মৃত্তিকা মাইতি

রোদ মুড়ি দিয়ে রাস্তায় বসে অমূল্য দাস। মাঘের শীত কিছুতেই শরীর ছাড়ছে না। সকালে পান্তা খাওয়ার পর যেন আরও জাঁকিয়ে ধরেছে।

একটু আগে দাওয়ায় গড়িয়ে নিচ্ছিল। ছেলে সুভাষ কাজে বেরিয়েছে। বউমা ঘর-গেরস্থিতে। অমূল্য শুয়ে থাকতে পারল না। মনের অস্থিরতা ঠেলে তুলে এনেছে তাকে। না জানি মেলার কত মানুষ সব ফিরে যাচ্ছে। তাই বেরিয়ে এসেছিল। ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ভুরুজোড়ার ওপরে ডান হাতের আঙুলগুলো ছাউনি মতো করে উত্তর-দক্ষিণের কোণ বরাবর দেখার চেষ্টা করল। কাউকেই ঠাওর করতে পারল না। দাওয়ার পাশে রাখা লাঠিটাতে ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। খালপাড়ে গিয়ে বাঁশের পুলটার কাছে বসলে দক্ষিণ পাড়ের মানুষগুলোর যাতায়াত দেখতে পাবে। বাসি মেলায় তারা কী জিনিস কিনল, কে কতয় পেল, তাও জানা হবে।

যেদিন থেকে অমূল্য হাঁটুর জোর হারিয়েছে, ছেলেকে সে বেস্তো-মিনতি করে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে বলেছিল, ‘তুমি চলতে পারনি, তোমাকে বইবে কে?’ তারও আগে একবার অমূল্য বলেছিল, ‘মেলা থেকে কিছু বেতের জিনিস কিনিস।’ তাও হয়নি। বাপ-ঠাকুদ্দার আমল থেকে দেখে আসছে বাসি মেলার জিনিস কেনা। ওসব ঘরে থাকা তো দেখানোর মতো ব্যাপার।

অমূল্য মায়ের মুখে গল্প শুনেছিল, একবার তার মা আর বাবা গিয়েছিল মহিষাদলে রথ দেখতে। সেখান থেকে একটা ধামা এনেছিল। অমূল্য বড় হয়ে দেখেছে গ্র‌ামের লোক এসে তাদের ওই ধামা দেখত আর তার দাম জানতে চাইত। কিন্তু ছেলে-বউমার এসবে আনন্দ নেই। কিসে যে তাদের আনন্দ আর কিসে নয়, আজও বুঝতে পারে না অমূল্য। তারা মেলায় যায়, ঘোরে, খায়দায়, চলে আসে। কিছু যদি কেনেও, অমূল্যকে জানানোর প্রয়োজন নেই তাদের।  

সংসার সংসার করে সারাটা জীবন ঘরকুনোই থেকে গেল অমূল্য। আজ অবধি কোনওদিন বাসে চেপে কোথাও যায়নি সে। তার অবশ্য একটা কারণ আছে। ছোটবেলায় একবার কার সঙ্গে যেন বাসে চড়ে কোথায় যাচ্ছিল। জানলা দিয়ে বাইরে দেখেই জান উড়ে গিয়েছে। গাছগুলো পাঁই পাঁই করে ছুটছে দেখে সহ্য করতে পারেনি। ভয়ে হাত-পা নেতিয়ে গেছিল। অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়।

সেই থেকে সে যেখানেই যায়, পায়ে হেঁটে। কাজের জন্যও দূরে কোথাও যেতে পারেনি। নিজের গ্র‌ামে আর আশপাশের চাষে, ধানকাটায় লেগে থাকত। বাকি সময় মাছ ধরার জাল বোনা নয়তো লোকের ঘর ছাওয়ার কাজ। কত লোকের ঘর সারিয়েছে। আজ তার নিজের ঘরে উই। বাঁশের খুঁটিতে, শিরীষের কড়িকাঠে। ছেলে বলেছে, ‘পুরনা ঘর আর রাখবানি।’ সে আবাস যোজনার পাকার ঘরের তালে রয়েছে।

