রামকুমার মুখোপাধ্যায়

দিনপতির উদয় সঙ্গে এ প্রভাতে তন্বীগুলির উত্থান শয্যা হতে, শত মাতৃ ডাকে যাদের নিত্যদিনের নিদ্রাভঙ্গ, তারাই পক্ষীরবে উপবিষ্ট শয্যা উপরে। কারও জীবনে এই প্রথম প্রসন্ন প্রভাত দর্শন, কারও জীবনে এই প্রথম নবদিনের পক্ষী গীত শ্রবণ। উদীয়মান আদিত্য দর্শনে কন্যাগুলি যেমন বিমুগ্ধ, আদিত্যও তেমনই প্রাতঃকালে কন্যাগুলির মুখ অবলোকনে অভিভূত। জন্মের পর চতুর্থ মাসে আদিত্যের প্রথম মুখদর্শন সংস্কার। তারপর বহু বৎসর অতিক্রমে এই সংস্কারহীন দৃষ্টিযোগ। পক্ষীদল তন্বীগুলির মগ্ন চিত্তে মধুর রব শ্রবণে আপ্লুত। এ যেন বারিদকালের প্রথম বর্ষণের অতীব মধুর ধ্বনি শ্রবণ কন্যাগুলির। অচিরে আদিত্য ও পক্ষীদল নিজ নিজ সূক্ষ্ম বোধে। কন্যাগুলির এই প্রভাতকালে শয্যাত্যাগ হর–পার্বতীর শয্যা উত্তোলনের উৎসাহে। এ বিষয়ে এদের অধ্যাবসায় তুলনারহিত। এই বিপুল উদ্যোগের প্রথম উপার্জন নবযুগলের সুখনিদ্রা ভঙ্গ এবং দ্বিতীয় উপার্জন শয্যা উত্তোলনের দক্ষিণা।

অঙ্গ সংস্কার ও নববস্ত্রে কন্যাগুলি যেন হিমকণায় স্নাত প্রভাতকালের কুসুম। মঞ্জীর ধ্বনিতে তারা হর–পার্বতীর শয্যাগৃহের দ্বারে। তাদের করাঘাত দ্বার উপরে। কোমল হতে সে ধ্বনি ধীর ঘন। সরোবরের রাজহংস শ্রুতিতে সে কর ধ্বনি। তারাও সবাক। সে সঙ্গে কণ্ঠযোগ পার্বতীর কিশোর কিশোরীটির। যাদের না কুসুমশয্যা না শয্যাতোলনের দক্ষিণা প্রাপ্তি, তারা প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গে বীতরাগ। কিন্তু শত তন্বীর কণ্ঠরোলে যা রাগ তাই অনুরাগ। অগত্যা শয়ন হতে উপবেশন শয্যা উপরে। সদ্য নিদ্রা হতে জাগ্রত বাদ্যকারদল। নবযুগলের দ্বারে তন্বীমুষ্টির করাঘাত তাদের শ্রুতিতে সুমিষ্ট ও ছন্দময়। তাই চর্মবাদ্যগুলি বাঙ্ময় দ্বারবাদ্যে সঙ্গ দানে। সাধুজন বড়ই বিড়ম্বিত। ওই উদিত সবিতার বন্দনামন্ত্র কর ও বাদ্য ধ্বনিতে ওষ্ঠেই অবলুপ্ত। অগত্যা নীরবে সর্বপ্রসবিতা জগৎস্রষ্টা সবিতার ধ্যান। সাধুদলের উচ্চারণ, ‘প্রাতঃকালে কায়–মনো–বাক্যে সংসার তরণের তরণিস্বরূপ, সময় গণনার নিমিত্ত কালস্বরূপ, গাভীদের কণ্ঠবন্ধন মুক্তকারী অনন্তশক্তি সম্পন্ন সবিতাকে আমি ভজনা করি।’ পরের স্তোত্রগুলিও অতিমধুর ও ভাবময় কিন্তু হর–পার্বতীর দ্বার উন্মোচনের সিদ্ধিতে ভূলোকের সকল বরণীয় তেজ ও দীপ্তি তন্বীগুলির মুখে। নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাদের পুষ্পশয্যার অনন্য অঙ্ক সন্ধান পার্বতী মুখমণ্ডলে। কিন্তু সে মুখ আবৃত পার্বতীর দুই করতলে। তাই শশাঙ্কহীন শশীদর্শন সখীগুলির।

