সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

মোবাইলে দিয়ে রাখা অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙল সাম্যর। মাথা ভার হয়ে আছে। এবার থেকে রাতে এক পেগ কমাতে হবে। অফিসে আজ ইমপর্টেন্ট মিটিং আছে। হ্যাংওভারটা থেকে গেলে বড় সমস্যায় পড়ে যেতে হয়। ঘরের এসিটা অফ করে ওয়াশরুমে যায় সাম্য।

সাদা ধবধবে কমোডের সামনে দাঁড়িয়ে সাম্য পেচ্ছাপ সারে। মুখে-চোখে জল দিয়ে বেরিয়ে আসে। কী একটা যেন মিসিং মনে হচ্ছে। ফিলিং লস্ট।  বউ মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে বলে কি? সে তো অনেক দিনই গেছে। এরকম অনুভূতি আগে কখনও হয়নি।

দরজা ফাঁক করে গোবিন্দ মুখ বাড়ায়। বলে, ‘চা দেব কি?’

‘না, একটু পরে দে। দাড়িটা কেটে নিই। খাবার রেডি কর। আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোব।’

ঘাড় নেড়ে গোবিন্দ দরজা ভেজিয়ে চলে যায়। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার টেনে শেভিং কিট বার করতে থাকে সাম্য। অনু, মানে বউ অন্বেষা ঘরে দাড়ি কাটা পছন্দ করত না। বলত, ‘বাথরুমে যাও। ঘরে দাড়ি কাটলে আমার কেমন জানি গা ঘিনঘিন করে।’ সাম্যর আবার ওয়াশরুমের আয়নায় পোষায় না। বড্ড ছোট। নিজেকে ভালো করে দেখা যায় না। এই নিয়ে প্রায়ই খটাখটি। এরকম আরও সব ফালতু ব্যাপারে আপত্তি ছিল অনুর। এখন আর সেসব মানতে হয় না। বউ চলে যাওয়ার এই অ্যাডভান্টেজটা বড় নির্মল।

আয়নার সামনে দাঁড়ায় সাম্য। নিজের গালে হাত বোলাতে গিয়ে চমকে ওঠে, এ কী, আমি কোথায়?

আয়নায় সাম্যকে দেখা যাচ্ছে না! তা হলে কি ঘুমচোখে অন্য কোথায়ও দাঁড়িয়েছে? ঘরের চারপাশে চোখ বোলায় সাম্য। না, সব ঠিকই আছে। এরকম হচ্ছে কেন তবে? আবার আয়নার দিকে তাকায়। না, তাকে দেখা যাচ্ছে না। ঘরের আর সব কিছুই দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা কী হল? স্বপ্ন নয় তো? এখনও কি ঘুমিয়ে আছে সাম্য?

বিছানার দিকে তাকায়। কই, সে তো শুয়ে নেই। হার্টবিট বাড়ছে সাম্যর। আয়নাটা হাত দিয়ে স্পর্শ করে। হ্যাঁ, এটা আয়নাই। পায়ের তলার মাটি সরতে থাকে। কীরকম যেন সব হারিয়ে যাওয়ার ফিলিং। এই ফিলিংটাই অল্প করে এসেছিল ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর সময়। সেটা অনু বা মেয়ের জন্য নয়। চোখে-মুখে জল দেওয়ার সময় ওয়াশরুমের ছোট আয়নায় নিজেকে দেখতে পায়নি সাম্য। তখন ব্যাপারটা নোটিশ করেনি। কিন্তু এই অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটছে কীভাবে? সাম্য অন্ধ হয়েও যায়নি। ঘরের সব কিছু দেখতে পাচ্ছে। হাত-পাও দেখা যাচ্ছে নিজের। শুধু আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না। এটা মৃত্যুর পরবর্তী অধ্যায় নয় তো? না, না, তা কী করে হবে? একটু আগে গোবিন্দ চা দেবে কিনা জেনে গেল। না কি সেটাও কোনও ভ্রান্তি?  সাম্যর ফাঁকা ফাঁকা লাগে বুক। ঠিক চিৎকার নয়, প্রায় আর্তনাদের মতো সাম্য ডেকে ওঠে। ‘গোবিন্দ! গোবিন্দ!’

ডাকার পরই মাথায় আসে, গোবিন্দকে ব্যাপারটা বুঝতে দেওয়া চলবে না। এই ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সের ওর বন্ধুদের ঘটনাটা বলে দিতে পারে। তারপর সেখান থেকে ছড়াবে।

গোবিন্দ চলে এসেছে ঘরে। উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে দাদাবাবু?’

গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে সাম্য বলে, ‘আয়নাটা একবার দ্যাখ তো। কোনও গোলমাল দেখতে পাচ্ছিস?’

