অনিতা অগ্নিহোত্রী

সুকান্ত এসে দাঁড়াল, হাতে একখানা ফটোকপি করা কাগজ। ওতে রুট, সময়, যাত্রাপথের নানা স্টপ, তাদের ঐতিহাসিক তাৎপর্য (ইফ এনি) লেখা আছে।

‘আপনি কোন রুটটা প্রেফার করছেন একটু বলবেন? আমি রিকুইজিশনটা দিয়ে দিতাম— আপনাকে সইও করতে হবে না।’

জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন নিশীথ। একটু দূরে পাঁচিল ঘেঁষা নিমের গাছ কচি পাতায় ভরে এসেছে। সবাই এখন তাঁর পরিশ্রম কম করতে চায়। সইও করতে হবে না। সুকান্ত বলছে।

‘ঠিক আছে, তুমিই করে দিও।’ জানলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিশীথ সামান্য হাসলেন।

‘ময়দান রুটটাই দিই স্যার?’

‘পুলিশ?’

‘ওরা অ্যালাউ করবে। ডিসি ট্র্যাফিককে একটা স্পেশাল রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি— একদিনের জন্যই তো!’

‘হ্যাঁ, একদিনেরই তো ব্যাপার।’

ট্রামডিপোর মধ্যেই অফিসবাড়িটা। ছিরিছাঁদ তেমন নেই— নীচে সারি সারি আট–দশটা ঘর। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠেও চার–পাঁচটা। তাঁর কামরাখানি বেশ বড়ই। সাজানোগোছানো নয় অবশ্য। কাচ ঢাকা একটা অর্ধবৃত্তাকার টেবিল আছে, তাকে ঘিরে ছ–সাতটা গদিআঁটা চেয়ার। কোনও এক কালে সবক’টা চেয়ারে লোকজন বসে টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন সে দিনকাল আর নেই। চেয়ারগুলো ফাঁকাই পড়ে থাকে। খুব পুরনো ফাইলপত্র রেকর্ডরুমে পাঠানো হয়ে গেছে। তবু এ ঘরের দেওয়ালে সিমেন্টের তাকে অনেক রকমের নথি, ডিজাইনের বক্স ফাইল, নানা কাগজপত্র।

একমাত্র গ্রুপ ডি ছেলেটাকে দিয়ে মাঝেসাঝে পরিষ্কার করাতে হয়। সেও খুব আগ্রহী নয়। বাবা ছিলেন ড্রাইভার। নবীন শেঠ। নবীনের ছেলে গৌতম বাপের অকালমরণের পর কাজটা পেয়েছে। ভাগ্যিস পেয়েছিল কারণ তারপরেই ওই লেভেলের সবক’টা পদ অবলুপ্ত হয়ে গেছে। নবীনের চাকরি পাকা। ফোনে সারাদিন সে গেম খেলে আর হোয়্যাটস অ্যাপ করে। মাঝেসাঝে ডাকলে কিছু কাজ। গৌতমের মতো স্থায়ী কয়েকজন কর্মচারী, প্রবীণ ও অল্পবয়সি অন্য ডিভিশনে বদলি হয়ে যাবে। অ্যাডহকরা পাবে সুবর্ণ করমর্দন। এইসব কাগজপত্রগুলোর কী হবে কে জানে! যদি সি আর ডি ক্যাটাগরিতে ক্ল্যাসিফাই করে তবে নষ্ট করে দেওয়ায় কোনও বাধা নেই। ফাইলগুলোর বিষয়বস্তু এতটাই পুরনো হয়ে এসেছে যে, ওগুলোর শ্রেণি যাই হোক, আর প্রাসঙ্গিকতা নেই এখন।

ট্রাম তুলে দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানি থাকবে কারণ ট্রামের নামে গোড়াপত্তন হলেও তাদের বেঁচে থাকতে হবে কাজকর্মের গতিপ্রকৃতি পালটে নিয়ে। আজ নিশীথের রিটায়ারমেন্ট। আর কাল থেকে ট্রামের চলাচল শেষ। যেন একটা ভারী কালো পর্দা নেমে আসছে নিশীথের কর্মজীবনের শেষ অঙ্কে। ঘোরানো চেয়ারের পিঠে লেগে থেকেও শিরদাঁড়াটা কেমন যেন শক্ত হয়ে আছে। উঠে দাঁড়িয়ে পর্দাহীন জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন নিশীথ। এবার শ্বাস নিতে ভালো লাগছে। ঘরের ভিতরে যেন সূক্ষ্ম ধুলোর জান জড়িয়ে আছে, দেখা না গেলেও তারা শ্বাসনালীর ভিতর ঢুকে পড়তে চায়।

