সাহিত্যিক দিব্যেন্দু পালিতের জন্ম 1939 সালের 5 জানুয়ারি, ভাগলপুরে। পরে চলে আসেন কলকাতায়। মাত্র ষোলো বছর বয়সে তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় বিখ্যাত পত্রিকায়। পরবর্তীতে তাঁর লেখা বারবার ছুঁয়ে থাকতে চেয়েছে জীবনের সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতাকে। গল্প ও উপন্যাস লেখার পাশাপাশি নিভৃতচারী হয়ে লিখে গিয়েছেন কবিতাও। বাংলা সাহিত্য মনে রাখবে তাঁর ‘সহযোদ্ধা ‘, ‘অন্তর্ধান ‘, ‘ঘরবাড়ি ‘, ‘আমরা ‘, ‘বিনিদ্র ‘, ‘সম্পর্ক ‘ এবং আরও অনেক উপন্যাস। ‘মূকাভিনয় ‘, ‘চিলেকোঠা ‘, ‘শীত গ্রীষ্মের স্মৃতি ‘, ‘মুখগুলি, ‘মুন্নির সঙ্গে কিছুক্ষণ ‘, ‘আলমের নিজের বাড়ি ‘-র মতো আরও অনেক গল্প স্মৃতিধার্য হয়ে থাকবে বাঙালি পাঠকের। গত 3 জানুয়ারি 2019, আশি বছরের জন্মদিনের মাত্র দু ‘দিন আগে তাঁর প্রয়াণ ঘটে। এখানে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল 2013 সালের 27 জুন, লেখকের বাড়িতে। উপস্থিত ছিলেন অমর মিত্র, অরিন্দম বসু ও রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। দ্য ওয়াল নতুন করে সামনে আনল এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যিকের সেই অন্তরঙ্গ কথোপকথন যা লেখক ও পাঠকদের কাছে আজও প্রাসঙ্গিক।


আজ ২৭ জুন। প্রিয় লেখক দিব্যেন্দু পালিতের ফ্ল্যাটে ওঁর সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আড্ডা দিতে আমরা— আমি অমর মিত্র, অরিন্দম বসু এবং রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় মেঘমল্লারে এসেছি। মূলত ওঁর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং নানা সামাজিক বিষয় ও ওঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা কথা বলব। আমার সঙ্গে যে দুজন আছেন, তাঁরা তরুণ লেখক— একজন কবি ও অন্যজন গল্পকার-ঔপন্যাসিক।

অমর মিত্র:   দিব্যেন্দু দা, আপনার প্রথম গল্প ছন্দপতন আনন্দবাজার পত্রিকায় বেরিয়েছিল ১৯৫৫ সালে। ভাগলপুরে আপনার জন্ম ১৯৩৯-এ, অর্থাৎ মাত্র ষোলোর কিছু বেশি তখন। সেই সময় আনন্দবাজারের সম্পাদক ছিলেন মন্মথনাথ মণ্ডল। ওঁকে আপনি গল্প পাঠিয়েছিলেন যা ছাপা হয়েছিল। আপনি তো এরও বেশ কয়েক বছর বাদে কলকাতায় আসেন?

দিব্যেন্দু পালিত: কলকাতায় পাকাপাকিভাবে আসি ১৯৫৮ সালে, বাবা মারা যাওয়ার পর।

অমর মিত্র: এই ১৯-২০ বছর বয়সে যখন আসেন, তার মধ্যেই দেশ এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় আপনার গল্প বেরিয়েছে।

দিব্যেন্দু পালিত: হ্যাঁ।

অমর মিত্র:  আমি অনেকের কাছে শুনেছি যে কলকাতা শহরে আপনাকে নিঃসঙ্গভাবে প্রচুর লড়াই করতে হয়েছে। চোখের সমস্যাতেও ভুগেছেন। অথচ বাইরে ভালো চাকরি পাওয়া সত্ত্বেও যাননি, কলকাতা শহরকে আঁকড়ে ধরে থেকেছেন। এর পিছনে কী কারণ ছিল?

দিব্যেন্দু পালিত:  আমার একটা জীবিকার দরকার ছিল। কারণ বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পরিবারটা অসহায় হয়ে পড়ে। আমি মধ্যম পুত্র। দাদা পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। ওর যা উপার্জন তা দিয়ে একটা মোটামুটি মাঝারি সংসার চালানো যায় না। আমার ওপরের বোন তখন কলেজে পড়ানোর চাকরি নেওয়ার কথা ভাবছেন। আমার চাকরির দরকার ছিল এবং এটাও মনে হয়েছিল যে কলকাতা শহরে এলে হয়তো লেখালেখির ব্যাপারে যোগাযোগ হবে এবং সুযোগ আরও বাড়বে। সেইজন্য আমি কলকাতা চলে আসি। আমার বাবার দু-চারজন বন্ধুবান্ধব কলকাতায় থাকতেন। আমি ভেবেছিলাম যে দেখা করলে হয়তো কিছু সাহায্য হতে পারে। কিন্তু খুব নিরাশ্রিত বোধ করতাম। এক পরিচিত আত্মীয়ের বাড়িতে এসে উঠেছিলাম। কিন্তু আমার ওইভাবে হঠাৎ চলে এসে থাকাটাকে তাঁরা খুব পছন্দ করেননি। ফলে আমাকে কিছুদিন শিয়ালদা স্টেশনেও থাকতে হয়েছে।

শিয়ালদা স্টেশনের কাছে হায়াৎ খান লেন বলে একটা লেন আছে, তোমরা নিশ্চয়ই জানো। সেখানে মৃগেন ঘোষ নামে আমার স্কুলের এক বন্ধু থাকত। সে বলল যে তার ওখানে আমি খাওয়াদাওয়া করতে পারি কিন্তু থাকাটা তারা অ্যালাউ করবে না যেহেতু ওটা মেসবাড়ি। এটা ১৯৫৮ সাল। তখন শিয়ালদা স্টেশনে উদ্‌বাস্তুদের ভিড়। শিয়ালদা নর্থের টিকিট কাউন্টারের সামনে একটা খুব মোটা পুরু বেঞ্চি পাতা থাকত। সেইটাই ছিল আমার রাত্রে শোয়ার জায়গা। সেখানে ছিলাম ঠিকই কিন্তু খেতে পেতাম না। খাবার জুটত না। আর মফস্‌সলের ছেলেদের খিদে বেশি পায়।

একদিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন আমার খাবার জোটেনি। পয়সাকড়িও নেই যে কিনে খাব। খিদের জ্বালায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছিলাম। এক উদ্‌বাস্তু বৃদ্ধা আমার কাছে এসে শালপাতায় তিনটে রুটি আর তরকারি দিয়ে গেলেন। বললেন, দেখে তো মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের ছেলে। খাওয়া হয়নি। তুমি এটা খাও বাবা। সেদিন তিনি আমাকে অনাহার থেকে বাঁচিয়েছিলেন। পরে আমি তাঁকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু অত ভিড়ে আর পাইনি। তিনি আমার স্মৃতিতে এখনও থেকে গেছেন। সেদিন বুঝেছিলাম যে মানুষের বিপদে মানুষই হাত বাড়িয়ে দেয়। আমাকে তো তিনি চিনতেন না। তবে তিনি একজন নারী— ফলে মাতৃত্বের একটা ব্যাপার ছিল। অথচ তাঁকেও ভিক্ষে করেই খেতে হত।

যাইহোক, তখন আনন্দবাজার, দেশ-এ আমার লেখা বেরিয়ে গেছে এবং আস্তে আস্তে অনেককে চিনেছি। বিমল কর তখন দেশ পত্রিকায় কাজ করতেন। তাঁর সঙ্গে চেনা হয়ে গিয়েছিল। রমাপদ চৌধুরী এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গেও পরিচিতি হয়। আড্ডাগুলোও চিনে গেছিলাম।

অমর মিত্র: তারপর আপনি কোথায় থাকলেন? দক্ষিণ কলকাতার দিকে বোধহয় কোথাও এসেছিলেন?

দিব্যেন্দু পালিত:  চেতলায়। অজয় দাশগুপ্ত নামে একজন ছিলেন। কলেজ স্ট্রিটে জীবনানন্দ দাসের ভাই অশোকানন্দ দাসের বইয়ের দোকানে কাজ করতেন। অজয় আমার এইরকম অবস্থা শুনে চেতলায় নিয়ে গেল। চেতলায় তার এক জ্যাঠতুতো দাদা থাকত। তাদের বাড়ির প্রবেশপথের একপাশে একটা তক্তপোশ পাতা ছিল। সেইখানে আমাকে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিল। টাকার বিনিময়ে খাওয়া। কারণ ওর দাদার অবস্থাও ভালো ছিল না।

অমর মিত্র:  আপনার চোখে একবার খুব—

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ, সেটায় আসছি। তখন যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করি। একদিন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়তে পড়তে হঠাৎ চোখে প্রচণ্ড ব্যথা। আলোও দেখতে পাচ্ছিলাম না। তা যাদবপুরে অমলেন্দু মিত্র নামে আমার এক সহপাঠী ছিল। সে ওই হলে আমার পাশে বসে পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়ছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, লোডশেডিং হলো না কি? সে বলল, তুমি এ কথা বলছ কেন? আমি বললাম, আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। সে বলল, এখানে এখন পুরো আলো রয়েছে। তা যাইহোক, আমি তখন হাজরা পার্কের পিছন দিকে হাজরা রোডে থাকি। ১২৮/৪ হাজরা রোড ছিল ঠিকানা। সে আমাকে সেখানে পৌঁছে দিল।

এই ঠিকানাও আমাকে খুঁজে দিয়েছিল ভূমেন্দ্র গুহ। ভূমেন তার আগে পিজিতে হাউস সার্জন ছিল। তখন এরা— ভূমেন, নয়াকর ভট্টাচার্য আমার বন্ধু হয়ে গেছে।

অমর মিত্র:  নয়াকরকে আমি দেখেছি। লম্বা মতো, ইউ বি আই-তে কাজ করত।

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ। তা ভূমেনেরও একজন সঙ্গী দরকার ছিল। একা থাকা তার পছন্দ না। সে আমাকে বলল, আপনি আমার ওখানে চলে আসুন। তা অমলেন্দু তো আমাকে ওখানে নিয়ে গেল। তার সঙ্গে পরে দেখা হয়েছিল সমরেন্দ্রর।

অমর মিত্র:  সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত?

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ। অমলেন্দু ওকে আমার চোখে না দেখতে পাওয়ার ঘটনাটা জানায়। ওকে বলে যে একজন ডাক্তার দেখানো হয়েছে এবং তিনি চোখের একটা ড্রপ দিয়েছেন। তখন ‘বিজলী গ্রিল’ নামে যে দোকানটা, তখন ছোটই ছিল, সেখানে আমি খেতাম। খুঁজে খুঁজে গিয়ে খেয়ে আসতে খুব কষ্ট হত। একদিন কচুরি, হালুয়া আর ভাঁড়ের চা খেয়ে ফেরার পর যে বাড়িতে থাকতাম সেই বাড়ির মহিলা বললেন যে বুদ্ধদেব বসুর কাছ থেকে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন এবং আপনাকে একটা চিঠি দিয়ে গেছেন— আপনাকে লেখা বুদ্ধদেববাবুর চিঠি। আমি বললাম যে, আমি তো পড়তে পারব না। আপনি একটু পড়ে দিন। বুদ্ধদেববাবু লিখেছিলেন, ‘আমি সমরেন্দ্রর কাছে শুনলাম যে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়তে পড়তে তোমার চোখে আঘাত লেগেছে। এই চিঠি পাওয়া মাত্র তুমি যে করেই হোক আনন্দকিশোর বক্সীর সঙ্গে দেখা করো। (তোমরা হয়তো তার নাম শুনেছ। তিনিও লেখক ছিলেন, দেশ পত্রিকাতেও উপন্যাস লিখেছেন।) সে তোমাকে ডক্টর অমল সেনের কাছে নিয়ে যাবে। তুমি ভালো করে চোখ দেখাবে। তোমার বাবা নেই। এখানে একা থাক কিন্তু কোনও অসুবিধা হবে না। খরচ যা হয়, তার দায়িত্ব আমার।’ চোখে আঘাত লাগার ধারণাটা ওঁর ভুল ছিল। তা যাইহোক, চিঠি পেয়ে আমি আনন্দকিশোর বক্সীর কাছে গেলাম। ইন্দিরা সিনেমার উলটোদিকে কাঠের সিঁড়িঅলা দোতলা বাড়িতে তিনি থাকতেন। উনি আমার কাছ থেকে সব খোঁজখবর নিয়ে ডক্টর সেনকে ফোন করে সেদিনই আমাকে দেখাতে নিয়ে যাওয়া স্থির করলেন। ডক্টর সেন আমাকে দেখে ইঞ্জেকশন দিলেন। চোখের শিরা ছিঁড়ে গেছিল। বুদ্ধদেববাবু না থাকলে আমার কী হত! আমি তো কাউকে চিনতাম না।