গোবিন্দ আয়নার সামনে এল। খুঁটিয়ে দেখে বলল, ‘না, কোনও গোলমাল দেখছি না। ঠিকই আছে।’

সাম্য গোবিন্দর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। গোবিন্দর যখন কোনও খটকা লাগল না, তার মানে দেখতে পাচ্ছে সাম্যকে। শুধু সাম্যই পাচ্ছে না। সাম্য গোবিন্দকে বলে, ‘চা-টা নিয়ে আয়। নিউজ পেপারটাও আনবি।’

কী হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বুকটা ধক ধক করে যাচ্ছে সাম্যর। তবে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে এখন। কাউকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। চেনা–পরিচিতজন ব্যাপারটা জানলে কেউ কেউ যেমন উদ্বিগ্ন হবে, অনেকে আবার হাসিঠাট্টাও করবে। সাম্য সো কলড্‌ একজন সফল পুরুষ। পরিচিত মহলে তাকে অনেকে হিংসেও করে।

আপাতত সাম্যর প্রধান সমস্যা, মাথার চুল কীভাবে আঁচড়াবে? দাড়ি না হয় কাটা যাবে সেলুনে। একসময় সাম্যর মাথায় ঘন চুল ছিল। পঁয়তাল্লিশে এসে তার অনেকটাই এখন হালকা হয়েছে। কায়দা করে আঁচড়ে সাম্য চুলটা ভরাট দেখানোর চেষ্টা করে। এখন কায়দা করবে কী করে? মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে সাম্যর। আজ অফিস ছুটি নেবে কি? প্রবলেম আছে। প্রচুর জবাবদিহি করতে হবে। ইমপর্টেন্ট মিটিং আজ। কোম্পানির বিজনেস ভালো যাচ্ছে না। প্রায়ই মিটিং করতে হচ্ছে কোম্পানির মাথারা মিলে। সাম্য জুনিয়র ম্যানেজার। তাকে তো থাকতেই হবে মিটিঙে। অফিসে কিছুতেই তার এই অবস্থার কথা বুঝতে দেওয়া যাবে না। ম্যানেজার পদটার জন্য তাকে আনফিট মনে করবে কোম্পানি। এখন ভাবতে হবে এই অবস্থা থেকে বেরোনোর উপায়টা কী? ফার্স্ট স্টেপ কী হওয়া উচিত?

গোবিন্দ চা নিয়ে ঢোকে ঘরে। সাম্য বিছানায় গিয়ে বসেছিল আগেই। এখন গোবিন্দর হাত থেকে চা নেয়। গোবিন্দ বলে, ‘আয়নায় কী সমস্যা হয়েছে?’

‘কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেছে।’ চায়ে চুমুক দিয়ে বলে সাম্য।

গোবিন্দ বলল, ‘তা তো হবেই। অনেক দিন তো হল। বউদি থাকলে ঠিক পালটে নিত। গোটা ড্রেসিং টেবিলই কিনে আনত হয়তো।’

সাম্য ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকায়। এটা অনুরই কেনা। অনু তখন প্রফেসরি করছে। সাম্য ছিল সামান্য প্রোগ্রামার অ্যানালিস্ট। আয়নাটা কি প্রতিশোধ নিচ্ছে অনুর হয়ে?

 দুই

অফিসটা মোটামুটি সামলে নিয়েছে সাম্য। এখন গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছে কসবায়। চোখ দেখাবে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল অফিসে বসেই। এই ডাক্তারের কাছেই চোখ দেখায় সাম্য। বয়স্ক মানুষ, নাম আছে খুব। আন্তরিক ব্যবহার। গত আধ ঘণ্টা ধরে চেম্বারে বসে আছে সাম্য। ভাবছে, এটা চোখেরই প্রবলেম তো?

চোখ ছাড়া আর কী? দেখারই সমস্যা হচ্ছে যেখানে। তবে শুধু নিজেকে আয়নায় দেখতে না পাওয়াটা আশ্চর্য ব্যাপার! এরকম রোগ কারও কখনও হয়েছে বলে শোনেনি সাম্য। হয়তো হয়, সাম্যর মতোই সেই রুগি নিজের রোগটা চেপে যায়। যেমন সাম্য চেপে আছে সকাল থেকে। আন্দাজে চুল আঁচড়েছে, দাড়ি কেটেছে সেলুনে। দিব্যি গাড়ি চালিয়ে অফিসে গেছে। শুধু সিনিয়ার ম্যানেজার তড়িৎ সরকার একবার বলল, ‘কী রে, চুলটা ঠিক করে আঁচড়া!’

উত্তরে সাম্য অল্প হেসেছে। যে হাসির কোনও মানে হয় না। নিজেকে আয়নায় দেখতে না পাওয়াতে কনফিডেন্স ক্রমশ ল্যাক করছে। হয়তো তড়িতের মতো আরও অনেক স্টাফেরই সাম্যর হেয়ার স্টাইলটা বেখাপ্পা লেগেছে, কেউ ব্যাপারটা উপেক্ষা করেছে, জুনিয়ররা ভয় পেয়েছে কমেন্ট করতে।

আচ্ছা, চুলটা কি ছোট করে নেবে? আঁচড়ানোর বালাই থাকবে না। পরক্ষণেই সাম্যর মনে হয়, চুল ছোট করার পর তাকে কেমন দেখাবে সেটাও তো দেখতে পাওয়া যাবে না। নিজেকে দিনে একবারও দেখতে না পেলে ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনটা ঘেঁটে যাবে।

‘সাম্য দাশগুপ্ত। সাম্য দাশগুপ্ত কে আছেন?’ মহিলা কণ্ঠের ডাক। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ায় সাম্য।

#         #       #

ডাক্তার সাম্যর মুখের দিকে চেয়ে বসে আছেন। চোখের সমস্ত পরীক্ষা করা হয়ে গেছে। সাম্যর সমস্যা শুনে বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন ডাক্তার। পরীক্ষার পর এখনও কোনও মন্তব্য করেননি।

নীরবতা ভেঙে সাম্য জিজ্ঞেস করল, ‘কী বুঝলেন ডাক্তারবাবু?’

