হৈমন্তী শুক্ল

সেইসব দিন কোথায় যেন হারিয়ে গেল। নতুন জামা, নতুন জুতো, নতুন ঘড়ি আর নতুন গান। পুজো আসছে মানেই উন্মাদনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা। পুজো আসার কত আগে থেকেই রেডিওতে শুরু হয়ে যেত পুজোর গান শোনার হিড়িক। বাড়ির বাচ্চা থেকে বুড়ো কেউ বাদ নেই। সেইসব গান থেকেই বাছাই হয়ে যেত এবারের পুজোর লিস্টে কোন শিল্পীর কোন গান বাড়িতে আসবে।

তারই মধ্যে সুন্দর মলাটের ঝকঝকে ছাপানো গ্রামোফোন কোম্পানির পুজোর গানের বই বাড়িতে এসে ঢুকত। সে কী আগ্রহ। কোন গান কোন শিল্পী কোন গীতিকারের কথায় ও কার সুরে গাইছেন। এটা জানা তখন যেন কত আগ্রহের ছিল।

সেই কবেকার কথা। ১৯৭০ সাল। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ও শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের সুরের ছড়ার গান ঠাঁই পেয়ে গেল শারদ অর্ঘ্যে। আমার প্রথম পা রাখা। বাবা জীবনের শুরু থেকে শুধু গানের রেওয়াজ নয়, উপদেশও দিতেন— গান যেন হয় মনের সাধনা। যে সাধনায় শ্রোতাদের মন জয় হবে। চর্চা আর চেষ্টায় খামতি না থাকলে সাফল্য একদিন আসবেই।  

সত্যিই তাই হয়েছিল। বাবা হরিহরণ শুক্ল সেই যে ছোটবেলায় নানা স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিলেন মনের মধ্যে, তারই পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল ১৯৭২ সালে। ‘কান্না নয়, আমার চোখের জল’ গানটি লিখলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আর সুর দিয়েছিলেন শৈলেন মুখোপাধ্যায়। প্রতিবছর পুজোর গানের তালিকায় পাকাপাকি জায়গা হয়ে গেল। সেই সময়ে ‘পুজোর’ গানের শিল্পী এই তকমা পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। আর তাই পুরোপুরি প্রকৃত শিল্পী হয়ে গেলাম। যেখানেই যাই সেখানেই শুনি— ‘আপনার পুজোর গান খুব ভাল লেগেছে’।

কিন্তু বড় দুশ্চিন্তাও কাজ করত বারোমাস। সেটা আর কিছু নয়, পুজোর গান নিয়েই। আমি আর পিন্টুদা মানে পিন্টু ভট্টাচার্য প্রায়ই এই দুশ্চিন্তা শেয়ার করতাম।

যদি এমন দিন আসে কখনও কোনও বছর গ্রামোফোন কোম্পানি পুজোর গান গাইতে না ডাকে, তাহলে কী হবে? গান ছাড়া বাঁচব কী করে? এ যে কত বড় দুশ্চিন্তা তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। এক একটা দিন কাটত আর মনের মধ্যে ‘কু’ ডাকত। কেন এখনও ফোন এল না? তাহলে কি বাদ পড়ে গেলাম?

না, সব ভুল ভাঙত যখন হঠাৎই ডাক আসত। এমনকি এটাও বলে দেওয়া হত, কার লেখা গান, কার সুরে গাইতে হবে। গীতিকার, সুরকারের সঙ্গে জোট বাঁধতে হত এবং দিনের পর দিন চলত চর্চা। একটু এদিক ওদিক হওয়ার যেন উপায় নেই। তখনকার দিনে সারা বছর মাত্র তো দুটো কি চারটে গান কিন্তু তার জন্য যা প্রস্তুতি তা এখন কাউকে বললে বিশ্বাসই করবে না। তারপর রেকর্ডিং হত। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম। কিন্তু একটা ভয় কাজ করত যতদিন না পুজো আসে, শ্রোতারা সত্যিই আমার গানকে ভালো বলবে তো? তাদের মনে ধরবে তো? এরকম নানা দুশ্চিন্তায় যখন দেখতাম বড় পুজোমণ্ডপে আমার গান বাজছে তখন আনন্দে টপটপ করে চোখে জল ঝরে পড়ত। যাক বাবা, সাধনায় ত্রুটি নেই। মানুষের মনে আমার গান একটু হলেও জায়গা পেয়েছে।

