অমর মিত্র

মা ও ছেলের কথা হয় সন্ধের পর। সন্ধের পর লিলির হাত খালি হয়। দুটি ঘরের একটিতে টেলিভিশন। শম্ভু বাড়ি থাকলে টেলিভিশন নিয়েই বসে থাকে। শম্ভুর নেশা ফুটবলে। ফুটবল সে খেলত। বারপোস্টের নীচে গোলে বুক চিতিয়ে দাঁড়াত। লিলি তা শুনেছে শম্ভুর কাছে। তার খুব নাম হয়েছিল। দশদিকে হায়ার করে নিয়ে যেত। তারপর!

তারপর যা হয়েছিল তা লিলি জানে। শম্ভু বলে সব মিথ্যে কিন্তু লিলির মনে হয় সত্যি। শম্ভুর লোভ শম্ভুর খেলা শেষ করে দিল। গোলকিপার তো। তার কাজটাই আসল কাজ। গোলকিপার বিপক্ষের এগারোজনের বিপক্ষে একা। তাকেই সবাই টার্গেট করে ছুটে আসে। কিন্তু সে যদি গোপনে চুক্তি করে বিপক্ষ দলের সঙ্গে, ডান দিক দিয়ে বল ঢুকলে বাঁ দিকে ঝাঁপাবে, তাহলে তো দল হারবেই। শম্ভু বলেছে, সব মিথ্যে। তাহলে কেন মাঠ থেকে তাড়িয়ে দিল? দিকে দিকে রটে গেল শম্ভু হীরা বিপক্ষের পয়সা খেয়ে গোল ছেড়ে দেয়। আবার বিপক্ষও রটিয়ে দিল, শম্ভু হীরা টাকা নিয়েও কথা রাখে না। কিন্তু শম্ভুর অস্বীকারও তাকে বাঁচাতে পারেনি। মাঠ তাকে ছাড়তে হয়েছিল। কেন? শম্ভু বলে, সে গড়ের মাঠে খেলতই। তা বন্ধ করে দিল কিছু লোক। লোক এমনি হয়। তারা মনে করে, একুশ নম্বর বস্তির শম্ভু পাড়ায় খেলবে, বেশ। হায়ারে খেলবে, তাও মেনে নেওয়া গেল। শালা, গড়ের মাঠে যাবে কেন? তখন সে কি থাকবে ২১ নম্বরে? চাকরি পাবে খেলার জন্য। তারপর সল্টলেকে বাড়ি করবে। ভালো বিয়ে করবে। ভোটে দাঁড়িয়ে এম এল এ হয়েও যেতে পারে। শম্ভুর মুখেই শোনা। শম্ভু বলে, ‘কিছু মানুষ জন্মায় এমনি ভাগ্য নিয়ে। কিছুতেই তুমি উঠতে পারবে না। সিঁড়ি ভেঙেই দেবে।’

এত কিছুর পর শম্ভু এখনও টেলিভিশনে ফুটবলই দেখে। ফুটবল দেখতে দেখতে ঘুমিয়েও পড়ে। হাঁ করে ঘুমোয় শম্ভু। তার চোখের সামনে বিলেতে মাঠভর্তি লোক চিৎকার করে। গোলকিপার গোল বাঁচায় অবিশ্বাস্য উড়ান দিয়ে। শম্ভুকে ডাকতে গিয়ে লিলি দাঁড়িয়ে পড়ে। সে দেখতে পায়, শম্ভু, শম্ভুই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারপোস্টের নীচে। আহা, তার স্বামী এমন হতেই পারত। ফসকে গেছে। শম্ভু তাই বলে।

শম্ভু ফুটবল দেখছে। এখন লিলি তার ছেলেকে ফোন করবে। সে আছে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর। সেখানে একটা পাহাড় আছে, জয়চণ্ডী নাম। তাতুন একটা মেসে থাকে। সারাদিন সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরে। ফার্টিলাইজার বেচা তার কাজ। খুব কষ্ট তার চাকরিতে। গরমে আরও কষ্ট। শুনলে লিলির চোখে জল এসে যায়। তাতুন বলে, ‘একটা ফসল মা, আর সব গরিব মানুষ, সার নেবে কে?’

‘তাহলে ওখানে পাঠাল কেন তোকে?’