‘দেখুন, আমার তো মনে হচ্ছে এটা চোখের প্রবলেম নয়। আপনার চশমার পাওয়ার, ভিশন সবই ঠিক আছে। ব্রেন স্ক্যান যে করতে বলব, সেটাও বলা যাচ্ছে না। আপনি দেখছেন সবই ঠিকঠাক, শুধু আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন না।’

‘দ্যাট মিন্‌স, এরকম পেশেন্ট আপনার কাছে প্রথম?’

‘শুধু তাই নয়, আমার ডাক্তারি শিক্ষায় এরকম পেশেন্টের রেফারেন্স আমি পাইনি। যদি সত্যিই এটা চোখের রোগ হয়, তা হলে অবশ্যই বিরলতম।’

‘যদি সত্যিই মানে! আপনার মনে হচ্ছে এটা চোখের প্রবলেম নাও হতে পারে।’

‘এগজ্যাক্টলি। যদি কিছু না মনে করেন, আপনাকে একটা ব্যাপার সাজেস্ট করব?’

‘করুন না, প্লিজ।’

‘আপনি কোনও ভাল সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কনসাল্ট করুন।’

‘তার মানে এটা সাইকিয়াট্রিক প্রবলেম?’

‘আই অ্যাম নট সিওর। তবু মনে হচ্ছে যেন একবার কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া ভাল। নাউ ইট্‌স আপ টু ইউ।’

সাম্য আন্দাজ করতে পারছে তার মুখটা থমথমে হয়ে গেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ফিজ চেম্বারে ঢোকার আগেই দিয়ে এসেছে। দরজার দিকে ঘুরতে যাবে, ডাক্তারবাবু বলে ওঠেন, ‘আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করছি, এই রোগটা যেহেতু খুবই রেয়ার, সেরে ওঠার পর আমাকে প্লিজ বলে যাবেন কীভাবে রিকভার হল।’

সাম্য ঘাড় নাড়ল। মনে মনে বলল, আদৌ কি সারবে? চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল সে।

#        #         #

নিজের ফ্ল্যাটে চলে এসেছে সাম্য। চোখের ডাক্তারের কথাগুলো তাকে এত অন্যমনস্ক রেখেছিল, ঠিকমতো ড্রাইভ করে উঠতে পারছিল না। অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারত। কমপ্লেক্সের গ্যারেজে গাড়ি রেখে লিফ্‌টে ঢুকেই সাম্য চমকে উঠেছিল, লিফ্‌টের ভিতরের তিন দেওয়ালের রিফ্লেক্টরে তাকে দেখা যাচ্ছে না। নিজেকে মনে হচ্ছিল শরীরহীন, অনেকটা আত্মার মতো। সকালে ওই লিফ্‌টেই নেমেছে। তখন ব্যাপারটা লক্ষ করেনি। আরও কয়েকজন বাসিন্দা ছিল লিফ্‌টে, আলোও ছিল প্রচুর।

নাইন্‌থ ফ্লোরে এসে নিজের ফ্ল্যাটের ডোরবেল টিপেছিল সাম্য। দরজা খুলে গোবিন্দ চোখ কুঁচকে বলেছিল, ‘বাইরে কি ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে?’

সাম্য বুঝেছিল তার চেহারা দেখে কথাটা বলছে গোবিন্দ। কোনও উত্তর দেয়নি সে। গোবিন্দ গেল জানলার কাছে, বাইরেটা দেখতে। সাম্য ঢুকেছিল ওয়াশরুমে।

অনেকক্ষণ ধরে ব্যালকনিতে বসে রয়েছে সাম্য। সামনে অন্ধকার ঢাকা রাজারহাটের বিস্তীর্ণ প্রান্তর।  অন্যদিন অফিস থেকে ফিরে ড্রিঙ্কস নিয়ে বসে পড়ে, সামনে চলে টিভি। আজ কিছুই ইচ্ছে করছে না করতে। এই রোগটা কীভাবে সারবে বুঝে উঠতে পারছে না সাম্য। কোন ধরনের ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত? কারও সঙ্গে একটু আলোচনা করতে পারলে ভাল হত। কার সঙ্গে করবে আলোচনা? সেরকম কোনও কাছের মানুষের কথা মনে পড়ছে না, যে কথাটা পাঁচকান করবে না। সাম্যর এই দশায় হয়তো মজাই পাবে নিকটজন। সাম্য যে একসময়ের ঘনিষ্টজনদের খোঁজই রাখে না আর। তাদের জগতের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারে না।

পর্দা সরিয়ে গোবিন্দ এল ব্যালকনিতে। বলল, ‘দাদাবাবু, আর এক কাপ চা দেব, না কি ড্রিঙ্কস সাজিয়ে দেব এখানেই?’

‘না, আমিই যাচ্ছি ভিতরে।’ বলে সাম্য রকিং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতের শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা টুসকি মেরে ব্যালকনির বাইরে ফেলে। মাটিতে পড়তে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা দিকে তাকিয়ে কী যেন মনে পড়তে চায়? কী?