সরকারি কলেজের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। মাইনে বেশি ছিল ঢোকার মুখে তাই সিম্পসন অ্যান্ড স্মিথের মতন এক প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকেছিলেন। এরা জাহাজ বানাতে পারে, তেমন ভাঙতেও। যাকে বলে শিপ ব্রেকারস। যেসব জাহাজ কারিগরি ত্রুটির জন্য আর জলে ভাসানো যাবে না তাদের গোয়ার বিশাল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে নিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। সব শেষে ডিসপোজাল। এদের কলকাতার অফিসে ঢুকেছিলেন নিশীথ। কাজটা অবশ্য খুব পছন্দের ছিল না। সততার সুনাম ছিল। লতায়-পাতায় খবর পেয়ে তখনকার এম ডি ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বছর পাঁচেকের মধ্যেই নিশীথ এসে গেল ট্রাম কোম্পানিতে। প্রথমে রোলিং স্টক ডিভিশনের ইনচার্জ। তার অনেক পরে, জেনারেল ম্যানেজার। সময় লেগেছে। মাইনেও এখানে প্রতিবছর এক ইঞ্চি করে বাড়ে। তবে কাজে মজা ছিল। নিশীথ জড়িয়ে গেছিলেন খুব। বছর পাঁচেক আগে ম্যানেজার হয়ে এসেছে সুকান্ত, সে নিশীথের খুব কাছের। তবু সেও হয়তো পুরোটা বুঝতে পারবে না।

জানলার ধারে দাঁড়ালে হেডকোয়ার্টার অফিসের ডিপো আর ওয়ার্কশপের একটা প্রান্ত দেখা যায়। টানা শেডের নীচে সারি সারি ট্রাম দাঁড়িয়ে। কোনওটা দীর্ঘমেয়াদী বিশ্রামে এসেছে। কয়েকটার আবার সামান্য মেরামত ও সার্ভিসিং দরকার। ডিপোর পিছন দিকটা পুরোটাই ওয়ার্কশপ। এখান থেকে তার খুব অল্প অংশই দেখা যায়। বাদল দিনের নীলাভ কালো আকাশ থমথম করছে কারশেডের মাথায়।

পঁয়ত্রিশটা রুট ছিল শহরজুড়ে, সাড়ে পাঁচশো ট্রাম চলত, আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যখন তিনি এসেছিলেন। নামতে নামতে রুট এখন এগারোটা, খান চল্লিশেক ট্রাম চলে। ট্রামেদের কেউ চায় না। একদিন শহরের প্রাণবায়ুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ট্রাম। অদ্ভুত একটা যান। কিছুটা কুমির, কিছুটা কাগজের তৈরি মাছ মেশামেশি একটা নিরীহ চেহারা— অন্য কোনও যানের মতো দেখতে নয়। তার ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টার কিছুটা মিলমিশ আছে; তার লাইন আছে, টিকি বাঁধার জন্য মাথার ওপর ওভারহেড তারও। দু’দিক দিয়ে বাঁধা পড়া। তবু ট্রামের মধ্যে যেন কত ছন্দ, স্মৃতি ইতিহাস। নিশীথের যৌবনে অতি শ্লথ ওই ট্রামে লাফিয়ে ওঠা আর চলন্ত ট্রাম থেকে ছুটতে ছুটতে নেমে পড়ার মধ্যে ঝুঁকি ছিল না, উত্তেজনা ছিল। লেডিস সিট থেকে তরুণীরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখত। পিছনের সিট দুটো মুখোমুখি আর সামনের দিকেরগুলো এ ওর পিছনে। কেমন যেন নিয়মভাঙা ক্লাসরুমের মতো দেখতে ট্রামের বসার বিন্যাসটা!

