একসময় মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে শুরু করেছিলেন। পরে নিজের মতো করেই ছোট বাজেটের ছোট ছোট ছবি। আরও পরে তাঁরই তৈরি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ বাংলা সিনেমার জগতে যোগ করল এক নতুন ধারা। পেল জাতীয় পুরস্কার। তবু সেই ছবি তাঁকেই দেখাতে হয়েছে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে। সেখানেও তাঁর উদ্যোগ ব্যতিক্রমী। আরও একটি ছবি ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-র মুক্তি আসন্ন। সিনেমা তৈরির প্রেক্ষাপট, বাংলা সিনেমার সমস্যা ও সংকট, অন্য ধারার সিনেমা বানানোর প্রয়াস ও সম্ভাবনা, নিজের ভাবনাচিন্তার জগৎ এরকম অনেক বিষয় নিয়ে  কথা বললেন চলচ্চিত্র পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য তাঁর সঙ্গে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে সিনেমাটোগ্রাফার সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুজাতা কুণ্ডু।

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবি তৈরি থেকে শুরু করে গোটা জার্নিটা, এমনকি তৈরির আগে থেকে যদি বলো আর একটা হচ্ছে তৈরির পরে এই দেখানোর প্রক্রিয়াটা, মানে নিজেই ঘুরে ঘুরে দেখানো যেটা এখনও পর্যন্ত বাংলায় কেউ করেনি।

তৈরির আগের কিছু পার্ট বলি। আমি কলকাতায় চলে এলাম, ধরো ১৯৯৭ সালে। আমার বাবার বাড়ি তেহট্ট আর মায়ের বাড়ি  বহরমপুর। বহরপুরে আমি বড় হয়েছি। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে নিয়মিত তেহট্ট যেতাম। রুটটা হচ্ছে বহরমপুর থেকে পলাশি হয়ে তেহট্ট যাওয়া আর একটা হচ্ছে দেবগ্রাম দিয়ে। আমি যখন কলকাতায় চলে আসি তখন কলকাতা থেকে তেহট্ট যাওয়ার রুটটা আমি চিনতাম না। কলকাতায় থাকার একটা শেকিনেস ছিল। বছর পাঁচেক ছিল।  থাকার একটুও ইচ্ছে ছিল না। রূপকলা কেন্দ্রে ভর্তি হবার পর ওটা ভাঙে। প্রথম যখন কলকাতা থেকে তেহট্ট যাচ্ছি— সেটা ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-তে আছে,  শিকারপুরের বাস। যদিও আমি শিকারপুরের বাস পাইনি, আমি উঠেছিলাম করিমপুরের বাসে। এবার তেহট্ট যেতে গেলে কোথায় নামতে হবে সেটা আমি খেয়াল করিনি, কখন নির্দিষ্ট বাসস্টপ পেরিয়ে চলে গেছি। হঠাৎ দেখি বলছে নাজিরপুর। ওখানে নেমে ফিরতি বাসে তেহট্ট যেতে হবে। এবার সন্ধে সন্ধে হয়ে গেছে আর আমার পুরো গুলিয়ে গেছে কেসটা। লোকজন কম, জায়গাটা চেনা কিন্তু কিছুই চিনতে পারছি না। ওই যে ফিলিংটা… ওইটা হচ্ছে রুট। ওই যে ভয় পেয়েছিলাম, সেই ভয়টা এখনও আছে। তখন আমার বয়স হচ্ছে ধরো, ওই ১৮-১৯। ওই যে একটা কোথাও গিয়ে হারিয়ে যাব— সেটা ছিল।

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ভেবেছিলাম হ্যান্ডিক্যাম নিয়ে করব। ওইভাবেই লেখা ছবিটা। কারণ, টেলিফিল্মের কথা মাথায় রেখে লেখা। তখন বাজেট হত দেড় লাখ টাকা। তাতে ক্যামেরা ভাড়া না করে ছোট করে ভেবে কাজ করতে শুরু করেছিলাম। ভেবেছিলাম এই গল্পটাই বলব। গল্প শুনে ‘তারা’ চ্যানেলের ছন্দাদি, সৌগতদা বলল এটা ছবি বানাবে। তখন মূল প্রোডিউসার গল্প শুনে বললেন, ‘তুমি প্রেমের কিছু বোঝো না, স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ করে আনো।’ আরও অনেকের কাছে গিয়েছিলাম। এক বিখ্যাত ডিরেক্টর বললেন, ‘এটাতে কোনও সার্চ নেই।’ তো আমি কোনও চেঞ্জ করিনি। এরপর ‘তারা’ থেকে আবার ছবিটা করার জন্য বলল।

