একরাম আলি

বীরভূমের যে গাঁয়ে আমার জন্ম সেই ছোট্ট জনপদটির ইতিহাসের খোঁজ এখনও পড়েনি। ফলে তেমন উৎসাহী কাউকে পাওয়া যায়নি যিনি ঘোষণা করে ফেলবেন— জোব চার্নক গোছের কোনও এক ভাগ্যান্বেষী এসে ছায়াঘন একটি গাছতলা পেয়ে এত সালের এত তারিখে ডেরা বেঁধেছিলেন আর গ্রামটির শুভ জন্ম হয়েছিল। কোনও ভূর্জপত্রে বা তুলোট কাগজে গ্রামটির জন্মপত্র লেখা নেই। শোনা কথা : প্রথম জরিপের আগে-পরে ব্রিটিশের খাতায় লেখার জন্যে গ্রামটার যখন নামের দরকার হয়, গাঁয়ের লোকের কাছে শুনে তারা সরল করে লিখেছিল— ভিলেজ টেঘোরিয়া। যেন আন্দালুসিয়া বা আনাতোলিয়া। আসলে নামটি ছিল তেঘর‍্যা। যেমন পুরুল্যা।

ছোট্ট গ্রাম। কিন্তু যত ছোটই হোক, নিজের গ্রাম তো ভেতরে ভেতরে অনন্তবিস্তৃত।

তা, নাতনির দু’মাস বয়স হতেই চারদিক থেকে নামকরণের তাড়া। এই তো সেদিন, বছর পাঁচেক আগের কথা। যেতেই হল সেই গ্রামে। যাবার আগে ফোন করা ছিল সবাইকে। সবাই অর্থে এখানে আবহমানকালের সবাই। পাশের দমদমা গ্রামের ধাইমা, গাঁয়ের সব কাজের ডাকুইয়ে— অর্থাৎ গ্রামের বাড়ি বাড়ি খবর দেওয়ার কাজ যে করে— অনাথ বায়েন, লাগোয়া গোয়ালগ্রামের নাপিত নৃসিংহপদ ভাণ্ডারীর নাতি এবং দ্বিজপদ ভাণ্ডারীর ছেলে নন্দ (বেচারা নোদাঁ নামেই পরিচিত!), গাঁয়ের মসজিদের খতিব, সঙ্গে আত্মীয়কুল। নামকরণ অর্থে এখানে আকিকাহ। আরবি আক— মানে কাটা থেকে শব্দটি এসেছে। সেদিন জাতক বা জাতিকার মস্তকমুণ্ডন হবে। আঁতুড়ের চুল আর থাকবে না। কাজটি করবে কে? ওই গোয়ালগ্রামের নাপিতই, যে পরিবারটি বংশপরম্পরায় করে আসছে। কাজটি করা উচিত ছিল সাত দিনে, একান্তপর একুশ দিনে। কিন্তু দেশভাগ, স্বাধীনতা, তেভাগা, নকশাল আন্দোলন, চাঁদে নিল আর্মস্ট্রঙের পায়চারি এবং ব্যাঙের ছাতার মতো নার্সিংহোমের দাপটে পারিবারিক আঁতুড়ঘরটিই তো কবে যেন উচ্ছেদ হয়ে গেছে! তার আবার সাত দিন! তাতে আবার ধাইমা? কিন্তু ওই যে, প্রসূতি আর নবজাতিকা/জাতকের পরিচর্যা তো দমদমার ওই বাগদি পরিবারের মহিলাদেরই করে আসার কথা। এবং বংশপরম্পরায়। তাদের তো অধিকার আছে।

বুড়ি ধাইমা এসেই নাতনিকে কোলে নিতে তৎপর। ব্যাপার দেখে জাতিকার তরুণী মা সন্ত্রস্ত। মহিলার কনুই পর্যন্ত দু-হাত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে নিজে ঘষে তবে শান্তি। কিন্তু কী যে অস্বস্তি সারা শরীরে তখন! যেন আমারই গায়ে কেউ ঘষে দিচ্ছে বিষতেল। মেয়ে তো জানে না, এর ঠানশাশুড়িই— যে আমার জন্মের সময় আঁতুড়ঘরে টানা একুশ দিন ছিল মায়ের একমাত্র সঙ্গিনী! পলতেয় দুধ খাইয়েছে। কষে তেল মাখিয়ে সেঁক দিয়েছে। ঘুম পাড়িয়েছে। কোলে নিয়ে জেগে থেকেছে রাতের পর রাত।

কিন্তু ধাইমাদের যে বুঝদার না হলে চলে না। এসবের পরেও দিব্যি সাদরে কোলে শুইয়ে সে ডাকল নাপিতকে। বারবার সতর্কবাণীও বর্ষিত হচ্ছিল মিশি দিয়ে দাঁত মাজা ফোকলা মুখে— দেখিস বাবা। রাঙা টুকটুকে মেয়েটাকে খাম করে দিস না। সাবধানে ক্ষুর চালাস।

ক্ষুর? মেয়ে তখন আর সন্ত্রস্ত নয়, উত্তেজিত— বাবা, এসব কী হচ্ছে? ওই ভোঁতা ক্ষুরে মাথা ন্যাড়া?