কলেজ স্ট্রিট কিংবা শিয়ালদহে বি এ, বি এস সি পড়তে যাওয়া বন্ধুদের ঈর্ষাই করত নিশীথ। তাদের মধ্যে অনেকেই ট্রামে যায়। সহপাঠিনীদের সিটের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে যেতে পারে, যেদিন দেরি না করে বাড়ি থেকে বেরোয়। নিশীথের বাড়ি যদিও বালিগঞ্জে, তার কলেজ শিবপুরে। সেখানে হস্টেলে থাকতে হত তাকে। তবু তার যৌবনের মনোরম কলকাতার যে আমেজ নিতে মাঝেসাঝেই সে বেরিয়ে পড়েছে তার দুটো অক্ষ ছিল— এক, গঙ্গা নদী, অন্যটা ট্রাম। খিদিরপুরের রুটে যেখানে ট্রাম ও নদীপথ প্রায় সমান্তরাল, অন্তত কয়েক ঝলক হলেও— সেখানে অকারণ যাওয়া ছিল তার এক বিপুল বিলাসিতা। বালিগঞ্জের দিকে তখন ট্রামলাইনে বর্ষার দিনে কচি ঘাস গজিয়ে উঠত, লাইনের ধারে অল্প জায়গাতেই একমাথা ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত কৃশ কৃষ্ণচূড়া বা গুলমোহর— ট্রাম যেন নিশীথকে হাত ধরে কলকাতার রোমান্টিক ঐশ্বর্যের মধ্যে নিয়ে যেত। টং টং ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে ট্রাম, তার ড্রাইভারের কেবিনে হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা— দয়া করিয়া এখানে থুতু ফেলিবেন না। সামনের দিকের প্রথম সিটটাতে বসলে লেখাটা দেখা যেত। বালক নিশীথ তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ওরকম লেখা কেন? ড্রাইভারের কেবিন কেউ ময়লা করে?’ বাবা খুব হেসেছিলেন। ‘করে। অনেক সময় পান বা খইনি মুখে রাখলে। টানা দাঁড়ানো ডিউটি তো!’

ওই জায়গাটা খুব আকর্ষণীয় মনে হত নিশীথের। আমি দাঁড়িয়ে আছি, ট্রামটা চলছে সামান্য যান্ত্রিক কলকাঠি নাড়ায়, দু’পাশে সরে সরে যাচ্ছে গাছপালার ঝাপসা সবুজ, আরও পিছনে মহানগরের ব্যস্ত রাস্তা, তার নানা রঙের দীর্ঘ হ্রস্ব বাড়িঘর, সিনেমা হল, ফুটপাথের পসরা— আমার লাইন ধরে আমি এগোচ্ছি— কোনও বাধানিষেধ নেই।, মাঝেমধ্যে সিগন্যাল অথবা উদভ্রান্ত পথচারী কোনও দিকে না তাকিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে। আমি সতর্ক হয়ে গেছি সেই উনিশশো পঞ্চাশের দশকের পর। কোনও কবি আমার সামনে এসে পড়লে ট্রামের অবয়বে বিদ্যুৎ শিহরণ খেলে যায়। ওই একটা দুর্ঘটনা ছাড়া এ শহরের কোনও ক্ষতি আমার ট্রামের চাকায় হয়নি। মানুষ ভালোবাসে, বিশ্বাস করে ট্রামের গতিকে… 

ওয়ার্কশপের কাজে খুব জড়িয়ে পড়েছিল নিশীথ— মনপ্রাণ দিয়ে। নতুন ট্রামের বডি তৈরির কাজ, তার সুপারভিশন। প্রথমে তৈরি হয় কাঠের খাঁচাটা, তারপর মজবুত ধাতব পাতে তার ওপরটা মোড়া, বসার বেঞ্চ তৈরি হয়ে ভিতরে ফিট করার কাজ, আস্তে আস্তে পুরো একখানা নিখুঁত যানের অবয়ব সেজে উঠবে নিশীথের চোখের সামনে। তখন একজন মন্ত্রী ছিলেন, গ্রামস্তরের বামপন্থী। হয়তো তাঁরও ছিল নিশীথের মতো ট্রাম–রোমাঞ্চ; এটা ওটা জুড়ে ডিজাইন বদলানোর ফরমাশ দিতেন। একবার মন্ত্রীমশাই য়ুরোপ বেড়িয়ে এসে খুশিতে ডগমগ— ইতালির মিলানো শহরে ট্রামে বসে নাকি আকাশের তারা দেখা যায়, ওপরটা গম্বুজ আকৃতির কাচে তৈরি, একেবারে স্বচ্ছ। দিনে, রাতে কখনও আকেশে নীল কখনও রাতের ছায়াপথ— ‘নিশীথবাবু, ওইরকম ট্রাম আমাদেরও চাই!’

