আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল

কী বিচ্ছিরি চাকরি ঐ ঘর-গেরস্তালি শত কাজের ভিড়।

(যাব: আবু হাসান শাহরিয়ার)

ভ্রমণ ও সাইকেল— দুটিই সঙ্গী হয়ে আছে নব্বই দশকের শুরু থেকে। ভ্রমণ আর নেশা নয়, ইবাদত হয়ে গেছে। এই ইবাদতনামায় যুক্ত হয়েছে ৬টি মহাদেশের ৫৭টি দেশ। লেখা হয়েছে আমার ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা নিয়ে দুটি বই : ‘সঙ্গী সাইকেল ও আরাধ্য পৃথিবী’ ও ‘এবং পূর্ব আফ্রিকা’। সম্পাদনা করেছি ‘ভ্রমণের খেরোখাতা’ ও ‘এক্সপেরিয়েন্স বাংলাদেশ’ নামে ভ্রমণ সংকলন।

ভ্রমণের ডাক যিনি শুনেছেন তার কি বন্ধ খাঁচা ভালো লাগে? ভ্রমণ হল নেশার মতো। সেই নেশায় বুঁদ আমি ও মুনতাসীর মামুন। দুজনে মিলে ১১ জুন যাত্রা শুরু করি সিয়াটল থেকে এবং ৬৬ দিন পর ১৪ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে যাত্রা শেষ করি। পথিমধ্যে পাড়ি দিয়েছি যেসব স্টেট সেগুলো হল— ওয়াশিংটন, আইডাহো, মন্টানা, ওয়াইমিং, সাউথ ডাকোটা, নেব্রাস্কা, আইওয়া, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, ওহাইয়ো, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও ভার্জিনিয়া। সব মিলিয়ে ৫ হাজার মাইল পথ। প্রথমে পেয়েছি পাহাড়ি রাস্তা, তারপর কিছুটা সমতল ভূমি এবং সবশেষে আবার পাহাড়ি পথ। তবে কষ্টকর পাহাড়ি পথ হলেও ভার্জিনিয়া ছিল সবচেয়ে সুন্দর।

আমাদের ট্যুরের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। আমেরিকা-সহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে; কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না রিসাইক্লিংয়ের প্রবণতা। আমাদের মতো সমুদ্র সমতলের খুব কাছের দেশগুলোর জন্য বিষয়টি হুমকিস্বরূপ। ইমরান ও তার এম আই টি-র বন্ধুরা মিলে আমাদের সাইকেল সফর শুরুর আগেই একটি বিশেষ স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন বানিয়ে দিল। আমরা সাইকেল চালাতাম আর পথে প্লাস্টিকের জিনিস দেখতে পেলেই তার হিসাব রাখতাম মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই গণনা গুগল ম্যাপের মাধ্যমে ওয়েবসাইটে চলে যেত।

যাত্রাপথ

আমাদের পুরো ভ্রমণে আমরা থেকেছি সরকারি পার্ক, ক্যাম্পগ্রাউন্ড এবং শেষের দিকে মোটেলে। ক্যাম্পগ্রাউন্ডে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কেনাকাটার জন্য রয়েছে দোকান। আমরা অল্প ক’দিন ছাড়া পুরো ভ্রমণপথে নিজেরাই রান্না করেছি। রান্নার সব সরঞ্জাম বহন করতাম। বেশি খাবারদাবার সঙ্গে নিয়ে ওজন বাড়াতাম না। কারণ, প্রতিটি শহর বা ক্যাম্পগ্রাউন্ডে খাবার কিনতে পাওয়া যেত। আর সবসময় ব্যাগে থাকত কিছু এনার্জি বার, খেজুর ইত্যাদি। আমরা যে সাইকেলে করে আমেরিকা ঘুরেছি তার নাম টেনডেম সাইকেল। এটি বাইক ফ্রাইডের তৈরি। এই সাইকেলের দাম শুরু হয় ১ হাজার ২০০ ডলার থেকে। সাইকেলটির সুবিধা হল, আপনি যেখানেই যান না কেন, এটিকে খুলে একটি স্যুটকেস বা বাক্সের ভেতরে নিয়ে যাওয়া যায়।

