মদনগোপাল মুখোপাধ্যায়

পলাশির যুদ্ধের শতবার্ষিকীতে সিপাহিবিদ্রোহ অথবা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম দেশের ইতিহাসে এক অনন্য তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহে ব্রিটিশদের সঙ্গে সিপাহিদের যুদ্ধের ব্যাপকতা ছিল মূলত প্রায় সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে। যুদ্ধে উভয় পক্ষের একদিকে নৃশংসতা অন্য দিকে বীরত্বের কাহিনি নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। সেই সময়ের বহু নথিপত্রে, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে, চিঠিপত্রে এই ইতিহাসের আকর বিধৃত রয়েছে। আরও রয়েছে বেশ কিছু স্কেচ যেগুলি ব্রিটিশ আর্মির অফিসাররা করেছিলেন এবং পরে সেগুলি থেকে এনগ্রেভিং করে লন্ডন প্রিন্টিং এবং পাবলিশিং কোম্পানি প্রকাশ করেছিল। ক্যাপ্টেন জি এফ এটকিনসন, জর্জ ফ্রাঙ্কলিন, ক্লিফোর্ড হেনরি মেচামের করা স্কেচ থেকে টি পিকেন, ডাবলিউ সিম্পসন ই ওয়াকার লিথোগ্রাফ প্রিন্ট করেন। এ ছাড়া এ সলোমান এবং ডাবলিউ কার্পেন্টারের ড্রইং এবং তৈলচিত্রের মাধ্যমেও যুদ্ধের ছবি পাওয়া যায়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য, এই ঐতিহাসিক ঘটনার কিছু ফটোগ্রাফ যা  ইতালিয়ান ফেলিক্স বিয়েতো তুলেছিলেন। ফটোগ্রাফির তখন সবে শুরু। চল্লিশের দশকে ফটোগ্রাফিতে হাতেখড়ির পর বিয়েতোর আকর্ষণ ছিল যুদ্ধের ছবি তোলা। বিয়েতো ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ছবি তুলে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করে সিপাহি যুদ্ধের খবর শুনে ১৮৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় এসে হাজির হন এবং সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর ভারতে বেরিয়ে পড়েন। লখনউতে গিয়ে যেখানে দু’হাজার সিপাহিদের হত্যা করা হয়েছিল সেখানে তিনি মাটি খুঁড়ে মৃত সিপাহিদের ছবি তোলেন। মনে করা হয় তিনিই প্রথম মৃত মানুষের ছবি তুলেছিলেন। পরে দিল্লিতে গিয়ে তিনি লালকেল্লা, কাশ্মিরী গেট, যেখানে বিশেষ যুদ্ধ হয়েছিল সেসব অঞ্চলের ছবি তোলেন। বিয়েতো কোলোডিয়ান  গ্লাসপ্লেট নেগেটিভ থেকে আলুমেন সিলভার প্রিন্ট করতেন। সেইসব ছবি থেকেই দেখা যায় একসঙ্গে তিনজনের ফাঁসির একটি দৃশ্য। সমরক্ষেত্র থেকে চিত্র সাংবাদিক হিসাবেও বিয়েতোকে পুরোধা হিসাবে মানা যায়। ফটোগ্রাফির সেই আদি যুগে ছবি তোলা মোটেই সহজ ছিল না। ভারী ভারী যন্ত্রপাতি বয়ে নিয়ে যেতে হত, লোকবল লাগত। তারপর কয়েক দশকের মধ্যে ফটোগ্রাফি সহজলভ্য হয় এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলিতে মুভি-সহ ফটোগ্রাফির ব্যাপক ব্যবহার হতে থাকে। এরই সূত্র ধরে সচিত্র পোস্টকার্ড জনপ্রিয় হয়। যদিও উনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে পোস্টকার্ডের প্রচলন শুরু হয় কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে সচিত্র পোস্টকার্ডের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