আমি প্রথম টেলিফিল্ম করেছিলাম আমাদের ওখানে, মুর্শিদাবাদে, ‘পিংকি আই লাভ ইউ’। ঠিক করে রেখেছিলাম প্রথম ফিচার ফিল্মটা করব তেহট্টে, সেটা যাই হোক। ঘটনাচক্রে হয়েও গেল। ছবির কাজ শুরু হল, তেহট্টে শুটিং করতে পারলাম। ছবি শেষও হয়ে গেল। তারপর হল কী, ‘তারা’ চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেল, ছবিটা প্রোডিউসারের হাতেই থাকল। আমার আর অতনুদার ছবি। তা উনি আর কিছুই করলেন না। এখনকার যে প্রোডিউসার, তাঁর হাতে ছবি গেল। প্রোডিউসারের নানা কথা— ছবি ছোট করতে হবে, মিউজিক চেঞ্জ করতে হবে— এসব নানা গণ্ডগোলের পর  কিচ্ছু না বদলে রিলিজ  করলাম। ২০১-এর ২১ এপ্রিল থেকে ১০ জুন অবধি শুটিং হয়েছে। রিলিজ করল ২০১৩–র ২০ সেপ্টেম্বর। অনেকটা সময়। ভেবেছি কিন্তু ২০০৮-এর শেষের দিকে। রিলিজ করার পর আমরা খুবই আনন্দিত।  শুক্রবার আমরা সবাই মিনিবাসে করে এখান থেকে প্রিয়ায় গিয়ে নামলাম। ও মা! সোমবার না মঙ্গলবার ফোন করে বলল ছবি পরের সপ্তাহে তুলে দেবে। এর আগে আবার কবিদার সঙ্গে কথা হয়েছিল, কবিদার ছবি ‘ফড়িং’ ২৭ সেপ্টেম্বর রিলিজ ছিল। রিলিজটা হচ্ছিলই না, দুজনেই চিন্তিত ছিলাম এটা নিয়ে। দুজনের চিন্তার কোনও কারণই ছিল না। কারণ। ফল একই হয়েছে, এক সপ্তাহতেই চলে গেছে।  

এইটা হওয়াতে দুঃখ পেলাম। প্রায় কেউই দেখতে পায়নি। আমি দেখলাম যে আমি আমার ছবি তেহট্টেও দেখাতে পারি না, বহরমপুরেও দেখাতে পারি। কারণ, হলগুলো রয়েছে নির্দিষ্ট এক একটা ডিস্ট্রিবিউটরের হাতে। আমি আমাদের জায়গায় ছবিটা দেখাতে পারছি না। সবাই খুব সহানুভূতি দেখাল। আমাদের রূপকলা কেন্দ্রে একটা ‘ন্যারো কাস্ট’ বলে ব্যাপার ছিল ডেভলপমেন্ট কমিউনিকেশনের মধ্যে। ব্রড কাস্ট মানে অনেককে দেখানো আর ন্যারো কাস্ট মানে বহু জায়গায় ছোট ছোট করে কমসংখ্যক লোককে দেখানো। খুব ইন্টিমেট ভিউইং, কিন্তু ডিরেক্ট কমিউনিকেশন দর্শকদের সঙ্গে। এভাবে বিভিন্ন জেলাতে গিয়ে গিয়ে ছবি দেখানো হত। আমাদের ম্যাডাম অনিতা অগ্নিহোত্রী এসব শেখাতেন।

আর একটা ব্যাপার, ২০১০ সাল থেকে তেহট্টে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়েছে, কিন্তু প্রথমবার আমি যেতে পারিনি কারণ শ্যুটিং করতে আমি তার তিন দিন পরেই গেছি। আমি ওদের ছবি বেছে দিয়ে এসেছিলাম। তো আমি তেহট্টে আমার পিসতুতো দাদা— বাপিদা, রহমানদার সঙ্গে কথা বলে একটা বাজেট তৈরি করলাম। হল ভাড়া, প্রজেক্টর ভাড়া ইত্যাদি নিয়ে প্রথমে বাজেট হল বোধহয় ১৫ হাজার টাকা।

বাকিটা ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে ঋত্ত্বিক চক্রবর্তী

দিনে ক’টা শো?

দিনে বোধহয় একটা করে না দুটো করে। রোববার তো দুটো শো ছিলই, আর বাদ বাকি দিনগুলো বোধহয় একটা করে। তিন দিনে চারটে বা পাঁচটা শো হয়েছিল। এবার আমাদের রূপকলার শিক্ষক আর বন্ধুদের কাছ থেকে ১ হাজার করে টাকা নিলাম। তখন টাকাপয়সার অবস্থা খুবই খারাপ, মানে টাকাপয়সা নেই। বাড়িতে বসে বসে ফটোশপে টিকিট, লিফলেট তৈরি করলাম। করে তেহট্টে পৌছে গেলাম। মাইকে প্রচার হতে শুরু করল, ডোর টু ডোরও হল। সবাই বলল টিকিটের দাম বেশি করতে। আমি বললাম— না, ২৫ টাকাই হোক, দেখি কী হয়! প্রথম দিন তো টেনশনে আছি, লোক আসবে কি আসবে না। তারপর দেখলাম লোক হচ্ছে।

প্রিমিয়ার করলাম ওখানে। মনসুরদা, মনসুর ফকির— আমাদের ছবি শুরু হয়েছিল ওঁর গান দিয়ে— ওঁকে ডেকে আর তেহট্টের অনেকে, যারা ছবিতে অভিনয় করেছেন তাঁদের নিয়ে। রোববারটা ভালো ভিড় হল। সন্ধেবেলায় তো আমি হলে ঢুকতে পারছি না, প্রচণ্ড ভিড়। সিনেমা দেখতে দেখতে কী মন্তব্য করছে, দেখে বেরিয়ে কী মন্তব্য করছে— সবটা শুনেছি। একটা মজার ঘটনা হল— তিনটে মেয়ে, ষোলো থেকে কুড়ির মধ্যে হবে, তারা আগের দিন ছবি দেখেছে, রোববার দুপুরে দেখেছে আবার সন্ধেবেলায় এসেছে। বুঝতে পারছি একটু ইতস্তত  করছে, আবার দেখার ইচ্ছে কিন্তু টাকা নেই। তখন আমি একজনকে দিয়ে বলে পাঠালাম— কোনও ব্যাপার নয়, ঢুকে পড়তে বলো। কিন্তু মেয়েগুলো লজ্জা পেয়ে চলে গেল।

ওখানকার দর্শকের অনেক ধরনের মন্তব্য খুবই ইন্টারেস্টিং। যেমন ধরো, টেকনিক্যাল কথা বলছে— পাতার শব্দ, জলের শব্দ এগুলো তো আমরা ছবিতে এভাবে দেখতে পাই না! তারপর হল ভূগোল নিয়ে গণ্ডগোল। ওঁরা জিজ্ঞেস করছেন— এটা তো এই জায়গা নয়, এটা কেন দেখালি? এইসব। সে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। ভীষণ আনন্দ পাচ্ছিলাম, পুরস্কার পাওয়ার থেকে বেশি আনন্দ। এমন আর পাব কিনা সন্দেহ আছে। 

তুমি ‘গোয়েন্দা’ যেখানে শ্যুট করেছিলে সেখানে দেখিয়েছিলে?