তাতুন বলে, ‘চ্যালেঞ্জ, যদি কাজ ভালো করি, টাকা বাড়াবে।’

‘আচ্ছা, তোর বাবা তাই বলে ভালো করে কাজ করতে, উন্নতি হবে।’

‘আজ খুব ঠান্ডা মা।’ তাতুন প্রসঙ্গ বদলে দিল।

‘তুই গায়ে সোয়েটার দিয়ে আছিস তো?’ লিলি জিজ্ঞেস করে।

‘সোয়েটার কী বলছ মা, আমি কম্বল গায়ে চৌকিতে বসে আছি, সোয়েটার গায়ে দিয়ে শুই।’

‘তাতুন, তোদের আজ কী রান্না হল?’

‘ডিমের ঝোল, আলু-পিঁয়াজ ভাজা আর রুটি।’

‘বিকেলে কী খেলি আজ?’

‘উফ মা, তুমি তো জান, মুড়ি চপ আর পিঁয়াজ, সোমবারে যা, রোববারেও তা।’

‘কেন বোঁদে আর মুড়ি ?’

‘বোঁদে দেখলেই লুচি-পরোটার কথা মনে হয়।’ তাতুন বলে।

‘পরোটা খেতে ইচ্ছে হয়?’

‘ইচ্ছে হলে তো হবে না, রোববারে যদি সবাই থাকে, তবে হতে পারে, কিন্তু হয় না মা, সবাই থাকে না, বাঁকুড়ার ছেলেরা চলে যায়, পুরুলিয়ার অন্য ছেলেরা চলে যায়, রোববারে আমি একা প্রায়।’

‘আজ তো রোববার।’

‘হ্যাঁ, আজ রোববার, আজ তিনজন আছে, পাঁচজন বাড়ি গেছে।’ তাতুন বলল।

‘তোদের না ন’জন ছিল?’ লিলির সব জানা। তাতুন যা যা বলেছে ফোনে, সব তার মুখস্থ যেন।

‘একজন সাত্যকি রায়, নতুন চাকরি পেয়ে কলকাতা ফিরে গেছে।’

‘সেই সাত্যকি, ইংলিশ বলত খুব, কলকাতায় চাকরি?’

তাতুন বলল, ‘হ্যাঁ মা, ছ’মাস বাদে মুম্বই, ভালো ইংরেজি জানে, ফ্লুয়েন্ট ইংলিশ বলে, বড় কোম্পানিতে হয়েছে, বিদেশেও যাওয়ার সুযোগ আছে।’

লিলি চুপ করে থাকে। তাতুন পড়েছে কানাইলাল একাডেমিতে। আগে নাকি ওই স্কুলের খুব নাম ছিল। ওই স্কুলের ছেলেরাই দেশ-বিদেশে থাকে। বিলেত-আমেরিকায়। কিন্তু এখন? সুনাম নেই। লিলির খুব ইচ্ছে ছিল তাতুন বড় স্কুলে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়াম। কিন্তু শম্ভুর তখন খুব বিপদ। হাতিবাগানের হকার উচ্ছেদ হয়েছে। তখন কী করে ইংলিশ স্কুলে পড়াবে? তার রেডিমেডের স্টল ভেঙে দিয়ে পুলিশ মালপত্র নিয়ে গেল। তাতুনের বাবার স্টল থাকলে চেষ্টা করে দেখতে পারত। ইংলিশ ভালো জানলে তাতুনও চাকরি নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসতে পারত। তাতুনও বিদেশ যেতে পারত। তাতুনকে সে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কোন সাবজেক্ট ভালো জানিস তাতুন?’ 

তাতুন বলল, ‘কোনওটাই জানি না মা, আমাদের স্কুলে কোনওটাই ভালো হত না, কিছুই শেখায়নি।’

লিলির মনখারাপ হয়ে গেল। তবু বলল, ‘তা কেন, ওই স্কুল থেকে কি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়নি ?’

তাতুন বলল, ‘আগে হয়েছে, আমাদের সময় সব গোলা, বাদ দাও মা, সবার সব হয় না। বাবা তো গড়ের মাঠ অবধি যেতে পারেনি, বাবা নাকি দারুণ গোলকিপার ছিল।’

লিলি প্রসঙ্গ বদলে দিল এবার। বলল, ‘আজ তোরা মুরগির মাংস খেতে পারতি।’

তাতুন বলল, ‘সকলে থাকলে হয়, রোববারেই সবচেয়ে খারাপ খাওয়া হয়, কেউ তো থাকে না প্রায়।’

‘দুপুরে কী হল তাতুন?’

