অরিন্দম বসু

কলকাতায় সন্ধে পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। এখনও কিছু রাস্তায় গ্যাসের বাতি জ্বললেও বেশিরভাগ রাস্তাতেই ইলেকট্রিকের আলো ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট কড়েয়া বাজার এলাকা জুড়ে পাঁচটা রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে অনেকদিন হল। নিউ পার্ক স্ট্রিট আর পার্ক সার্কাস ট্রামডিপোর মোড় থেকে বালিগঞ্জ স্টোর পর্যন্ত রাস্তায় তেমনই আলো। চওড়া রাস্তার দু’পাশে বড় বড় গাছ। অনেক বাড়ির হাতায় বাগানও আছে। সেই সৈয়দ আমির আলি অ্যাভিনিউ ধরে হেঁটে এসে আঠাশ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন একজন। পরনের ধুতি-পাঞ্জাবি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হলদেটে দেখালেও আসলে তা সাদা। মাথায় কাপড়ের উঁচু টুপি। তার নীচে দিয়ে ঠাসা বাবরি চুল ঘাড়ের অনেকটা অবধি নেমে এসেছে। চোখে গোল ফ্রেমের একখানি চশমা। পায়ে তালতলার চটি। তিনি বাড়িটার সদর দরজায় হাত রাখতেই তার একটা পাল্লা আপনাআপনি খুলে গেল। একটু যেন অবাক হলেন মানুষটি। অবশ্য রাত ন’টায় খোলা থাকতেই পারে। রাস্তায় লোকজনের যাওয়া-আসাও তো রয়েছে। আশেপাশের কয়েকটা দোকানঘর বন্ধ। কিছু খোলা। আসার পথে ভাতের হোটেল আর চাপাতি ও গোশতের হোটেলও খোলা দেখেছেন। তিনি ঢুকে পড়লেন বাড়ির ভেতরে।

সামনের একফালি লম্বাটে জায়গাটা অন্ধকার। সেটা পেরিয়ে আর একটা খোলা দরজার সামনে দাঁড়ালেন তিনি। বাহারি পর্দায় সুতোর নকশা। তার ওপারে আলো জ্বলছে ঘরের ভেতরে। সেখানে কাঠের লম্বা সোফায় গদিতে বসে একজন ঝুঁকে রয়েছেন একটা বইয়ের ওপর। স্বাস্থ্য বেশ ভাল। চওড়া কাঁধ। মুখে লালচে আভা। পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তাকে দেখে তিনি গলা তুলে বলে উঠলেন, ‘এই তো, নজরুল এসে গেছে। মোতাহেরা, কোথায় গেলে, নজরুল এসেছে।’

নজরুল ইসলামের শ্যামবর্ণ ভরাট মুখে হাসি। তিনি বললেন, ‘অত ব্যস্ত হয়ে ডাকাডাকির কী আছে ইউসুফ? তোর বাড়িতে আমি  কি আসিনি আগে!’

ইউসুফও হেসে উঠলেন। ‘এসেছিস তো। নলছিটি থেকে আমি বদলি হয়ে কলকাতায় এলাম— তাই তো দেখা হল। প্র‌ায় আঠেরো-উনিশ বছর পর। তবে মাত্র এক বছর হল এসেছি। তার মধ্যে এলিই বা ক’বার! আমার বন্ধু— যার কবিতা লোকের মুখে মুখে ফেরে, যার বই ঘরে ঘরে পড়া হয়, যার গান সাধারণ মানুষও গায় আবার সিনেমার নায়ক-নায়িকারাও গায়— তার জন্য হাঁকডাক করব না!’

নজরুল সোফায় বসে পড়েছিলেন। এই ঘরের বাঁপাশে যে ঘর সেখানেও পর্দা। এরমধ্যেই সেই পর্দা সরিয়ে ঢুকে এলেন এক মহিলা। মাঝারি চেহারা। সাধারণ শাড়ি গায়ে জড়ানো। ঘোমটা মাথায় তুলেছেন, তবে পুরোটা নয়। তাকে দেখে নজরুলের মুখে আবার হাসি ভেসে উঠল।

‘ভাইয়া, এত দেরি করে এলেন!’