ক্যাম্পগ্রাউন্ডের মধ্যে ক্যাম্পগ্রাউন্ড অব আমেরিকা (কে ও এ) হচ্ছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। গোটা আমেরিকায় রয়েছে তাদের সুবিশাল নেটওয়ার্ক। ডেভ ড্রাম নামে এক ভদ্রলোক ১৯৬২ সালে মন্টানার ব্লিলিংসে এটি শুরু করেন। বর্তমানে ৫০৬টির বেশি কে ও এ রয়েছে আমেরিকাজুড়ে। তবে সবচেয়ে বড় কে ও এ হচ্ছে ফ্লোরিডা এবং দ্বিতীয়টি সাউথ ডাকোটায়।

মিজোলায় আমরা আমেরিকার সবচেয়ে বড় সাইক্লিংয়ের সংগঠন অ্যাডভেঞ্চার সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনে যাই। সেখানকার সবার সঙ্গে পরিচিত হই এবং আমাদের ভ্রমণ সম্পর্কে তাদের অবহিত করি। তারা আমাদের ছবি তুলে হল অব ফেমে ঝুলিয়ে রাখল এবং আমাদের জিনিসপত্র ও সাইকেলের ওজন মাপল। তাদের ভাষ্যমতে, এত ওজন নিয়ে কেউ ক্রস ইউ এস এ সাইক্লিং করেননি এবং জানালেন, টেনডেম সাইকেল নিয়েও কেউ যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দেননি।

এ সিএ-র মতে, আমরাই নাকি প্রথম মুসলমান যারা সাইকেলে করে ইউএস এ পাড়ি দিচ্ছি। সাইক্লিংয়ের সংগঠন এসিএ-র অফিস অনেক বড়। বিপুলসংখ্যক লোক কাজ করেন সেখানে। এসিএ-র অফিসে যাওয়ায় এবং ক্রস ইউ এস এ সাইক্লিং করার কারণে তারা আমাদের দুজনকে ফ্রি সদস্যপদ দিলেন।  আগে থেকেই এসিএ-র ম্যাপ আমাদের সংগ্রহে ছিল তাই ম্যাপ আর কিনতে হয়নি। আমরা যে রুট ধরে আমেরিকা পাড়ি দেব সেটা হচ্ছে সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট। তার নাম ট্রান্স-আমেরিকা। ৬৬ দিনের বিশাল ভ্রমণের কিছু টুকরো স্মৃতি তুলে ধরছি পাঠকের জন্য।

উঁচু–নীচু বন্ধুর পথ

ডার্বি থেকে উইসডম ৫৮ মাইলের পথ। ২০ মাইল চালানোর পর হালকা বিশ্রাম নিলাম। ডার্বি শহরটি ৪ হাজার ফুট উচ্চতায়। আমাদেরকে পাহাড় ঠেলে ৭ হাজার ফুট উচ্চতায় যেতে হল। ১৩ মাইল যেতে সময় লাগল ৫ ঘণ্টা। ভীষণ কষ্ট ও পরিশ্রমের দিন পার করেছি তখন। আমরা সাইকেল-সহ দু’বার পড়ে গেলাম। এডউইনের ওখানে বিশ্রাম নেই এবং দু’জন কানাডিয়ান সাইক্লিস্টের সঙ্গে কথা হল। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। সম্ভবত প্রেমিক-প্রেমিকা। বিদায় জানিয়ে আবার রওনা হলাম। বিশাল আকাশ, ফসলের জমিতে অনেক গোরু এবং কিছুক্ষণ চালানোর পর লক্ষ করলাম মৌমাছির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মশা। আমরা সাইকেল চালাচ্ছি এবং পেছন পেছন মশাগুলো অনুসরণ করছে। অতি দুষ্টু মশা কানে কামড় দিচ্ছে। হাতে, হাঁটুতে, ঘাড়ে— সর্বত্র বিচরণ করছে। মশার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে চললাম। জীবনে মশার এমন একত্রিত আক্রমণ কখনও দেখিনি।