ধুতি সামলে মাঠে নেমে পড়ল অমূল্য। মেলার এই পাঁচটা দিন এত মানুষ যাওয়া-আসা করে যে পায়ের চাপ পড়ে পড়ে মাঠের মাঝ বরাবর সিঁথি তৈরি হয়ে যায়। মেয়েরা মাথার মাঝখানে যেরকম কাটে, সেই। প্র‌তি বছরের মতো এ বছরও পড়েছে। সেই শুঁড়া পথ ধরেই এগিয়ে যেতে লাগল সে। ছোটবেলায় এই ধুলোমাখা পথের ওপর ছুটতে কত আনন্দ হত। আজও সেই একই আনন্দ যেন বুকের ভেতর থেকে উঠে আসছে।

একদল মানুষ ফিরছে কথা বলতে বলতে। কতগুলো বাচ্চা বেলুন হাতে আগে আগে লাফাচ্ছে। বউমানুষগুলো পেটের কাছে ওগুলো কী জাপটে ধরে আছে তা বুঝতে পারল না অমূল্য। তবে একজনের হাতে কলসি আর লোকটার মাথায় হোগলার একটা চাটাই। এগিয়ে যাচ্ছিল তারা। অমূল্য আর থাকতে পারল না। ডাক দিল– ‘ও দাসেরে পো… চাটাইটা কত পড়লা গো?’

লোকটা উত্তর দিল, ‘এ, দেড়শোয় পাইলি গো।’

যেন আঁতকে উঠল অমূল্য। ‘অ্যাঁ! ওর দর অ্যাত হছ্যা? এই তো কিছুদিন আগেও পঞ্চাশ-ষাটে কিনছি বো।’

‘সে তাহালে অনেক বছর আগের কথা দাদু। তখন তুমানকের কাজের মজুরিও কম থ্যালা। সারাদিনের খাটনির পর সত্তর-আশি হাতে আসত। আর এখন তিনশো-সাড়ে তিনশো। জিনিসেরও দাম বাড়া।’

অত কথা শোনার পরেও অমূল্যর কৌতূহল যায়নি। বলল, ‘এ বছর মেলায় আর কী কী বুসছে?’

যতক্ষণ অমূল্যর কথা শুনতে পাচ্ছে, উত্তর দিচ্ছে লোকটা। ‘প্র‌তি বছর যা যা বুসে। এ বছর আরও কিছু নতুন নতুনও উঠছে। কত সব বিদেশি জিনিস। সেদিকেই মানুষের ঝোঁক…’

শেষের কথাগুলো আর শুনতে পেল না অমূল্য। একে ওরা দাঁড়ায়নি তার ওপর কথাগুলো হাওয়ায় টেনে নিয়ে গেল উলটো দিকে।

দাঁড়িয়ে পড়ে শুনছিল অমূল্য। এবার সেও চলতে শুরু করল। মেলা একই আছে, শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আর জিনিসের মূল্য বদলে গিয়েছে।

তুফানগাজির মেলা হয় পাঁচ দিনের। শেষের দিন ভাঙা মেলা। আজ সেই ভাঙা মেলার জিনিস সস্তায় কিনে ফিরছে কত মানুষ। এখনও যাচ্ছে অনেকে। বেতের তৈরি ধামা, চাল মাপার কচাঁ, বাঁশের বোনা মাটি বওয়ার ঝড়া, কুলো, শাক ধোওয়ার পাছিয়া, মাটির তৈরি বড়-ছোট মেচলা কিনতে। আর বউরা যায় ভাল শাঁখ আর শাঁখা নিতে। ধারালো বঁটি আর দাউলিও কেনে।

