীপ ভারতীয় সুন্দরবনের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এবং বঙ্গোপসাগর থেকে ছুটে আসা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সরাসরি এই দুটি অংশে আঘাত করে। ২০১১ সালের জনগণনায় বালিয়ারা দ্বীপের বাসগৃহের সংখ্যা ছিল ১৭৪৬ টি, অন্যদিকে গোবর্ধনপুর গ্রামের বাড়ির সংখ্যা ছিল  ২৪৩ টি । বালিয়ারাতে বাস করেন ৮৬৭২ জন মানুষ, আর গোবর্ধনপুর ১১৮৫ জন মানুষের গ্রাম।

দ্বীপগুলিকে ঘিরে থাকা বাঁধ বা মানুষের অকুতোভয় মনোভাব যে এই ভূমিখণ্ডকে স্থায়িত্ব দিতে পারবে না সে কথা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, সুন্দরবনের যে সময় মানুষ বসতি স্থাপন করেছে সে সময়ে ভূমির গঠন একেবারে অপরিণত পর্যায়ে ছিল। আজও সেই ভূমি গঠন সম্পূর্ণ হয়নি।  গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার পলি যে ভূমি গঠনের কাজ শুরু করেছিল আজ থেকে প্রায় ছয় কোটি বছর আগে, সে কাজ আজও চলছে। হিমালয় থেকে বয়ে আসা পলির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জোয়ারের সময় বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা পলির সঞ্চয়ও। নদী এবং সমুদ্রবাহিত পলির মিলিত সঞ্চয় কার্যের ফলে একদিকে যেমন জেগে উঠছে নতুন চর, অন্যদিকে তেমনই কিছু কিছু জায়গায় প্রায় নিয়মিতভাবেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ব-দ্বীপ। ভাঙা গড়ার এই খেলাই সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য। 

 আমরা যদি ১৭৮০ সালে তৈরি জেমস রেনেলের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের  প্রথম বৈজ্ঞানিক মানচিত্রটি ভালোভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো সেখানে সুন্দরবন অঞ্চলের বিস্তার প্রায় কলকাতা পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যার চাপে সে বনভূমি ধ্বংস হতে হতে আজ বাংলার দক্ষিণ অংশে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আজকের সুন্দরবনের মানচিত্র লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যায় ভারতীয় সুন্দরবনের তুলনায় বাংলাদেশ সুন্দরবন অংশে স্বাভাবিক উদ্ভিদের আবরণ কিছুটা হলেও অক্ষত আছে। আমরা যে দুটি গ্রামের কথা আলোচনা করছি সে গ্রাম দুটি এমন দুটি দ্বীপে যে দ্বীপগুলি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ কথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন জোয়ার ভাটার খেলা পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের গঠনের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের এক নিবিড় সংযোগ আছে। এই ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, এই ভূমির গড়ে ওঠা এবং তাকে সুস্থিত করার অন্যতম অংশীদার। মানুষের তৈরি নদী বা সমুদ্র বাঁধ যতই মজবুত হোক তা একটি পৃষ্ঠীয় নির্মাণ। এই নির্মাণ দ্বীপগুলিকে যতটা সুস্থিতি দিতে পারবে তার চেয়ে অনেক বেশি সুস্থিতি দিতে পারতো ম্যানগ্রোভের আবরণ। জনসংখ্যার চাপে সে ম্যানগ্রোভ আবরণ অনেকদিন আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে  ফলে দ্বীপগুলিতে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সরাসরি এসে লাগছে। এর ফলে ত্বরান্বিত হচ্ছে দ্বীপের ক্ষয়।

জলোচ্ছ্বাসের সামনে অসহায় গোবর্ধনপুরের কংক্রিটের নদীবাঁধ

ইংরেজরা যখন এই ভূমি  থেকে রাজস্ব আদায়ের চেষ্টায় কৃষিকাজ প্রচলনের চেষ্টা করলো তখন দেখা গেল দিনে দুবার লবণাক্ত জোয়ারের জল এই দ্বীপগুলিতে  প্রবেশ করে কৃষির ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। এই অসুবিধা দূর করতে দ্বীপগুলিকে ঘিরে ফেলা হতে লাগলো বাঁধ দিয়ে। ফলে জোয়ারের জল ঢোকা বন্ধ হলো  দ্বীপের অভ্যন্তরে। এর ফলে কয়েক বছর বাদে কৃষিজ ফসল উৎপাদন শুরু হলো দ্বীপগুলিতে। কিন্তু জোয়ারের জলের সঙ্গে ঢুকে আসা পলি বালি ঢোকাও বন্ধ হয়ে গেল  দ্বীপের অভ্যন্তরে। বেশ কয়েক বছর পরে দেখা গেল জোয়ারের সঙ্গে ঢুকে আসা পলি  দ্বীপভূমিতে প্রবেশ করতে না পেরে নদীর অভ্যন্তরে জমা হতে হতে নদীর জলতলকে উঁচু করে ফেলেছে। দ্বীপগুলি পড়ে আছে নীচে। আজকের সুন্দরবনের  মনুষ্য বসতিযুক্ত দ্বীপগুলি তাই  অনেকটা চামচের আকার ধারণ করেছে। বড় বড় জলোচ্ছ্বাস বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় যখন সমুদ্র বা নদী ফুলে-ফেঁপে উঠছে তখন দুর্বল বাঁধ সেই জল আটকে রাখতে পারছে না। চামচের আকৃতির দ্বীপের মধ্যে ঢুকে আসা জল প্লাবিত করে ফেলছে গ্রামগুলিকে। নীচু হয়ে যাওয়া দ্বীপভূমি থেকে জল বার করে আনাও বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ত জল বেশ কয়েক বছরের জন্য বন্ধ্যা করে দিচ্ছে কৃষিভূমিকে। কিছু কিছু জায়গায় প্রায় প্রত্যেক ভরা জোয়ারেই সমুদ্র বা নদীর জল বাঁধ ভেঙে বা উপচে গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করছে।