হ্যাঁ, বড় করে দেখিয়েছিলাম।

‘গোয়েন্দা’-তে কী হয়েছিল?

‘গোয়েন্দা’-তে তো রিঅ্যাকশনটা মজার খুবই। শেষটা কারও পছন্দ হয়নি, শেষে গোয়েন্দা অপরাধীদের ছেড়ে দিয়েছে বলে। ন্যায়-নীতি বোধ গুলিয়ে গেছে, সেটা আমার চ্যানেলের সঙ্গেও প্রথমে মতপার্থক্য হয়েছিল।

তুমি কনভিন্সড ছিলে?

একদম, মানে আমি তো আর ন্যায়–নীতি বিচার করে সিনেমা করছি না। হাতে এসেছে, লিখেছি। যেরকম করে দেখানো দরকার, তাই লিখেছি।

তুমি বলছিলে, রূপকলায় তখন যেভাবে ক্লাস হত সেখান থেকেই এইভাবে সিনেমা দেখানোর আইডিয়া এসেছিল।

হ্যাঁ, আমাদের সময় তিন মাসের কমন ক্লাস হত  ডেভলপমেন্ট কমিউনিকেশনের সঙ্গে। মানে ওই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র–ছাত্রীরাও আমাদের সঙ্গে ক্যামেরা, এডিটিং এসবের ক্লাস করত। আমাদের কমিউনিকেশনের যে ক্লাস হত সেগুলোতে কলকাতা ছাড়াও বাইরে, মানে জেলায় গিয়ে ছবি দেখানোর জন্য অভ্যাসটা ছিলই। ম্যাডাম চলে যাবার পর আর এভাবে রূপকলায় হয়নি।

এরপর খবরের কাগজে বেরোল। তারপর বর্ধমান, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, নদিয়া, উত্তরবঙ্গেও দেখানো হয়েছিল।

বাকিটা ব্যক্তিগত সিনেমার পোস্টার

এই যে ছবি দেখানোর প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তুমি এটা শুরু করলে, এটা তো একটা অন্যরকমের ব্যাপার।

এখানে আর একটা কথা বলি, আমাদের কিন্তু প্রিমিয়ার পার্টিও হয়েছে। যে টাকা উঠেছিল তাই দিয়ে খিচুড়ি, মাংস, রাম খাওয়া হয়েছে। তেহট্টতে। আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব ছিল আমরা করেছি। আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তোমার কি মনে হচ্ছে যারা নতুন ধারার ছবি করছে তারা কোথাও রুট থেকে আলাদা হয়ে সেটা বানাচ্ছে?

প্রথম কথা হল রুটটা কী, সেটা জানার অসুবিধা আছে। প্রবলেমটা আসলে, হলে কীভাবে চলবে ছবিটা, কত টাকা উঠবে ইত্যাদি। অথবা ফেস্টিভালে ছবিটা কীভাবে দেখানো যায়, কোথায় সিলেকশন হল? এখন ধরো, বিদেশি ফেস্টিভ্যালে নির্দিষ্ট একরকমের ছবি চলে। আবার বাণিজ্যিক যে ছবি তার জন্য আর এক রকমের স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়। এবারে এসবের মাঝে আমি কী করতে চাই সেটা গুলিয়ে যায়। মানে যারা ছবি করতে চান, তাঁদের নিজেদের তো কিছু একটা আছে— সেটা যা ইচ্ছে হতে পারে। আমি একটা ফেস্টিভ্যালের জন্য সিনেমা করতে চাই আর আমি একটা নিজের জন্য সিনেমা করতে চাই— সেটা বেছে নেওয়া খুব ইমপর্টেন্ট ব্যাপার। এখন সেইটা তো কেউ করে না। লোকে প্রথমে ভাবে, আচ্ছা ওখানে গেলে ওটা হবে যেহেতু ছবি তৈরি বিরাট টাকার ব্যাপার। যদিও আমার নিজের মনে হয় এখন টাকার ব্যাপারটা অনেকটা কমে গেছে।

কীভাবে?

তেহট্ট, বহরমপুরে বসে এখন ছবি তৈরি হচ্ছে, ছেলেপুলে সিনেমা তৈরি করছে তেহট্টে। তাহলে? কী বলবে? আমাদের ছবি দেখিয়ে লাভ হয়নি? ওরা এখন শর্ট ফিল্ম তৈরি করছে, ইউ টিউবে দিচ্ছে। এটা তো সুবিধে, খরচ অনেক কম। এখন সেটাকে ভালো করে লিখে-টিখে, ভালো প্যাকেজিং করে দেখানো যাচ্ছে। এবার আমাদের ছবির অসুবিধে হচ্ছে, কলকাতা ছাড়া আর কোনও গল্প নেই, মানে যাবতীয় সিনেমার গল্প হচ্ছে কলকাতায় থেকে দেখা, মানে গ্রাম দেখলেও  কলকাতার মানসিকতা দিয়ে দেখা।

মানে পয়েন্ট অফ ভিউটা কলকাতার?