অমনি লেগে পড়ল নিশীথ। সুকান্ত আসার অনেক আগে গোপালবাবু বলে একজন বয়স্ক ম্যানেজার ছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘ধরনা আন্দোলনের শহরে কাচটা আর মাথায় লাগাবেন না স্যার, তার চেয়ে ফাইবার গ্লাসের ট্রান্সপারেন্ট শিট দিয়ে ট্রাই করি—’

নিশীথের ভালো লেগেছিল মন্ত্রীর এই ছেলেমানুষি আবদারটুকু। ট্রাম নিয়ে নতুন কিছু তার কাছে বড় কেউ চায় না— তাঁর এম ডি–ও নয়। সেই নতুন ছাতের ট্রামে চড়ে রাতের বেলা ঘুরেও এলেন মন্ত্রীমশাই— সঙ্গে নিশীথ। তারা–টারা অবশ্য দেখা গেল না, তবে ট্রামের আলো নিভিয়ে দেওয়ায় ভিতরে নেমে এল এক অদ্ভুত অন্ধকার। তাতেই উনি খুশি।   

‘মিলানো’-র ট্রামের দেশি অবতার নিশীথের সেই ‘ফাইবার গ্লাস টপ’ ট্রাম অবশ্য চলেনি, ওই ভাবেই রাখা আছে। ওয়ার্কশপে মাঝেমধ্যে ঘষামাজা মেইন্টেনেন্স হয়। কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে নিশীথও বুঝতে পারেনি তার শহর কত বিরূপ হয়ে উঠছে ট্রামগাড়িদের উপর। তার মধ্য চল্লিশেও ট্রামের ওভারহেড তার ছিঁড়ে গেলে অথবা চাকা লাইন ফসকে সারি সারি ট্রাম দাঁড়িয়ে গেলে মানুষ অত বিরক্ত হত না। ফাঁকা বর্জিত ট্রামের ভিতরে প্রেমিক–প্রেমিকা যুগলকে গুঞ্জরনরত দেখেছে নিশীথ।

শহরের দিনযাপনের অঙ্গই যেন ছিল এভাবে ট্রামের দাঁড়িয়ে পড়া। এখন ট্রামের ঢিলেঢালা শ্লথ ভাব, লাইন ছেড়ে বেরোতে না পারা, আচমকা লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়া— কোনওটাই পছন্দ নয় শহরের ব্যস্ত মানুষদের। তারা সবসময় দৌড়চ্ছে আর দাঁত মুখ খিঁচিয়েই আছে। ট্রামের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্র্যাফিক ডিপার্টমেন্ট। ট্রামের জন্য শহরে সর্বদা জ্যাম হচ্ছে— এমন একটা ধারণা তারা সরকারের মাথায় এমন ভাবে ঢুকিয়েছে যাতে আস্তে আস্তে গুটিয়ে ফেলা যায় ব্যস্ত রাস্তার রুট। ট্রামে চড়ে কেবল বুড়োবুড়ি আর যাদের কোনও কাজ নেই, তারা। কাজেই ব্যস্ত রাস্তা থেকে ট্রাম বাতিল হচ্ছে একে একে। এই বিরূপতাটা কি কেবল ট্রাম ব্যস্ত শহরের উপযুক্ত নয় বলে? না কি অন্য কোনও গোপন কারণ আছে? নিশীথ দেখেছে তাদের হরিদেবপুর ডিপোর ষাট একর জমি কেমন রাতারাতি বিক্রি হয়ে গেল শহরের বড়সড় ডেভলপারের কাছে। ট্রামের অনেক জমি শহরের এমন সব জায়গায় যেখানে রিয়েল এস্টেটের বাড়বাড়ন্ত। হয়তো ট্রাম আরও বাড়বে ধরে নিয়ে ডিপোগুলো ওখানে করা হয়েছিল। সরকারই তো ছিল সব জমির মালিক!