অরিন্দম বসু:  এতটা শোনার পর আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি। আপনি ভাগলপুর থেকে মাত্র ষোলো বছর বয়সে গল্পটা যে পাঠিয়েছিলেন সেটা ঠিক কেন? কোনও সাহিত্যের জায়গা বা অন্য কোনও ভাবনা?

দিব্যেন্দু পালিত:  খুব ভালো প্রশ্ন। ভাগলপুরের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ সাহিত্যচর্চার ব্যাপারে বেশ এগিয়েছিল। প্রতিবছর ওরা সর্বভারতীয় সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করত। গল্প-কবিতা এবং প্রবন্ধ। আনন্দবাজার এবং যুগান্তরে এক কলমের ওপর বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। সর্বভারতীয় ক্ষেত্র থেকে প্রতিযোগীরা আসত। সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে আমিও গল্প পাঠাই। সেই গল্পটা প্রথম হয়। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন বনফুল। ধরে নিতে পারো যে যোগ্য লোকের হাতেই বিচার হয়েছিল। বনফুলের সঙ্গে পারিবারিক একটু পরিচিতি ছিল। কিন্তু উনি জানতেন না যে আমি লিখেছিলাম। পুরস্কার দিতে গেছিলেন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়— বৈষ্ণব সাহিত্যের একজন পুরোধা। তা সেখানে আমাকে দেখে বনফুল জিজ্ঞাসা করলেন, তুই গল্প লিখতে শুরু করলি কবে? আমি বললাম, এই লিখে ফেললাম। তিনি বললেন, তুই লেখ। লেখার হাত আছে তোর, চেষ্টা করলে পারবি।

বনফুল মারা যাওয়ার পর ওঁর নামে স্মৃতি পুরস্কার চালু হয়, বছর পাঁচেক চলেছিল। সেই পুরস্কারটাও প্রথম আমাকেই দেওয়া হয়েছিল। সেটা নিতে গিয়ে আমার ওঁর সেই কথা মনে পড়ে যায়।

দিব্যেন্দু পালিত, তাঁর স্ত্রী কল্যাণী পালিত, মনোজ মিত্র, ভগীরথ মিশ্র, নলিনী বেরা ও অমর মিত্রের পরিবার

অরিন্দম বসু:  আপনি যখন কলকাতায় এলেন, আপনার থাকার জায়গা নেই, খাওয়ার ব্যবস্থা নেই— কলকাতাও খুব অস্থির অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তখন। আপনার মধ্যে কি কোথাও এরকম কিছু কাজ করেছিল যে কলকাতায় গেলে সাহিত্যচর্চার সুবিধা হবে? যেহেতু আমাদের সাহিত্যচর্চা চিরকালই কলকাতা-কেন্দ্রিক এবং আমরা এর থেকে বেরোতে পারলাম না।

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ, সেটা মনে হয়েছিল এবং সেই সাহায্য কলকাতা আমাকে করেছে। মন্মথ বাবু, তাঁর সহকারী তখন ছিলেন নীরেন্দ্রদা। তারপর বিমলদা— এই মানুষগুলো; পরবর্তীতে সন্তোষ কুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র— এদের সকলের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়ে যায়। রমাপদ চৌধুরী পরে রবিবাসরীয় দেখতেন।

অরিন্দম বসু:  অগ্রজ বাদ দিয়ে সমসাময়িক যাঁরা?

দিব্যেন্দু পালিত:  সমসাময়িক বলতে সুনীল, শীর্ষেন্দু— কৃত্তিবাসের গ্রুপটা।

অমর মিত্র: তারপরে আপনি সিরাজদা, অতীনদা, প্রফুল্লদা, অমলেন্দু চক্রবর্তী— এদের সকলের কথা লিখেছেন। এক জায়গায় আপনি লিখেছিলেন, লেখক মাত্রেই সাহিত্যিক নন। লেখকের থেকে সাহিত্যের দাবি অনেক বেশি। বুদ্ধদেব বসু যেমন লিখেছিলেন, লিখতে লিখতেই একজন লেখক হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন বলেছিলেন এরকম, তা সাহিত্যিকদের জন্য জানাটা খুব জরুরি। এ বিষয়ে কিছু বলুন।

দিব্যেন্দু পালিত:  বুদ্ধদেববাবু যা বলেছিলেন যে হাতে কলম ও গল্প বলার ক্ষমতা থাকলে একজন গল্প লিখতে পারে। ধৈর্য থাকলে উপন্যাস লিখতে পারে কিন্তু সাহিত্যিক হওয়ার জন্য আরও কিছু দরকার। সেটা হল সাহিত্যবোধ।