পরনে লুঙ্গি। গায়ে মলিন হাওয়াই শার্ট। পায়ে রবারের স্যান্ডেল। উঠোনের আমগাছতলায় নন্দ দাঁড়িয়ে। দু’হাত পিছনে। আর সেখানেই তার ক্ষুর-কাঁচির থলেটি ধরা। যেন লুকোনো। বিড়বিড় করে বলার চেষ্টা করছে— চিন্তার কিছু নাই। ক্ষুর খুব করে শানানো। দরকারে ফের ঘষে নিলেই হল। কিন্তু কে শোনে!

ফলে হল না। নিয়মরক্ষার জন্যে কাঁচি দিয়ে ডগে ডগে ছেঁটে দেওয়া হল, যেটা নাকি কলকাতায় ফিরে চোখা নাপিত ডেকে মেরামত না করলেই নয়।

ধাইমার চিরকালীন বরাদ্দ নতুন শাড়িকাপড়। সঙ্গে সিধে এবং নগদ টাকা। নাপিত একধাপ উপরে। একই জিনিসপত্র একটু বেশি। মসজিদের খতিবেরও কিছু পাওনা রয়েছে। পাঞ্জাবি-লুঙ্গি-গেঞ্জি। তিনিই তো জাতিকার নামকরণে শিলমোহর লাগাতে বলশালী এক খাসির প্রাণ আল্লাহর নামে উৎসর্গ করবেন।

দুই

আজকাল নানা ব্যাপারে মানুষের কৌতূহল বেড়েছে। দোষের নয়। তথ্যপ্রযুক্তির ধাক্কা। এই নাপিত, ধাইমা, ডাকুইয়ে— এরা আকিকাহ বা নামকরণ অনুষ্ঠানে টুপি-পরা খতিবের সঙ্গে জুটল কোত্থেকে?

তাহলে বেশ খানিকটা পিছিয়ে যেতে হয়। এলাকায়— বেশ বড় সে এলাকা— নাপিত-পরিবার একটিই। আমাদের ছোটবেলায় নাপিতরা পাঁচ ভাই। ছোটটিকে বাদ দিলে চার ভাইয়ের দু’জন ঘরজামাই হয়ে ভিনগাঁয়ে। থাকে দ্বিজপদ আর উমাপদ। এদের ছিল যজমানি প্রথা। ক্ষৌরকর্মে নগদ দেওয়ার প্রথা ছিল না। বার্ষিক ধার্য ছিল। আর ছিল জন্ম, বিবাহ, মৃত্যুতে (এক্ষেত্রে মুসলমানদের নাপিত লাগে না) বাড়তি পাওনা। এরা ডোম বায়েন বেদে হাড়িদের ক্ষৌরকর্ম করে না। কেননা এলাকার বড় বড় পুজোআচ্চায় এদেরই ডাক পড়ে। ব্রাহ্মণদের ক্ষৌরকর্ম এরাই করে থাকে। তাহলে মুসলমানদের যজমানি করে কেন? দ্বিজপদর সহজ উত্তর— বংশপরম্পরায় কাজটা তারা করে আসছে।

খড়ের আঁটির ওপর বারান্দায় বসে হুই যে বাচ্চাটি, মাথা উমাপদর হাড়িকাঠে, মানে হাঁটুতে— সে তো বছর ষাটেক আগের কথা। লাঙলের ফালের মতো কাঁচি চলছে।

… আহ, লাগছে!…

লাগবে না বাবা। এই তো—

মাঝে মাঝেই আটকে যাচ্ছে কাঁচি। গলা নামিয়ে স্বীকারোক্তি— আজই শান দিতে দুবরাজপুর যাবার কথা। ভোরে গাইটো বিয়োইলো, দামড়া বাছুর। ফেলে কী করে যাই বাবা? কালই যাব। মাকে বোলো না, বেশ?

ছাড়া পেতেই একছুটে বাড়ির ভিতরে। আয়না চিরকালই চাটুকার। পুরো সত্যি কখনও বলে না। সেই আয়নাতেই একটা আধাখোট্টা মাথা! আমারই তো! স্কুল যাব কী করে? ছুট্টে এসে ধরি— কী করেছ?