তন্বীগুলি অচিরে উপবিষ্ট দ্বারের চৌকাষ্ঠ উপরে। হরের শয্যাগৃহ হতে নিগর্মনের পথখানি রূদ্ধ। দূর হতে সে দৃশ্য দর্শন নন্দি ও ভৃঙ্গির। তাদের আর্ত কণ্ঠে তন্বীগুলিকে আহ্বান দ্বার হতে দেহ উত্থানের। চৌকাষ্ঠ উপরে উপবেশনে নিতম্বে স্ফোটকের উৎপত্তি। অতীব বেদনাদায়ক সেই শৃঙ্গধারী মাসপিণ্ডগুলি। তখন নিত্য নিম্বপত্র ও শ্বেতচন্দনের পঙ্কদান। কিন্তু কে শোনে কার সুবচন! কৈলাসপতি এখন ঔষধিপ্রস্থের মহাকন্দরে আবদ্ধ। পরিণয়কালে বেশ পরিবর্তন আর এখন শয্যাগৃহের পথটি রুদ্ধ তন্বীদলের দেহ কপাটে। নন্দি–ভৃঙ্গির শতবার স্ফোটক শব্দটি উচ্চারণেও তারা অনড়। শয্যা উত্তোলনের দক্ষিণা দান কালে বরগৃহের নানান কৌশল। তাই মক্ষিকা বিতারণের ভঙ্গিতে কন্যাগুলির স্ফোটকের ভীতি বিতারণ। শয্যা উত্তোলনে চার প্রকার দ্রব্যদান হিমাদ্রিবিধি। কৈলাসপতি নিকটে তারই অঙ্গীকার প্রার্থনা। কিন্তু সে প্রার্থনার স্বরভঙ্গি এতই সোচ্চার আর দেহভঙ্গি এতই দৃঢ় যে নন্দি–ভৃঙ্গি বিমূঢ়। তারা ভাবিত কন্যাগুলির প্রার্থনার রীতি যদি এই তবে ভীতি প্রদর্শনটি কেমন? প্রার্থনা ও লাঞ্ছনার মধ্যে সত্যিই কোনও ভেদরেখা বিদ্যমান নাকি হিমাদ্রির তন্বীবিধিতে এ দুটি সমার্থক!