অমর মিত্র:  আপনার বহুদিন আগে লেখা একটা অসম্ভব ভালো উপন্যাস— সহযোদ্ধা— যা সত্তর সালে লেখা অর্থাৎ তার বয়স হয়ে গেছে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর; পঁয়ত্রিশ বছর বাদে এই উপন্যাসটা আমি গতকাল থেকে পড়া শুরু করে আজ শেষ করলাম আবার। খুঁটিয়ে পড়লাম। আগে আরও দু’বার পড়া এই উপন্যাসটা এবার পড়তেও একইরকম সেনসেশন হল। এখন তো আর বলতে বাধা নেই যে কোন ঘটনার অবলম্বনে এই কাহিনিটি লেখা হয়েছিল। উত্তমকুমার সরোজ দত্তের খুন হওয়ার ঘটনাটি দেখে বম্বে চলে গেছিলেন— এই বিষয়টাকেই এখানে অন্যভাবে লেখা হয়েছে। পড়তে পড়তে মনে হল মানুষের এই যে ইনসিকিওরিটি, কর্পোরেট হাউসের বড় চাকুরে ও লেখকের যে ইনসিকিওরিটি— তা কিন্তু এখনও রয়ে গেছে। গত চল্লিশ বছরে বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসগুলোর মধ্যে সহযোদ্ধা একটি। এটা নিয়ে আপনি একটু বলুন।

দিব্যেন্দু পালিত:  নৈহাটির সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসটি সম্পর্কে লিখেছিলেন যে ‘আমাদের অনেকের হয়ে এই কথাটি উনি বলে গেলেন।’ ওই সময়টা ভয়াবহ সময় ছিল। আমি আরও ভয় পেতাম এই কারণে যে মফস্‌সল থেকে এসেছিলাম, কলকাতা শহর ভালো চিনি না। আমার এক ছোট ভাই তখন এখানে প্রেসিডেন্সিতে পড়ত। সায়েন্স কলেজের হস্টেলে থাকত, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। ওর এক বন্ধু নকশাল ছিল, খুনও করেছিল। সেও ওইখানেই থাকত। একদিন রাত্রে সে আমার বাড়িতে আসে এবং আমাকে বলে যে তার ফিরে যেতে ভয় লাগছে। তাকে আমি বললাম যে তোমার কিছু হবে না, তোমাকে আমি পৌঁছে দিচ্ছি। সে জিজ্ঞাসা করল আমি ফিরব কী করে। আমি তাকে বলি যে সেটা আমার চিন্তা। বেরিয়ে গল্প করতে করতে হেঁটে হেঁটে ওকে আমি ওর ওখানে পৌঁছে দিই। এইসব ঝুঁকিও নিতে হয়েছে। কারণ পুলিশ যদি জানতে পারে যে আমার বাড়িতে এসে রয়েছ, তাহলে সবাইকে ধরবে। এইজন্যেই খুবই বিপজ্জনক সময় ছিল।

অরিন্দম বসু: আপনি তো বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে কাজ করেছেন। এটা আপনার লেখাতেও এসেছে। ‘সম্পর্ক’ উপন্যাসে কর্পোরেট হাউসের লড়াই, প্রতিযোগিতা, তার কোনও বড় এগ্‌জিকিউটিভের একা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় এনেছেন। ‘বিনিদ্র’ উপন্যাসেও একই চরিত্র, বোধহয় কোম্পানির নামটাও এক ছিল।

দিব্যেন্দু পালিত:  কোম্পানির নামটা ইচ্ছে করেই এক রেখেছিলাম।

অরিন্দম বসু: আপনার এক উপন্যাসের এক চরিত্রের নাম রামতনু সোম। তিনি অন্য এক উপন্যাসের কম গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র, অথচ নামটা এক। এ থেকে বোঝা যায় যে আগে-পরে লেখা হলেও আপনি বিষয়টা এনেছেন। এই লেখাগুলো এখন পড়লে মনে হয় যে কিছুটা চাকচিক্য যোগ হয়েছে, হয়তো বা বদল হয়েছে কিন্তু মানুষের প্রতিযোগিতা বা একাকীত্ব, সাংসারিক জীবনের সঙ্গে কাজের জীবনের লড়াই তো রয়েই গেছে। বোধহয় বিনিদ্রতে আছে ‘ম্যারেড টু ওয়ার্ক, ম্যারেড টু অফিস’। এই জগৎটা আপনার দেখা জগৎ। আপনি একটা অদ্ভুত সময়ের কথাও বললেন। এইগুলো কীভাবে আপনার লেখায় বারবার চলে আসে?

দিব্যেন্দু পালিত:  আমার অভিজ্ঞতা তো অনেক হয়েছে। ভারতবর্ষের তখনকার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন সংস্থাতে আমি কাজ করেছি। সেখানে কাজ করতে করতেই নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিভিন্ন চরিত্রের সংস্পর্শে এসেছি। এসব থেকে বিভিন্ন রকম উপলব্ধি হয়।

অমর মিত্র:  সহযোদ্ধায় আদিত্য প্রশ্ন তুলছে যে গরীব ছেলেরা সুতি ব্যবহার করে, টেরিলিন নয়। তাহলে বিজ্ঞাপনটা কাদের জন্য? সেখানে আদিত্যর বিষণ্ণতা, ক্রমশ একা হয়ে যাওয়া এবং শেষপর্যন্ত বিষয়টাকে সে সমগ্রে নিয়ে যায় একটা চিঠি দিয়ে। এসব বাদেও উপন্যাসটিতে অনেক শেড আছে। আদিত্য তো একজন লেখকও। সহযোদ্ধায় আপনি লিখেছেন, ‘আজ যা ঘটনামাত্র, ধোঁয়া কিংবা লাবণ্যে চিহ্নিত, কালই তা পরিণত হবে ইতিহাসে’— এই জায়গাটা খুব সুন্দর। ধোঁয়া বা লাবণ্যে বসবাসকারী মানুষের প্রতিক্রিয়া নেওয়াটা লেখকের কাজ। বাংলা সাহিত্যে নাগরিক মানুষের কথা লিখেছিলেন মতি নন্দী, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আর আপনি। একটা পরিপূর্ণ শহরে থাকার কারণে মানুষের মধ্যে যে নাগরিক মানসিকতা ও মনন আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে দেখছি তা আমরা আগে দেখিনি। অথচ এটা নিয়ে আপনি লিখেছেন অনেক আগে যখন আমাদের মধ্যে আধা গ্রাম, আধা শহর ছিল। অনেক গল্পেই এই বিষয়টা ছিল, যেমন ‘জেটল্যাগ’ গল্পের সেই মেয়েটি। এই নাগরিকতাটা আপনি কোথা থেকে পেলেন?