ভারতবর্ষের বিষয়ে কৌতূহলী পশ্চিম দেশগুলিতে সিপাহিবিদ্রোহ তখনকার সময়ের একটি বহু আলোচিত বিষয়। ব্রিটিশ জনসাধারণ, যারা সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ ও তাদের দেশবাসীদের হত্যার কথা জেনেছিল তাদের সবিশেষ আগ্রহ ছিল সেইসব ঘটনা এবং স্থানের ছবি দেখার। এর ফলে বিদ্রোহের অর্ধ শতাব্দী পরেও বিদ্রোহ সংক্রান্ত সচিত্র পোস্টকার্ডগুলির আকর্ষণ বজায় থাকে এবং আজ দেড়শো বছর পেরিয়েও  বিদ্রোহ সংক্রান্ত সচিত্র পোস্টকার্ডগুলি এখনও আকর্ষণীয়। বিদ্রোহের স্মৃতিধারক কিছু সচিত্র পোস্টকার্ড, ম্যাপ ও মেডাল-সহ সেই ঘটনাবলীর একটি রেখা আলেখ্য এই নিবন্ধে প্রকাশ করা হল।

বিভিন্ন কারণে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। জাতপাত ও ধর্মের সংস্কার জনসাধারণের মতো সিপাহিদের মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। গোরু ও শুয়োরের চর্বি দিয়ে তৈরি কার্তুজ যা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ব্যবহার করতে হত তা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রথম ধরায়। মঙ্গল পাণ্ডে ব্যারাকপুরে প্রথম বিদ্রোহের সূচনা করেন এবং উচ্চ পদাধিকারী দু’জনকে গুলিতে নিহত করেন। এর ফলে তাঁর ফাঁসি হয় এবং পুরো রেজিমেন্টের উর্দি কেড়ে নেওয়া হয় ও তাদের চাকরি চলে যায়। আহত, অপমানিত সিপাহিরা কর্মচ্যুত হয়ে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় নিজেদের গ্রামে ফিরে যায় এবং তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে থাকে। তাদের অভিজ্ঞতার কাহিনি দাবানলের মতো বিভিন্ন সেনা ছাউনিতে ছড়িয়ে পড়ে। এমনই একটি সেনা ছাউনি ছিল দিল্লি থেকে চল্লিশ মাইল দূরে মেরঠে।

মেরঠের ব্যারাক ও গার্ড ঘর। সাদা-কালো ছবি থেকে হাতে রং করা এই কার্ডটি জার্মানিতে তৈরি এবং এইচ এ মির্জা অ্যান্ড সন্স দিল্লি থেকে প্রকাশিত, সাল উল্লেখ নেই।

১৮৫৭ সালের ২৪ এপ্রিল মেরঠে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর কিছু সিপাহি গোরু ও শুয়োরের চর্বি দিয়ে তৈরি কার্তুজ ব্যবহার করবে না বলে বিদ্রোহ করে। কর্তৃপক্ষ এই প্রাথমিক বিদ্রোহ সহজেই দমন করে সাজা হিসাবে সর্বসমক্ষে বিদ্রোহীদের উর্দি কেড়ে নেয় এবং কারাদণ্ড ঘোষণা করে। কর্তৃপক্ষের এই ব্যবহার দ্রোহের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয় এবং ১০ মে রবিবার ঘোড়সওয়ার বাহিনীর কয়েকশো সিপাহি জেল আক্রমণ করে তাদের সতীর্থদের জেল থেকে মুক্ত করে এবং অন্য কয়েদিদেরও মুক্তি দেয়। পরে তারা স্থানীয় ইওরোপীওদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং স্ত্রী, পুরুষ, শিশু নির্বিচারে গণহত্যা, লুঠতরাজ ও ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করতে শুরু করে। সারারাত ধরে এই তাণ্ডব চালিয়ে রাত ভোর হবার আগে সিপাহিরা দিল্লির উদ্দেশ্য রওনা হয়।