শয্যা উত্তোলনের প্রথম দক্ষিণাটি অতি সাধারণ। অঙ্গরাগের নানা প্রসাধন সামগ্রী। কন্যাগুলির কাম্য মুখচর্চায় রক্ত, পীত, কৃষ্ণ ও শ্বেতচন্দন। প্রেতিনীগুলি করজোড়। কৈলাসগিরি চন্দনবৃক্ষহীন। তবে চন্দনের তুল্যে অধিক সুগন্ধি ও অতীব মসৃণ একটি বর্ণময় ভস্ম সহজলভ্য সে গিরিতে। সেটি মুখ উপরে প্রলেপনে ব্রহ্মকমলের দলগুলি পূর্ণরূপে প্রকাশিত। ও ভস্মে ত্বক উপরের অনাবশ্যক স্নেহ অপসারিত। প্রেতিনীদলের বাকমাধুর্যে মোহিত কন্যাগুলি। একটি চর্মবটুয়া হতে অল্প তৃণভস্ম দান এক প্রেতিনীর। অচিরে সে ভস্ম এক তন্বীর কপোল ও ললাটে। পার্বতীর সখীদল ভস্মের সুবাস ও বর্ণগুণে সত্যিই মুগ্ধ। চন্দনকাষ্ঠের বিকল্পে তৃণভস্মে তাদের সমবেত সম্মতি। কিন্তু নেত্ররঞ্জনে কী দান পার্বতী পতির? তন্বীগুলির অভিলাষ সৌবীরাঞ্জন। সিন্ধুনদের উপকণ্ঠে সৌবীরদেশে সেই নীলাঞ্জনের প্রাচুর্য। কিন্তু সে দেশ দীর্ঘ পথ। কৈলাসের যে আপন অঞ্জন সেটিও অপরূপ। যমরাজের মহিষটির মতো তা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। সে অঞ্জন ধারণে নেত্রদুটি বর্ষণকালের বারিগর্ভ অম্বুদ। মধ্যে মধ্যে ঘন বর্ষণ ঠিকই কিন্তু তা আনন্দাশ্রু। শ্বেতগিরির কী সে তিমিরবর্ণ অঞ্জন তা দর্শনে উন্মুখ কন্যাগুলি। তাদের করতলে একে একে শত কজ্জ্বললতা দান প্রেতিনীদলের। কজ্জ্বললতার দণ্ডটি দীর্ঘ এবং বর্ণ শ্বেতশুভ্র। দণ্ডের এক প্রান্তে অঞ্জনগর্ভ। তার মধ্যে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ সেই কৈলাসকজ্জ্বল। এর প্রকৃষ্ট নাম অগ্নিসার। অগ্নির অগ্রভাগ বা শিখা হতে এর উৎপত্তি। কৈলাসে সহজলভ্য দাহ্য হল অস্থি। প্রজ্জ্বলিত অস্থির অগ্নিমুখ হতে এই ধূম সংগ্রহ। ঘন সে ধূম সঙ্গে অমানিশার হিমকণা মিশ্রণে কৈলাসকজ্জ্বলের সৃজন। কজ্জ্বল সঙ্গে একটি অনুপম শলাকাও দান প্রতি জনে। অতীব প্রীত কন্যাগুলি। হর অধরে কৌতুক। শ্যেনপক্ষীর পক্ষকন্টক হতে শলাকাগুলি প্রস্তুত। তাই সে শলাকায় নেত্রে অঞ্জন দানে দৃষ্টি এবার শ্যেনপক্ষীর মতো অতি প্রখর।

তন্বীগুলির অধর বিল্বফলের মতো লোহিতবর্ণ। বিনা রঞ্জনীতেই তা দৃষ্টিনন্দন কিন্তু তবু তাদের আহ্লাদ অধররাগের। কৈলাসে প্রবল শৈত্যে চমরীর দুগ্ধরস দান অধরে। দুগ্ধরস সঙ্গে অধররসের মিলনে তন্বীদল ওষ্ঠে মদিরার মত্ততা। সে মদিরা পানের প্রাণসখা এই ঔষধিপ্রস্থেই কিন্তু সে সঙ্গ সঙ্গোপনে। মহাশঙ্খমালা জপের মতো সে ক্রিয়া অপ্রকাশ ও অতি গুহ্য। কিন্তু চিত্তটি উৎফুল্ল এবং মনটি প্রসন্ন। প্রিয়জন সঙ্গে যোগবাসনা অন্তরে। তাই এমন প্রসাধন। সে সঙ্গে নিতম্বে স্ফোটকেরও ভীতি অতিক্রম। প্রেমবন্ধনে ও গিরিলঙ্ঘনে ভয়কে জয় করা হল প্রকৃত শক্তি। প্রকৃষ্ট রূপে আপন বিশ্বাসকে ধারণ করা এবং সে সঙ্গে ঈষৎ অঙ্গরাগ। অঙ্গ সংস্কার বিনা না অধরাসঙ্গ না অমর্ত্যযোগ।