দিব্যেন্দু পালিত:  বিজ্ঞাপনের জগৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জগৎ। মানুষের প্রয়োজন ও তার পূরণ বিজ্ঞাপনের জগৎ যেভাবে দেখেছে তার ফলে মানুষকেও তারা প্রোডাক্ট হিসেবেই দেখে। এই জগৎকে চেনা খুব কঠিন। কেউ কেউ বলেছেন যে বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞাপনের জগৎকে প্রথম নিয়ে আসে দিব্যেন্দু পালিত। আর কেউ এই নিয়ে লেখেনি। কারণ, না জেনে লেখা যায় না।

অরিন্দম বসু: এক্ষুনি একটা কথা আমার মনে পড়ে গেল। ‘বিনিদ্র’ উপন্যাসের একটা চরিত্র  আরেকজনকে বলছে, ‘তোরা ভিখিরিকে বলিস টেরিলিন পরতে, আর অপুষ্টির দেশের মেয়েদের বলিস বাথ ডেভেলপার ব্যবহার করতে।’

অমর মিত্র:  আপনি অনেকটা এগিয়ে গিয়ে ভেবেছেন।

দিব্যেন্দু পালিত:  ভাবার সুযোগ ছিল। শুধু দেশের ব্যবস্থা জানলে হত না। বিদেশেও কীভাবে কী কাজ হচ্ছে তাও আমাদের জানতে হত।

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়:  ভাগলপুর থেকে কলকাতায় এসে বিভিন্ন লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীকালে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় এগ্‌জিকিউটিভ হিসেবে কাজ নিয়ে ঢোকার পরেও আপনি সমান্তরালভাবে লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। এটি বিরল দৃষ্টান্ত। আপনার মফস্‌সলের সরলতা, দৃষ্টির মধ্যে যে ভার্জিনিটি— তা থেকে আপনি ক্রমশ যখন বিজ্ঞাপন জগতে ঢুকছেন, তার ক্রুয়েলটি, তার দ্ব্যর্থবোধকতা— এইসব কি আপনার লেখার মধ্যে ছাপ ফেলেছিল?

দিব্যেন্দু পালিত:  নিশ্চয়ই। বিজ্ঞাপন জগতে আমি কাজ না করলে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন হত না। আমি যদি ভাগলপুরেই থেকে যেতাম, পরবর্তীকালের এই লেখক হয়ে উঠতে পারাটা হত না। ভাষা, ভঙ্গি— এইসবই পালটেছিল। একই সময়ে দেশ, কৃত্তিবাস আর কবিতা পত্রিকায় আমার লেখা বেরিয়েছিল। আধুনিক কবিতার যে বীজ তা আমার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ পড়ে হয়নি, আধুনিক কবিতা পড়ে হয়েছিল। তুলনামূলক সাহিত্যও খুব বড় প্রেরণা ছিল আমার জন্য। আলবেয়ার কামু আমার প্রিয় লেখক এবং তাঁর প্রভাব আমার লেখায় নিশ্চয়ই আছে— আমি তা অস্বীকার করি না। কারণ সেই প্রভাব আমি গ্রহণ করেছি।

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়:  কামুর প্রভাবের কোন জায়গাটা আপনাদেরও প্রভাবিত করেছে? কাফকাও তো ছিলেন সেই সময়ে। তাঁরও অনেক বড় সৃষ্টি আছে।

দিব্যেন্দু পালিত:  কামু অনেক বেশি আধুনিক লেখক। কাফকা অ্যাবস্ট্রাক্ট ধরনের।

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়:  দিব্যেন্দুদা, আপনার লেখার প্রসেস কী ছিল? লেখাটা আপনাকে বয়ে নিয়ে যেত না কি আগে থেকে আপনি চরিত্র অনুযায়ী ভাগ করে নিতেন?

দিব্যেন্দু পালিত:  প্রশ্নটা খুব ভালো। লেখাটা আসার পর কীভাবে এগোব ভাবি। একটা স্টেজের পর লেখাটা নিজে থেকেই এগোয়। কোন দিকে যেতে হবে, সে দিকটা দেখিয়ে দেয়, বানিয়ে লেখা যায় না।

অরিন্দম বসু:  আমি ‘আমরা’ উপন্যাসটার কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করব। এর আগে পর্যন্ত লেখা উপন্যাসগুলোর চেয়ে ‘আমরা’ উপন্যাসের প্যাটার্ন আলাদা। কিছুটা মনোলগে বলে যাওয়া কথা, চরিত্রদের ভাবনাগুলোও কখনও এক ঘটনায় ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং সম্পূর্ণ অন্য একটা ঘটনাতে পৌঁছে যাচ্ছে, সময়ের এগিয়ে-পিছিয়ে আসা— এই উপন্যাসটা অদ্ভুত লাগে আমার। এক জায়গায় রয়েছে, ‘লেখক হয়ে ফুটবল দেখতে যান কেন? বস্তুত আমি শুনলাম, আপনি মানুষ হয়ে হাঁটেন কেন?’ আরেকটা জায়গায় একটি ছেলে নিজের প্রেম সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে ভাবছে যে, ‘আমরা ভাত একসঙ্গে খাই না, ঘুমের মধ্যে বিছানায় পা একসঙ্গে ছড়াই না, একটা কাজই একসঙ্গে করি— চুমু খাই।’ এই চিন্তাটাই খুব অদ্ভুত। সামাজিক, রাজনৈতিক থেকে সামগ্রিক একটা ভাবনা এবং অত্যন্ত প্যাঁচালো পুরো বিষয়টা— যেন ঘোরের মধ্যে লেখা।   

দিব্যেন্দু পালিত:  দুজন বয়োজ্যেষ্ঠ লেখককে আমি খুব শ্রদ্ধা করি— শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সন্তোষকুমার ঘোষ। আনন্দবাজার পত্রিকায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আমরা’-র রিভিউ করেছিলেন। তাতে তিনি বলেন, প্রত্যেক ভালো লেখকই তার সেরা লেখাটা আগেভাগে লিখে ফেলে গোড়ার দিকে। আমার মনে হয় দিব্যেন্দু এই যে লেখাটা লিখল— ‘আমরা’— এইটাই ওর সেরা লেখা এবং সেই লেখা যা ওকে বাঁচিয়ে রাখবে।  

অরিন্দম বসু:  এই উপন্যাসের ভাবনাটা সম্পর্কে একটু বলবেন? আমার ভীষণ কৌতূহল।

দিব্যেন্দু পালিত: তখন নতুন লেখার ঝোঁক চলছিল, এটা সেই ঝোঁকেই লেখা।

অমর মিত্র:  ‘সহযোদ্ধা’ কোথায় লিখেছিলেন?