তাতুন জবাব না দিয়ে বলল, ‘মা, এদিকে মানুষ খুব গরিব।’

‘আমরা কি বড়লোক?’

‘না, তা বলছি না, এই শীতে পটাপট ক’টা বুড়ো মরে গেল, রাতে গায়ে দেবার মতো কম্বলই নেই, আমি দেখেছি দিনেরবেলায় রোদে বসে হিহি করে কাঁপছে।’

লিলি বলল, ‘বয়স হলে রক্তের তেজ কমে যায়, তোর কাজ কেমন হচ্ছে?’

‘ভালো না, সার কেনার পয়সা নেই লোকের, জলের অভাব, সার কিনে কী করবে, চাষের ঠিক নেই।’

‘তাহলে তুই কী করে তোর কাজ করবি?’

‘এইভাবেই হচ্ছে মা।’ বলল তাতুন। চুপ করে থাকে লিলি। ছেলের চাকরি থাকবে তো? না থাকলে ফিরে আসবে বাড়ি? তারপর? তাতুন বলল, ‘মা, আমার এক বন্ধু হয়েছে, শশধর মাহাতো।’

লিলি হাসে। বলে, ‘ওদিকে মাওবাদী নেই তো?’

‘কী যে বলো! কত কষ্ট করে থাকে মানুষ। মা, শশধরের বাড়ি অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে এক গাঁয়ে, শশধর আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।’

‘কবে গেলি?’

‘আগের শুক্রবারে, শুক্র, শনি থেকে রবি রাতে ফিরেছিলাম।’

‘বলিসনি তো?’ লিলি বলল। 

‘বলা হয়নি মা, আগের রোববারে তুমি ফোন করনি তো।’

লিলি বলল, ‘ফোনে ব্যালেন্স ফুরিয়ে গেল, তোর বাবা তিন দিন বাদে ভরে দিল, বলে ফোন করে কী হবে, আগে যখন মোবাইল ছিল না, তখন কি কেউ চাকরি করতে বাইরে যেত না।’

‘বাবা সব ভুল করে, দিন পালটেছে মা, বাবার কিছু হয়নি বলে আমার হবে না?’

‘থাক তাতুন।’ লিলি ছেলেকে শান্ত করে।

‘বাবাকে এমন করতে বারণ করে দেবে। আচ্ছা, আমি এখান থেকেই তোমার ফোনে রিচার্জ করে দেব মা।’

‘তাই দিস।’ লিলির মন ভরে উঠল। তখন সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর বন্ধু শশধর কী করে?’

‘সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে হিসেব রাখে।’ তাতুন বলল।

‘ভালো কাজ?’

‘ও কমার্স পড়েছিল কিন্তু কাজটা ক্লাস ফাইভ পড়লেই হয়।’

‘কী কাজ রে, অ্যাকাউন্টস?’

‘না মা, কোন লরিতে ক’বস্তা সিমেন্ট লোড হল, সেই হিসেব রাখা।’ তাতুন ধীরে ধীরে বলল।

‘খাটনি বেশি নেই তাহলে?’ লিলি জিজ্ঞেস করল।

‘খাটনি খুব, রাতেই বেশি গাড়ি লোড হয়, প্রায়ই রাতে ডিউটি দেয় তাই।’

‘তুই রাত জাগতে পারবি না?’

তাতুন বলল, ‘আমার তো দিনেই কাজ মা।’

‘না, না, ওই সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে?’ লিলি আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করে।

তাতুন বলল, ‘চাকরি ভালো না মা, খুব গালি দেয় শশধরকে।’

‘কেন, গালি দেয় কেন?’ লিলি জিজ্ঞেস করে।

‘ছুটি দিতে চায় না একদম, ভয়ে ভয়ে রেখে দেয় সবসময়।’

‘আজ, রোববার?’

‘না, ট্রাক এসে গেলে যেতে হবে, ডিউটি ইজ ডিউটি।’

‘তাহলে করে কেন?’