উইসডমে পৌঁছানোর পর রাস্তার সঙ্গে যে ক্যাম্পগ্রাউন্ড পেলাম তাতে থাকা যাবে না। পানি নেই, রেস্টরুমের দেখা নেই— সর্বোপরি মশার যন্ত্রণা। খুবই ছোট শহর উইসডম। মাত্র ৫০ হাজার লোকের বসবাস। কে থাকে এত মশার মধ্যে? দুটি বার, একটি দোকান পেলাম। যদিও দোকানটি সন্ধ্যার আগে বন্ধ হয়ে গেছে। বারে গিয়ে ক্যাম্পগ্রাউন্ড ও লজের খোঁজ করলাম। যদিও পাশে হোটেল ছিল; কিন্তু সেটার কথা তারা বলল না। মনে হল লজের সঙ্গে বারের ব্যবসায়িক বা পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। লজের পাশেই তার মালিক থাকেন। সেখানে যাই এবং ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বা দর-কষাকষি করে ৬৫ ডলারে রফা করি। এই ৬৫ ডলার আমাদের জন্য অনেক টাকা। কারণ, ক্যাম্পগ্রাউন্ডে আমরা বেশ সস্তায় থাকতে পারতাম। কিন্তু ওখানে কোনও চয়েস নেই।

এমনি করেই তাবু টাঙিয়ে রাত্রি যাপন। সিয়াটেল।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে আর মশার উপদ্রবও বেড়ে চলেছে। লজটি খুবই সুন্দর। দুটি রুম। কিচেন, বাথরুম সবই আছে। রান্না হল, বেশ খাওয়াদাওয়া হল এবং টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ট্যুরের মধ্যে সবচেয়ে দামি লজে ছিলাম। সেদিন ঘুম হল সবচেয়ে কম। ইমরান তার পায়ের ব্যথায় অস্থির। রাত তিনটার দিকে ঘুম থেকে উঠে তার পায়ে ম্যাসাজ করে দিলাম। ৪টা ৪০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে রওনা দিলাম উইসডম থেকে জ্যাকসনের উদ্দেশে। মাত্র ১৮ মাইলের পথ। পুরো ভ্রমণে এটিই ছিল সবচেয়ে কম পথের ভ্রমণ। খুবই সুন্দর পথ। দু’পাশে পাহাড়, মাঝেমধ্যে গোরুর খামার এবং বাছুর-গোরু দেখলাম। শরীর ক্লান্ত, তাই জ্যাকসনে এসে ক্যাম্পগ্রাউন্ডে উঠলাম। এখানে একটিই ক্যাম্পগ্রাউন্ড রয়েছে। বিশাল বড় হলরুম। অফিস থেকে জানাল, বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। একটি পরিবার পুরো ক্যাম্পগ্রাউন্ড ভাড়া নিয়েছে। তাদের আবার সুইমিং পুল রয়েছে। অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলাম। ক্যাম্পসাইটের বিপরীতে একটিমাত্র গ্রোসারির দোকান। দোকানে কর্মরত মহিলা জানালেন, এ শহরে মাত্র ৩৪ জন লোক থাকেন। দোকান থেকে হালকা কিছু খাবার কিনলাম। অনেক সাইক্লিস্ট এসেছেন ক্যাম্পগ্রাউন্ডে। একটি পরিবারের একজনের সঙ্গে পরিচয় হল। তিনি বললেন, তাঁদের পরিবারের ৪০ জন এসেছেন বিভিন্ন স্টেট থেকে এবং তারা আজ সবাই ৩০ মাইল সাইকেল চালিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কমবয়সি ছেলেমেয়েও রয়েছে। তারাও সঙ্গ দিয়েছে সাইকেল চালিয়ে। তিনি জানালেন, প্রতিবছর তাঁরা পরিবারের সবাই একত্র হয়ে সাইকেল চালান এবং ক্যাম্পগ্রাউন্ডে অবস্থান করেন। আহ্, কী আনন্দ!