পৃ্থ্বীর ললাট টিকা হল রবি ও শশী, গিরির ললাটতিলক তুষার, জলধির ললাটবিন্দু বারিবুদ্বুদ। পার্বতীর সখীগুলিকে কোন ললাটিকা দান কৈলাসের? যমপত্নী বিজয়া পরিণয় ক্রিয়ায় কুশলী এবং লোকাচার বিষয়ে অভিজ্ঞ। শয্যা উত্তোলনের পারিতোষিকস্বরূপ তার প্রেরণ শত সাম্পামণ্ড। অগ্নিপক্ক যবচূর্ণ, চমরীদুগ্ধ ও কৈলাস সুরার মিশ্রণে সেই মণ্ডগুলির নির্মাণ। সে মণ্ডের তিলকে ললাটখানি দৃষ্টিনন্দন। দেবভোগ্য সে সাম্পামণ্ড অতি পূতও। তার স্পর্শে চিত্তখানি নির্মল ও অন্তরটি নিশিদিন উচ্ছ্বল। হর আপন করাঙ্গুলে তিলকদান করে তন্বীদলে। পরম ভক্তিভাবে সে টিকা গ্রহণ কন্যাগুলির। একই সঙ্গে শত মুখগহ্বর মুক্ত হর সমুখে। উদরটিকে পূত করো হে কৈলাসপতি। দু–একটি মণ্ড দাও মুক্ত গহ্বরে। উদরে ক্ষুধা, তাই তোমাকেই বিপদভঞ্জন বলে মানি।

দূর হতে নন্দি ও ভৃঙ্গি শত মুখগহ্বর দর্শনে শঙ্কিত। শত তন্বীর অনুরাগ কিংবা বিরাগ— দুটিতেই কৈলাসপতির প্রাণ ওষ্ঠাগত। কিন্তু সে মুখগহ্বরে হরের মণ্ডদানে হরানুচর দুটির অধরে হাস্যরেখা। প্রত্যাবর্তনকালে ভোজনের যে সঞ্চিত সাম্পামণ্ড, সেগুলিও দান তন্বীভোজনে। কৈলাসের খাদ্যপদটির শতমুখ প্রশংসা গৃহদ্বারে। তন্বীগুলিকে কেশবন্ধনের বর্ণময় রজ্জু ও কেশকণ্টক দান প্রেতিনীদলের। প্রাপ্তিতে তন্বীগুলি আহ্লাদিত। রজ্জুগুলি পশু রোমের এবং কণ্টকগুলি মীনজাত। হিমাদ্রিলোকে অতি সূক্ষ্ম তন্ত্রীগুচ্ছে কেশবন্ধনী কিন্তু তারও অধিক সূক্ষ্ম কৈলাসের কেশরজ্জু। কেশকণ্টকও ভিন্ন। হিমাদ্রির হেমকণ্টকের বিপরীতে এগুলি প্রকৃতিজাত। সেগুলির গাত্রে কারুকর্ম। কন্যাগুলি কৈলাসের কলাকুশলতায় মুগ্ধ। গৌরীর কৈলাস বাসকালে এই সব অভিনব প্রসাধনী ও অলংকার নিত্য ব্যবহার। সখী সুখের সেই ভবিষ্যৎ ভাবনায় তন্বীগুলির মহানন্দ। গৌরী তখন হিমগিরির মতো নিত্য নবরূপে সুন্দর।