কত বছর ধরে যে এই মেলা চলে আসছে তা ঠিক ঠিক কেউ বলতে পারে না। শুধু জানে বছরে একবার হয়। মাঘ মাসের শুরুর রোববার বা লক্ষ্মীবার। যেটা আগে পড়বে সেই বারে মেলা বসে। আশপাশের গ্র‌ামের মানুষও তাই জানে। মেলায় যে দোকানপাতি বসে তাদের কাউকে ডাকতে হয় না। বিনা নেমন্তন্নেই পৌঁছে যায় তারা। তবে মেলার একটা গল্প লোকমুখে ঘোরে। অমূল্যও শুনেছিল তার দাদুর কাছে।

কার্তিকখালি গ্র‌াম যেখানে শেষ সেখানে ওপাশের গ্র‌াম গঁ-ডকের শুরু। সেই দুই গ্র‌ামের মাঝখানে অনেক ফাঁকা পতিত জমি আছে। সেখানে আগে একটা বট গাছ ঘিরে হাট বসত। সপ্তাহে দু’দিন। সেই হাটেরও বয়েসের কোনও গাছপাথর নেই। এখনও বসে। রোববার আর বৃহস্পতিবার। হাটবার এলেই আশপাশের গ্র‌ামের মানুষ সেখানে জড়ো হয়। টাটকা তরিতরকারি আর মাছ সস্তায় পাওয়া যায়। মাটিতে গামছা নয়তো চটের বস্তা বিছিয়ে চাষিরা যার যার খেতের জিনিস নিয়ে বসে। বেগুন, ঝিঙা, ঢেঁড়শ, কাঁচালঙ্কা, টমেটো, শসা, আরও কত কী। অমূল্যও গিয়েছে আগে। ওই হাটেই একবার তুফানের মুখে পড়ে গিয়েছিল মানুষজন। বাজার সেরে বাড়ি ফিরবে, খুব জোরে ঝড় উঠল। ঝুপড়িগুলো সব উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। মাটিতে পাতা জিনিস লণ্ডভণ্ড। বাতাসের সঙ্গে ধুলো আর খড়কুটো মিশে এমন পাক খাচ্ছে যে কেউ চোখ মেলে চাইতে পারছে না। একে সন্ধে নামছে তার ওপর এই বিপদ! তারা কোথায় যাবে, কী করবে, তুফানের হাত থেকে বেঁচে আদৌ বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা সেই ভয়েই আকুল।

সেই সময় কিছু মানুষ দেখতে পেল ঝড়ের ভেতর থেকে ঘোড়ায় চেপে বেরিয়ে আসছে একটি লোক। মাথায় লম্বা টুপি, গালময় দাড়ি আর গায়ে আলখাল্লা চাপানো। লোকটি ঘোড়া থেকে নেমে অসহায় ভীতু মানুষগুলোকে একটা ঝুপড়িতে নিয়ে যায়। তাদের শান্ত করে বাইরে এসে দু’বার ডাক পাড়ে জোরে জোরে। কী সেই ডাক তার মানে বোঝেনি কেউ। তবে তারপর সব চুপ।

ঝুপড়ির মানুষ বাইরে এসে দেখে ঝড় থেমে গিয়েছে। কিন্তু সেই ঘোড়ায় চড়া লোকটি কোথাও নেই! অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও যখন তাকে পাওয়া গেল না তখন অনেকে বলতে লাগল, এ নিশ্চয়ই কোনও পির। তুফানের মুখ থেকে আমাদের বাঁচাতে এসেছিল। ওরা যখন এইসব বলাবলি করছে তখন চাষিরা ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তাদের জিনিসপত্র কুড়িয়ে জড়ো করছিল। তাদেরই একজন হুরি করে উঠল। চিৎকার শুনে সবাই তার কাছে গিয়ে দেখে বটগাছের নীচে মাটির তৈরি একটা ছোট ঘোড়া দাঁড়িয়ে। আর তার ওপর বসে এক মূর্তি। হুবহু সেই ঘোড়ায় চড়া লোকটির মতো দেখতে!