এখন জানলা দিয়ে যতটুকু দেখা যাচ্ছে হেড অফিসের রাজ্যপাট— ডিপো, ওয়ার্কশপ— সবমিলিয়ে দেড়শো একরের কম হবে না। কাল থেকে এসব জমির বন্দোবস্ত করতে উঠেপড়ে লাগবে সরকার। কোম্পানির ঘাড়ে তাদের ব্যবস্থা রেখে। লাইন উপড়ে ফেলে মসৃণ ও জ্যামরহিত করে ফেলা হবে সেই এগারোখানা রুট যেখানে এখনও ধুঁকতে ধুঁকতে ট্রাম চলে। উৎসবে, বিয়ে, পার্টিতে, সিনেমার শ্যুটিংয়ে ট্রাম ভাড়া দিয়ে কিছু রোজগার হত। সে তেমন দারুণ কিছু না। সিঙ্গল বগির ক’খানা ট্রামকার তিন ঘণ্টার জন্য আট হাজার টাকায় ভাড়া পাওয়া যায়— অনেকেই জানে না। অনেকেই ভাড়ার ব্যবস্থা করতে এসে অবাক হয়ে যায়। কেউ বলে, ‘ইস, আগে জানলে বাবা–মাকে একদিন শহর ঘুরিয়ে আনতাম।’ কেউ বলে, ‘আহা, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ফরেন থেকে এসেছিল, ওদের একদিন ট্রামে করে নিয়ে বেড়ানো যেত। বিদেশি তো ওরা, হেরিটেজ বোঝে।’ রোজগারের জন্য ততটা নয়, গাড়িগুলো চালু থাকবে বলেই দেওয়া। তবু একদল মানুষ ছেলে মেয়ে বুড়ো বুড়ি সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে, ট্রামকারটা বেলুনে রিবনে সেজে উঠেছে— সবাই বেড়াতে যাবে এই ভাবনাটাই খুব আনন্দের।

ট্রামগুলো, উৎসবের ট্রাম, নিত্যদিনের যান ট্রামগুলো কতদিন আর রাখা যাবে। এমনিতেই তো চালু না থাকা গাড়িগুলোয় জং ধরেছে। নিশীথ ভাবতে চেষ্টা করে, শেষটা কীভাবে আসবে? ওর সেই হারানো কোম্পানি— সিম্পসন অ্যান্ড স্মিথ, যারা জাহাজ ভেঙে বিক্রি করত, তাদের মতো কেউ কি আসবে আর ট্রামগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে, বড় বড় কন্টেনারে ভরে…। টং টং ঝনঝন ধাতব শব্দে মাথা ভরে যায়। মুখ ঢেকে চেয়ারে বসে পড়ে নিশীথ।

সুকান্ত তখনই এসে দাঁড়ায়। সন্ধে হয়ে গেছে। আলো জ্বলে উঠেছে অফিসে। রোজ এতক্ষণ তারা কেউ থাকে না। নিশীথ থাকলেও অন্যরা বাড়ি চলে যায়। নিশীথের ফেয়ারওয়েল সভা হয়ে গেছে দুপুরেই। অফিসেরও শেষ মিটিং বলা যায় এটাকে। হিসেবপত্র কষে মিটিয়ে দেওয়ার কাজ প্রায় শেষ। আগামিকাল থেকে— হ্যাঁ, ঝাঁপই পড়ে যাবে ট্রাম অফিসের।

গত দু–তিন বছর ধরে অফিসটাও খুব অসহনীয় হয়ে উঠছিল, এত প্রিয় অফিস নিশীথের। যতদিন যথেষ্ট পরিমাণ কাজ ছিল এতগুলো মানুষের, ততদিন কোনও দিকে তাকানোর সময় ছিল না। এখন ওয়ার্কশপে কর্মহীন স্টাফদের তাস খেলা, হ্যা হ্যা হাসি, কদর্য ভাষায় কথা— সবই বুকে এসে বেঁধে। ইউনিয়ন আগে ছিল, এখনও আছে। যারা আছে তারা চোখের সামনে শেষ অঙ্কের পর্দা নেমে আসা দেখতে পাচ্ছে। যারা ছিল মেন গেটের বাইরে তাদের দেওয়াল লিখনে ‘কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে’ ‘গর্জে ওঠার ডাক’ রোদে জলে ম্লান হয়ে এসেছে। নতুন ইউনিয়ন কর্মীদের বলেছে, নিশীথের গরজ না থাকার জন্য বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে ট্রাম ডিভিশন। যদিও তারা জানে, আসল কারণ তা নয়। নিশীথের অবসরের দিন আর কোম্পানির শেষ দিনটা যে এভাবে সমাপতিত হবে তা নেহাতই ডেভলপারদের সঙ্গে কোম্পানির চুক্তিপত্রের একটা বিশেষ ধারা। তবু স্টাফ, ওয়ার্কারদের পিছন থেকে দেওয়া আওয়াজ, গালিগালাজের টুকরো নিশীথের পিঠে এসে লেগে ঝরে যায়। তাকে এসব বিদ্ধ করে না, যতটা গায়ে লাগে ট্রামহীন একটা শহরের ভবিষ্যৎ।