এই রোগটার চিন্তাতেই হয়তো মাথা খারাপ হয়ে যাবে, মাথা খারাপের জন্য রোগটা হয়নি। পকেট থেকে ফোন সেট বার করে সাম্য। কাউকে একটা জানাতেই হবে সমস্যাটার কথা। অনেকটা অজান্তেই অনুর নম্বরে কল করে বসে। কেটে দেবে কি? রিং হচ্ছে। ফোন সেট কানে নেয় সাম্য। অপর প্রান্তে অনু বলে, ‘কেন ফোন করছ?’

‘একটা বিচ্ছিরি ঝামেলায় পড়ে গেছি অনু।’

‘আমি শুনে কী করব?’

‘তোমাকে শুনতেই হবে। বিরাট ক্রাইসিসে পড়ে গেছি। বলতে পার জীবনমরণ সমস্যা।’

‘ক’পেগ চলছে এখন?’

‘বিশ্বাস করো, আজ মদ নিয়ে বসিইনি।’

‘ঠিক আছে বলো, কী বলার আছে?’

সাম্য বলতে শুরু করে সকাল থেকে আজ যা যা ঘটেছে। চোখের ডাক্তারের সাজেশনটাও বলল। তারপর অনুকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার কী মনে হয়, এই রোগটা মানসিক?’

ওপ্রান্ত বেশ খানিকক্ষণ নীরব থাকে। এবার বলে ওঠে অনু, ‘তোমার জীবনে এই ধরনের কিছু ঘটবে আমি জানতাম। নিজের সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণ করে চলেছ তুমি। খালি উন্নতি, আরও উন্নতি চাই চাকরিতে। সকাল থেকে রাত শুধু অফিস, দিনের পর দিন ট্যুরে থেকেছ। বউ-মেয়ের খোঁজ নাওনি ফোনে। আমাদের সময় দাওনি। অথচ কোম্পানির স্বার্থে অন্য কোম্পানির মেয়ে ডিরেক্টরের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছ গোয়ায়…’

‘স্টপ ইট। সেই এক ঘ্যান ঘ্যান। তুমি শুধু বলো এই রোগটা মানসিক কি না?’

গলা তোলে অনু। বলে, ‘কী করে জানব। আমি কি ডাক্তার?’

চুপ করে যায় সাম্য। এবার অনু গলা নামিয়ে বলে, ‘আমি বলি কি, তুমি তোমার মতো হয়ে ওঠো। কলেজের জি এস যে সাম্যদার স্পিচ শুনে আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম। যার এক ইশারায় আমরা যে কোনও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তাম, তার মতো। যার বাড়িভর্তি বই। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস তার কণ্ঠস্থ। স্বদেশি, বিদেশি সাহিত্যে যার অনর্গল আনাগোনা। সেই সাম্যদার এখনও মনে আছে সেসব কিছু?’

কথা ঘোরায় সাম্য। বলে, ‘একবার রুমনিকে ফোনটা দাও না। কথা বলি।’

‘রুমনি ঘুমিয়ে পড়েছে।’

‘বাজে কথা বলো না। এত তাড়াতাড়ি ঘুমোয় না রুমনি।’

‘না, ঘুমোয়নি রুমনি, তবে তোমার সঙ্গে এখন কথা বলতে দেব না। খুবই রেস্টলেস, ইরেলেভেন্ট কথা বলছ তুমি। রুমনি ঘাবড়ে যাবে।’

ফোনটা সাম্যই কাটল আগে। অন্বেষাকে কাটতে দিল না।

তিন

আজকের দিনটার জন্য অফিসে ছুটি চেয়েছিল সাম্য। সিনিয়র তড়িৎ সরকার বলল, ‘কী করে বলছিস ছুটির কথা! দেখছিস কোম্পানি একটা টারময়েলের মধ্য দিয়ে চলেছে, যখন তখন মিটিং ডাকছে। তুই এক কাজ কর, খানিকটা পরে ঢোক অফিসে।’

তাই মেনে নিয়েছে সাম্য। সকালের খাওয়াদাওয়া সেরে অফিস বেরোনোর সময়ে বেরিয়েছে। গাড়ি চালিয়েছে সিঁথিতে নিজেদের বাড়ির দিকে। মাঝে একবার সেলুনে ঢুকে শেভ করে নিয়েছে। আন্দাজে আঁচড়িয়েছে চুল। কাল ফোনে বাড়ির কথা একবার তুলেছিল অনু। তারপর থেকেই সিঁথির বাড়িটা ভীষণ টানছিল। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। বোধহয় আগের বিজয়া দশমী লাস্ট। বাড়ি যাওয়ার পিছনে কারণও আছে। কেন জানি সাম্যর মনে হচ্ছে বাড়ির আয়নায় তাকে দেখা যাবে। কতদিনের পুরনো আয়না! সাম্যর জন্মের আগের। বাবা-মায়ের ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়না। সে কি চিনতে ভুল করবে সাম্যকে? সেই ছোট থেকে সাম্যকে দেখছে। সাম্য জানে এই প্রত্যাশার পিছনে কোনও লজিক নেই। না থাক। তার রোগটাও রীতিমতো আজব ধরনের। সাম্যর জীবন এখন রিয়েলিটি, লজিকের বাইরে।

সিঁথি পৌঁছে গেল সাম্য। এ গলি ও গলি ঘুরে ঠাকুরদার বানানো সত্তর বছর আগের বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করাল। বাড়ির হলুদ রং খসে পড়ে প্রায় সাদা হয়ে এসেছে। বাবা বাড়ি সারাইয়ের টাকাপয়সা চায় না সাম্যর কাছে। ভাই নিজের সামর্থ মতো সারিয়ে নেয়।

সদর দরজা খোলা। খোলাই থাকে। একটা বিড়াল বেরিয়ে এল। থমকে দাঁড়াল সাম্যকে দেখে। এবার নেমে এল রাস্তায়। সদর পেরিয়ে বাড়ির উঠোনে পা রাখল সাম্য। বাবা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে। বড়ছেলেকে দেখে হাঁক পাড়লেন, ‘হ্যাঁ গো, দ্যাখো কে এসেছে!’