এসব ব্যাপার দেখে লোকজন বিশ্বাস করে নিল, কোনও পিরবাবাই তাদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু কে সে? ওইরকম চেহারার কোনও মানুষ তো তাদের গ্র‌ামের নয়। নানা কথা হতে হতে একজন বলল, ‘আমার মনে হয় এ কাদিরপুর গ্র‌ামের গাজিসাহেব।’ অনেকে মনে পড়ে যাওয়ার মতো মাথা নাড়তে লাগল। হ্যাঁ, হতে পারে। কার্তিকখালির পিছন দিকে যে গ্র‌াম, সেটা কাদিরপুর। সেখানে এক গাজিসাহেব ছিলেন। সে অনেক দিন আগের কথা। কেউ তাকে দেখেনি। তার গল্প শুনেছে শুধু। তিনি নাকি ঘোড়ায় চড়ে ঘুরতেন। আজ সেই গাজিসাহেব তাদের তুফানের থেকে বাঁচাতে এসেছিলেন। সেই থেকে হাটের নাম হয় তুফানগাজির হাট। গাছতলায় যে মূর্তি পাওয়া গেছিল তাকে ওখানেই রাখা হল। হাটবারে মানুষের চলাচল রইল। তারা মাখা সন্দেশ আর মাটির ঘোড়া কিনে গাছতলায় যে যার মতো মানত করতে লাগল।

এভাবেই মেলারও শুরু। আগে ছোট করে হত। আস্তে আস্তে বড় মেলার চেহারা নিল।

অমূল্য মেলায় যেত দাদুর হাত ধরে। ঢুকেই আগে এক গেলাস বেলের সরবত খাওয়াত দাদু। কী যে আনন্দ হত। সেই দাদু চলে যাওয়ার পর সঙ্গী ছিল বন্ধুরা। তাদের সঙ্গে কত কী যে করেছে, সব ঠিক ঠিক মনেও পড়ে না। তারপর সঙ্গী হল রেণুকা। তাকে নিয়ে মেলায় ঘুরে ঘুরে সংসারের কত জিনিস কিনেছে। ধান সেদ্ধর বড় মেচলা আর ধামা নাকি তার মতো কমে কেউ কিনতে পারত না। বলত রেণুকা। দোকানি কি আর এমনি এমনি দিতে চায়? দরাদরি করে অন্য দোকানদারের দিকে পা বাড়ালে তখন সে বলে, ‘ভাঙা মেলা, জিনিস বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে কী করব। আমার ঠকা হবে, তবুও লিয়া যাও।’

এখন সেসব দিন স্বপ্ন। রেণুকাও তার মেলা সেরে আগে আগে চলে গিয়েছে।

লাঠি ধরে মাঠের মাঝখানেই উবু হয়ে বসে পড়ল অমূল্য। জানটা আঁইঢাই করছে। যেন বেরিয়ে যেতে চায়। একভাবে বেশি দূর আর হাঁটতেও পারে না। জীবনের নিয়মমতো কবেই সে সময় পেরিয়ে এসেছে। অমূল্যর দু-একজন বন্ধু তো আর নড়াচড়াও করতে পারে না। গাছের গোড়ায় নয়তো দাওয়ায় বসে সময় পার করে। অমূল্য কিছুদিন আগেও জাল বুনত। চোখের কারণে এখন আর ছোট ঘর দেখতে পায় না। তাই তাও ছাড়তে হয়েছে। আস্তে আস্তে তাদের সময়ের সবই যাচ্ছে। এখন ছেলে সুভাষের সময়। তারপর তার ছেলের আসবে।

বাড়ি-ঘর নেই। ফাঁকা মাঠ বলেই ঠান্ডা বাতাসটা বেশি লাগছে গায়ে। চাদরটা ভাল করে মুড়িয়ে নিল। এত কষ্ট করে এত দূর আসা কেন। যে যা পারে নিয়ে যাক মেলা থেকে। নিজের মনেই বিড়বিড় করছে অমূল্য। তারপরেই মনে হল, তাই কি হয়? বছরে একবারই আসে জিনিসগুলো। ফিরে পরের বছর। কষ্ট হলেও সে পৌঁছবে খালপাড়ে। জীবনভোর আর কী-ই বা পেল। এই টুকুটুকু আনন্দই তো জড়িয়ে আছে তাকে।

নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খালপাড়ে এসে পড়েছে অমূল্য। বাঁশের পুলটার কাছাকাছি বসে পড়ল উঁচু ঢিবিটার ওপর। খালে এখন হাঁটুডোবা জল। ভাটা চলছে। ঘোলা জলে ছোট ছোট ডাকরা মাছগুলো জলের ওপর যেন পিছলে পিছলে যাচ্ছে। পাড়ে নোনা জল আর কাদামাখা ঘাস। তার ওপর লাল লাল কচি কাঁকড়াগুলো সতর্কভাবে দাঁড়া ফেলে ফেলে ঘুরছে। কাউকে যেতে দেখলেই গর্তে গিয়ে ঢুকবে। হাজার চেষ্টা করেও বের করা যাবে না।

অনেকের একসঙ্গে কথা বলার গুনগুন আওয়াজে পুলের দিকে চোখ ফেরাল অমূল্য। আবার একদল মানুষ ফিরছে। দেখেই বোঝা যায় সকলেই সংসারী। বাসি মেলার ভিড় আলাদা। যত সংসারী মানুষের ঠেলাঠেলি। বাকি দিনগুলোর মতো কচিকাঁচারা তত যায় না। কারণ খাওয়ার জিনিসের দোকান, নাগরদোলা, খেলনা রেলগাড়ি, আরও অনেক কিছু আগের দিন রাতেই গুছিয়ে তেরপল ঢাকা দিয়ে দেয়। পরের দিন যারা জিনিস বেচে তারা মাটিতে খড় বিছিয়ে বসে।

ওরা পুল পেরিয়ে এপারে চলে এসেছে। বউদের হাতে একটা করে বড় ব্যাগ। লোকটার মাথায় মেচলার মতো দেখতে একটা কিছু কিন্তু পোড়ামাটির গেরুয়া রং নয়। তবে কি কাঁচা মেচলা নিয়ে যাচ্ছে? অমূল্যর মন ছটফটিয়ে উঠল। ‘কাঁচা মেচলা লিয়া যাওটঅ, কী করব গো?’

লোকটা অমূল্যকে ঘুরে দেখলও না। মাথার ওটা বোধহয় খুব ভারী। চাপে বেঁটে হয়ে গেছে সে। বলল, ‘এটা মাটির না গো। সিমেন্টের মেচলা। সরকার এখন শুধু ঘরই পাকার করেনি। রাস্তাঘাট, হাঁড়ি-কলসি সবই পাকার করি দিবে।’ বলেই নিজের কথায় হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল। তার রহস্য করা দেখে সঙ্গীরাও হাসছিল।

অমূল্যর মনের ছটফটানি থামেনি। ওরা চলে যাচ্ছে। জিনিসটার দাম জানা হল না। গলায় যতটা জোর আছে তা লাগিয়ে জানতে চাইল, ‘পড়লা কত ওটা?’

তার চেয়েও জোরে উত্তর এল। ‘একশো সত্তর…’

একেবারে চুপ মেরে গেল অমূল্য। চিন্তায় পড়ল সে। কী হারে জিনিসে দাম বাড়ছে! গরুকে জল খাওয়ানোর ছোট মেচলারও এত দাম! আগে এগুলো পঞ্চাশ-ষাট ছিল। আর মাটির কলসি বারো-পনেরো। তবে একটাই সুবিধে হয়েছে। গরুকে জল বা জাবনা খেতে দিলে  আর সে শিঙের গুঁতোয় অত সহজে ভাঙতে পারবে না।