দিব্যেন্দু পালিত:  বেতার জগতে।

অরিন্দম বসু:  কামুর কথা হচ্ছিল একটু আগে। যাঁরা লিখতে আসছেন, তাদের ‘ঘুণপোকা’, ‘কুবেরের বিষয়-আশয়’, ‘আমরা’— এইসব উপন্যাসগুলো একদম পাশাপাশি রেখে সাজিয়ে দেওয়া যায়— এগুলো পড়ে ফেলা উচিত। 

দিব্যেন্দু পালিত:  তোমরা এবার একটা করো না। এই যেমন লিস্ট করলে, এভাবে যদি কিছু—

অমর মিত্র:  আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিন আছে যা আমরা পরে প্রিন্টেও আনব। সেখানেই আমরা নানারকম কাজ করব। আরও গল্প আছে, যেমন— বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে একটা লেখা। তখনও বৃদ্ধাশ্রমের কনসেপ্ট সেভাবে আসেনি। পড়তে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। অথচ অনেক আধুনিকমনস্ক গল্প। এই যে নগরজীবন নিয়ে দিব্যেন্দুদার লেখা, তারই প্রোডাক্ট ওই গল্পটিও। ‘জেটল্যাগ’-ও তাই।

দিব্যেন্দু পালিত:  বিমলদা, রমাপদবাবু— এদেরও কন্ট্রিবিউশন রয়েছে ভালো লেখা চিনিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে। একটা ঘটনা বলি। আমি একটা গল্প লিখেছিলাম— আনন্দবাজারের শারদীয়া সংখ্যায় পরে বেরিয়েছিল। তা প্রথমে কিছুতেই লেখা হচ্ছে না দেখে ওয়ার্নিং দিলেন— কালকের মধ্যে যদি লেখা না হয় তাহলে এ সংখ্যায় লেখা যাবে না। তারপর আমি রাত জেগে বেলা বারোটা অবধি একনাগাড়ে লিখে গেলাম। জমা দিলাম ওঁর কাছে। রমাপদবাবু বললেন, দিচ্ছেন বটে, যাবে কিনা সন্দেহ। দেখেছেন তো বিজ্ঞাপনে আপনার নাম নেই? আগে ছিল। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় নামটা তুলে দিয়েছি। তারপর প্রকাশিত হল, বিজ্ঞাপন বেরোল, তাতেও আমার নাম নেই। তখন গেলাম আবার। জিজ্ঞাসা করলেন, খুব গালাগালি করছেন তো আমাকে? তা লেখাটা কেমন লিখেছেন? আমি বললাম, সে তো আপনি বলবেন। পাশের ঘরে তখন মণিশঙ্কর মুখার্জি, সুনীল গাঙ্গুলী— সেই তিনতলার ঘরটায়— আড্ডা দিচ্ছে। উনি বসতে বললেন। তারপর বললেন, এরকম গল্প যদি আর একটাও লেখেন তাহলে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী হয়ে যাবেন। বিজ্ঞাপনে আপনার নাম নেই যেহেতু, কাল আপনার জন্য আলাদা বিজ্ঞাপন দেব। এইভাবে একজন তরুণ লেখককে প্রশ্রয় দেওয়া সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। বিমলদারও এই গুণটা ছিল। সন্তোষবাবুরও ছিল।

অমর মিত্র:  সন্তোষবাবুকে আমি দেখেছি ভোরবেলা সিল্কের পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে গাড়ি চালিয়ে  এক তরুণ লেখকের বাড়িতে চলে এসেছেন তাকে জানানোর জন্য যে তার কোন গল্পটা ভালো লেগেছে। ৮০-৮১ সালের কথা। তখন টেলিফোনও ছিল না।

অরিন্দম বসু:  একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। উপন্যাস বড় হবে, না ছোট হবে, না মাঝারি হবে, তা নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। উপন্যাসের শক্তি তার আয়তনের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু আপনার সমসাময়িক অনেক লেখকই বৃহৎ বা ঐতিহাসিক পটভূমিকা বেছেছেন। পুরনো সময়কে বেছেছেন বলাটা হয়তো ভালো। যার ফলে অনেকটা বড় জায়গা নিয়ে লিখেছেন। আপনার কি কখনও এরকম মনে হয়েছে?

দিব্যেন্দু পালিত:  বড় উপন্যাস লেখা কাল হয়ে দাঁড়াল বাংলা সাহিত্যে ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা শুরু হতে। তার আগে পর্যন্ত যে সমস্ত লেখা বেরিয়েছে, কেউ ধারাবাহিক খুব বেশি লেখেনি। ধারাবাহিক লিখতে গিয়েই আসলে টেনে বাড়ানোর মতো বড় হয়ে যাচ্ছে। সুনীল আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিন্তু তার পূর্ব-পশ্চিমে একটা চ্যাপ্টার ছিল— কথা বলতে যাচ্ছে, দেখা হচ্ছে— কী বৃত্তান্ত, খবরাখবর। এটা না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। এগুলো করতে হত অল্প সময়ে উপন্যাসের কিস্তি দেওয়ার জন্য। সুনীল যদিও খুবই সিগনিফিক্যান্ট লেখক এবং বাংলা সাহিত্যে ওর মতো এন্টারপ্রাইজিং লেখকও খুবই কম আছেন— তা সে উপন্যাসই হোক বা গল্প হোক।

অরিন্দম বসু:  তাহলে আমার প্রশ্নটা থেকে বোধহয় একটা জায়গায় যাওয়া যাচ্ছে, দিব্যেন্দুদা। নিবিড় হয়ে ওঠা এবং তীব্র হয়ে ওঠা— আপনার লেখার মূল উদ্দেশ্যই কি তাই থাকে? গল্প এবং উপন্যাসের— উভয়ত?