বাংলা লোককাহিনির পাতায় নাপিতরা বরাবরই ধূর্ত। কোনও কোনও গল্পে বুদ্ধির জোরে অনেককে বিপদ থেকে বাঁচিওয়েছে। তবে সেসব বুদ্ধি হয়তো বা চালাকির তুতোভাই। তেমনই একটা আত্মবিশ্বাসের রেখা খেলে যেত উমাপদর ঠোঁটে— কেনে? যেমন তোমার কাটি। আলবুট ছাঁট!

আলবুট? হায় রে প্রিন্স অ্যালবার্ট। সিংহাসনে বসার সুযোগই জোটেনি তাঁর। মাত্র আঠাশ বছর বয়সে যুবরাজ এডওয়ার্ডের পুত্র এবং রানি ভিক্টোরিয়ার আদরের নাতিটি মারা যাওয়ার পাঁচ/ছ-দশক পরেও তাঁর হেয়ার স্টাইলের দূরবর্তী আর গলিত রূপটি বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে— অন্তত নামে হলেও— কী করে যে টিকে ছিল, আজ ভাবি।

নাপিত যেমন, ধাইমাও তাই। জন্মের সময় একদা সে-ই ছিল একাধারে ডাক্তার, নার্স আর বিশ্বস্ত আয়া। তারাও তথাকথিত ছোট জাতের প্রসূতির ডাকে যেত না। অন্য হিন্দুদের যেমন, তেমনই আসত মুসলমানদের ডাকে। দরকারে আজও আসে। ঝুঁঝকি রাতেও।

তিন

একটু ভিতরে ঢুকলেই দেখা যাবে, বাংলার সমাজবিন্যাস বড় বিচিত্র। রহস্যে ভরা। মধুরও। যে শহর বা জনপদ বহু আগেই সমাজহারা, এই রহস্যময় মাধুর্যের পুরনো স্টেনসিলগুলো আর সেখানে দেখা যাবে না। তাই বলে কি ছিল না? নেই?

১৯৬০ সাল। জানুয়ারি মাস। ক্লাস ফাইভে ভর্তি করা হল দু’মাইল দূরের পুরন্দরপুর হাইস্কুলে। সঙ্গে হোস্টেলেও। হিন্দু-মুসলমানের একটাই হোস্টেল। এমনকি ঘরও ভাগ করা ছিল না। সুপার বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সাড়ে ন-বছর বয়স। সর্বকনিষ্ঠ সদস্য আমি। কীভাবে যেন নাম হয়ে গেল ভানুসিংহ! রান্নার ঠাকুর মিশিরজি। সঙ্গে এক সহকারী। আর ঝি। তখনও মাসি-তে অবনমন হয়নি। আমরা বলতাম— ঝি-মা। হোস্টেলে নিজের কাজ নিজে করার নিয়ম। পারব না ভেবে ঝি-মায়ের সঙ্গে কী এক বন্দোবস্ত করা হয় বাড়ি থেকে। এঁটো থালা-বাসন— বিশেষ রাতে— সে-ই ধুয়ে আনত পুকুরঘাট থেকে। কেচে দিত জামাকাপড়। স্কুলের কাছেই বায়েনপাড়ায় তার আস্তানা। কুচকুচে কালো। চেহারায় এতটুকু লালিত্য ছিল না। হোস্টেলের শত কাজ সামলে যখন জানতে চাইত কিছু করতে হবে কিনা, ঘরছাড়া এক বালকের সে হয়ে উঠেছিল আশ্রয়, যে আশ্রয়ে ছিল পারিবারিকতা।

সপ্তাহান্তে বাড়ি গেছি। হোস্টেলের কথা খুঁটে খুঁটে শুনে মা বলল— ওকে বলিস তো একবার আসতে।

সময় তো নেই। সারাদিন হোস্টেলের কাজ। তবু কী এক ফাঁক বের করে ঝি-মা গিয়েছিল। দুধ-মুড়ি আর ছানার মণ্ডা খাইয়েও মায়ের শান্তি হয়নি। হাতে পাঁচ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলেছিল—এটা রাখ। ওর বাবাকে বলিস না। একটাই ছেলে আমার। একটু দেখিস মা। পুজোর আগে একবার মনে করে আসিস। শাড়িকাপড় নিয়ে যাবি।

আমি তখন খুব ব্যস্ত। সরস্বতী পুজোয় ‘মুকুট’ নাটকে ছোট রাজকুমার। সব সময় আঊড়ে যাচ্ছি সংলাপ। রিহার্সালের সময় একদিন দুঁদে পণ্ডিতমশাই রিহার্সালের দায়িত্বে থাকা শ্যামাপদবাবুকে বললেন— ওই পুঁচকেটাকে দরকার।

কেন?