তাতুন বলল, ‘আমি যেজন্য করি মা।’

লিলি বলল, ‘তাতুন তুই কবে কলকাতা আসবি?’

‘শীতটায় কাজ হয় বেশি মা। লোকের হাতে পয়সা থাকে, ফসল বেচার টাকা, আর গরম নেই, সাইকেল চালিয়ে সুখ, শীতে এদিকটা ভালো, শুধু রাত্তিরে খুব কনকনানি।’

‘তুই যে আগে বলেছিলি শীত সহ্য করা যায় না।’ লিলি জিজ্ঞেস করে।

‘অভ্যেস হয়ে গেছে মা, একটা মোটা ভুটিয়া সোয়েটার কিনে নিয়েছি, আমি অযোধ্যা পাহাড় যাব আবার।’

লিলি চুপ করে থাকে। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তাতুনও চুপ। তাতুন একটু বাদে বলল, ‘মা, আমি অন্য কাজের চেষ্টা করছি, একটা ল্যাপটপ হলে সুবিধে হত।’

‘অনেক দাম।’

‘জানি, তাহলে চাকরি খুঁজতে সুবিধে হত।’

লিলি বলে, ‘দেখছি, মোবাইলে হয় না?’

‘না মা।’

লিলি বলল, ‘অনেক টাকা তো।’

‘জানি, কিন্তু এ চাকরির কোনও ভবিষ্যৎ নেই।’

লিলি চুপ করে থাকে। ইস, ছেলেটা যদি ইংলিশ বলতে পারত! ছেলেটার যদি ভালো রেজাল্ট হত। তাদের যদি আর একটু সামর্থ্য হত। ওকে ম্যানেজমেন্ট পড়িয়ে নিলেই বড় চাকরি করত। ম্যানেজমেন্ট পড়ার কথা সে টিভিতে শুনেছে। টিভিতে কত লেখাপড়ার বিজ্ঞাপন থাকে। একটা পড়া আছে— হোটেল ম্যানেজমেন্ট। গ্র্যান্ড হোটেল, তাজ বেঙ্গল থেকে বিদেশে কত চাকরি। পয়সা দিলেই ডিগ্রি। তাতুনকে একটা ল্যাপটপ কিনে দিতে বললে ওর বাবা শম্ভু কি হ্যাঁ করবে? বলবে পুরুলিয়ায় ল্যাপটপ কী হবে? মন দিয়ে কাজ করতে বলো। লিলি জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ রে, অযোধ্যা পাহাড়ে বরফ পড়ে?’

তাতুন হাসে, ‘কী যে বলো মা, কিন্তু কী অপূর্ব জায়গা!’

লিলি বলল, ‘তুই একটু থাকলে আমি আর তোর বাবা যাব।’

‘বাবা না এলে আমিই তোমাকে নিয়ে আসব মা, বাবা খুব ঝামেলাবাজ।’

‘বাবার সম্পর্কে অমনি কথা বলে না।’ লিলি ছেলেকে থামায়। বাবার সঙ্গে ওর বনে না। কেন বনে না তা ওরাই জানে। ছেলে বলে বাবা তার লেখাপড়ায় নজর দেয়নি বলে তার এই অবস্থা। ভালো স্কুলে পড়লে সে কত ভালো চাকরি করতে পারত। কিন্তু বোঝে না, তার বাবার সামর্থ্য ছিল না।

কথা ঘুরিয়ে দিল তাতুন। বলল, ‘শশধরদের বাড়ি পাহাড়ের কোলে, একটা ঝরনা আছে, সারাদিন জল পড়ছে পাহাড়ের গা দিয়ে, ওখানে শালবন, বসন্তকালে শালফুল ঝরে পড়ে থাকে, এখন শালবনে পাতা ঝরছে, ঝরতে ঝরতে বন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।’

‘ছবি তুলেছিস?’

‘হ্যাঁ মা।’

‘ঝরনার ছবি?’

‘পাঠিয়ে দেব মা।’

‘আমি একবার যাবই।’ লিলি বলল। বিয়ের পর একবার দিঘা, একবার বনগাঁ আর একবার পুরী, এই তার ঘোরা। তাতুন যদি অযোধ্যা পাহাড়ে নিয়ে যায়, খুব ভালো হবে। সে কখনও পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখেনি। পুরী থেকে ফেরার পথে ট্রেন থেকে যা দেখেছিল, দূরে মেঘের মতো নীল পাহাড়ের ঢেউ। লিলি জিজ্ঞেস করল, ‘পুরুলিয়ায় খুব জলের কষ্ট না?’