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ। উভয়ত।

অরিন্দম বসু:  আর কবিতায়? এবার আমরা একটু কবিতার দিকে যাব।

দিব্যেন্দু পালিত:  আমরা রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে বড় হয়ে উঠেছি কবিতায়। যদিও রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে আমি কিছু ভাবতে চাই না। কবিতা আরও অনেক কিছু দাবি করে, নইলে তা কবিতা হয়ে ওঠে না।

অরিন্দম বসু:  আমি একটা কথা বলতে চাই দিব্যেন্দুদা। একটা গল্প যদি পাঁচ-সাত পাতারও হয়, তাহলেও আমাকে সেখানে অনেক কথা বলতে হয়, অনেক ঘটনা ও চরিত্র আনতে হয়। তারপরে হয়তো কাহিনির পূর্ণাঙ্গ রূপ হয়, বা যা বলতে চাইছি তা বোঝানো যায়। উপন্যাস আরও বিস্তৃত জায়গা দাবি করে। কিন্তু কবিতা তো চার লাইনেও বলা সম্ভব। এমন কথা ওই চার লাইনে বলা যাবে যা গল্পে বলতে পাতার পর পাতা লাগবে।

দিব্যেন্দু পালিত:  জীবনানন্দ দাসের সাকসেস ও ফেলিওরটা খুব বড়। ফেলিওরটা এখানেই যে অনেক অবান্তর জায়গা নিয়েছেন, বেশি কথা বলেছেন।

অরিন্দম বসু:  কীরকম?

দিব্যেন্দু পালিত:  অনেক কবিতায় এত বেশি কথা বলেছেন, যা ঠিক আমাদের মনের মতো নয়।

অমর মিত্র:  আর জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাস?

দিব্যেন্দু পালিত: সেগুলো ভালো কিন্তু তত ভালো নয়। আসলে একটা সত্যি কথা বলি। জীবনানন্দের গদ্য আমি খুব ভালোভাবে পড়িনি।

অমর মিত্র: আমি ওঁর কিছু গল্প-উপন্যাস পড়েছি। আমার কিন্তু খুব আধুনিকমনস্ক বলে সেগুলোকে মনে হয়েছে।

দিব্যেন্দু পালিত: হ্যাঁ, আধুনিক যে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আরেকটা কথা হচ্ছে যে আর কোনও কবি এইভাবে লেখেন না। সেদিক থেকে তিনি একটা দৃষ্টান্ত।

(বাঁ দিক থেকে) অমর মিত্র, দিব্যেন্দু পালিত, রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম বসু

অমর মিত্র:  হ্যাঁ, এবং কাহিনির দিক থেকে আপনাদের যে ধরন, সেই একই ধরনের লেখা। এবং তাঁর লেখায় কবিতার প্রভাব পড়ে থাকতে পারে।

অরিন্দম বসু:  না, কবিতার প্রভাব বোধহয় খুব একটা ছিল না।

অমর মিত্র: পরের দিকের কিছু লেখা পড়ে মনে হয়েছে। তবে সেগুলো তো অনেক পরে বেরিয়েছে। অপ্রকাশিতও ছিল তো লেখা, ট্রাঙ্কের মধ্যে রাখা ছিল।

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ, ভূমেন কপিও করেছিল। তবে আমার মনে হয়েছিল উনি কবিতাটাই ভালো লিখতেন।

[রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় দিব্যেন্দু পালিতের ‘অ্যালার্ম’ কবিতাটি পড়লেন]

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়:  দিব্যেন্দুদা, আপনি এই কবিতাটির ভেতরের কথাটা একটু বলবেন? এই জায়গাটা ভারি আশ্চর্য যে ‘ভুল ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়েছিলাম’।

দিব্যেন্দু পালিত:  কনশাস ও সাবকনশাসের রহস্যই তো এর মধ্যেকার কথা।

অরিন্দম বসু:  আমি তোমাকে একটু থামাচ্ছি রজত। একটু আগে গল্প-উপন্যাস নিয়ে কথা হচ্ছিল। এইমাত্র রজতের পাঠ করা কবিতাটি সম্পর্কে আপনি বললেন যে কনশাস এবং সাবকনশাসের মধ্যেকার কোনও রহস্য কবিতাটার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। একইরকমভাবে আপনার বহু উপন্যাসের কথা আমরা জানি যেগুলোতে এই খেলাটা আপনি খেলেছেন। খুব সাম্প্রতিক, বছর দুই আগে আপনার লেখা একটা গল্পে এরকম রয়েছে— হাসপাতালে কেউ অপেক্ষা করছে, ভেতরে রোগী। আপাতভাবে সংলাপ পড়লে ঘটনার গতিপ্রকৃতি খুব স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু যত গল্পটা শেষের দিকে যায়, তত বোঝা যায় যে গল্পটার মধ্যে এই কনশাস এবং সাবকনশাসের একটা ব্যাপার রয়েছে।   

দিব্যেন্দু পালিত:  বুঝতে পেরেছি কোন গল্পটার কথা বলছ। এই গল্পটা লেখার পর এবং এখন যে তুমি বলছ— এখনও আমার একটা দৃশ্য মনে পড়ছে। উডল্যান্ডস নার্সিংহোমের বাইরে যে সিঁড়ি, সেখানকার গেস্টরুমটা— এইসব রয়েছে লেখাটাতে। একজন ডিভোর্সি মহিলাকে নিয়ে বোধহয় লেখা।

অরিন্দম বসু: একটা কথা এ প্রসঙ্গে মনে এল। আমি জানি না এটা কেন আপনি করেছেন বা ঘটিয়েছেন, বারবারই ঘুরেফিরে কারও না কারও মৃত্যু আসে।