গল্প যদি ওখানকারও হয়, এরা বানাবে এখানকার দৃষ্টিভঙ্গিতে। মানে আমার কথা হল যদি নর্থ বেঙ্গলের লোক, পুরুলিয়ার লোক, বহরমপুরের লোক, বাঁকুড়ার লোক ওইখানকার গল্প বলে তাহলে গল্প অনেক বেশি অথেনটিক হয়। ওই যে ভাইব্রেন্ট বলো, একজটিক বলো, রিয়েল লাইফ, যাই বলো না কেন— সেটা অনেক বেশি হবে, তারা যদি প্রপার ছবি করে। সেই জায়গাটা চলে আসছে, কারণ ছবি তৈরি হচ্ছে এই জায়গাগুলোতে, ফিচার ফিল্ম হচ্ছে। কিন্তু সবসময় একটা চিন্তা মাথায় থাকে— যে টাকাই খরচ হোক, সেই টাকাটা তুলতে হবে, সেই টাকাটা তোলার জন্য অনেক কিছু হিসেব করতে হবে। কিন্তু তার বাইরেও একটা জায়গা আছে। আমার নিজের মনে হয়— আগে আমার কথা শুনে লোকে হাসত, এখন আর হাসে না। ইন্টারনেট আসার আগে আমি বলতাম যে, তুমি যে সিনেমাটা করবে সেটা দেখার জন্য গোটা পৃথিবীতে অন্তত ০.১ শতাংশ লোক আছে। এবার পৃথিবীর জনসংখ্যা যদি সাড়ে সাতশো কোটি হয় তাহলে ০.১ শতাংশটা কত হিসেব করো। তারা যদি ১০ টাকা করে দেয় বা তার অর্ধেক মানে ৫ টাকা করেও দেয় তাহলে তোমার ছবির টাকা উঠে গেল।

সেটা পৌঁছবে কী করে?

এবার সেই পৌঁছনোটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে হতে চলেছিল, কিন্তু এখন আবার ওটা কর্পোরেট জায়গায় চলে গিয়ে খাদে পড়া অবস্থা হয়ে গেছে। ফলত ওইটা চালিয়ে যেতে হবে।

মানে স্ট্রাগলটা?

হ্যাঁ।

আমরা অনেক সময় দেখি যে দুটো স্কুল অফ ফিল্ম মেকিং। একটা স্কুলের বিশ্বাস হচ্ছে যে, সবকিছুই টেকনিক্যালি খুব সফিস্টিকেটেড হতে হবে মূলত এরা প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্ম স্কুলে পড়েছে; আর একটা সেকশন যারা বিশ্বাস করে, সিনেমা যে কোনওভাবেই করা সম্ভব। এবার আমার মনে হয় দুটো সেকশনেরই কিছু প্রজ অ্যান্ড কর্নস আছে অনেকে টেকনক্যাল বিষয়গুলো একেবারেই উহ্য করে দেন, আবার অনেকে সেটা নিয়েই অবসেস্‌ড থাকেন তুমি প্রতিষ্ঠানে পড়েছ, তারপরেও ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-তে অন্যভাবে ভাবলে।

মানে তুমি ছবিটা হ্যান্ডিক্যামে ভেবেছ, তারপর ডি এস এল আর–এ শ্যুট করেছ। রেড বা ওই ধরনের ক্যামেরা তো তখন এসে গেছে

হ্যাঁ, আমাদের কাছেই রেড–এ শ্যুট করার বাজেট দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমরা করিনি। আমি বলেছিলাম এত টাকা আমার লাগবে না ক্যামেরার জন্য।

সেক্ষেত্রে তো ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-ই বাংলায় প্রথম ডি এস এল আর–এ তৈরি ছবি তুমি আর শুভঙ্কর তো একটা ইউনিক ভাবনা থেকে এটা শুরু করেছিলে।

এবার হল কী, হ্যান্ডিক্যামে তো ভেবেছি, কিন্তু সেরকম হ্যান্ডিক্যাম তো নেই। এবারে শুভঙ্কর বলল, মিনিমাম একটা জেড ওয়ান পি দিয়ে শ্যুট না করলে… মানে হলে দেখানো হবে তো! এবারে পার্থদা— আমাদের সাউন্ড ডিজাইনার, রেইকিতে গিয়ে আমাদের বলল, বম্বেতে একটা শ্যুটিং হয়েছে ‘সাত খুন মাফ’, রঞ্জন পালিত শ্যুট করেছেন। তাতে সেভেন ডি বলে একটা ক্যামেরা ডিরেক্টর ব্যবহার করেছেন এবং সেটা খুবই চমৎকার। কিউ সদ্য একটা কিনেছে। আমাদের কিউ–এর কাছে নিয়ে গেল। কিউ খুবই এন্টারপ্রাইজিং, ওকে আমরা বলেছিলাম আমরা একেবারে লন্ঠনের আলো, কুপির আলো এসবে শ্যুট করব। সেটা নিয়ে কিউ একটু চিন্তিত ছিল— এটা কি হবে? তো আমি আর শুভঙ্কর গিয়ে দেখলাম ঠিকঠাকই হচ্ছে। তিনটে স্টিল লেন্স ছিল, ৫০, ১০-২২ একটা জুম ছিল আর ১৮-১৩৫।