মা বেরিয়ে এল বারান্দায়। সাম্যকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছে। সাম্য হাসছে। বুঝতে পারছে হাসিটা ঠিকমতো হচ্ছে না। মা বলে, ‘কী রে, হঠাৎ তুই! একেবারে না বলে কয়ে!’

বারান্দায় উঠে এল সাম্য। বলল, ‘আজ অফিসে দেরি করে গেলেও হবে। তাই ভাবলাম একবার তোমাদের দেখে যাই।’

‘সে ভাল করেছিস। তা তুই চুলটা এভাবে আঁচড়েছিস কেন? নাকি আঁচড়াসনি ঠিক করে।’

চেষ্টা না করেই সাম্য সুযোগ পেয়ে গেল বাড়ির আয়নার সামনে যাওয়ার। বলে উঠল, ‘সে কী, চুল আঁচড়াতেই ভুলে গেলাম! দেখি তো।’

জুতো ছেড়ে বাবা-মা’র ঘরে ঢুকে গেল সাম্য। সেই পুরনো ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। না, দেখা যাচ্ছে না আয়নায়। বুকে কী একটা যেন চাপ মারছে! কষ্ট বোধহয়। আয়নার সামনে থেকে সরে আসে সাম্য। বাড়ির আয়নাটার ওপর ভীষণ অভিমান হচ্ছে, এত তাড়াতাড়ি তাকে ভুলে গেল!

বাবা বসে আছে ইজিচেয়ারে। পাশে বেতের মোড়া, সাম্য বসল। কাগজ থেকে মুখ তুলে বাবা বলল, ‘তুমি কি সত্যিই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছ? না কি অন্য কোনও কারণ?’

‘কেন একথা বলছ? কম আসি বলে বলছ?’

‘না, তা নয়। তোমার চেহারার মধ্যে একটা হয়রান ভাব দেখছি। চাকরির জায়গা ঠিক আছে তো?’

‘ঠিক আছে। কোনও সমস্যা নেই। হঠাৎ চাকরির কথা মাথায় এল কেন?’

‘আসলে কর্পোরেট হাউজ নিয়ে আজকাল যা শুনি, প্রায়ই নাকি চাকরি চলে যায়।’

‘ঠিকই শোনো। তবে যাদের চাকরি চলে যায় তাদের মধ্যে আমি পড়ি না। বরং কাদের চাকরি যাবে সেটা ঠিক করি। একটু ভুল বললাম। কোম্পানি আমাদের ঠিক করতে বলে।’

আপনজনের হাসি নিয়ে বারান্দায় আসে ভাইয়ের বউ। দেখে মনে হচ্ছে রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। বলল, ‘দাদা, জলখাবার হচ্ছে। খেয়ে যাবেন।’

‘না গো, বাড়ি থেকে খেয়ে বেরিয়েছি। তুমি বরং এক কাপ চা দিয়ো।’

ঘাড় হেলিয়ে ফিরে গেল ভাইবউ। সাম্য বাবাকে বলে, ‘বাড়িটা তো এবার রং করাতে হবে। রং সবই প্রায় ঝরে গেছে। কিছু টাকা দিয়ে যাই?’

‘তুমি টাকা দিয়ে কী করবে! নিজে তো এসে থাকবে না। তোমার টাকা নিলে ভাইয়ের মানে লাগতে পারে। তার থেকে সে যতটা পারছে করুক।’

‘এসে থাকতেও তো পারি মাঝে মাঝে।’

‘তা পারো। আমি তো তোমার ভাইয়ের নামে পুরো বাড়িটা লিখে দিইনি। তবে কিনা তুমি একা এসে থাকলে আমার যতটা না ভালো লাগবে, আমার দিদিভাই, বউমাকে নিয়ে এলে আরও ভালো লাগত। কতদিন দেখিনি দিদিভাইকে!’

এর উত্তরে কিছুই বলার নেই সাম্যর। কথা ঘোরাল সে। বলল, ‘আমার ঘরটায় একবার ঘুরে আসি।’

‘যাও। একইরকম আছে। তোমার বোন-জামাই এলে থাকে। ওদের বাচ্চাদুটো আমাদের সঙ্গে।’

তথ্যটা জানে সাম্য। বোনের বরের বেঙ্গালুরুতে চাকরি, সংসার পেতেছে ওখানেই। বাবার সামনে থেকে উঠে গিয়ে সাম্য সিঁড়ি ভেঙে নিজের দোতলার ঘরের পৌঁছয়। ভেজানো আছে দরজা। ঠেলে খোলে। আশা করেছিল অনুর কথামতো এ ঘরে প্রচুর বই ছড়ানো ছেটানো অবস্থায় দেখবে। হয়তো কলেজবেলার নিজেকেও দেখবে। গন্ধ পাবে পুরনো দিনের। সেসব কিছুই হল না। ঘর একেবারেই পরিপাটি। কে যেন নিপুণ হাতে সাম্যর অতীতটা মুছে দিয়েছে।

দমে যাওয়া মন নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে বাবার কাছে ফেরে সাম্য। ভাইবউ পলি চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাপ হাতে দিয়ে বলে, ‘কী ব্যাপার দাদা, মুখটা এমন শুকনো করে রেখেছেন কেন?’