সত্তরের দশকে আমাদের নজর ছিল সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-সহ প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের দিকে। পুজোর গান নিয়ে ওঁরা কী ভাবছেন। নতুন কোনও শিল্পী পুজোর গানে সুযোগ পেলেন কিনা। সত্তরের দশকে দেখেছি অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাই চাইতেন বাংলা গানে আরও নতুন প্রতিভা উঠে আসুক। সলিল চৌধুরী প্রায়ই বলতেন, কত প্রতিভা রয়েছে যাদের একটু সুযোগ দিলেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। তবে এটা ঠিক, যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হলেই তবেই তাকে সুযোগ দেওয়া হত। বড় কঠিন পরীক্ষা। প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও সুরকাররা সেই যোগ্যতা যাচাই করতেন বড় নিষ্ঠার সঙ্গে। এখনকার মতো কেউ চট করে ‘শিল্পী’ হয়ে যেতেন না। আগে যোগ্যতা, পরে গান।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাতেই আছে, একটু ভুল হলে তখন কতটা বকা খেতে হত। ভুলের ক্ষমা নেই। বারবার চেষ্টা করলে তবেই পরীক্ষায় পাশ করতে হত।

মনে আছে পণ্ডিত রবিশঙ্কের সুরে পাঁচটি গান আমি গেয়েছিলাম, কী কঠিন পরীক্ষা। যখন সবকটি গান ওঁর পছন্দ হল, তখনই ছুটি পেলাম। আমার সে কী উন্মাদনা। যেন যুদ্ধ জয় করে ফিরলাম। গানের জন্য যুদ্ধ।

পুজোর গান এত ভাল হত কেন? অনেকেই এই প্রশ্ন করে থাকেন। আসলে শুধু যোগ্যতা নয়, কিছু নিয়মকানুনও মেনে চলতে হত। সেইসময়ে যেমন অনেকবার দেখেছি যা এখনও মনে আছে। মনে পড়ে, অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুজোর গান নিয়ে। তিনি যা নির্বাচন করবেন তাই হবে। এরকমভাবেই অভিজিৎদার মতো বেশ কয়েকজনের ওপরে সেই গুরুদায়িত্ব পড়ত। তিনি যেভাবে যা নির্দেশ দিতেন সেইভাবেই চলতে হত। এককথায়, শিল্পীরা বাধ্য ছিলেন তাঁর কথাই মেনে চলতে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আমাকে দিয়ে গাইয়েছিলেন ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না’। মান্না দে সুর দিলেন আমার গাওয়া ‘নয়নে আবির ছড়ালে’ গানটিতে। আমার এখনও মনে আছে, পুলক বন্দোপাধ্যায় একটি গান লিখেছিলেন— ‘আমার বলার কিছু ছিল না’। মান্না দে দ্বিধায় ছিলেন, এই গান কে গাইবে। আমরা অনেকেই সেখানে বসে আছি। এমন সময় পুলকদা বেশ জোরের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘এই গান হৈমন্তীর গলায়ই বেশ মানাবে।’ হ্যাঁ আমাকে দিয়েই গাওয়ানো হয়েছিল। হিট, হিট, সুপারহিট।