তার মানে তোমার উত্তরটাও খুব স্পষ্ট, একেবারে নেগেট করলেও চলবে না আবার টেকনোলজি অবসেস্‌ড হলেও চলবে না

তুমি কোন তুলি দিয়ে কোন ক্যানভাসে কী ছবি আঁকবে সেটা ডিপেন্ড করছে। মানে আমার যদি সত্যিকারে অ্যারি লার্জ ফরম্যাটের ক্যামেরা দরকার হয় আমি তাহলে ওই ক্যামেরাটাই নেব। যে সিচুয়েশনে যে গল্পে যেটা দরকার সেটা তো আমায় নিতে হবে। একবার ইনস্টিটিউট থেকে বেরোচ্ছি, তখন ম্যাডাম অনিতা অগ্নিহোত্রী আমাকে বললেন, কোথাও চাকরিবাকরি করতে যেতে হবে না, আমাদের এখানেই প্রোডাকশন করো আর এসথেটিক্স আর টেকনোলজি দুটোকে ব্যালান্স করে রেখো। প্রচণ্ড টেকনিক্যাল হতে যেও না আবার প্রচণ্ড এসথেটিক্সের কথা মাথায় রেখে টেকনোলজিকে বাদ দিয়ে দিও না, সবসময় দুটোকে ব্যালান্স করে চলো। আমাদের এডিটিংয়ের শিক্ষক মিতাদিও তাই বলতেন। তো ওইটা আমার মাথায় এখনও ঘোরে, ফলে এখনও আমি যতটা সম্ভব টেকনিক্যাল বিষয়ে পড়াশোনা করি। ওটা তো আমাকে দেখতেই হবে। আবার ‘এক ইঞ্চি নড়ব না’ টাইপ হলে ছবিটা হয় না। মানে একটা কিছু করা তো ভেতরকার ব্যাপার, সেটা টেকনিক্যালিটি দিয়ে আটকে দিলে মুশকিল হয়।

রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে অপরাজিতা

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ জাতীয় পুরস্কার পেল, তারপরেও তোমাকে বছর ছয়েক অপেক্ষা করতে হল পরের ছবিটা করার জন্য একজন ফিল্ম ডিরেক্টর হিসেবে কীভাবে দেখছ বিষয়টাকে?

যে কোনও জিনিসই লোককে দেখানো যেতে পারে। এখন টিক টক ভিডিও–ও হয়। খুব সিরিয়াস বিষয়ও হয় অনেক সময়। আগে দেখার মধ্যে কালেক্টিভনেস ছিল, দলবেঁধে সিনেমা দেখা। সেইটা তো এখন কমে গেছে। এখন একা দেখার ব্যাপারটা হয়ে গেছে, তার সঙ্গে আবার হাতে চলে এসেছে।

একই ঘরে পাঁচজন পাঁচ রকম জিনিস দেখছে একই সময়ে

বিশাল একটা গর্জাস ফিল্ম লোকে হলে গিয়ে দ্যাখে। এমন কিছু ছবি তৈরি হওয়া দরকার যেগুলো ওইখানেই ভালো লাগে। আমি লার্জার দ্যান লাইফ সিনেমার কথা বলছি না। মানে এমন কিছু সিনেমা যেটা এখানে ভালো লাগবে না, সেই ফিলটা হবে না। সেরকম একটা কিছু করা দরকার। ধরো যখন টেলিভিশন এসেছিল তখন ৪:৩ ফরম্যাট ছিল, কিন্তু তারপর ওটাকে কমব্যাট করার জন্য একটা প্যানোরামা ভিশন এল, দর্শক কিন্তু ফিরেছিল। আমার মনে হয় কনটেন্টের অভাব। কেননা, সমস্ত কিছু যদি কলকাতার দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্যাখো তাহলে একইরকম লাগবে। তুমি যদি পাঁচ বছর পরে ছবিগুলো দ্যাখো, তুমি দেখবে একটা ট্রেন্ড, সব ছবিই একইরকম লাগবে। তুমি যদি পুরনো দিনের বাংলা বা হিন্দি ছবি দ্যাখো, মূলত হিন্দি ছবির কথাই বলব— একইরকম ছবি। কনটেন্টের খুব অভাব। বাংলায় এতরকমের সংস্কৃতি, এত বৈচিত্র্য— বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন রকম। অথচ একটা কমন ব্যাপার দ্যাখানো হয়, যেমন— চাষিভাই চাষ করে একটা লুঙ্গি পড়ে, খালি গায়ে বা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে। একজন মুসলিমের দাড়ি থাকে, গোঁফ থাকে না, কিংবা গ্রামের মেয়েরা ভুরু প্লাক করে না, চুল কাটে না। এগুলো অতি সাধারণীকরণ। ব্যাপারটা মোটেই এমনটা নয়।

যেমন সাধারণ সিনেমায় যেভাবে অন্ধ মানুষের অভিনয় দেখানো হয়, কোনও অন্ধ মানুষ মোটেই দৈনন্দিন জীবনে সেই ব্যবহার করেন না। কিন্তু দ্যাখো, একটা সাকসেসফুল মডেলই টিকবে ধরা যায় কিন্তু এখানে তো সেভাবে কিছু হচ্ছেও না।