নজরুল তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে। এখন যিনি বাংলার প্র‌ধানমন্ত্রী সেই আবুল কাশেম ফজলুল হকের ছোট ভাগ্নে ইউসুফ আলি। হকসাহেব যখন দৈনিক নবযুগ কাগজ বের করতেন তখন মুজফফর আহমেদ ছিলেন তার এডিটর আর নজরুল ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর। সেটা উনিশশো কুড়ি হবে। সেই সময় দু’জনে একবার বরিশালের নলছিটিতে গেছিলেন ইউসুফের কাছে। তখন ইউসুফ সবে এই মোতাহেরা বানুকে বিয়ে করেছে। এখন তাদের তিন মেয়ে। সবাইকে নিয়ে ইউসুফ কলকাতায় এই ভাড়াবাড়িতে। সে ছিল সাব রেজিস্ট্রার। পরে অ্যাসেসরের পোস্ট পেয়েছে। শোনা যায় সে ব্যাপারে ফজলুল হকের কিছু বিশেষ উদ্যোগ ছিল। লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে এ নিয়ে কথাও শুনতে হয়েছিল হকসাহেবকে। তবে তাঁকে দমানো কঠিন। এই কাছেই ঝাউতলা রোডে তাঁর বাড়ি। ক্যাবিনেটের কাজ সেরে ফেরার পথে মাঝেমধ্যে তিনি এ বাড়িতে চলেও আসেন।

নজরুল বললেন, ‘হ্যাঁ, একটু দেরি হয়ে গেল। তোমাদের অসুবিধা হল, না?’

‘না না।’ যেন ভুল করে বলে ফেলেছেন এমন গলা মোতাহেরার। ‘আপনি এলে তো মেয়েগুলো খুশি হয়। আমাদের গোটা বাড়িটাই খুশি হয়ে ওঠে। তা ছাড়া আপনার কবিতা, গান— সে শোনার লোভও তো কম নয়।’

‘তা হলে তো তোমার কবিতা আর গানের কথাও বলতে হয় মোতাহেরা। তোমার সেই যে বই— কাফেলা। আহা! কী অপূর্ব সব কবিতা আছে তাতে। সাধের যামিনী পোহাল তাহার/ না কহিতে দুটি কথা/ডুবিল চাঁদিমা অমার সাগরে/জাগিয়া রহিল ব্যথা। চন্দ্রমার বদলে তুমি কেমন চাঁদিমা কথাটা ব্যবহার করেছিলে।’

মোতাহেরা বানু চোখ নামিয়ে নিলেন। ‘অমন বলবেন না। আপনার মুখ থেকে আমার কবিতার প্র‌শংসা শুনতে লজ্জা করে।’

মাথা নাড়লেন নজরুল। ‘তা বললে তো হয় না বোন। ভাল যদি বলার থাকে তা মন খুলেই বলতে হয়। এ তো সাহিত্য। অন্য লেখকের লেখা ভাল লাগলে তা যদি আরেকজন না বলেন তা হলে তাকে সাহিত্যিক বলা চলে না। তোমার গানের কথাও না বলে উপায় নেই। তুমি করগো আমায় বধির তোমার/অধীর বাঁশরী বাজায়ে/এসো হৃদি কদম্বে শিহরণ তুলি হিয়ার যমুনা নাচায়ে। কে. মল্লিক তোমার এ গান রেকর্ড করেছেন। সে আমি শুনেছি। মুসলমান মেয়েদের মধ্যে প্র‌থম তোমার গানই তো রেকর্ড হয়েছে। তবে তোমার কবিতা যখন গান হল তখন যিনি গাইলেন তিনি হিন্দু, আবার লেখার সময় তোমার তো মনে হয়নি যে তুমি মুসলমানের মতো লিখছ। শিল্প-সাহিত্যে এসব চলে না। তাই বা বলি কেন, জীবনের কোথাও এসব নিয়ে আসা ঠিক নয়।’

মোতাহেরা বললেন, ‘আমার বাবা সৈয়দ সাজ্জাদ মোজফফর তো স্কুলে পড়াতেন। ফারসি, উর্দু ইংরেজি জানতেন। কুঞ্জবিহারী মুখোপাধ্যায়ের টোলে সংস্কৃতও শিখেছিলেন। বাবার কাছ থেকে আমিও ফারসি, সংস্কৃত, বাংলা শিখেছি। আমি ছোটবেলায় বরিশালের বামনায় থাকতাম নানাসাহেব মির সারওয়ারজানের বাড়িতে। সেখানে বসুমতী, প্র‌বাসী, মুসলমানহিতৈষী আসত। সব পড়তাম। আমার মা-দিদিমারা স্কুলে না পড়লেও ফারসি, আরবি জানতেন। আমি তো রামায়ণ, মহাভারত পড়েছি। যোগীন্দ্রনাথ, দক্ষিণারঞ্জন, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের লেখাও পড়েছি।’

নজরুল সোফায় পিঠ সোজা করে বসলেন। ‘পড়তে তো হবেই। না হলে জানব কী করে, বুঝব কী করে— আমার দেশ কেমন! এইসব মিলিয়েই তো এই দেশ আমার।’

এবার মোতাহেরা বললেন, ‘বউদি কেমন আছেন এখন?’