‘এই তো, শীত চলে যেতে যেতে জল ফুরিয়ে যাবে।’

লিলি বলল, ‘খুব কষ্ট হবে তখন, ক’দিন বাড়ি ঘুরে যাস!’

‘হুঁ, তবে কুয়োর জল খুব ঠান্ডা, কিন্তু কত নীচে জল নেমে যায়, গরমের সময় ভোরে বেরতে হবে, বেলা বাড়তে চলে আসব, তাই বলেছে শশধর আমাকে।’

‘খাওয়ার জল পাবি তো?’

‘হ্যাঁ মা, এখানে যারা থাকে, তারা যেভাবে পায়।’

‘আমাদের এখানে টালা ট্যাঙ্ক, চব্বিশ ঘণ্টা জল।’

‘শশধরকে বলি, ও অবাক হয়ে যায়।’ তাতুন বলে, ‘পুরুলিয়া টাউনেই গরমে লোকে জল পায় না।’

‘ওদের ঝরনা তো সারাবছর জল দেয়?’

তাতুন বলে, ‘গরমের সময় জল কমে আসে মা, আমি আবার যাব দোল পূর্ণিমার সময়।’

‘আমাকে নিয়ে যাবি?’

‘হ্যাঁ মা, দেখি পারি কি না। মা ও মা, আমি গতবছর যে গিয়েছিলাম, তখন পলাশ ফুটেছে অযোধ্যা পাহাড়জুড়ে, যেন আগুন জ্বলছে পাহাড়ে আর মাঠে মাঠে।’

‘সে তো জানি, ছবি দেখিয়েছিলি।’

‘মা একটা কথা বলি, শশধরের বোন রানি মাহাতো, সে পলাশ ফুল শুকিয়ে আবির করতে পারে।’

‘টিভিতে দেখেছি, পুরুলিয়ায় অমন হয়।’

‘মা, আমি একটা কথা বলি।’

‘বল, বলছিস তো, কী বলবি?’ লিলি জিজ্ঞেস করে।

‘রানি মাহাতো, রানি, রানি খুব যত্ন করে ওদের বাড়ি গেলে, পিঠে করে খাইয়েছে, আমরা যে গেলাম, তখন।’

‘তো?’ লিলি চুপ করে থাকে। লিলির বুক ধকধক করে। কী বলবে তাতুন? আগে যখন ফোন করেছে তখন কত কষ্টের কথা বলেছে। এক মাস আগেই শীত নিয়ে কত কথা বলল। তখন নভেম্বরের মাঝামাঝি। আজ চাকরি বদল করা আর ল্যাপটপ ছাড়া তেমন কোনও কষ্টের কথা নেই। অযোধ্যা পাহাড়, ঝরনা, শালবনের পাতা ঝরে যাওয়া— কথা সব এই নিয়ে। আর!

তাতুন বলল, ‘মা, কিছু বললে না তো।’

‘কী বলব রে?’ লিলি বলল।  

‘আমি প্রেমে পড়েছি।’

লিলি চুপ। হাহাকার না আনন্দ, কিছুই বুঝতে পারে না সে।

‘বাবাকে বলতে হবে না, অযোধ্যা পাহাড়ের রানির কথা বলছি মা। আচ্ছা রাখি, একটা ফোন আসছে।’ তাতুন বলল, ‘রানি।’ লিলি চুপ করে থাকে। তাতুন ফোনটা আচমকা কেটে দেয়। লিলির বুক আরও ভার হতে থাকে। তাতুন— সুরজিৎ এখন রানির সঙ্গে কথা বলছে। রানি মাহাতো। পলাশ আর পাহাড়ের দেশের মেয়ের সঙ্গে বন-পাহাড়ের ঝরনার মতো কলকল করছে। সেই ছলছল ধ্বনি শুনতে পাচ্ছে লিলি। টিভির ঘরে ঢুকে দেখল চেয়ারে বসে নাক ডাকছে তাতুনের বাবা। টিভিতে খেলা হয়েই যাচ্ছে।   

চিত্রকর: দেবাশীস সাহা