শয্যা উত্তোলনে প্রধান দান হল বস্ত্র। বৃক্ষের আচ্ছাদক যেমন পত্র, গিরির আচ্ছাদক তুষার, অম্বরের আচ্ছাদক অম্বুদ, তেমনই নরদেহের আচ্ছাদক হল পরিধান। অন্তরীয় ও উত্তরীয়ে অঙ্গে সে আবরণ দান। যে বয়নকুশলীদের করাঙ্গুলে বস্ত্রের বয়ন তা অতীব সূক্ষ্ম এবং আবরণ হিসেবে সেগুলি উত্তম। তন্বীদল বলে, তারও অধিক উৎকৃষ্ট হল হিমাদ্রিলোকের যজ্ঞবস্ত্রের বয়ন। দুই রমণী ঊষা ও রাত্রি বয়ন করে সে বস্ত্র। তোমার কৈলাসগিরিতে যেমন বয়ন তেমনই বসন দাও হে গৌরীপতি। তবে দেখো সে বস্ত্রের বর্ণ যেন পক্ক হয়। হিমাদ্রি ও কৈলাসগিরির মধ্যস্থলে একটি বিশেষ ব্রীহির ফলন নিত্য বৎসর। সে মঞ্জরি শষ্যভারে অবনত। সে ব্রীহির নাম হল হরজটা। তার বর্ণ স্বর্ণচাতকের মতো। ব্রীহিজাত অন্ন ভোজন করুক গিরিবাসী, আমাদের দিও হরজটা বর্ণের বস্ত্র। শুনি তোমার প্রিয় পুষ্প হল আকন্দ। তাই বৃক্ষটির নাম হরবল্লভ। আকন্দপুষ্পের নীললোহিত বর্ণেও আমাদের রুচি। তাই দিও। তুমি নাকি যোগ কালে কণ্ঠে ধারণ কর রুদ্রাক্ষ। লোকমুখে ওটার নাম হরপ্রিয়। না হে গৌরীপতি, রুদ্রাক্ষের মালা জপার কোনও বাসনা নাই অন্তরে। রুদ্রাক্ষের বর্ণটি কিন্তু অপরূপ। বাসনা ওই বর্ণের বসন পরিধানের। কিছু বস্ত্র হরজটা ব্রীহিবর্ণের, কিছু হরবল্লভ আকন্দ বর্ণের আর কিছু হরপ্রিয় রুদ্রাক্ষ বর্ণেরও দিতে পারো। তবে দেখো নীল অম্বর, হরিৎ সূর্যাশ্ব ও শ্যামল দূর্বাদলের মতো তোমার দানের বস্ত্রগুলির বর্ণও যেন সুপক্ক হয়।

তন্বীগুলির প্রগলভতায় নন্দি ও ভৃঙ্গি বিমূঢ়। ব্রীড়া ও গাম্ভীর্যের কোনওটাই নাই কন্যাগুলির। উপবিষ্ট হর সমুখে কিন্তু হর ভাবের স্পর্শহীন কন্যাদল। বস্ত্র বিষয়টি অতীব জটিল এবং তার অর্থগরিমা বিস্তৃত। সার বস্তুটি হল আত্মা। এই আত্মা এক, অব্যয়, চৈতন্যস্বরূপ, আনন্দময় ও শুদ্ধ। এই আত্মার বস্ত্র হচ্ছে দেহ। সেই দেহের নির্মাণ অস্থি, মাস, শোনিত, নাড়ি, নাভি আদি বস্তুতে। এই আদি বস্তুগুলির আচ্ছাদক ত্বক। সেটিও একটি বস্ত্র। সেটিকে আবরণ দান কেশের। তারপরে তন্বীদলের বর্ণময় বসন। তার আবার পক্ক–অপক্ক! তবে পক্ক বর্ণে মতি জলে শ্রেষ্ঠ পরিধান হল অজিন। সেটি অঙ্গে ধারণে মনটিও বর্ণময়। তখন কৈলাসপতির মতো ব্রহ্মাণ্ডের রঙ্গদর্শন।

নন্দি ও ভৃঙ্গির ভাবগম্ভীর বস্ত্রবিচারে বৃষভ মুখে কৌতুক। এ যেন ভূতদলের অপাঞ্চতক মহাভূতের পঞ্চাত্মকতা সম্পাদন। প্রচলিত শব্দে যা হল পঞ্চীকরণ। বিষয়টি এমন কিছু জটিল নয়। আকাশাদি পঞ্চভূতকে দুটি সমান অংশে বিভক্ত করে, ওই দশ অংশের প্রথম পাঁচ অংশ পুনর্বার সমান চার ভাগ করে, ওই চার ভাগের এক–এক ভাগ, স্ব স্ব অপর দ্বিতীয়াংশ ভিন্ন অন্য চার ভূতের অবশিষ্ট চার দ্বিতীয়াংশের প্রত্যেকের সঙ্গে সংযোজন। বৃষভ ও নন্দি–ভৃঙ্গির মধ্যবর্তী পথখানিতে পদার্পণ যমরাজের। দূর হতে শমনরাজ দর্শনে তন্বীগুলি দণ্ডায়মান। বাসনার নিবৃত্তি ও উপশম নিশ্চয় নব বসন দানে! তন্বীগুলির মধ্যে একটা সদা রঙ্গময়ী। যম দর্শনে সেটির আশ্রয় গ্রহণ দ্বার পশ্চাতে। সেখান হতে তার ঘোষণা, ‘পুষ্পশয্যা উত্তোলন কন্যাপক্ষের সখীদের। সে কর্মের দক্ষিণা যত উত্তম ততই সুখময় নিত্যনিশির দম্পতি শয়ান। আর এক শয্যা উত্তোলন যমরাজের। তার শয্যা উত্তোলনে ধরাধামের পাট সমাপ্ত। সে তোলনে নাই কোনও নব পাতন। তাই যমরাজের কর্মটি দক্ষিণাহীন। মুনিজনের শব্দবন্ধে এটি হল ‘মানদ’ বা ‘সাম্মানিক’।