আবৃত্তির জন্যে।

সংস্কৃত শ্লোক ও পারবে?

আমিই তো ক্লাস নিই, শ্যামা। একটু ফাঁকিবাজ, তবু ও-ই পারবে। জয়দেবের শিবস্তোত্র ওদের পাঠ্য না হলেও হোস্টেলে প্রেয়ারে ওই শ্লোকটাই তো বলতে হয়।

ফলে দু’দিনের অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ। এরই ফাঁকে সন্ধেয় ঝি-মা এসে জানিয়ে গেল মায়ের কথা। আজ গিয়েছিল সে। খুঁটিয়ে বর্ণনা। কী ভালো মা!

ধুর, এদিকে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে— শিবম শিব নাকি শিবং শিব?

চার

অনটন হয়তো বা মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। গত শতকের সেই ষাটের দশকে আমাদের স্কুল ছিল বেশ গরিব। হিন্দু-মুসলমানের জন্যে দু-দুটো হোস্টেল টানার মতো সঙ্গতি ছিল না, নাকি তার দরকারই বোধ করেননি বড়রা— আজ নিশ্চিত করে বলা মুশকিলের। ফলে সামসুলদা— যে নাকি ছিল স্কুলের ফুটবল টিমে একমাত্র আয়রনম্যান, মানে রাইট ব্যাক— অবলীলায় কোনও ব্রাহ্মণসন্তানকে বলত, বেশি বকিস না। আটশো বছর তো নিজের পইতে বাঁচাতেই কাটিয়ে দিলি আর শাসন করলাম আমরা। বা, এরকম খুচরো তর্ক। সবই হাসতে হাসতে।

স্কুল আর হোস্টেল একই কম্পাউন্ডে। জনাচারেক মাস্টারমশাইও থাকতেন। একজন সেখ খবিরউদ্দিন। প্রতি বছর স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর একটা কবিতা থাকতই। কোনও বিখ্যাত কবিতার প্যারডি। যেমন— শুধু গোটা দুই ছিল মোর বই আর সবই গেছে ছিঁড়ে। বা, জীবন আমার করো জিলিপির মতন প্যাঁচের আধার…।

মাস্টারমশাইদের মাইনে কম। হোস্টেলের খাবার নিতান্ত সাদামাটা। পোশাক চলনসই, মানে হাতে কাচা। জীবন নিম্নমধ্যবিত্ততায় সমৃদ্ধ। ব্র্যান্ড-ছাপ মগজে তেমন ঢোকেনি তখনও। তাই দোকানে গিয়ে গায়ে-মাখা সাবান চাওয়াটাই ছিল দস্তুর। সুপার বিশ্বনাথবাবুকে বলতে শুনেছি— আলু ক’কিলো দিলে মিশির? চার কিলো? কুমড়ো দাও ছ’কিলো। জল থাকবে কিলো চারেক। মোট তাহলে দাঁড়াল চোদ্দো কিলো। হবে না?

হেডমাস্টারমশাই স্থূলকায় অমূল্যকুমার ঠাকুর। স্কুল থেকে ফেরার সময় মোড়ে বাবা গদিতে থাকলে চেয়ার মুছে এগিয়ে দেওয়া হত। কর্মচারীকে হেঁকে বলা হত সিগারেট আনতে। তিনি জাঁকিয়ে বসে— না হে জোবেদ, বিড়িই দাও। বিড়ির বান্ডিল-দেশলাই এলে লম্বা সুখটান দিতেন। ততক্ষণে হয়তো এগিয়ে এসেছে চায়ের গ্লাস। আবার চা? আচ্ছা দাও।

এমন অনাড়ম্বর জীবনযাপনের নুনে-খাওয়া দেওয়ালে কোনও এক অনর্গল জানালা ছিল— যেখান দিয়ে দূর অরণ্যবাহিত হাওয়ার সঙ্গে সাতমহলা আকাশের নীলও ঢুকে পড়ত। চাইত সবার গায়ের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে সবাইকে একই বর্ণে রাঙিয়ে দিতে। হেডস্যার, খবিরউদ্দিন স্যার, মা, ঝি-মা, দ্বিজপদ আর নন্দ নামের নাপিত, শ্যামাপদবাবু, পণ্ডিতমশাই, ধাইমা, মসজিদের খতিব, সুপার বিশ্বনাথবাবু, আয়রনম্যান সামসুলদা, বাবা— সব্বাইকে।

সেই জানালাটা কি ইট গেঁথে কেউ বন্ধ করে দিচ্ছে? হাওয়া আর আসছে না যে!

চিত্রকর: সৌজন্য চক্রবর্তী