প্রতিবছর আইওয়াতে ৭ দিন ব্যাপী সাইকেল প্রতিযোগিতার আসর বসে।

আর একটি গ্রুপে পাঁচজন সাইক্লিস্টকে আসতে দেখলাম। তাদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। রজার ফ্রাঙ্কের সঙ্গেই আমার বেশি আলাপ হল। রজার বললেন, প্রতিবছর আইওয়াতে র‍্যাগবেরি অর্থাৎ সাত দিনব্যাপী সাইক্লিং হয়। সারা বিশ্ব ও আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাইক্লিস্টরা এখানে আসেন এবং সাত দিন একত্রে সাইকেল চালান। শুনেই তো ভালো লাগল এবং ইমরানকে বললাম আইওয়ার এই সাইকেল ইভেন্টের কথা।

পরে ওদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক হল আমরা ওদের সঙ্গে আইওয়া পর্যন্ত যাব। আমাদের প্রাথমিক রুট পরিবর্তন করতে হল আইওয়া যাওয়ার জন্য। র‍্যাগবেরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো, বৃহত্তম ও দীর্ঘতম বাইসাইকেল ট্যুরিং ইভেন্ট। চলতি বছরে (২০১৯ সাল) তারা ৪৭ তম বছরে পদার্পণ করবে। অর্থাৎ এটি চলছে ১৯৭৩ সাল থেকে। মোটামুটিভাবে এটি ৪৬৮ মাইল দীর্ঘ একটি পথ, যা সবসময় সমতল নয়। এটি আইওয়ার পশ্চিম বর্ডার মিসৌরি নদীর তীরবর্তী কোনও এক জায়গা থেকে শুরু হয়। তবে তারা প্রতিবছরই রুট পরিবর্তন করে থাকে। র‍্যাগবেরিতে প্রতিদিন গড়ে ৬৭ মাইল সাইকেল চালানো হয়। ইভেন্টে রেজিস্ট্রেশন করে সাইকেল চালাতে হলে এক সপ্তাহের রাইডের জন্য আপনাকে গুনতে হবে ১৫০ ডলার। অথবা দিন হিসাবে রেজিস্ট্রেশন ২৫ ডলার করে।

পাহাড় লেকের যুগলবন্দি, ইয়োলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক যাওয়ার পথে।

যখনই সমতল ভূমি থেকে ওপরে উঠতে হত তখনই আমার ভীষণ কষ্ট হত। মনে হত নিশ্বাস নিতে পারছি না। সাইকেল থেকে নেমে হেলমেট খুলে সাইকেলের পেছন ঠেলতে ঠেলতে ওপরে উঠতে হত। জ্যাকসন থেকে ডিলনের পথে অনেক সাইক্লিস্টকে দেখলাম। পথে সাইকেল থামিয়ে কথা হল অস্ট্রেলিয়ান এক সাইক্লিস্টের সঙ্গে। তিনি পূর্ব থেকে যাত্রা শুরু করেছেন এবং পশ্চিমে গিয়ে শেষ করবেন। জানতে চাইলাম এই ভ্রমণটা শেষ করার জন্য কোন জিনিসটা সবচেয়ে জরুরি? ভদ্রলোক বললেন, অলওয়েজ বি পজিটিভ। তাতেই হবে। তাঁর কথা পুরোপুরি সত্য ছিল। আজ ট্যুর শেষে সেটা বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারছি। আমার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ছিল এবং বেশ ক্ষুধা পেত ট্যুরের আগে। তখন ভেবেছিলাম, এত কম খেয়ে কীভাবে ভ্রমণ করব। অথচ পজিটিভ মনোবলই সব কিছু দূর করে দিল। খুব কম খেয়েও যথাসময়ে খাবার গ্রহণের ফলে কিন্তু কোনও সমস্যাই হয়নি। পথে আরও কিছু সাইক্লিস্টের সঙ্গে কথা হল। তাঁরা জানালেন, ক্যানসারের জন্য তাঁরা অর্থ সংগ্রহ করছেন মন্টানায়। পথে মার্কিন মুলুক এফোঁড়-ওফোঁড় করেছেন এমন যত সাইক্লিস্টের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ছিলেন রজার। বয়স ষাটের ওপরে। ডিলনের ‘কে ও এ’ নামক ক্যাম্পগ্রাউন্ডে আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম।