ভূতনাথের পরিণয়ে প্রেতনাথের প্রস্তুতি দিনধার্যের সময় হতে। প্রেতলোকের প্রতিটি গৃহবাসী ধরাধামে বাসকালে যুক্ত ছিল কোনও না কোনও কুকর্মে। তাদেরই এক মহাসংঘ প্রেতলোকে। সেগুলিকে সুকর্মে পরিচালনা করা জটিল এক ক্রিয়া। কিন্তু যমরাজ অতি বিচক্ষণ। তার ঘোষণা হর পরিণয়ের বস্ত্রগুলি সুচারু বয়নে প্রেতলোক হতে মুক্তি ও সুরলোকে গমন। সুরলোক অভিলাষীরা এক পদে দণ্ডায়মান হর পরিণয়ের বস্ত্র বয়নে। নিশি পতনে রোম সংগ্রহে তারা ভূলোক পরিক্রমায়। বনচারী অজ, মেষ, মেরুবাসী ভল্লুক এবং ঘন অরণ্যবাসী কেশরীরও কেশ কর্তন প্রেতদলের। কত কেশবতীর ঘন সুদীর্ঘ কেশ নিদ্রামধ্যে অদৃশ্য! বিচিত্র বর্ণের সেই বস্ত্রগুলি তন্বীগুলির করা দান প্রেতরাজের। একটি নয়, প্রতিটি তন্বীকে দুটি বস্ত্র দান যমরাজের। সে বস্ত্রগুলি যেমন সুগ্রন্থিত তেমনই সুবর্ণ। তন্বীগুলির নতশির প্রণতি যমরাজে। সে সঙ্গে সাধুবাদ যমলোকের সেই প্রেত ও প্রেতিনীদলের যাদের করাঙ্গুলে এই অপূর্ব সৃজন।

মেনকা মাতা স্বধার দূরাগত  কণ্ঠধ্বনি, ‘থামা তোদের শয্যাতোলনি। গৌরী আর হর যে বাসি মুখে বাসি বস্ত্রে উপবিষ্ট। ছাড় দে জননীদল।’ কন্যাগুলিও উচ্চকণ্ঠে, ‘মাতামহী, তোমার পদজোড়ে প্রণাম। কিন্তু এখনও যে অর্থদান অবশিষ্ট। সে দানের অঙ্গীকার করুক বরগৃহ, ক্ষণ মধ্যে গৌরীপতির মুক্তি।’ তন্বীগুলির ‘অর্থদান’ উচ্চারণে কুবেরের অজবাহনটি উচ্চরব। ত্রিলোকের ধনপতি হল যক্ষ ও কিন্নররাজ কুবের। কৈলাসের অলকাপুরীতে তার বাস আর সে গৃহে অষ্টনিধি। সে অষ্টকলসের নাম হল পদ্ম মহাপদ্ম মকর কচ্ছপ মুকুন্দ নীল নন্দ ও শঙ্খ। অজবাহনের ডাকে কুবের অচিরে তন্বীগুলির সমুখে। কুবের দর্শনে তন্বীগুলির পরস্পরে দৃষ্টি বিনিময়। কুবের ধনপতি কিন্তু দানে তেমন মতি নাই। অলকাপুরীর চিত্ররথ উদ্যানে তার উপবেশন একটি সুবৃহৎ জম্বুবৃক্ষ তলে। বারমাসী সে বৃক্ষের বর্ষব্যাপী ফলদান। বৃক্ষের তলে বাস কুবের বাহন অজ সঙ্গে একটি অজীর। ধনপ্রার্থীদের কুবেরের দান বৃক্ষফল ও বৃক্ষতলের ছায়া। ফল ভোজনে তৃষ্ণা ও জরা হতে মুক্তি আর বৃক্ষছায়ায় আত্মার শান্তি ও অন্তরের আনন্দ। একবার দুই সমতলবাসী তন্বী কুবের কাছে গমন করেছিল দুটি বৈদূর্যমণির বাসনায়। তাদের কপোলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফোটক দর্শনে কুবেরের দান জম্বুত্বক চূর্ণ, মধু ও অজীদুগ্ধের সুমিষ্ট পূর্ণভাণ্ড পানীয়। সেটি পানে অতিসারের শোণিতস্রাবে নিবৃত্তি।