আগের মানুষগুলো চোখের বাইরে যেতে না যেতেই আবার কয়েকজন এসে পড়েছে। তাদের কথা শুনতে পায়নি অমূল্য একটা শাঁখের আওয়াজে। ছেলেটা থেকে থেকে শাঁখের মুখে হাতের তেলো থাবড়ে নিয়ে ফুঁক দিচ্ছে। বউ বিরক্ত হচ্ছে, আবার হেসেও ফেলছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ছেলেটা অমূল্যকে দেখে দাঁতগুলো মেলে ধরল। ‘পঞ্চমুখী শঁখ। বউয়ের অনেকদিনের ইচ্ছা থ্যালা। ফাঁকা জায়গায় বাজিয়ে দেখিটি আওয়াজটা ক’পাড়ায় পৌঁছায়।’

শাঁখটার দাম জানা হল না অমূল্যর। ওরা মাঠে নেমে গেছে।

বেলা বাড়ছে। অমূল্যর নিস্তেজ শরীরটার মতো সূর্য আর ঝিমিয়ে নেই। তেজ নিয়ে মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। নোনা হাওয়ায় হাত-পায়ের লোমগুলো বাড়িমুখো বইছে অমূল্যর। আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ ঝুরো ঝুরো হয়ে ভেসে যাচ্ছে নীচে দিয়ে। খালের ওপারে সেই কেঁদ গাছটার দিকে চোখ পড়ল। আগের মতোই নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে। ডালপালা আর মাথায় পাতার বোঝা নিয়ে সবই ঠিক আছে তার। শুধু বয়েসটাই বেড়েছে অমূল্যর মতো। চামড়া দেখলেই বোঝা যায়। মোটা হয়ে ফেটে উঠেছে। অমূল্য অজান্তে নিজের গায়ের ছালে হাত বোলাচ্ছিল। বিরাশি কি পঁচাশির ছাল তো হবেই।

যাঃ, এ কী ভুল ভাবছে অমূল্য। তার গায়ে ছাল হতে যাবে কেন? এ তো চামড়া। সারাজীবন সংসারকে আগলে রেখে ঝড়, জল, দুঃখ-কষ্টে ছায়া দিয়েও সে গাছ হয়ে উঠতে পারেনি। দামি তো ওই কেঁদগাছটা। রোদের সময় এখনও মানুষ ওর ছায়া পায়। ফল-পাতা পেড়ে নিয়ে গিয়ে গরু-ছাগলকে খাওয়ায়। যখন কিছুই দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না ওর তখন কেটে ঘরের কোনও আসবাব বানানোর কাজে লেগে যাবে। পুরনো তো অমূল্য। তাই বোধহয় চামড়া কুঁচকে নরম। আগের মতো টান টান আর নেই।

চোখদুটো কচলে নিয়ে ভাল করে গাছটাকে দেখল। বয়েসে তার চেয়ে দু’গুণ বেশি তো হবেই। বাবারও জন্মের আগের গাছ। আজও সোজা। অমূল্যর মতো বেঁকে পড়েনি। দু’জনের একটাই মিল। গায়ের রং, কালো। অমূল্য থাকবে না একদিন। এই মেলা, মেলার জিনিস, কেনার মানুষ সবই শূন্য হয়ে যাবে কোনওদিন! তখনও কি গাছটা থাকবে তার জায়গায়? নাকি সেও চলে গিয়ে শূন্য হয়ে যাবে? একটা নিশ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল অমূল্যর। লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। এখন আর ঠান্ডা নেই। রোদের ঝাঁঝে মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখের পাতা আঠা আঠা হয়ে বুজে আসছে। আর থাকা যায় না। অনেকটা পথ ফিরতে হবে।

আবারও অনেকের গলা শুনতে পাচ্ছে অমূল্য। উঠে দাঁড়িয়েও এগোতে পারছিল না। চোখ ফিরিয়ে দেখল খালের এপাড়-ওপাড়। দুই পাড়েই অসংখ্য ছায়া ছায়া মূর্তি। তারা আসছে না যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। সবই যেন গুলিয়ে যেতে লাগল তার। একাকার হয়ে যেতে লাগল আসা আর যাওয়া।

চিত্রকর: মৃণাল শীল