তার এই কথায় যেন নজরুলের চোখ নিভে এল কিছুটা। খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর একটা বড় শ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে। বললেন, ‘প্র‌মীলা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। দু’বছর হয়ে গেল। সেই যে পক্ষাঘাত হল, আর সারল না। নীচের দিকটা অসাড় হয়েই রইল। চিকিৎসা আমার সাধ্যমতো যা করার করিয়েছি। এখন হোমিয়োপ্যাথিতে এসে পৌঁছেছে। আমাদের তো তক্তপোশ নেই কোনও। মেঝেয় তোশক পাতা। সে সেখানেই আধশোয়া হয়ে সবজি কাটে। দুই ছেলের জামায় বোতাম লাগায়, চুল আঁচড়ে দেয়। এমনকি চা-ও করে ওভাবেই। সানি আর নিনি মিলে মায়ের হাতের কাছে সব গুছিয়ে দেয়। তোমরা তো জান, প্র‌মীলার মা আমাদের সঙ্গেই থাকেন। বাকি সময় ঘরের কাজ তিনিই করেন। কখনও বাজারও করে আনেন।’

বলতে বলতে থেমে গেলেন নজরুল। ইউসুফ ও মোতাহেরাও কিছু বলতে পারছিলেন না। ঠিক এই সময় পাশের ঘর থেকে তিনটি মেয়ে এসে এ ঘরে ঢুকতেই নজরুলের চোখে আলো ফিরে এল। ইউসুফ আর মোতাহেরার এই তিন মেয়ে। বড়টি তসকিনা বানু। ডাকনাম লিলি। মেজো তহমিনা— তাকে ছবি বলে ডাকা হয়। দুজনেই কিশোরী। সবে শাড়ি ধরেছে। একেবারে ছোটটি নাসিমা— বুলু। সাখোয়াত মেমোরিয়ালে ক্লাস ফোরে পড়ে। সাখোয়াতে মুসলিম মেয়েরাই পড়ে শুধু। বাস আছে। তার সমস্ত জানলা পর্দা দিয়ে ঢাকা। বাসে উঠতে হয় বোরখা পড়ে।

তসকিনা আর তহমিনা নজরুলের কদমবুসি করল। নাসিমা তাদের পিছনে। নজরুল তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই সে ছুটে এসে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্র‌ায়। নজরুল তাকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল রাখলেন। এ মেয়ে খুব চঞ্চল। তিনি বলেন বেদুইন মেয়ে।

নাসিমা তার কানে কানে কিছু বলতে চাইছিল। মাথা ঝুঁকিয়ে মন দিয়ে শুনলেন নজরুল। তারপর বললেন, ‘সে কী! কী করে উড়ে গেল?’

নাসিমা বলল, ‘কী করে জানব! কেউ দরজাটা খোলা রেখেছিল মনে হয়।’ বলতে বলতে আড়চোখে তাকাল তার দুই দিদির দিকে। তারা হেসে ফেলল। হেসে উঠলেন মোতাহেরাও। নাসিমা একটা ময়না পুষেছিল। উড়ে গেছে সেটা। সেকথাই সে বলছিল তাহলে ভাইয়াকে।

নজরুল বললেন, ‘তোমার কি মনখারাপ?’

মাথা ওপর-নীচে করল একবার নাসিমা।

‘মনখারাপ কোরো না। পাখিকে খাঁচায় রাখতে নেই। তার জন্য তো চিরকালের অনন্ত আকাশ রয়েছে। সেখানেই তার মুক্তি। তাকে উড়তে দিতে হয়।’

নাসিমা হাঁ করে তার কথা শুনছিল। কিছুটা যেন থমকে গেছে ঘরের পরিবেশ। এসময় নাসিমাই বলে উঠল, ‘তুমি আজ গান শোনাবে না?’

হেসে ফেললেন সকলে। নজরুলও হাসতে হাসতেই বললেন, ‘শোনাব না আবার! তোমার মতো এমন কদরদান আমি কোথায় পাব আর!’