শত তন্বীর দুই শত কর আন্দোলিত কুবেরের মুখ সমুখে। তাদের না স্ফোটক না শোণিতের অতিশয় নিঃসারণ। তাদের বাসনা শয্যাতোলনির সার্ধশত সুবর্ণ, শ্বেতবর্ণ ধন ও কড়ি। এগুলি দানে সম্মতি দিলে কৈলাসপতির মুক্তি তাদের দেহপ্রাকার হতে। কুবের হাস্যমুখ। হর তার বান্ধব, তাই দানে সে উদার। উৎকৃষ্ট দানই সে দেবে। সুবর্ণ দেবে, শ্বেতবর্ণ ধন রজতমুদ্রা দেবে সে প্রতিজনে। পঞ্চকড়িও দেবে যদিও একটি কড়িতেই বার্ধ্যকে ভবসাগর অতিক্রম। তবে তন্বীগুলির জরাকাল সুদূরে। উপস্থিত ওই কড়িতেই অঙ্গসজ্জা। তাই পঞ্চবিধ কড়িদান। তন্বীগুলির করতলে অচিরে পঞ্চকড়ি— স্বর্ণবর্ণা সিংহী, ধূম্রবর্ণা ব্যাঘ্রী, পীতপৃষ্ঠা শ্বেতোদরা মৃগী, শ্বেতবর্ণা হংসী এবং নাতিদীর্ঘা বিদন্তা। দাতা কুবের তাই তন্বীগুলির নিবিড় পর্যবেক্ষণ কড়িগুলিকে। ছিদ্রময় কান দ্রব্যে বড় বিড়ম্বনা। কান নিশীতে যাত্রা নাই, কান স্তনে দুগ্ধ নাই, কান কপর্দকে ক্রয় নাই। কুবের দানের কড়িগুলি সত্যই দোষহীন। তুষ্ট কন্যাদল। সেগুলিকে বাম করে ধারণে দক্ষিণ করতল প্রসারিত কুবের সমুখে। কিন্তু তা সঙ্কোচন হর ও পার্বতীর শয্যাগৃহ পরিত্যাগ কারণে। কুবের যখন দানে সম্মত তখন বৃথা কেন নব বরে বন্ধন!