অনেক কষ্টে মুখে হাসি আনে সাম্য। পলি বলে, ‘দাদা, আপনাকে কিন্তু নিউ হেয়ার স্টাইলে দারুণ লাগছে! একদম লেটেস্ট!’

এবার সত্যিই হেসে ফেলে সাম্য। নিজের ওপর। ফিরে গেল পলি। কাপ হাতে মোড়ায় বসে সাম্য বাবাকে বলে, ‘আচ্ছা বাবা, আমাদের বংশে কেউ কি পাগল ছিল?’

‘আমার তো জানা নেই। তবে তুমি কেন জিজ্ঞেস করছ বুঝতে পারছি। নিজের মধ্যে এমন কিছু সিম্পটম দেখছ, যেটাকে পাগলামি বলে মনে হচ্ছে। বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছ তুমি। তবে আমি বলব ওগুলো পাগলামির লক্ষণ নয়। তোমার অফিসের কাজের চাপের উপসর্গ। ওরা যে বেতন দেয়, তার তিনগুণ উসুল করে নেয়। ওটাই ওদের লাভ। আমার মনে হয় চাকরিটা এবার ছাড়া উচিত তোমার। ছোটখাটো হালকা কাজ বেছে নাও। এতদিন তো অনেক রোজগার করছ।’

‘কাজের চাপ তো নিতেই হবে বাবা। সবাই নিচ্ছে। মানুষ নিজেই জানে না তার কাজ করার ক্ষমতা কতটা। অসীম ক্ষমতা মানুষের।’

বাবা চুপ করে রইল। হঠাৎ গলা তুলে বলতে লাগল, ‘আয়! আয়! আয় না…’

বিড়ালকে ডাকছে বাবা। যে বিড়ালটা সাম্য বাড়িতে ঢোকার সময় বেরোচ্ছিল। এখন সদরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে।

চার

শনি-রবি ছুটি ধরে গত ছ’দিন অফিসে যায়নি সাম্য। দাড়িও কাটেনি। অফিসে মেল করে জানিয়ে দিয়েছে তার হাই ফিভার। ডিরেক্টর, অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর, সিনিয়র ম্যানেজার ফোন করে জানতে চেয়েছে শরীরের হাল-হকিকত এবং যত দ্রুত সম্ভব কাজে যোগ দিতে বলেছে। সাম্যকে ছাড়া নাকি অনেক অসুবিধে হচ্ছে কোম্পানির।

কথাগুলো শোনার হয় তাই শুনে গেছে সাম্য। অফিসে যাওয়ার মেজাজ পায়নি। কিন্তু মেজাজ তো আনতেই হবে। দিন-রাত এক করে আজ সে জুনিয়র ম্যানেজার। আরও অনেক উঁচুতে উঠতে হবে। কোম্পানিতে তার ট্র্যাক রেকর্ডও বেশ ভাল। তাই অনেক ভেবে আজ সে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এসেছে। এঁর একটা আর্টিকেল বড় ম্যাগাজিনে পড়েছিল, সেই রেফারেন্সে চলে আসা। বয়স্ক মানুষ, অত্যন্ত ভাল ব্যবহার। সাম্যর সমস্যা এবং কী চাকরি করে, বিবাহিত কিনা জেনে নিয়ে উনি ব্লাড প্রেশার চেক করলেন। চোখের ওপর আলো ফেলে দেখলেন কিছু, তারপর বললেন, ‘শারীরিকভাবে আপনি মোটামুটি সুস্থই আছেন। তবু কিছু রুটিন পরীক্ষা দিচ্ছি। ওগুলো দেখার পর মূল চিকিৎসা শুরু করব।’

মাথা হেলিয়েছিল সাম্য। ডাক্তারবাবু কী কী পরীক্ষা করতে হবে লিখছেন এখন প্রেসক্রিপশনে। চেম্বারে ঢোকার পর থেকেই আলো ভীষণ কম লাগছে সাম্যর। মানসিক রোগীদের কম আলোয় দেখাই কি নিয়ম?

লেখা থামালেন ডাক্তারবাবু। মুখ তুলে জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি ড্রিঙ্ক করেন? সিগারেট?’

ঘাড় হেলায় সাম্য। ফের ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করেন, ‘ড্রিঙ্ক কি রেগুলার না অকেশনাল?’