মোতাহেরা বললেন, ‘ভাইয়া, আপনি কিন্তু আজ খেয়ে যাবেন এখানে।’

তার দিকে তাকালেন নজরুল। ‘আবার! তোমাদের এখানে এসে তো খেয়েই যেতে হয় বোন।’

‘তাই তো হবে। বোনের বাড়ি থেকে না খেয়ে যেতে হয় নাকি!’

‘আজ করেছ কী?’

‘মাংসের কোপ্তা।’

‘বাঃ, এর আগে এসে খেয়েছিলাম— সে তো দিনেরবেলায়— সেই কলাপাতায় মুড়ে ভাপে নারকেল চিংড়ি। এখনও ভুলিনি।’

এমন সব বলতে গিয়ে নজরুলের মনে পড়ে গেল বাড়ির কথা। দুই ছেলে, প্র‌মীলা, তার মা গিরিবালা দেবীর কথা। কতদিন যে ভালোমন্দ রান্না হয় না বাড়িতে। এদের সেসব বলা যায় না। কাউকেই বলা যাবে না। দুঃখ যত নিজের মধ্যে থাকে ততই ভালো। পরে তা কাব্য হবে, গান হয়ে উঠবে। গল্পে জেগে থাকবে হয়তো।

মোতাহেরা তার মেয়েদের বললেন, ‘তোমরা এখন একটু ও ঘরে যাও। গানের সময় ডাকব ঠিক।’ তারপর তিনি নজরুলের দিকে ফিরে তাকালেন। ‘রান্না তো হয়েই আছে। আপনাদের দিয়ে দেব এখন? খেতে খেতে না হয় কথা বলতে পারবেন।’

‘দিয়ে দাও। রাত বাড়ছে তো। ওকে বাড়ি যেতে হবে না!’

মোতাহেরাকে ইউসুফ একথা বলতেই তিনি উঠে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। তখন তিনি নজরুলকে বললেন, ‘মুজফফরের খবর কিছু জানিস?’

‘সে তো সব জেলই ঘুরে নিল প্র‌ায়। বক্সারে ছিল। তরপর গোরখপুরে, দমদম সেন্ট্রাল জেলে। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার আসামি। তাকে অত সহজে ছাড়ে! তবে শুনছি ছাড়া পেতে পারে। পেলে দেখা করতে আসবে নিশ্চয়ই।’

‘মুজফফর কী করতে চেয়েছিল বল তো?’

নজরুল ইউসুফের দিকে না তাকিয়ে বললেন, ‘আমি আর ও একসময় ভেবেছিলাম এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলব। দু’জনেই তখন কিন্তু কংগ্রে‌সে। সুভাষচন্দ্র বর্মার মান্দালয় জেলে। কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্র‌াদেশিক কংগ্রে‌সের সম্মেলন— সেখানে গাইলাম দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে…। তারপর দেশবন্ধুর হিন্দু-মুসলমান প্যাক্ট ভেঙে গেল। গান্ধীজির স্বরাজও এল না। দেশের নানা জায়গায় ছোটখাটো দাঙ্গা লাগল। কলকাতাতেও তো হয়েছিল। আমাদের কাণ্ডজ্ঞান চলে গেছে ইউসুফ।’

‘দ্যাখ নজরুল, আমি খাঁটি মুসলমান, যাকে বলে রিলিজিয়াস। আমি মনে করি একজন মুসলমানকে খাঁটিই হতে হবে। তেমন কোনও হিন্দুও নিশ্চয়ই মনে করেন। এই হিন্দু-মুসলমানকে মেলানো খুব কঠিন কাজ। যে রাস্তা দিয়ে তুই হেঁটে এখানে এলি— সৈয়দ আমির আলির নামে এই যে রাস্তা— পথটুকুই আছে শুধু। তিনি যে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের সমর্থক ছিলেন তা কি মনে রেখেছে কেউ?’