মেরঠের ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন দ্বিগুণ হয়। ৪ জুন গভীর রাত এবং ৫ জুন সকাল থেকে কানপুরের সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং স্থানীয় ট্রেজারি (তোষাখানা) আক্রমণ করে এবং তারপর দিল্লি অভিমুখে কিছুটা গিয়ে নানা সাহেবের নেতৃত্বে ৬ জুন আবার কানপুরে ফিরে আসে এবং স্থানীয় ইউরোপীয়দের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। অবশেষে  একটা চুক্তি অনুসারে তারা ইংরেজদের নিরাপদে কানপুর ছেড়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই অনুযায়ী ২৭ জুন সকালে সতীচৌরা ঘাটে চল্লিশটি নৌকা জড়ো করে ইংরেজরা কানপুর ছেড়ে যাবার উদ্যোগ করে। এই সময় দু’পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয় এবং বহু স্ত্রী, পুরুষ, শিশু গুলিতে, আগুনে পুড়ে অথবা জলে ডুবে মারা যায়। মাত্র একটি নৌকা কোনওমতে পালাতে সক্ষম হয় এবং কানপুরের সমগ্র ইংরেজ অধিবাসীদের মধ্যে মাত্র চারজন বাঁচেন।  

বিরল একটি সচিত্র পোস্টকার্ডে দেখা যাচ্ছে সেই কলঙ্কময় সতীচৌরা ঘাটের ছবি। লক্ষণীয় যে কার্ডে লেখা “The Massacre Ghat, Cawnpore”। ‘’ব্ল্যাক হোল অফ ক্যালকাটা”-র মতো এই কলঙ্কিত নামেই ব্রিটিশরা এই ঘাটকে মনে রেখেছিল। কার্ডটি ছাপা হয় ফ্রান্স থেকে। প্রকাশ করে রাফায়েল টাক অ্যান্ড সন্স লন্ডন থেকে। লেখা আছে “কোলো-ফটো”।  আগে কানপুর ইংরেজিতে Cawnpore এই বানান লেখা হত। সাল উল্লেখ নেই।

একটি পোস্টকার্ডে দেখা যাচ্ছে নানা সাহেবকে। কোমরে ছুরির বাঁট, হাতে ধরা তরোয়াল। দু’কানে কর্ণকুণ্ডল। গলায় মুক্তোর মালা। সাধারণ পাগড়ি মাথা। কার্ডে লেখা “Nana Dhondoo Punth of Bithoor. The Rebel Governor of Cawnpore.” কার্ডটি লুক্সেমবার্গে ছাপা এবং রেভারেন্ড ডি. এ. কানে কানপুর থেকে এটি প্রকাশ করেন | কার্ডে কোনও তারিখ নেই। রেভারেন্ড কানে নিশ্চয়ই কোনও মিশনারি ছিলেন যিনি যুদ্ধ পরবর্তীকালে নানা সাহেবের ছবি আঁকিয়ে বা পূর্বতন কোনও ছবি থেকে এই কার্ড করেন এবং কানপুরের ঘটনার প্রচার করেন।  

এই ঘটনায় ইংরেজদের মধ্যে সিপাহিদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও রাগের সৃষ্টি হয়, যার ফলে ব্রিটিশদের মন্ত্র হয় “কানপুরকে মনে রেখো”।

৩ মে লখনউতে প্রথম বিদ্রোহ সূচিত হয়, যা সহজেই সাময়িকভাবে নিবারণ করতে সমর্থ হয়েছিল ব্রিটিশরা। এর সপ্তাহ দু-একের মধ্যেই মেরঠ ও দিল্লিতে সেনা অভ্যুত্থানের সংবাদ লখনউয়ের সিপাহিদের মধ্যে পৌঁছে যায়। যার ফলে আবার ৩০ মে সিপাহিরা স্থানীয় সেনা অফিসারদের বাড়িতে আগুন লাগায় এবং একজন সেনাধ্যক্ষকে গুলি করে। এই সময় লখনউ অঞ্চলের সেনা সর্বাধিনায়ক স্যার হেনরি লরেন্স সিপাহিদের বাগে আনেন এবং তারা দিল্লির দিকে পালিয়ে যায়। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে সিপাহিরা যে আবার আক্রমণ করতে পারে এই আশঙ্কা মাথায় রেখে স্যার লরেন্স তাঁর নিজের বাসগৃহ, যাকে রেসিডেন্সি বলা হত এবং মাচ্ছি ভবন নামে সুরক্ষিত একটি প্রাসাদকে দুর্গের মতো তৈরি করেন। পরে রেসিডেন্সিতেই সব ইউরোপীয়দের আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করেন। ২৯ জুন লরেন্স তাঁর বাহিনী নিয়ে লখনউ শহরের বাইরে আক্রমণকারী সিপাহি বাহিনীর মুখোমুখি হন এবং সেই খণ্ডযুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে আবার রেসিডেন্সিতে আশ্রয় নেন। ৩০ জুন দুপুর থেকে জয়ী সিপাহিরা রেসিডেন্সি আক্রমণ করে কিন্ত তৎক্ষনাৎ রেসিডেন্সি অধিকার করতে পারে না। শুরু হয় অবরোধ। সামান্য কয়েকজন ইউরোপীয় সৈন্য, কিছু দেশীয় সৈন্য ও সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকেরা (সংখ্যায় মোট সতেরোশো ) ৬ হাজার থেকে এক লক্ষ সিপাহিদের তিন মাস ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়। এর মধ্যে ২ জুলাই অসুস্থ শয্যাশায়ী স্যার হেনরি তাঁর ঘরের মধ্যে ফেটে পড়া বোমায় আহত হয়ে মারা যান।