‘রেগুলার।’

ওদুটোই কমাতে হবে। ছেড়ে দিতে পারলে সব চেয়ে ভালো। ট্রাই করুন। আমি আপাতত একটা মাত্র ওষুধ দিচ্ছি। স্ট্রেস রিলিফের ওষুধ। প্যাথোলজিকাল টেস্টগুলো করে আনুন। তারপর দেখছি।’

‘আচ্ছা ডাক্তারবাবু, আমার মতো পেশেন্ট কি আপনার কাছে আসে? এই যারা আয়নায় নিজেদের দেখতে পায় না।’

‘না, আপনার মতো সমস্যা নিয়ে আজ অবধি কেউ আসেনি। তবে মেন্টাল ডিজঅর্ডারের সিম্পটম নির্দিষ্টভাবে কিছু হয় না। বিভিন্ন পেশেন্টের ক্ষেত্রে সিম্পটমও সব আলাদা।’

‘আপনি তা হলে বলছেন আমার এটা মেন্টাল…?’

‘না, এখনও আমি নিশ্চিত নই। তবে আপনি যে খুব অ্যাঙ্গজাইটির মধ্যে আছেন সেটা বুঝতে পারছি। তাই স্ট্রেস রিলিফের ওষুধটা দিলাম।’ বলে একটু থামলেন ডাক্তারবাবু। ফের শুরু করলেন, ‘আপনার যা চাকরি শুনলাম, তাতে ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিসে তো পড়ার কথা নয়। বড় কোনও লোন আছে কি, যেটা আপনাকে  দুশ্চিন্তায় রেখেছে?’

মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝায় সাম্য। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করেন, ‘কোনও রিলেশন, যা সমাজের চোখে অবৈধ?’

আবারও সাম্য মাথা নাড়ল। ডাক্তারবাবু পরের প্রশ্নে গেলেন, ‘গত এক বছরের মধ্যে কোনও শকিং ইনসিডেন্ট ঘটেছে আপনার জীবনে?’

সাম্য ভাবতে থাকে। খানিকক্ষণ ভেবে বলে, ‘না, সেরকম তো কিছু মনে পড়ছে না। স্ত্রী আমার সঙ্গে থাকে না। মেয়ে নিয়ে চলে গেছে। গোড়াতেই আপনাকে বলেছি। সে ঘটনা প্রায় এক বছরের হতে চলল। আপসেট অবশ্যই হয়েছিলাম। এখন অ্যাডজাস্ট হয়ে গেছে। ইনফ্যাক্ট, আমার একা থাকতেই বেশি ভালো লাগে এখন। আর কিছু শকিং হয়নি।’

‘ঠিক আছে।’ বলে ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশনে আরও কীসব লিখলেন। তারপর সেটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওষুধটা আজ থেকেই চালু করে দিন।’

#        #         #

ট্যাবলেটটা কিনে ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছে সাম্য। ব্যালকনিতে বসেছে ড্রিঙ্কস নিয়ে। সিগারেট খেতে খেতে ভাবছে গত এক বছরের মধ্যে শকিং কোনও ঘটনার কথা, যা সে ভুলে গেছে। না কি অনু, রুমনির চলে যাওয়াটা গভীরভাবে দাগ কেটে আছে তার মনে? সাইকিয়াট্রিস্ট নতুন একটা চিন্তা ঢুকিয়ে দিলেন মাথায়। ছুটির ক’টা দিন সাম্য শুধু নিজের ছায়া খুঁজেছে আয়নায়। সারাটা দিন ফ্ল্যাটে থাকত, সন্ধেবেলা গাড়ি ছাড়া বেরোত রাস্তায়। বাসে, অটোতে চেপে বিভিন্ন মার্কেট এলাকায় গিয়ে নানান দোকানের আয়নায়, শো-কেসে নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজত। আজও খুঁজেছে। ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল গাড়ি ছাড়াই। এখনও নিজেকে পেল না আয়নায়। মাঝে একদিন ভুল করে শপিং মলে শার্ট কিনতে গিয়েছিল সাম্য। শার্ট নিয়ে ট্রায়ালরুমে ঢুকে পুরোপুরি ‘নেই’ হয়ে গিয়েছিল সে। নিজেকে দেখা যাচ্ছে না। শার্টটা ফিট করছে কিনা বোঝার কোনও উপায় নেই। সাম্য টের পেয়েছিল আরও অনেক, প্রচুর সমস্যা অপেক্ষা করছে তার জন্য। এর থেকে রেহাই পাবে কবে?

হাতের সিগারেটটা ব্যালকনির বাইরে ছুড়ে দিল সাম্য। অন্ধকারের মধ্যে জ্বলন্ত সিগারেটটা নীচে পড়তে পড়তে যেন বলে উঠল, স্যার সব ফিনিশ হয়ে গেল…

রকিং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সাম্য। সিগারেটটা এখনও মাটিতে পড়েনি। দশতলা থেকে নীচে পড়তে সময় লাগবে। কার কথা মনে পড়ল সাম্যর? শুভায়ু! গালে অল্প দাড়ি। শখ করে রাখা। কোম্পানির প্রোগ্রামার অ্যানালিস্ট। বেশি দিন হয়নি সে সাম্যর আন্ডারে জয়েন করেছিল। একদিন অফিসের লবিতে মুখোমুখি দেখা। সাম্য মজা করে বলেছিল, ‘কী রে ব্যাটা, দাড়ি কবে কাটবি? কর্পোরেট অফিসে এসব মানায়!’

শুভায়ু হেসে বলেছিল, ‘প্রেমিকার বারণ আছে স্যার।’

‘ঢপ মারলি? দাড়িটা রাখার জন্য ভাল অজুহাত খাড়া করেছিস।’ প্রশংসার সুরে বলেছিল সাম্য।

শুভায়ু মিটিমিটি হেসে বলেছিল, ‘এইজন্যই আপনি আমার বস। কীরকম চট করে ধরে ফেললেন!’