ক্যাম্পগ্রাউন্ডের মালিক বব এবং তাঁর স্ত্রী। গোটা আমেরিকায় ৫০০-র বেশি কে ও এ (ক্যাম্পগ্রাউন্ড অব আমেরিকা) রয়েছে। আমরা ছয়জনের জন্য ভাড়া দিলাম ৪০ ডলার। বেশ বড় ক্যাম্পগ্রাউন্ড। বব বেশ মজার এবং নিখাদ ভদ্রলোক। আমার সঙ্গে তাঁর বেশ জমে গেল। ক্যাম্পগ্রাউন্ডে আমেরিকার পতাকার পাশাপাশি কানাডিয়ান পতাকাও সগর্বে উড়ছে। এর কারণ জানতে চাইলে বব জানালেন, প্রতিবছর কানাডা থেকে সাড়ে তিন লাখের বেশি পর্যটক অনেক লম্বা সময়ের জন্য আমেরিকায় বেড়াতে আসেন। কানাডার কুইবেকে শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিপুলসংখ্যক কানাডিয়ান বুড়ো-বুড়ি আমেরিকার গরম প্রদেশগুলোয়— বিশেষ করে ফ্লোরিডায় এসে বসবাস করেন। বব জানালেন, এই যে বিপুলসংখ্যক লোক কানাডা থেকে এখানে আসেন তাঁরা যাতে আমেরিকানদের বন্ধু মনে করেন এবং নিজেদের পতাকা দেখে ভাবেন যে কানাডাতেই আছেন, এমন চিন্তা থেকেই মার্কিন পতাকার পাশাপাশি কানাডার পতাকাও ঝোলানো হয়েছে। এটি একটি ব্যবসায়িক পলিসি। বব জানালেন, অ্যাডভেঞ্চার সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন কিংবা ‘কে ও এ-র সদস্যদের তাঁরা ডিসকাউন্ট দিয়ে থাকেন।

মন্টানাতে এডের আতিথেয়তা

ডিলন থেকে মন্টানা ধরে US41 ধরে এগোনোর পথে টুইন ব্রিজ পার হওয়ার পর উলটো দিক থেকে এত বেশি বাতাস আসছিল যে সাইকেল চালানোই বেশ কষ্টকর ছিল। পথে এক সাইক্লিস্টের সঙ্গে দেখা। তিনি জানালেন, মিডওয়েস্টে অনেক জায়গায় চার্চ, ফায়ার স্টেশনে থাকা যায়। টুইন ব্রিজে ঢোকার পর ক্যালকাটা ডাইনার নামে একটি রেস্তরাঁ চোখে পড়ল আমাদের। কিছুদূর সাইকেল চালানোর পর হঠাৎ করে এক বাড়ি থেকে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। আমরা ভয়ে জোরে পা চালালাম প্যাডেলে। মাইল ছয়েক যাওয়ার পর আবারও সেই ভয়ানক উলটো বাতাস শুরু হল। অনেক কষ্টে অলডারের কে ও এ-তে পৌঁছাই এবং এই কে ও এ-তে কেটেছে আমাদের ভ্রমণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়।