বিগ্রেডিয়ার জেনারেল হেনরি মন্টগোমারি লরেন্সের  জন্ম হয়েছিল আইরিশ পরিবারে, ১৮০৬ সালে, শ্রীলঙ্কায় | বার্মা, আফগানিস্থানে এবং অবশেষে এই বিদ্রোহে নানা যুদ্ধে তিনি পারদর্শিতা দেখান। পাঞ্জাবে দক্ষ প্রশাসক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। মহারাজা গুলাব সিংহকে কাশ্মীর বিক্রিতে বড় ভূমিকা নেন। সৈন্যদের সন্তানদের জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় স্কুল খোলেন এবং কলকাতায় আলেকজান্ডার ডাফের সঙ্গে ফ্রি চার্চ ইনস্টিটিউশন গঠন করেন যা পরে ডাফের জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইনস্টিটিউশনের সঙ্গে মিল স্কটিশ চার্চ কলেজ হয় | কলকাতায় ১৮৩৭ সালে তিনি বিয়ে করেন অনোরিয়া মার্শালকে। তাঁর মৃত্যুর পর রেসিডেন্সির কাছে কবরখানায় তাঁর সম্মানে বিশেষ স্মারকস্তম্ভ তৈরি করা হয়।

পরবর্তী পোস্টকার্ডে দেখা যাচ্ছে গোলাগুলিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত লখনউ রেসিডেন্সির ছবি। কার্ডটি টাক কোম্পানি ফ্রান্সে ছাপে লখনউয়ের নেওয়াল কিশোর এম্পোরিয়ামের জন্য।

একই সিরিজের পরবর্তী পোস্টকার্ডে দেখা যাচ্ছে রেসিডেন্সির মধ্যেকার ট্রেজারি বিল্ডিং। গোলাগুলির চিহ্ন সর্বত্র।

সেই সিরিজের পরবর্তী পোস্টকার্ডে দেখা যাচ্ছে রেসিডেন্সির বেইলি গার্ড গেটের ছবি (Bailey Guard Gate)। এখানেও গোলাগুলির চিহ্ন সর্বত্র। একই গেটের অন্য একটি ছবি আছে ব্রাসেলসে ছাপা। সেখানে বানান Baillic Guard Gate।

পরবর্তী ছবিতে দেখা যাচ্ছে রেসিডেন্সির মধ্যে ডা: ফেরার নিবাস। দেয়ালে অসংখ্য গুলির দাগ।

দিল্লিতে তখন মোগল সাম্রাজের শেষ অবস্থা। একসময়ের প্রবল পরাক্রান্ত মোগলদের বংশধর দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ তখন লালকেল্লায় বাস করছেন। তাঁর কাছে সরাসরি এসে ১১ মে সকালে সিপাহিরা নামে মাত্র এই বাদশাকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে বাধ্য করে। ইংরেজদের পেনশনভোগী, স্থবির, অতিবৃদ্ধ বাদশা কবিতা লিখতেন, বিদ্রোহের নেতা হবার কোনও ক্ষমতাই রাখতেন না। কিন্তু ভাগ্য যে কখন কাকে কোথায় নিয়ে যায় কে জানে।