নজরুল আনমনাভাবে বললেন, ‘বিশ্বযুদ্ধের পর করাচি থেকে ডাইরেক্ট এসে উঠেছিলাম বত্রিশ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে। উনিশ-কুড়ি বছর তো হয়েই গেল বোধহয়। মুজফফর আহমেদের ডাকেই এসেছিলাম। তখন সেখানে মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিস। সে ছিল সমিতির অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন সমিতির ক্লার্ক। কে না আসতেন! মোহিতলাল, কালিদাস রায়, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, শৈলজানন্দ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আফজালুল হক— আরও কতজন। আমাদের তো মেলামেশায় কোনও অসুবিধা হয়নি। সাহিত্যই ছিল বাঁধন। তার আগে থেকেই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা আর সওগাতে লিখেছি আমি। গল্প, কবিতা, প্র‌বন্ধ। সওগাতে বাউণ্ডেলের আত্মকথা লিখেছিলাম হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম নামে, সেই করাচি থেকে। তখন আমি সৈনিকই ভাবতাম নিজেকে। কিন্তু সৈনিকই হই আর সাহিত্যিক— কিছু করতে পারলাম কই!’

ইউসুফ বললেন, ‘একটা বিশ্বযুদ্ধ গিয়ে আর একটা এসে পড়ল। কোথায় যুদ্ধ হবে আর আমাদের এখানে সাধারণ মানুষের দুর্দশায়  পড়বে।’

‘আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ চিরকাল দুর্দশাতেই কাটিয়েছে ইউসুফ। সে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক। কংগ্রে‌স, মুসলিম লিগ, কৃষক প্র‌জা পার্টি, বিপ্লবীরাও রয়েছেন আর একদিকে। অথচ কী হলে যে দেশটা স্বাধীন হবে তা বোঝাই যাচ্ছে না। ব্রিটিশরা বোধহয় এমনই চেয়েছিল। দেখিস, রাজনীতি আর ধর্মের চাপে দেশটা পিষে যাবে একদিন। বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী। আমরা কী নিয়ে ভাবব বলতে পারিস?’

‘তোদের যা ভাবার। লেখা, সাহিত্য, গান—।’

ইউসুফ আলির এ কথায় নজরুল বললেন, ‘নিজভূমে পরবাসী হয়ে তা ভাবা যায়?’

দুই

এ ঘরের মেঝেয় ফরাস পাতা। সেখানে বসে হারমোনিয়াম একেবারে বাঁ হাঁটুর প্র‌ায় ওপরে তুলে নিয়েছেন নজরুল। তাকে ঘিরে বসেছে তিনটি মেয়ে। কিছুটা দূরে মোতাহেরা। ইউসুফও রয়েছেন পাশে। ছোট একটা গানের আসর। মোতাহেরা জানেন এ সময়টা নজরুলের খুব প্রি‌য়। তিনি যেন গানের জন্যই আসেন। আগেও হয়েছে। একের পর এক গান গেয়েছেন। তখন তাকে সবচেয়ে ঝরঝরে লাগে। তবে আজ কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটু আগেই গেয়েছেন— কত জনম যাবে তোমার বিরহে…স্মৃতির জ্বালা পরান দহে…। এখন গাইছেন—

নিরুদ্দেশের পথে আমি হারিয়ে যদি যাই

নিত্য নতুন রূপে আবার আসব…

আসব এই হেথাই…

গান শেষ করে হারমোনিয়ামের বেলো থামিয়ে রিডের ওপর হাত চেপে ধরলেন নজরুল। ভারী শ্বাস হয়তো মিশে গেল এ ঘরের হাওয়ায়। বললেন, ‘সব দুঃখের গান হয়ে যাচ্ছে, না? আচ্ছা, এবার একটা ঝুমুর গাই।’ বলেই ধরে নিলেন—

এই রাঙামাটির পথে লো

মাদল বাজে…বাজে বাঁশের বাঁশি

বাঁশি বাজে বুকের মাঝে লো

মন লাগে না কাজে লো…

নজরুলের ঠোঁটের কোণে হাসি। যেন খুশিতে হারমোনিয়াম ছেড়ে দিয়ে হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘তোরা ঝুমুর নাচ, ঝুমুর নাচ নাচ রে!’

দোলা লাগে শাল পিয়াল বনে

নোটন খোঁপার ফুলে লো

মহুয়া বনে লুটিয়ে পড়ে

মাতাল চাঁদের হাসি লো

মাদল বাজে বাজে বাঁশের বাঁশি…

তসকিনা আর তহমিনা চুপ করেই বসে ছিল। নাসিমা কিন্তু ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করেছে। নজরুলের চোখ ঝলমল করে উঠল। হারমোনিয়ামের রিডে তার আঙুল ঘুরছিল। তার ফাঁকেই তিনি ইউসুফের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই বেদুইন মেয়েটাকে তোরা কোথা থেকে পেলি!’

গান শেষ হতেই ঝুপ করে বসে পড়ল নাসিমা। একটুও হাঁপায়নি সে। বরং বলে বসল, ‘আর হবে না গান?’