সত্তর ও আশির দশকে পুজোর গান ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বাংলা গান অনেকে গাইতেন। এমনকি বাংলা ছায়াছবির গানও অত্যধিক জনপ্রিয় হত। দেখা যেত সেইসব গানও পুজোর দিনগুলিতে নতুন সব গানের সঙ্গে সমান তালে বাজছে। ১৯৭৯ সালে আমার পুজোর গান ‘এখনও সারেঙ্গিটা বাজছে’ রেকর্ড বিক্রি হলেও একইসঙ্গে সেই সময়কার একটি বাংলা ছায়াছবির গান পুজোর বাজারে প্রচুর বিক্রি হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই, তখন বাংলা গানের এমনই কদর ছিল। নতুন নতুন সব সৃষ্টি। সুরের আগুনে জ্বলছে শ্রোতাদের আবেগ। শুধুমাত্র পুজোর গান নিয়েই বসে যেত আড্ডা। রকে রকে সেই সব গানকে ঘিরেই চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা। নবীন থেকে প্রবীণ সবারই আগ্রহ থাকত তুঙ্গে। আমি নিজেই দেখেছি, উত্তর কলকাতার কয়েকটি রকে রেডিওতে রাত আটটায় ‘পুজোর গান’ শুনছে মন দিয়ে পাড়ার ছেলে-ছোকরারা।

তবে বাংলা গান নিয়ে ডামাডোল শুরু হয়ে গেল আশির দশকের শেষ থেকেই। জীবনমুখী, আরও কত কি সব গান। যিনি লিখছেন তিনি সুর দিচ্ছেন, আবার তিনিই গাইছেন। বহুমুখী সব প্রতিভার প্রকাশ। সব যে খারাপ হচ্ছিল তা কিন্তু নয়। কেউ কেউ বলছিলেন, বাংলা গানে বড় একঘেয়েমি এসে গেছে— এবার নতুন জোয়ার আসবে। কিন্তু কোথায় কী। নতুন সব গান এল কিন্তু টিকল কই। সেই ঘুরে-ফিরে তরুণদা, মানবেন্দ্রদা, শ্যামলদা থেকে বনশ্রীদি। পুজোর ভিড়ে ভেসে এল আরতিদির গান ‘তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়’। পরিশ্রম দিয়ে যে গান তৈরি হত তার স্থায়িত্ব চিরকালই থাকবে এটা নতুন কিছু নয়।

হেমন্তদার মুখে শোনা একটা ছোট্ট ঘটনা এখানে না বললেই নয়। সলিল চৌধুরী পুজোর গানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হেমন্তদা তাঁর কাছে এসে অনেকগুলি গান শোনালেন। কিন্তু না, কোনও গানই সলিলদার মন-পসন্দ হল না। প্রায় হতাশ হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় হেমন্তদার মনে হল, যে গানটি এতক্ষণ তিনি শোনাননি, সেটিই শুনিয়ে দেখা যাক সলিলদার প্রতিক্রিয়া। ‘রানার চলেছে’ গানটি কিছুটা গাইতেই সলিলদা তাঁকে আবারও ঘরে এনে বসালেন। হ্যাঁ, এই গানই চলবে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন হেমন্তদা। সুপারহিট হয়ে গেল ‘রানার চলেছে’ গানটি। সেই গান আজও সমান জনপ্রিয়। পরবর্তীতে দেখেছি, সলিলদার মতো হেমন্তদাও পুজোর গান নিয়ে খুবই চিন্তাভাবনা করতেন। এত কিছু করতেন বলেই হয়তো গানের স্থায়িত্ব আজও অটুট ও অমলিন।