সিপাহীদের বিশৃঙ্খলতা, বাদশার নেতৃত্বহীনতা ও তলায় তলায় ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মধ্যে ব্রিটিশদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে দিল্লির প্রাচীরের বাইরে। ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধের শতবার্ষিকীর দিনে সিপাহিরা ইংরেজদের ওপর প্রবল আক্রমণ করে। সংখ্যায় সামান্য থাকায় প্রথম দিকে ব্রিটিশরা আক্রমণের চেয়ে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয় কিন্তু ধীরে ধীরে পাঞ্জাব থেকে নতুন সৈন্যরা আসতে থাকায় ব্রিটিশদের শক্তি বাড়তে থাকে। ৪ জুন ও ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে সিপাহি ও ব্রিটিশদের মধ্যে কুড়িটি খণ্ডযুদ্ধ হয় কিন্তু কোনও পক্ষই পুরোপুরি জয়ী হয় না।

এই সময়েই তাঁর বাহিনী নিয়ে সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে দিল্লিতে এসে হাজির হন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জন নিকলসন। তার অল্প আগে তিনি পথে দু’লক্ষ সিপাহিদের এক বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে বাড়তি আত্মপ্রত্যয় অর্জন করেন।

১৪ই সেপ্টেম্বর ব্রিটিশরা কাশ্মীর গেট আক্রমণ করে এবং শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। দু’পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয় এবং দুঃসাহসী নিকলসন কাশ্মীর গেটের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান। যুদ্ধ চলতে থাকে এবং শেষে সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে ব্রিটিশরা লাহৌর গেট, জুম্মা মসজিদ, অধিকার করে লালকেল্লায় আবার ব্রিটিশ পতাকা ওড়ায়।

কাশ্মীর গেট। গোলাগুলিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত গেটের ছবি | হাতে রং করা লিথোগ্রাফ থেকে জার্মানিতে ছাপা। ভারতে ও বার্মায় ১ পয়সা ও ভারতের বাইরে ১ আনার টিকিট লাগত।

এই সংগ্রামে উভয় পক্ষেই ছিলেন অনেক বীর যোদ্ধা ও নেতা | ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, কানপুর অঞ্চলে নানা সাহেব ও তাঁর সেনাপতি তাঁতিয়া টোপী | ব্যারাকপুরের মঙ্গল পাণ্ডে এখন কিংবদন্তী পুরুষ।

ইংরেজদের পক্ষে জন নিকলসনও যুদ্ধে মারা যাবার আগে থেকেই হয়ে উঠেছিলেন এক কিংবদন্তী পুরুষ। নিকলসনের জন্ম আয়ারল্যান্ডে। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্য বাহিনীতে যোগ দেন এবং আফগানিস্থানের যুদ্ধে গজনীতে যুদ্ধবন্দি হন। ৬ মাস বন্দি থাকার পর মুক্ত হন এবং ১৮৪২ সালে আফগানিস্থান থেকে সমগ্র ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে কোনওরকমে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন। এই পশ্চাদপসরণের সময় নিজের ভাইকে আফগানদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হতে দেখেন। সেই স্মৃতি নিকলসনের মনে ভারতীয় বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর এক ক্ষমাহীন ঘৃণা ও ক্রোধের জন্ম দেয়। রাওয়ালপিণ্ডিতে ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার হিসাবে থাকাকালীন তিনি একজন স্থানীয় আফগান নেতার মাথা কেটে বাঁধিয়ে নিজের টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিলেন অন্যান্য আফগান নেতাদের মধ্যে ভয় ও সম্ভ্রম জাগাতে। ছ’ফুটের ওপর লম্বা, বলিষ্ঠ, কালো দাড়ি, ধূসর চোখ, কালো চোখের তারা, উত্তেজিত হলে যা বাঘের চোখের মতো বড় হয়ে যেত, মুখে কখনও হাসি নেই, দয়া-মায়া নেই, সেই নিকলসন ছিলেন বেপরোয়া সাহসী। তলোয়ার যুদ্ধে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না সেই সময়। স্বল্পভাষী, একরোখা, নির্জনতাপ্রিয় নিকলসনকে কেউ ভাবত পাগলাটে, আবার কেউ ভাবত স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। নিকলসেনা বলে একটা কাল্ট অবধি গড়ে উঠেছিল এঁকে কেন্দ্র করে। একবার সেনাদের খাবারে বিষ মিশিয়েছে অভিযোগে তিনি সেনাদের অপেক্ষায় রেখে তিনজন রাঁধুনিকে তৎক্ষনাৎ ফাঁসি দেন কোর্ট মার্শালের তোয়াক্কা না করে।