কোনও মডেল তৈরি করাই উচিত না। একটা লোক মোটামুটি তার মতো করে যেভাবে প্র্যাকটিস করে, তাকে দিয়ে সেইভাবে ছবি বানাতে দেওয়া উচিত। কোটি কোটি টাকা না দিলেও মোটামুটি একটা সম্মানীয় বাজেট দিয়ে করতে দেওয়া উচিত। যদি কনটেন্টে নতুনত্ব আসে, তখন একটা অন্যরকম মডেল তৈরি হয়ে যাবে। বম্বেতে এখন কনটেন্ট নিয়ে কাজ চলছে। তারপর এখন আবার ওয়েব চলছে। আমি আদতে একজন এডিটর। তো আমি যদি আমার মতো করে একটা সিনেমা তৈরি করতে নাই পারলাম তাহলে অত খাটাখাটনি কেন করব? এই ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ ছবিটা তো আমার বছর তিনেকের কাছাকাছি হয়ে গেল। যে যত গালাগালিই আমাকে দিক, শরৎচন্দ্রের মতো হল না, মুড়ি-মিছরির একই দর— অনেক কিছু বলবে। কিন্তু আমি আমার মতোই করব। লোককে আনন্দ দিতেই তো করব। টাকাটা আমার আসে এডিট করে আর পড়িয়ে। ‘শিকড়’ নামের ডকুমেন্টারিটা যখন করেছি— এখন পোস্ট প্রোডাকশন চলছে— তখন একটা শিডিউল ছাড়া আর কিছুই করিনি। গেছি, ঘুরেছি, ফিরেছি, খেয়েছি, ঘুমিয়েছি— অত মাপ করে করিনি। তো ছবি করে যদি আনন্দই না পাই—।

রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে ঋত্ত্বিক চক্রবর্তী ও রাহুল

সিঙ্গল স্ক্রিন, পুরনো হল চলে যাচ্ছে আইনক্সে যা টিকিটের দাম তাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে কি নিয়মিত সিনেমা দেখা সম্ভব?

আমি নিজেই যাই না। আমাকে কেউ টিকিট দিলে যাই। একবার আমি গেছি, সিনেমা শুরু হতে দেরি আছে, তা একটা চা খেয়েছি। সিম্পল দুধ চা, তার দাম ২৫০ টাকা। এত কথা বলছি, হয়তো দেখবে আমার ছবিও মাল্টিপ্লেক্সেই রিলিজ করছে। হয়তো কেন, তাই হবে। আমি একটা ছবির প্রিমিয়ারে যাচ্ছিলাম প্রিয়া সিনেমা হলে। একটা অটো ধরেছি, তো অটোওলার সঙ্গে গল্প হচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, দাদা আপনি কোথায় যাবেন? সিনেমা দেখতে? বাংলা সিনেমা? আমি বলেছি, হ্যাঁ, বাংলা সিনেমা। কেন, আপনি বাংলা সিনেমা দ্যাখেন না?  তিনি বলছেন, না, আমি বাংলা সিনেমা দেখি না। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী দ্যাখেন? তিনি বললেন, হিন্দি। সিনেমা হলে যান? তিনি বললেন, না না, আমি বাড়িতে একটা বড় টিভি লাগিয়েছি আর সঙ্গে স্পিকার, ৫.১. ছবি ডাউনলোড করি, বন্ধুবান্ধব ডাকি, বসে সারাদিন সিনেমা দেখি! সিনেমা দেখার এই যে পদ্ধতি, সেটা তো আগে ছিল না। অনেক বদল হয়েছে। মানে সিনেমা আগে যখন দেখতে তখন তাকে থামিয়ে, সামনে গিয়ে, পেছনে এসে তুমি দেখতে পারতে না। ভুলগুলো বার বার করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে পারতে না। সেইটা তো এখন যে কেউ করতে পারে।

ম্যাজিকটা তো নেই।

ম্যাজিক অন্যভাবে ক্রিয়েট করতে হবে। এই ম্যাজিক আবার এরা— ওয়েব করছে এপিসোড ভাগ করে। মানে এপিসোডের হুক পয়েন্ট রেখে। আমার যেটা মনে হয়, ওয়েব সিরিজ বা ওয়েব, যাই হোক, তার স্থায়িত্ব কম। একটা ভালোলাগার মতো সিনেমা দেখলে তার যা ইমপ্যাক্ট, তার যা স্থায়িত্ব, ওয়েব সিরিজের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। জানি না পরে কী হবে। কারণটা আমি ডিফাইন করে বলতে পারছি না, কিন্তু এটা আমার মনে হয়।

একদিকে বলছে ছবি চলছে না, অন্যদিকে এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনযাপনের যে ছবি রোজ কাগজে, ফেসবুকে দেখতে পাচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে তারা খুবই হাই ক্লাসের জীবন যাপন করেন

যাদের টাকা আছে তারাই ছবি দেখবে। যারা টাকাটা দিতে পারবে তাদের জন্যই এন্টারটেনমেন্টটা দেব। বাদবাকিরা পেলে পেল, না পেলে পরে সিডিতে দেখে নেবে টাইপের আর কি। কিন্তু আমি ওইরকমভাবে ছবি বানাতে পারব না। আমাদের কেসটা হচ্ছে এইরকম যে, আমার পছন্দ হল আমি একটা সিনেমা করলাম, তোমার পছন্দ হল তুমি দ্যাখো। আমি সিনেমাটা এইরকমভাবেই করতে চাই।

হয়তো বলবে বাজে কথা বলছি, টার্গেট অডিয়েন্সের কথা ভাবছি না, টাকা ফেরত পাওয়ার কথা বলছি না, কিন্তু আমি বলেই তো দিলাম, আমার অন্তত ০.১ পার্সেন্ট আছে। আর ওয়েবে এখন এত কনটেন্ট দরকার, টাকা উঠবেই, হল থেকে না উঠুক। কারণ কনটেন্টও তো একইরকম হয়ে যাচ্ছে, অ্যামাজনও একরকম করছে, নেটফ্লিক্সও একরকম করছে। একটু অন্যরকম কনটেন্ট হলেই—।