‘আচ্ছা সুকান্ত, বলো, কয়েকটা দৃশ্য, শব্দ না থাকলে কি একটা শহর পালটে যাবে?’

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুকান্তকে জিজ্ঞাসা করেন নিশীথ। এমন কতবারই করেছেন গত ছ–সাত মাসে। সুকান্ত জানে, তার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করেন না নিশীথ।

‘এই যে ধরো সন্ধের কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসছে একটা ট্রাম, তার বুকের ওপর ঝোলানো বোর্ড— দ্য এন্ড— এটা কতবার দেখেছি আমি, আর দেখব না, অথবা ডিপোয় ঢুকে আসছে শেষ ট্রামটা— এ দৃশ্যটাও তো আমাদের হেরিটেজ। কিন্তু বিদেশিরা কেবল হেরিটেজ বোঝে, আমরা বুঝি না… ঘুম ভাঙার আগে প্রথম ট্রামের ঘণ্টির শব্দ কতবার শুনেছ সুকান্ত, কতবার মাঝরাতের স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে এসেছে লাইন বদলের ঘট ঘটাং স্বর— এই সবই তো রয়ে গেছে আমাদের ঘরকন্নার ভিতর।’

আজ শেষ দিনে, ফেয়ারওয়েল গিফ্‌ট হিসেবে সুকান্তরা কয়েকজন অফিসার লেভেলের নিশীথকে দিচ্ছে একটা বিশেষ ট্রামকার রাইড। ধর্মতলার গুমটি থেকে ছেড়ে খিদিরপুর রুট ধরে ট্রামটা যাবে মোমিনপুর হাজরা, তারপর ফিরে আসবে। কয়েক হাজার টাকার ব্যাপার কিন্তু এটা একটা অসামান্য আইডিয়া— ভেবেছিল সুকান্ত। বেদনা আর আনন্দে মেশামেশি একটা অন্তিম অভিজ্ঞতা নিশীথের জন্য। সাড়ে সাতটা বাজে। শহরের গাছের ডালপালায় পাখিরা ঘুমের আগের কলকলিতে মাতাচ্ছে। বৃষ্টি নেই এখন। চারদিক আলো, তবু এই জায়গাটা অন্ধকার।

নিশীথের মনে হচ্ছে কি, ইস, আগে জানলে কাউকে সঙ্গে আনা যেত…

সুকান্ত বলে, ‘আপনি চাইলে সুমনকে আনতেই পারতেন আজ।’ বলে চুপ করে যায়।

সুমন— বাবুসোনা। নিশীথের সন্তান। মনের অসহযোগে যে বত্রিশ বছরের যুবক অঙ্গে বস্ত্র রেখে উঠতে পারে না তার বাবার জন্য এটা পরিহাস না হয়ে দাঁড়ায়। চশমার ফাঁকে নিশীথের চোখে হাসি জড়ানো কষ্ট। ‘তুমি তো জান সুকান্ত!’

‘এই ট্রামটা! এই তো সেই ট্রান্সপারেন্ট ফাইবার গ্লাস সিলিং— এটা চালু আছে এখনও!’

‘আমরা চালু করেছি, ঘষেমেজে, আপনার জন্য!’ সুকান্ত হাসে।

‘আর এত আলো, বেলুন, কেন এত করলে সুকান্ত, এ তো উৎসব নয়!’