দিল্লিতে বিপর্যস্ত ব্রিটিশ সৈন্যদের সাহায্যে নিকলসন যথাসময়ে না এসে পৌঁছলে যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। কৃতজ্ঞতায় ব্রিটিশরা দিল্লিতে নিকলসনের স্মৃতিতে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেন সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি আয়তাকার বাঁধানো ক্ষেত্র। ক্ষেত্রের ওপর কয়েকটি ছোট কামান। ক্ষেত্রর মধ্যে একটি সুদৃশ্য স্তম্ভ এবং তার ওপর দণ্ডায়মান নিকলসন। তাঁর চরিত্রানুগ হাতে উন্মুক্ত তরোয়াল। স্তম্ভের গায়ে অনাড়ম্বরে লেখা শুধু তাঁর নাম। জন্ম-মৃত্যুর কোনও তারিখ অবধি লেখা নেই। লক্ষণীয় যে নিকলসনকে এখানে অশ্বপৃষ্টে দেখানো হয়নি, যদিও তিনি যুদ্ধের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা কোনও বিশ্রাম না নিয়ে উত্তর ভারতের রোদে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতেন এবং কাশ্মীর গেটে যখন গুলিবিদ্ধ হন তখন তিনি ঘোড়ার পিঠেই  ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার পর এটিকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং আয়ারল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। পোস্টকার্ডে যদিও সেই চিত্র আজ সর্বজনের জন্য রক্ষিত হয়ে আছে। রঙ করা এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে স্মৃতিস্তম্ভটির উন্মোচন করেন ভাইসরয় লর্ড মিন্টো ১৯০৬ সালের ৬ এপ্রিল। কার্ডটি জার্মানিতে ছাপা এবং এইচ এ মির্জা অ্যান্ড সন্স দিল্লি থেকে প্রকাশিত।

ইতিমধ্যে কানপুরে হেনরি হ্যাভলক নানা সাহেবকে পরাজিত করে লখনউতে যান সেখানকার অবরুদ্ধ ব্রিটিশদের সাহায্যে। কিন্তু মাঝপথে সংবাদ পান যে নানা সাহেবের সেনাপতি তাঁতিয়া টোপী আবার কানপুর আক্রমণ করতে উদ্যত। এই খবর শুনে হ্যাভলক আবার কানপুরে ফিরে আসেন এবং বিঠুরের যুদ্ধে তাঁতিয়াকে পরাজিত করেন। কিন্তু লখনউ মুক্ত করতে না পারার জন্য ইরান থেকে জেমস উট্রামকে কানপুরে নিয়ে আসা হয়। পরে উট্রাম হ্যাভলককেই নেতৃত্বে রেখে লখনউ আক্রমণ করতে যান।

দিল্লির যুদ্ধের পর স্যার কলিন ক্যাম্পবেলকে ব্রিটিশদের সর্বপ্রধান সেনাপতি করা হয় এবং তিনি লখনউকে মুক্ত করাই প্রধান কাজ হিসেবে মনে করে কলকাতা থেকে ২৭ অক্টোবর রওনা হয়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি লখনউ পৌঁছে ১৭ নভেম্বর রেসিডেন্সিতে অবরুদ্ধ ব্রিটিশদের সঙ্গে যুক্ত হন এবং নারী, শিশু, অক্ষম, অসুস্থ নাগরিকদের নিয়ে কানপুরের উদ্দেশে রওনা হন। ২৪ নভেম্বর হ্যাভলক অসুস্থ হয়ে লখনউতে মারা যান | উট্রাম অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে লখনউয়ের উপকণ্ঠে অবস্থান করতে থাকেন। ক্যাম্পবেল ইতিমধ্যে কানপুরে পৌঁছে তাঁতিয়াকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে লখনউ পুনরুদ্ধারের জন্য এক বিশাল বাহিনী নিয়ে উট্রামের কাছে পৌঁছন এবং পরে গুর্খা সৈন্যদের সাহায্যে দীর্ঘ যুদ্ধের পর ১৮৫৮ সালের ২১ মার্চ লখনউ অধিকার করেন। এরপর বিদ্রোহের আগুন নিভে যায়।