অলডারে কে ও এ-র মালিক এডউইন বয়স্ক লোক। প্রথম পরিচয়েই তাঁর সঙ্গে ভাব জমে গেল। তিনি আমাদের গাছের ছায়ার নীচে ক্যাম্প করতে বললেন। আমি তাঁর অফিসে মোবাইল চার্জ দিলাম এবং কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করলাম। রজারদের গ্রুপের তিনজন এলেন এবং বাকি দুজন মোটেলে উঠেছেন। ক্যাম্পগ্রাউন্ডের ভাড়া ছিল মাথাপিছু ১৪ ডলার। আমরা সেটি কমিয়ে ১২ ডলারে আনলাম। এডউইনের সঙ্গে আড্ডা শুরু হল। জানালেন, ১৯৯১ সালে এই ক্যাম্পগ্রাউন্ড কিনে নেন তিনি। ৫০ বছরের পুরোনো ক্যাম্পগ্রাউন্ড এটি। ছোট্ট সুন্দর পুকুর, কাঠের তৈরি বেশ কিছু রুম এবং দোলনা বানিয়ে রেখেছেন। ই-মেইল পেলাম ববের কাছ থেকে। তিনি ডিলনের কে ও এ থেকে ই-মেইল করেছেন। দুপুরে ইমরান রান্না করে সবাইকে খাওয়াল এবং এডউইন আমাদের ডিনারের দাওয়াত দিলেন। ডিনারের সময় অনেক গল্প হল। এডউইন আমাকে ও ইমরানকে একদিন তাঁর অতিথি হয়ে থেকে যেতে অনুরোধ করলেন। আমাদের জন্য এডউইনের আমন্ত্রণ অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ, আমেরিকানরা সচরাচর এমনটি করেন না। আমরা এডউইনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারলাম না। তাঁকে আমার ভালো লেগেছে। এডউইন খুব সুন্দর করে আমাকে ডাকতেন ‘মোহা মাই ফ্রেন্ড’— আমার নামের মোহাম্মদ থেকে ‘মোহা’। তাঁর ডাক আমি এখনও মিস করি। মন্টানা থেকে চলে যাওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। কতদিন বাবাকে দেখি না। এডউইনের মধ্যে বাবার আদর-স্নেহ দেখতে পেলাম।

মন্টানার ক্যাম্পগ্রাউন্ড

অলডার থেকে সঙ্গী সাইক্লিস্ট রজাররা চলে গেলেন। তাঁরা যাবেন ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে। আমরা তাঁদের সঙ্গে সেখানেই দেখা করব। ছুটি পেয়ে ফেসবুক ও ফ্লিকারে ছবি আপলোড করলাম। দুপুরে ইমরান মাংস রান্না করবে। দু-তিন ঘণ্টা সময় নিয়ে মাংসা রান্না করা হল। যদিও রান্নার সব উপকরণ এডউইনের তরফ থেকে দেওয়া। সবাই ইমরানের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ আর খুব তৃপ্তি করে খেলেন। এডউইনের ম্যানেজার গ্যানি। তিনিও এডউইনের বয়সি। আমাদের অবাক করে তিনি বললেন, আমি তো তোমাদের বাংলাদেশে গেছি সাত দিনের জন্য। আমরা স্বাভাবিকভাবেই নড়েচড়ে বসলাম এবং আগ্রহভরে তাঁর বাংলাদেশ ভ্রমণের কাহিনি জানতে চাইলাম। সে গল্প আর এক দিন, অন্য সময়ের জন্য জমা থাকল। সুতরাং আমার গল্প ফুরাল না, নটে গাছটিও মুড়াল না।

লেখক: বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।