অন্যরকম কনটেন্ট প্রোডিউস করার যে প্রোডিউসর তিনি বাঙালি হলে ভালো হয়।

আমি যদি অবাঙালি প্রোডিউসারকে বলি যে ছবির এখানে ঢাকের আওয়াজ দেব, তিনি ভাববেন শুধুমাত্র তো দুর্গা পুজোয় ঢাক বাজে, কিন্তু মনসা পুজোতেও যে ঢাক বাজে সেটা তো জানেন না। এই যে বাবা আর ছেলে আসবে, ছেলে কাঁসর বাজাতে বাজাতে মুড়ি আর বাতাসা খাবে— এইগুলো অন্য কাউকে বোঝানো মুশকিল হয়। সেই কারণেই বলছি। বাদ দিতে বলছি না, অবাঙালিরা তো প্রযোজনা করবেনই, কিন্তু বাঙলিরাও যদি করেন ভালো হয়। কেউ বলতেই পারেন, আগে তো অনেক অবাঙালি প্রোডিউসার কত ভালো ভালো ছবি করেছেন! তা করেছেন কিন্তু এখন সিচুয়েশনটা আলাদা।

সাক্ষাতকারের একটি বিশেষ মুহূর্তে প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য

আর একটা জিনিস হল ০.১ পার্সেন্টের কাছে পৌঁছনো

সাম্প্রতিক কালে দেখলাম যে বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলো যেই ইংরেজি মিডিয়াম হল অমনি বাবা-মায়েরা পিলপিল করে এসে বাচ্চাদের ভর্তি করাতে থাকল সেখানে, কেননা ইংরেজি ছাড়া চাকরি পাবে না। তা বাঙালিরই তো বাঙালিয়ানা বলে কিছু থাকছে না, মুড়ি-বাতাসা খাবার কথা তো এই বাচ্চারাও শিখছে না।

সে তো হবেই। আমাদের এখানে তো বাংলাতে কিছু করার, কোনও ফর্ম ফিল আপ করা বা অন্য কোনও অফিসিয়াল কাজ তো করাই যায় না। বিদেশি, হিন্দি সব ভাষাই থাকবে কিন্তু আমাদের যে মাতৃভাষা সেইটা দিয়েই কাজ হবে— এটাই তো হওয়া উচিত। আমরা তো নিজেরাই সেটা করতে পারিনি। আমরা তো নিজেরাই এর জন্য দায়ী। আগামী চার বছর বাদে দেখবে আমরা হয়তো হিন্দি সিনেমা করছি। আরও আট বছর পরে হয়তো আমরা, বাঙলিরা সাউথের কন্নড় ফিল্ম বানাচ্ছি— এটাও হতে পারে। কারণ এখন ছেলেমেয়েদের থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলা।

তাহলে উপায় কী?

বাংলা তো আমাদের পৃথিবীর চতুর্থ ভাষা, যেটা সারা বিশ্বের সব থেকে বেশি লোক বলে। আমাদের পৌঁছনো তো কোনও সমস্যার নয়। আজকাল আরও সুবিধা হয়ে গেছে। আমাদের ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’–র বাংলাদেশের ভিউয়ার আরও বেড়ে গেছে। আমার কাছে রেগুলার মেসেজ আসে। বা ধরো, আমাদের এখানে যেমন ত্রিপুরা বা বাইরের যে এন আর আই বাঙলিরা— সবার কাছে যদি পৌঁছনো যায়। আমি সিনেমা করি, এতটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। আমি আমার গল্প নিয়ে ছবি বানাব, দেবে কি? নয় তো ছেড়ে দাও।

মানে তুমি এই নেগোশিয়েশনটা করতে রাজি নও

পৌঁছনোর দায় তুমি নিতে চাও না, তারা নিজেই খুঁজে নেবে বলছ?

হ্যাঁ। আমি হেল্প করতে পারি, একদম ব্লক করে দিলে দায়িত্ব নিতে পারি।

বাংলায় কিছু করতে গেলে বাংলাদেশকে কোনও না কোনওভাবে ইনকর্পোরেট করতে হবে ওদের কাছেই ভাষাটা এখনও বেঁচে আছে।

হ্যাঁ আছে তো, কিন্তু করতে হবে এর কোনও মানে নেই। আমার মনে হয়, আমাদের জেলার লোককে ইনভলভ্‌ড করলে তাতেই অনেকটা হবে। কিন্তু তাদের কাছে আমরা যাই না, ওরা আমাদের কাছে এলে তখন তাদের ডাকি। এত যখন খারাপ অবস্থা, আমাদেরই ওখানে যাওয়া উচিত। পশ্চিমবঙ্গে কম বাঙালি আছে? মুর্শিদাবাদে সাত–আট রকমের বাংলা ভাষায় কথা চলে। এত ডাইভার্স। তাদের কাছে পৌঁছনো যায় না? তবে একা সম্ভব নয়। আমি আমার মতো যতটা যেখানে পারি, চলে যাই, যেখানে যতটুকু পারি।