রেসিডেন্সি অধিকার করার সময় ক্যাম্পবেলকে প্রতি সপ্তাহে লন্ডনে ম্যাপ সহযোগে তাঁর অগ্রগতি জানাতে হত। সেইরকম একটি ম্যাপে দেখা যাচ্ছে গোমতি নদীর পাশে তখনকার লখনউ শহর। গোলাপি রঙ করে দেখানো হয়েছে রেসিডেন্সি কম্পাউন্ড। তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে কিচেন গার্ডেন, চার্চ, অফিসারদের বাংলো, আস্তাবল, কমিশনারের বাড়ি, ট্রেজারি, ইত্যাদি। রেসিডেন্সির উত্তরের মাচ্ছি ভবন দেখা যাচ্ছে। ম্যাপের ওপরের দিকে ছোট বর্গক্ষেত্রের ভিতর হালকা গোলাপি রঙে চিহ্নিত করা আছে কলিন ক্যাম্পবেলের গতিপথ। নীল রঙে চিহ্নিত করা আছে দিলখুশা পার্ক। ওপরে বাঁদিকে আলামবাগ থেকে দূরত্ব দেখানো আছে ৩ মাইল | নদীর ওপর আছে নৌকা দিয়ে তৈরি সেতুর অবস্থান নির্দেশ।

ম্যাপ চিত্র

বীরত্বের জন্য দেওয়া মিশ্র ধাতুতে তৈরি মেডেলের ব্যাস ৩.৫ সেন্টিমিটার। মেডেলের ওপর অংশে লেখা Lucknow। সামনের দিকে অল্পবয়েসি রানি ভিক্টোরিয়ার সুন্দর মূর্তি। পাশে লেখা Victoria Regina। অন্য দিকে দেখা যাচ্ছে সিংহমূর্তি। সিংহের সামনে দণ্ডায়মান পুরুষমূর্তি | বাম হাতে ব্রিটিশ পতাকা আঁকা ঢাল, ডান হাতে বিজয়মাল্য। মূর্তির তলায় খোদিত 1857-1858। মেডেলটির পাশে ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা 189. Corpl. Charles Bentley. 3rd Bn Rifle BDr। মেডেলটি লাল-সাদা ডোরা রিবনে ঝোলানো। এটি এমনভাবে করা যে মেডেলটিকে সহজেই ঘোরানো যায়, যাতে দু’দিক দেখা যায়।

এই যুদ্ধে সর্বসমেত ১৮২ জনকে অসাধারণ বীরত্বের জন্য ভিক্টোরিয়া ক্রশ দেওয়া হয়। এই মেডেলটি ভিক্টোরিয়া ক্রশ নয়।

যুদ্ধ শেষে দিল্লিতে ব্রিটিশরা বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করে। নাম ছিল Fatehgarh (Mutiny Memorial) Delhi।

এই যুদ্ধের অনিচ্ছাকৃত ও হতভাগ্য নায়ক ছিলেন বাহাদুর শাহ। যুদ্ধ শেষে তাঁর ছেলে ও নাতিদের ব্রিটিশরা নির্মমভাবে হত্যা করে ও প্রায় নব্বই বছরের অশক্ত বাদশাকে বার্মায় অন্তরীণ করে রাখে। সেখানেই তিনি রেঙ্গুনে মারা যান ১৮৬২ সালের নভেম্বরে। মর্মাহত বাদশা অতি দুঃখে লিখেছিলেন—

“হ্যায় কিতনা বদ নসিব জাফর, দাফনকে লিয়ে

দো গজ জমিন ভি মিল না সকি কু-ই-ইয়ার মে।”

তথ্যসূত্র :

  1. Majumdar, R.C. : British Paramountcy and Indian Renaissance part 1. General Editor. Bharatiya Vidya Bhavan. Bombay.
  2. Dalrymple, William. The Last Mughal, The Fall of A Dynasty Delhi 1857. Vintage Books. N.Y. March 2008.