 আজ যদি আপনি মৌসুনি দ্বীপের দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত বালিয়ারা গ্রামের শেখ মুস্তাকিনের বাড়ির সামনে দাঁড়ান তাহলে অবাক হয়ে দেখবেন সেটি আসলে ঠিক বাড়ি নয়, বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। অথচ সে বাড়ির মধ্যেই রয়েছে তার এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তৈরি সংসার। এ বাড়িতে আসলে প্রতি জোয়ারে সমুদ্রের লবণাক্ত জল ঢুকে আসে। কয়েকটি ইঁট দিয়ে উঁচু করা চৌকির উপরে মুস্তাকিনের সংসারের সামান্য জিনিসপত্র। সেখানেই তার রান্নাঘর, শোবার ঘর এবং সবকিছুই। ঘরের পাশেই রাখা আছে তার ছোট্ট নৌকা। ভরা কোটালের দিন সে নৌকোই তাদের বাড়ি। বালিয়ারার দক্ষিণ প্রান্তের বাঁধ গত দশ বছরেও তৈরি করা যায়নি। যতবার বাঁধ তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে ধুয়ে গেছে সমুদ্র থেকে ছুটে আসা জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে।

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচা, বালিয়ারা, মৌসুনি৷

গত সাত বছরে আমাদের চোখের সামনেই অন্তত তিনবার এই অঞ্চলের নদী বাঁধ তৈরি হতে এবং ধ্বংস হতে দেখেছি। স্থানীয় মানুষের মুখে শুনেছি এই দ্বীপের দক্ষিণ অংশে এক বিশাল বালিয়াড়ি ছিল, সে বালির পাহাড় আজ আর নেই। প্রকৃতির খেয়ালে সে বালির পাহাড় এবং তার পাশের ঝাউ গাছের জঙ্গল সম্পূর্ণ উধাও। একই দৃশ্য দেখেছি মৌসুনি থেকে আরও দক্ষিণে অবস্থিত জম্বুদ্বীপেও। জম্বুদ্বীপের একদিকে সারি সারি শুয়ে থাকতে দেখেছি লম্বা লম্বা ঝাউ গাছকে, মনে হবে যেন কেউ কেটে রেখেছে সেই সব গাছ । আসলে কিন্তু সমুদ্র থেকে আসা ঢেউ এই জঙ্গলকে বিনষ্ট করেছে। আবার ওই দ্বীপের অন্য পাশে দেখেছি নতুন করে বেড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ঠিক যেমন মৌসুনি দ্বীপের উত্তর অংশে কাঁকরামারির চরে আজ নতুন করে গড়ে উঠছে ভূমি, জন্মাচ্ছে ম্যানগ্রোভ। সুন্দরবনের দ্বীপগুলির ধ্বংসের ছবি যখন আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় তখন তার অন্য অংশে যে নতুন ভূমির সৃষ্টি হচ্ছে সে কথা আমরা সব সময় খেয়াল করি না। ঘোড়ামারা দ্বীপের  ক্ষয় বা লোহাচড়া দ্বীপ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা সারা পৃথিবীব্যাপী মানুষ জানেন কিন্তু আমরা যদি এই অঞ্চলের মানচিত্রকে একটু ভালো করে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব একদিকে যেমন লোহাচড়া, সুপুরিভাঙ্গা, বেডফোর্ড আইল্যান্ডের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি এই দ্বীপ পরিমণ্ডলের কিছুটা উত্তরে অবস্থিত নয়াচরের আয়তন ক্রমশই বাড়ছে। গোবর্ধনপুর গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের অধিবাসী কানাইলাল গাঁতাইতের সঙ্গে গত বছর ভাদ্র মাসের কোটালের দিন যখন আমরা কথা বলছিলাম তখন তিনি ব্যস্ত ছিলেন সপ্তমবার তাঁর বাড়ি নির্মাণে। এর আগে ছয় বার তাঁকে দক্ষিণ থেকে একটু একটু করে উত্তরের দিকে সরে আসতে হয়েছে ভূমিক্ষয়ের এর জন্য।  প্রকৃতির সঙ্গে এ যেন এক নিরন্তর প্রাণান্তকর লড়াই। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম এই দ্বীপের দক্ষিণ অংশে নাকি ষষ্ঠ খণ্ড বলে একটি ম্যানগ্রোভের জঙ্গল ছিল, যেখানে  নাকি অনেক বাঘ ছিল। বর্তমানে সে জঙ্গলের অস্তিত্ব আর নেই। প্রথম যখন এ কথা শুনেছিলাম মনে হয়েছিল এ বুঝি বয়স্ক মানুষদের “গল্প কথা”। পরবর্তীকালে পুরনো মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে দেখেছি সত্যি সত্যিই জি-প্লট দ্বীপের দক্ষিণ অংশে ছিল আরও একটি ছোট ভূখণ্ড, যার অস্তিত্ব এখন আর মানচিত্রে ধরা পড়ে না। একইভাবে সাগরদ্বীপের দক্ষিণ অংশের বোটখালিতেও ব্যাপক ভাঙন চলছে। সেখানেও হাজার চেষ্টা করেও বাঁধের স্থায়িত্ব রক্ষা করা যাচ্ছে না।  এইসব ভাঙনের  একমাত্র কারণ হিসাবে অনেক সময় বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-উষ্ণায়ন এবং সমুদ্র জলস্তর বৃদ্ধির প্রভাবকে দেখানোর চেষ্টা চলেছে।