তার বাবা পাশ থেকে বললেন, ‘আজ আর নয়। এবার যেতে দাও। অনেক রাত হয়ে গেছে।’

কথাটা শুনেই নাসিমা লাফ দিয়ে দাঁড়াল। তারপর দৌড়ে গিয়ে নজরুলের দু’কাঁধের পাশ দিয়ে হাত ঝুলিয়ে পিঠের ওপর উঠে পড়তে চাইছিল সে। ‘না না, তুমি যাবে না। যেতে দেব না তোমায়।’

নজরুল ঝুঁকে পড়েছেন হারমোনিয়ামের দিকে। তিনিও দু’হাত দিয়ে নাসিমার হাত চেপে ধরলেন। ‘ওরে ছাড় ছাড়। আর একদিন আসব। সেদিন আবার হবে।’

ইউসুফ এবার গলাটা গম্ভীর করেই ছোটমেয়েকে বললেন, ‘বুলু, ছেড়ে দাও। সরে এসো।’

একটু পরেই বাড়ির দরজা খুলে গেল। ইউসুফ আলি সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন। নজরুল তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন একবার। তারপর পা বাড়িয়ে দিলেন রাস্তায়।

চারপাশ এখন একদম নিঝুম হয়ে এসেছে। সমস্ত দোকানপাট বন্ধ। অনেক বাড়ির আলো নিভে গেছে। কয়েকটিতে জ্বলছে। হাঁটতে হাঁটতে নজরুল বুঝতে পারছিলেন আশেপাশের গাছে পাখিরা কিচিরমিচির করছে। মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার সময় এখন। হয়তো ওদেরও। তার আগে নিজেদের ভেতরে কথা বলছে। ওদের দেশে কত ভাল আছে ওরা।

ট্রাম লাইনের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন নজরুল। পকেটে হাত দিয়ে তামার পয়সাগুলো বের করে দেখলেন একবার। যাবেন এন্টালি বাজারের কাছাকাছি পানবাগান লেনের বাড়িতে। দু’পয়সা ভাড়া ট্রামের। তা দিয়ে দেওয়ার পর আর অল্প কিছুই থাকবে। কাল কী হবে কে জানে। ভাবতে গিয়ে অস্থির লাগে। একসময় কত গান লিখেছেন। ভজন, গজল, শ্যামাসংগীত, ইসলামি গান। সংসার চালাতে গিয়ে দেনা হয়েছে অনেক। প্র‌মীলার অসুখের জন্য আরও হয়েছে। পাওনাদার সামলাতে সাঁইত্রিশটা বই আর সব গান সলিসিটার অসীমকৃষ্ণ দত্তর কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছেন। সঞ্চিতা আর অগ্নিবীণার কপিরাইট বিক্রি করে দিয়েছেন ডি এম লাইব্রেরির কাছে। স্কুলের ফিজ দিতে না পারায় ছেলেদুটোর নাম কাটা পড়েছে। কিছুতেই তো কিছু হল না।

খানিক আগে ইউসুফের কাছে যে প্র‌শ্ন করেছিলেন সেটাই আবার ভেসে এল মনে। একজন শিল্পী কী নিয়ে ভাববেন? এই যে তিনি খেয়েদেয়ে, গান গেয়ে বেরিয়ে এলেন। এ কি আত্মসুখ নয়? কবি কি নিজের সংসারের কথা ভাববেন? নাম-যশের কথা ভাববেন লেখক? সাহিত্যের কথা? না কি দেশের কথা? সারা পৃথিবী উথালপাথাল হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ আর দখলদারিই যেন তার ভবিতব্য। আর এ পোড়া দেশের কপালে শুধুই ভেদ-বিভেদ। সওগাত ভেবেছিল বুদ্ধির মুক্তি, নারীর স্বাধীনতা, দেশের আজাদি। নিজের দেশের ভেতরেই শিল্পীর কথা শোনে কে?

গলার কাছটায় কী যেন শক্ত জমাট হয়ে রয়েছে। এত কথা যে কাউকে বলার নেই। হয়তো এসব গভীর অসুখ হয়ে বাসা বাঁধছে মাথায়।

নিস্তব্ধ শহরে অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে ট্রামের ঘড় ঘড় শব্দ। রাস্তার আলোগুলো কি ঢিমে হয়ে এল? কেউ কোথাও নেই। নজরুল দাঁড়িয়ে রইলেন একা।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