বিসর্জন সমারোহই তো বলা যায় একে, তাই না? সুকান্ত বলতে গিয়েও বলে না কথাটা।

ভিতরে খুব বাদ্যযন্ত্র বাজছে, রবীন্দ্রসঙ্গীত। সিঙ্গল কোচ ট্রামটায় নিশীথ একা। কোথায় বসবেন তিনি? সামনের সিটটায়— যেখান থেকে ড্রাইভারের কেবিন দেখা যায়, না পিছনে ওই লেডিস সিটের দিকে? কেউ কি অপেক্ষা করে আছে তাঁর জন্য!

ছুটতে ছুটতে চলন্ত ট্রামে তাঁর ওঠা দেখে মণীষা পরে বলেছিল, ‘উফ, অমন করে নাকি! আমি যা ভয় পেয়েছিলাম!’

নিশীথ বলেছিলেন, ‘আসলে বাইরে থেকে তোমার খোঁপার ঝুমকোটা দেখলাম, তাই লোভ সামলাতে পারিনি!’

‘নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি।’ বুকে হাত রেখে মণীষা বলেছিল।

নিশীথের মনে হয়েছিল, আমিও দেখি! চলন্ত ট্রামে এভাবে! ধ্যাৎ! উনিশশো আশির দশকে ওভাবে কোনও যুবতীর হৃদস্পন্দন মাপা যেত না।

একটা চিঠি টেবিলের উপর রেখে চলে গিয়েছিল মণীষা। কিছু নিয়ে যায়নি। ‘সবাই কি আর ভালো মা হতে পারে? আমিও পারলাম না নিশীথ। বাবুসোনাকে রোজ এইভাবে দেখতে দেখতে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিলাম। নিজের জীবন নেব না, তাই পালালাম। মণীষা।’

ঘড়ি দেখলেন নিশীথ। রাতের আয়ামাসি এসে গেছে এতক্ষণে। তিনি যতক্ষণে পৌঁছবেন, বাবুসোনা ঘুমিয়ে পড়েছে।

শেষ ট্রাম চলেছে। রেড রোডের কাছে একটা মেঘ তাকে বৃষ্টি দিয়ে গেল ঝমঝম। বাইরের আলোর মালাটা আর জ্বলছে না। বরং কয়েকটা আর্ত জোনাকি ঢুকে জ্বলা-নেভা করছে অন্ধকারে। স্বচ্ছ চাঁদোয়ার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে মেঘ সরে যাওয়া আকাশের তারা। শ্রাবণের আকাশ! আর ওটা কী? ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয়— ওই কি অ্যান্ড্রোমিডা? ধূসর বেদনার তুলি টেনে চলে গেছে আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে! বাঁশি ও বেহালায় বাজছে— আমার এ ঘর বহু যতন করে, ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে… আমারে যে জাগতে হবে, কি জানি সে আসবে কবে– যদি আমায় পড়ে তাহার মনে…

রাতের পথে কোনও ট্রাফিক পুলিশ নেই। ড্রাইভার এমন একটা রুট নিয়েছে, যেখানে দু’পাশে ঝুঁকে ঝুঁকে আসছে লতাগুল্মের দল, হাসনুহানার গন্ধ, ওপাশে রাতের নদী— এত কাছে ছিল কি ট্রামের লাইন? তার গেরুয়া জল কেমন শান্ত ও মলিন দেখায় আধো অন্ধকারে। এত লম্বা ছিল এই রুটটা? ও পাশে সিটে বসে তাঁর দিকে হেলে হাসছে যে যুবতী— সেই কি চলে গিয়েছিল চিঠি লিখে? ড্রাইভার কেবিনের দরজাটাও স্বচ্ছ; এতক্ষণ দেখেননি নিশীথ! ট্রামটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাবুসোনা, নিশীথেরই ঢোলা একটা টি–শার্ট আর প্যান্ট পরে আছে ও। এতদূর তবে ও-ই চালিয়ে এনেছে ট্রামটাকে। নিশীথকে সুদ্ধু, উনি জানতে পারেননি?

ঘুমের মধ্যে শহর শেষবারের মতো শুনছিল ট্রামের ঘণ্টির শব্দ; হাজরার মোড়ের জটিল লাইন বদলের খেলায় তার আর্তস্বর আর কোনওদিন যা শুনবে না, সেই শব্দ, অথবা যা দেখবে না সেই চলাচলের দৃশ্য— নিশীথের প্রিয় শহর ভরে নিচ্ছিল মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে।   

চিত্রকর: সৌজন্য চক্রবর্তী