হর পশ্চাতে কুবেরেরও গমনের অভিপ্রায়। তাই দ্রুত তার রজতমুদ্রা দান তন্বীগুলির করতলে। সে দান শেষে কুবের খরপদে চলমান। সে পশ্চাতে ঝম্পদানে গমন তার বাহন অজটির। কিন্তু সেটির পথরোধ তন্বীগুলির। এখনও যে একটি দান প্রাপ্য। কুবের বাহনের সুদীর্ঘ কর্ণদুটি আন্দোলিত। নয়নদুটিও বদ্ধ। নব কোনও দানের কথা না শ্রবণ না অবলোকন। কুবের তার বাহনটির পরিণতি দর্শনে পশ্চাৎমুখ। তার দৃষ্টিটিও শূন্য। আর কোন দান প্রদেয় সেটি তার সম্যক বিস্মরণ। পার্বতীর সখীগুলির শতকণ্ঠে সে শব্দ উচ্চারণ— সুবর্ণ, কনক, কাঞ্চন, হেম, হিরণ্য। কুবেরের মুখমণ্ডলে স্বর্ণপ্রভা। এক তন্বী কর উত্তোলনে বলে, ‘সার্ধশত সুবর্ণমুদ্রা। তার একটিও হ্রাসে এই নধর অজটির ঔষধিপ্রস্থে অনন্তকাল বাস।’ কর্ণবিদারী কণ্ঠে অজটির রোদন পথ উপরে। কুবের করখানি দেহবস্ত্র মধ্যে। তারপর সে করখানি উত্তোলন ঊর্ধ্বে। একটি শিলা কুবেরের কর উপরে। সে শিলায় দিনপতির কিরণদান। সহস্র রশ্মিতে সে কিরণের বিচ্ছুরণ। গিরিশিখরের তুষারে স্পর্শমণির আলোকচ্ছটা। প্রতিটি তন্বীর করতলে। প্রতিটি তন্বীর করতলে একটি মণিদান হরসখা কুবেরের। কুবেরের জয়ধ্বনি শত তন্বী কণ্ঠে।

গৃহমধ্যে শঙ্খ ও উরূরব নবদম্পতির নিশি উপবাস ভঙ্গে। দু–একটি বাদ্যেরও কণ্ঠযোগ সে রবে। তন্বীগুলির ত্বরা নববেশ ধারণ। হর–পার্বতীর নিশিবাসের কক্ষটিকে প্রসাধন। সে কর্মে সহায় প্রেতিনীদল। তারপর সমবেত যাত্রা অন্দরে। সেখানে উপবিষ্ট হর ও গৌরী। তন্বীদলের গৃহমধ্যে পদার্পণে সহস্র কামিনী দৃষ্টি তাদের মুখমণ্ডলে। এগুলি হিমাদ্রিকন্যা নাকি কৈলাসতন্বী? মুখমণ্ডলে তৃণভস্মের প্রলেপ। চমরী দুগ্ধরসের ঘন আস্তরণ ওষ্ঠে। যেন দুগ্ধপান অন্তে মার্জারের ফেনময় গুম্ফ। ললাটে যবরেণুর একটি ক্ষুদ্র মণ্ড। পিপীলিকাদল এ দৃশ্য দর্শনে অবিলম্বে দেহ আরোহণে পদযাত্রায়। কেশবন্ধনের রজ্জুগুলি মহিষের পুচ্ছকেশের। কেশকণ্টক সরোবরবাসী সুবৃহৎ মীন পক্ষের। দেহবস্ত্রগুলি নানা পশুরোমের। আচম্বিত পঞ্চকামিনীর কণ্ঠে আর্তনাদ। চার পক্ষকাল পূর্বে নিদ্রাকালে তাদের কর্তিত কেশদাম কৈলাসের দানের দেহবস্ত্রে। সেই একই কুঞ্চিত কেশ, সেই একই বর্ণ। আর ওই যে স্পর্শমণি তা মানস সরোবর তীরের শিলা। তন্বীগুলিকে সহস্র কণ্ঠে আহ্বান এই সব দ্রব্য ত্যাগের। তন্বীগুলি বিভ্রান্ত। তারপর বারিমুকুরে তাদের আপন আপন রূপ দর্শন। হাস্যমুখ কন্যাগুলি। নববেশে তাদের নবীন রূপ। 

শব্দার্থ

স্ফোটক : ফোঁড়া, হিমাদ্রি : হিমালয়, শ্বেতগিরি : কৈলাস, ঔষধিপ্রস্থ : গিরিরাজ ও মেনকার বাসস্থান, সাম্পা : তিব্বত দেশের একটি বিশেষ খাদ্য পদ, অজিন : পশুর চামড়া, কেশরী : সিংহ, কপোল : গাল, জম্বুবৃক্ষ : জামগাছ, উরূরব : উলুধ্বনি।         

চিত্রকর: মৃণাল শীল