জম্বুদ্বীপের দক্ষিণদিকে জলের ধাক্কায় নষ্ট হয়ে যাওয়া জঙ্গল ৷

বস্তুত যদি সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশের মানচিত্রের দিকে আমরা তাকাতে পারি তাহলে বুঝতে পারবো, নদী এবং সমুদ্রের এই মিলিত ভাঙন সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশের যে দ্বীপগুলিতে ম্যানগ্রোভের আবরণ প্রায় নেই সেখানেই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। একদিকে যেমন এই সব অংশে ব্যাপক ভাঙন চলছে অন্যদিকে তেমনি ভূমির কোনও না কোনও অংশে নতুন করে ভূমি গঠনের কাজ চলছে। আজ সারা পৃথিবীব্যাপী মানুষ ভূ-উষ্ণায়ন এবং সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই পৃথিবীর উষ্ণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং দুই মেরু অঞ্চলে জমে থাকা বরফের আস্তরণ ধীরে ধীরে কমছে। বরফ গলা সেইসব জল সমুদ্রের মাধ্যমে চলে আসছে। ফলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি “গল্প কথা” নয়।  কিন্তু আজকের ভারতীয়  সুন্দরবনের যে সব দ্বীপ থেকে মানুষকে উদ্বাস্তু হয়ে অন্য জায়গায়  বাসস্থান খুঁজতে হচ্ছে তাঁদেরকে আমরা শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের উদ্বাস্তু বলব কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তাঁদের ভূমি হারানোর ঘটনাটি  মিথ্যা নয় কিন্তু এর পিছনে একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন নয় বরং দীর্ঘকাল ধরে একটি অপরিণত ভূমিখণ্ডে প্রকৃতির সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করে বেঁচে থাকার অসম চেষ্টার ফল বলা যেতে পারে। বসতি স্থাপনের সময় থেকেই সুন্দরবনের মানুষকে বোঝানো হয়েছে  প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই তাঁদের বেঁচে থাকতে হবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে তাঁদের শত্রু হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। নদীকে তার স্বাভাবিক গতি পথে চলতে দিলে সুন্দরবনকে আজ এতটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হতো না। এ কথা মানতেই হবে যে প্রাথমিকভাবে বসতি স্থাপনের সময় বাঁধ নির্মাণ ছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা সম্ভব হতো না। কিন্তু একটি নদীকে তার প্লাবন ভূমির সঙ্গে  সম্পর্কহীন ভাবে বেশি দিন রাখলে যে কুফল দেখা দিতে পারে তার চিহ্ন আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি সুন্দরবনের গ্রামগুলিতে। নদী তার হারানো জমি ফেরত চাইছে। ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া জনসংখ্যার চাপে থাকা সুন্দরবনের গ্রামগুলির পক্ষে সে জমি ফেরত দেওয়া প্রায় অসম্ভব। বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি করে, বাঁধের প্রকৌশলগত প্রাযুক্তিক উন্নতি ঘটিয়ে, বাঁধ এবং নদীর মাঝের চরে ম্যানগ্রোভ রোপন করে সাময়িক স্থায়িত্ব রক্ষা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদী  ফল পাওয়া বেশ কঠিন।

সুন্দরবনের দ্বীপগুলির এই ক্ষয় এবং মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে যাবার  ঘটনাগুলিকে তাই শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা  যুক্তিযুক্ত নয়।  গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করছি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন সংস্থা সুন্দরবনের মানুষের দুর্দশার পিছনে শুধুমাত্র এই  একটি কারণকেই বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। গবেষণার জন্য অর্থ বিনিয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থাও গবেষণা শুরুর আগেই এই কারণটিকে বেশি করে গুরুত্ব আরোপ করার কথা বলে দিচ্ছেন। গোটা সুন্দরবন জুড়ে ক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে সঞ্চয় বা নতুন ভূমি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলছে  সে বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন ।।

আলোকচিত্রী: অভিজিৎ চক্রবর্তী