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ, কেন জানি না, মৃত্যু সব সময়ই একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে। এটা আমার কাছেও খুব ক্লিয়ার নয়।

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়:  প্রথম দিকে যেমন আপনার কবিতা সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন যে বড় বেশি যৌনতা— সেই যৌনতা কিন্তু যত দিন গেছে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এবং কবিতা ন্যারেটিভ হয়েছে বেশি। যেমন ‘সিঁড়ি’ কবিতাটা [রজতেন্দ্রর পাঠ]।  আমার মনে হয়েছে কবিতাটা আরও আগে— ‘উঠে আসে সিঁড়ি’-তে শেষ হত।

দিব্যেন্দু পালিত:  তোমার ধারণা ভুল নয়। হতে পারে। এরকম অন্য অনেক কবির লেখা পড়েও আমার মনে হয় লেখাটা আগেই শেষ হয়ে গেছে।

অমর মিত্র:  আপনি তো নাটক, সিনেমা নিয়েও অনেক কিছু লিখেছেন। থিয়েটার করা লোকদের জন্য আপনি বড় একজন অবলম্বন ছিলেন।   

অরিন্দম বসু:  গ্রুপ থিয়েটার নিয়ে লিখতে গিয়ে মৃণাল সেনের কথা সরাসরি লিখেছেন।

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়:  এখন যারা নাটক করছেন, অভিনয় করছেন— তাদের মধ্যে কারও অভিনয় আপনার ভালো লাগে?

দিব্যেন্দু পালিত:  ওই ছেলেটি ভালো— দেবশংকর হালদার। কৌশিক সবচেয়ে প্রমিসিং ছিল একটা সময় অবধি। এখন আর করে না। সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও খুব ভালো অভিনেতা।  

অরিন্দম বসু:  একটু আগে সম্পাদকদের কথা উঠেছিল যখন আপনি বলেছিলেন, একজন ভালো সম্পাদক লেখককে প্রশ্রয় দেন। আপনিও তো বেশ কিছুটা সময় সম্পাদনা করেছেন। সেই সময়টাতে নতুন লেখকদের আগ্রহ, ইচ্ছে বা তাদের জোর কীভাবে সম্পাদক হিসেবে অনুভব করেছেন?

দিব্যেন্দু পালিত: বরং দৃষ্টান্ত দিই একটা। আমি যখন স্টেটসম্যান থেকে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়র সম্পাদক হয়ে এলাম, আমার কাছে তখন একটা সমস্যা ছিল যে কীভাবে লেখক পাব। এখন রবিশংকর বল ভালো লেখে এবং অনেক পুরস্কারও পেয়েছে। সেই সময় যাদের লেখা আমি পছন্দ করেছিলাম তাদের মধ্যে রবিশংকর একজন। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে তাকে তুলে ধরব। দু’বছরে বাইশটি লেখা লিখিয়েছিলাম ওকে দিয়ে। সুমন চট্টোপাধ্যায় সে সময় আনন্দবাজারে কাজ করে, সে একবার কলকাতায় এসে আমার বাড়িতে বসে জিজ্ঞাসা করল, কে এই ছেলেটি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, লেখে কেমন। সে বলল, লেখে তো খুব ভালো, নইলে কি বাড়ি বয়ে এসে বলি। এ দেখবেন অনেক দূর যাবে। সুতরাং রবিকে যে আমি যোগ্য লেখক মনে করেছিলাম তা খুব ভুল হয়নি। সম্পাদক হতে হলে গ্রহণক্ষমতা থাকতে হয়। গ্রহণক্ষমতা না থাকলে ভালো সম্পাদক হওয়া যায় না।

অমর মিত্র: এখন কি লিখছেন সেইভাবে?

দিব্যেন্দু পালিত:  না, চেষ্টা করি। কিন্তু আমার চোখের বেশ সমস্যা হচ্ছে।

অমর মিত্র:  আচ্ছা। আমাদের সন্ধেটা খুব ভালো কাটল। অসাধারণ কাটল।

দিব্যেন্দু পালিত:  তোমাদের সঙ্গে কথা বলেও খুব ভালো লাগল আমার। এই লেখাটা বেরোবে?

অমর মিত্র: হ্যাঁ, আমাদের অনলাইন ম্যাগাজিনে বেরোবে। ওটা আমি আমার ছোট ল্যাপটপটা নিয়ে এসে দেখিয়ে দিয়ে যাব।

অরিন্দম বসু:  প্রিন্ট আউট দিলে হয়।

অমর মিত্র: সে তো হয়ই। দেওয়াই যাবে। কিন্তু অনলাইন কেমন লাগছে, সেটাও একটু দেখালে ভালো হয়। আমরা যে অনলাইন ম্যাগাজিনটা করছি, বুকপকেট— এটা একটা আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন। আমার যে দু’জন সহ-সম্পাদক তাদের একজন থাকেন মুম্বাইতে, একজন নাগপুরে। যে মেয়েটি ডিজাইন করেছে সে থাকে লন্ডনে। টেকনিক্যাল দিকটি যে দেখে সে থাকে কলকাতায়। নানা ধরনের লেখা নিয়ে আমরা ম্যাগাজিনটা করছি। প্রথম পাতায় আপনার সাক্ষাৎকার থাকবে এবং আপনার একটা গল্পও রিপ্রিন্ট করব।

দিব্যেন্দু পালিত:  খুব ভালো। আরও বাড়ানো যায় কীভাবে দ্যাখো। আমার সাহায্যের দরকার হলে বোলো।

অরিন্দম বসু:  আপনার চোখের খুব সমস্যা চলছে?

দিব্যেন্দু পালিত:  হ্যাঁ, কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেলে যা হয়। চিকিৎসা চলছে। দেখি কী হয়।

অমর মিত্র: আমরা উঠি এবার তাহলে। আপনি ভাল থাকুন।

সাক্ষাৎকারটি ইতিপূর্বে সাহিত্যিক অমর মিত্র সম্পাদিত অধুনালুপ্ত ওয়েব ম্যাগাজিন Bookপকেট -এ প্রকাশিত।