এরপর আর শুভায়ুর সঙ্গে ঠাট্টা-মজার কথা হয়নি। কাজের কথা হত। ছেলেটাকে ভালো লাগত সাম্যর। খুব চটপটে, হাসিখুশি। বেশ কিছুদিন পর আবার সেই লবিতেই দেখা। অবশ্য দেখা বলা ভুল হবে। শুভায়ু সাম্যর জন্যই অপেক্ষা করছিল। দাড়ি কেটে ফেলেছে। মুখে গভীর বিষাদ। সাম্য বলেছিল, ‘বাঃ, একেবারে ক্লিন শেভেন! কী ব্যাপার?’

‘দাড়ি এ অফিসে মানায় না স্যার।’

‘যাক, বুঝেছিস তা হলে। না কি নিজেই বদলে যাচ্ছিস কর্পোরেট হাওয়ায়!’

কথাটা কানে না নিয়ে শুভায়ু বলেছিল, ‘স্যার, সত্যিই আমার প্রেমিকা আছে। আগের বার মজা করেছিলাম। আমাদের বিয়ের ডেটও ঠিক হয়ে গেছে। অনেক টাকা লোন করে ফ্ল্যাট নিয়েছি কসবায়। এখন শুনেছি অফিসের ছাঁটাইয়ের লিস্টে আমার নাম আছে। প্লিজ, একটা কিছু করুন স্যার। আমি একেবারে শেষ হয়ে যাব।’

সাম্য শুভায়ুর কাঁধে হাত রেখেছিল। বলেছিল, ‘দাঁড়া দেখছি, কী করা যায়।’

কিছুই করেনি সাম্য। করার নেইও কিছু। কোম্পানির ব্যবসায় কস্ট কার্টেলের জন্য সাম্যর মতো হায়ার পোস্টের লোকেরাই লোক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর একটা দুঃখের খবর আসে অফিসে। শুভায়ু তার কসবার ফ্ল্যাট থেকে ঝাঁপ মেরে দিয়েছে। একদম স্পট ডেড। ক’দিন মনটা অফিসের সকলেরই খারাপ ছিল। তারপর যা হয়, শুভায়ুকে ভুলে গেল সবাই। এখন কেন মনে পড়ল সাম্যর?

পাঁচ

আজ অফিসে এসেছে সাম্য। ডিরেক্টর সান্যাল কাল ফোন করেছিলেন। বললেন, ‘দাশগুপ্ত, কাল একবার যে করে হোক এসো অফিসে। একটা ভাইটাল মিটিং আছে। তোমার কন্ট্রিবিউশন ভীষণ দরকার। সি ই ও আসছেন মুম্বাই থেকে।’

মিটিং আবার কিসের, ফের হয়তো এক লট স্টাফ কমাবে। অবশ্য অন্য কারণও থাকতে পারে।

আজ অফিসের জন্য বেরিয়ে সাম্য সেলুনে গিয়ে দাড়ি কেটেছে। চুল আঁচড়েছে আন্দাজমতো। অফিসে এসে থেকে একটু অস্থিরতায় ভুগছে সে। সি ই ও এসেছেন বলে কথা! সাম্য ঠিকঠাক পারফর্ম করতে পারবে তো মিটিঙে? সি ই ও ধরে ফেলবেন না তো সাম্যর মনের আগোছালো ভাবটা? বারবার মনে হচ্ছে চুলটা ঠিক করে আঁচড়াতে পারলে ভালো হত। বেশ ক’বার ওয়াশরুমে গেছে। বৃথাই যাওয়া। ওয়াশরুমের আয়নায় নিজেকে দেখা যায়নি।

চেয়ার ছেড়ে কেবিনের বাইরে এল সাম্য। একবার ডিরেক্টর সান্যালের কাছে গেলে ভাল হয়। মিটিংটা নিয়ে একটু হোমওয়ার্ক করা উচিত।

অলকেশ সান্যালের কেবিনের ডোর ঠেলতেই থমকে যায় সাম্যর পা। এ কী দেখছে সে ঘরের মধ্যে! এখানে কোম্পানির সব মাথারা। সি ই ও, দু’জন ডিরেক্টর, অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর দু’জন, সিনিয়র ম্যানেজার, এইচ আর হেড… সকলেই একে অপরের মাথা আঁচড়ে দিচ্ছে চিরুনি দিয়ে। তারা সাম্যর উপস্থিতি টের পেয়ে ঘাড় ঘোরায়। কৌতুকভরা তাদের দৃষ্টি। চোখের ভাষায় তারা সাম্যকে ডাকে। তাদের সঙ্গে জয়েন করতে বলে।

ছিটকে পিছিয়ে আসে সাম্য। তড়িঘড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে আসে ফুটপাতে। সে যে গাড়ি এনেছে ভুলেই গেছে। সাম্য প্রায় দৌড়োচ্ছে। না, এ চাকরি সে করতে পারবে না। কিছুতেই না। সাম্য খেয়াল করছে না রাস্তার পাশে দোকানের কাচের শো-কেসে, সিগারেটের দোকানের আয়নায়, আরও নানান কাচে প্রতিফলিত হচ্ছে সে।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