এরকম তো নয় যে আমায় গাড়ি করে যেতে হবে। আমার বেড়াতে যেতে হয় না। আমার বেড়াতে যাবার দুটো জায়গা আছে। বহরমপুর আর তেহট্ট— যেখানে যাতায়াতের জন্য পঞ্চাশ–পঞ্চাশ একশো টাকা খরচ হয়। আমি বাইকে চড়ি না, অটোতে চড়ি, বাসে চড়ি, ট্রেনে চড়ি, মেট্রোতে চড়ি, আমার গাড়ি লাগে না। আমাকে প্রতিদিন রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেতে হয় না। বড় বড় জায়গায় যেতে হয় না। এখন যে একটা দ্যাখানোর ব্যাপার আছে, ওটাও আমায় করতে হয় না। লোকে বাড়িতে এসে অবাক হয়ে যায়, এইরকম একটা বাড়িতে থাকি! মানে লোকে বলেছে তাই বলছি।

হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি, তুমি পুরস্কার পাওয়া ডিরেক্টর তো।

মানে লোকের তৈরি করে দেওয়া মাপকাঠি অনুযায়ী— এখন আমার এমনটা থাকলেই ভালো হয়, এইটা আমি কখনও করিনি। তাই আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে।

একটা তো হচ্ছে তুমি করোনি, আর আর একটা হচ্ছে করতে না পারা।

আমি ঠিক করে রেখেছি যে আমার লাইফ স্টাইল আমি কিছুতেই বাড়াব না। আমার দরকার মতো নিয়ে নেব। গাড়িও ভাড়া নেব যখন দরকার, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গিয়ে একদিন রেস্টুরেন্টে খাব।

এই ভাবনাটা তোমার কোথা থেকে এসেছে? রূপকলা কেন্দ্র?

এটা এসছে আমার পিসেমশাইয়ের কাছ থেকে। উনিই আমার ফ্রেন্ড, ফিলজফার, গাইড ছিলেন। ২০১৬ সালে মারা গেছেন। নকশাল রাজনীতি করতেন তারপর ছেড়ে দেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, চাকরিবাকরি করেননি, টিউশন করে চালাতেন। অসাধারণ লিখতেন। উনিই আসলে এইটা আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন।

তাই আমার মনে হয় মফসস্‌ল থেকে লোকজন উঠে না এলে হবে না, অরিজিনাল জিনিস হবে না। যারা ওখানেই বড় হয়েছে, ওখানকার গল্পই বলছে। সব মানুষের অসংখ্য গল্প আছে। আমাদের জানতে হবে। আমরা তো জানতেই ইচ্ছুক নই।

রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে ঋত্ত্বিক চক্রবর্তী ও জ্যোতিকা জ্যোতি

যদি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ পুরস্কার না পেত?

আমার বাবা, মা, আমাদের টিম— সকলের জন্য এটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে বলে ছবিটা ভালো— যখন এ কথা কেউ বলে তখন সেটা শুনতে আমার খারাপই লাগে। সিনেমার নামটা বললেই হয়, সঙ্গে জাতীয় পুরস্কার না বললেও চলে। আমি মনে করি ছবিতে ওই জোরটা আছে। ছবিটা পুরস্কার পাবার আগেই আমরা ছবিটা দেখাতে শুরু করেছি।  

গল্প খোঁজা, গল্প দেখা আর যাপন এরা তো হাত ধরাধরি করে চলে

এই গল্প বলতে কে সাহায্য করছে?

আমায় কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার আগেও লোকে বলার সুযোগ দিয়েছে। সিনেমা হচ্ছে না, মোবাইলে সিনেমা তৈরি করেছি। আমার তো অভ্যেস হচ্ছে বাড়িতে স্লো প্রিমিয়ারে ল্যাপটপে এডিট করা। ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’ থেকে ‘সত্যি হলেও গল্প’— আমার ওভাবেই করা। শুরুর ছবিটায় এক বন্ধুর মোবাইল ক্যামেরা দেখে দারুণ লেগেছিল। এ তো যা ইচ্ছে তাই করতে পারি! তো মোবাইল দিয়ে ওইটা শ্যুট করেছিলাম। আমি তো ওই প্র্যাকটিস থেকে উঠে এসেছি। তুমি আমায় যা কিছু দাও, আমি করে দেব। কোনও কিছুকে ব্রাত্য করে দিলে চলবে না। তোমার যে ক্যানভাস থাকবে, কোথাও পেন্সিলে আঁকবে, কোথাও জল রঙ করবে।

ফেস্টিভ্যালের ভেতরেও একটা পলিটিক্স চলছে, তাই অনেকেই ডেড লাইন নিয়ে ফেস্টিভ্যালে ছবি তৈরি করতে শুরু করে।

পুরস্কারে প্রোডিউসারের একটা সুবিধা হয়, একটু প্রচার পাওয়া যায়, টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু আমার মনে হয় একটু অপেক্ষা করাও যায়। এ বছরে দিলাম না, পরের বার দিলাম। কারণ ছবিটা তো থাকবে। এই যে গণ্ডগোলগুলো হয়ে গেল— সেটা তো সমস্যার। আর পুরস্কারের অসুবিধা হল, কোনও একটা জায়গায় গিয়ে তুমি বক্সড হয়ে যাবে। মানে, এ একটা পুরস্কার পেয়েছে বলে আলাদা করে দেওয়া হয়। আগে যে আমার কথা শুনছিল না সে আমি একটা পুরষ্কার পেয়েছি শুনলে ‘ও আচ্ছা আচ্ছা, তাহলে শুনি’ করতে থাকবে। আরে আমার কি কোনও দাম নেই না কি? পুরস্কারের জন্য তো আর আমি সিনেমা বানাব না!

আচ্ছা, আপাতত এবারের মতো আমাদের কথা শেষ। তোমার ছবি ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ তো এই সেপ্টেম্বরেই রিলিজ করছে। তারপর আবার একদিন কথা হবে।

সাক্ষাৎকার সহযোগিতায় সুস্মিতা সিনহা