ভাবা যায়, এই বাংলা গানের দুনিয়ায় সেইসব ব্যক্তিত্বের কথা যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন শুধুমাত্র বাংলা গানের জন্যই। চাওয়া-পাওয়া বা যশের লোভে তাঁদের কখনও সেই পথ থেকে বিচ্যুত করা যায়নি। কত অন্য সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তাঁরা। আজ তাই হয়তো তাঁদের সৃষ্টি সসম্মানে আঁকড়ে ধরে আছেন বাংলা গানের শ্রোতারা। অনুপম ঘটক থেকে রবীন চট্টোপাধ্যায় বা সুধীন দাশগুপ্ত থেকে নচিকেতা ঘোষ এমন আরও কত নাম আছে যাঁদের ধ্যানজ্ঞান ছিল শুধুই গান আর গান। নামী-অনামী যে শিল্পীই হোন না কেন, এঁদের কত সম্মান দিতেন তাঁরা। শুনেছি, রেকর্ডিংয়ের ফ্লোরে নচিকেতা ঘোষ খুব বকতেন শিল্পীদের। ভুল হলে তা শুধরেও দিতেন— তা সে যত বড়ই শিল্পী হোন না কেন। একবার মান্না দে গাইছিলেন নচিকেতা ঘোষের সুরে। কিছুতেই তা পছন্দ হচ্ছিল না সুরকারের। বাধ্য হয়ে নচিকেতাদা শিল্পীকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার সুরেই আপনাকে গাইতে হবে। আপনার সুরে নয়।’ মান্না দে একটু থমকে গিয়ে তাই করেছিলেন। ভাবা যায় না, একজন শিল্পী অন্য একজন শিল্পীকে কত সম্মান দিচ্ছেন। এই সম্মানটা এখন বুঝি অভিধান থেকেই উঠে গেছে। যাক, সেই বিতর্কে যাব না।

যা বলছিলাম, আমি যে কত বকা খেয়েছি অভিজিৎদা ও শৈলেনদার কাছে তা গুনে বলতে পারব না। কখনও রাগ বা অভিমান হত না। কারণ ওঁরা তো শিক্ষকের মতো শাসন করছেন, করবেনও। বকা খাওয়ার পর সেই কাজ যে এত নিখুঁত ও মনের মতো হবে ভাবলেই এখন কেমন আনন্দ হয়। গর্ব হয়।

পুজোর গান ছিল একটা উপলক্ষ। আর তার জন্যই প্রতিবছর তখন অত ভাল ভাল গান তৈরি হয়েছে।

আর এখন? সবই হচ্ছে কিন্তু বাংলা গান হিট করছে না। গানের মধ্যে মনের খিদে মিটছে না। যদিও মানুষের সময় নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে। গান শুনবে কখন?

অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। তবে ক্ষোভ তো আছেই। যখন ভাবি এরা কারা, যারা কোমর নাচিয়ে, শাড়ি দুলিয়ে বা চড়া রঙের জিন্‌স পরে মঞ্চে মাইক্রোফোন নিয়ে গান গাইছে? গান যাই হোক, রুচির প্রকাশ থাকবে না কেন? গান তো সাধনা। আমরা যদি এখনও অনন্তকাল ধরে মহিষাসুরমর্দিনী বা মহালয়া শুনে নিজেদের মনে ও প্রাণে শুদ্ধিকরণ ঘটাতে পার, তবে কেন বাংলা গানের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পারব না? তার জন্য কি রুচিকেও বিসর্জন দিতে হবে?

সন্ধ্যাদিকে এখনও শ্রদ্ধা করি শুধু তাঁর গানের জন্য নয়, রুচির জন্যও। তিনি যখন পুজোর গানের রেকর্ড সেরে বাইরে বেরোতেন তখন তাঁকে দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যেত। গান যদি হয় ঈশ্বর, তবে তার পূজারি তো আমরাও। এখন অনেকেই তা ভুলে গেছেন।

যুগের পরিবর্তনে অনেক কিছুই হয়। যুগের বড় ধর্ম এটাই। তবুও সেই পরির্তন চাই, যেখানে আবারও ফিরে আসবে পুজোর গানের আমেজ। মনকাড়া নতুন সব বাংলা গান। আমারই মতো নতুন কেউ গেয়ে উঠবেন— ‘এখনও সারেঙ্গিটা বাজছে…’

সেই দিন কি সত্যিই আসবে?

অনুলিখন: বিপ্লবকুমার ঘোষ