প্রতাপাদিত্য পাল

নীহাররঞ্জন রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বিভাগে ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মাবকাশের পরে। আমি সবে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস অধ্যয়ন করতে ভর্তি হয়েছি আর উনি ছিলেন রানি বাগীশ্বরী অধ্যাপক। ওঁকে অবশ্য প্রথম দেখি তার মাস দুয়েক আগে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা সমাপ্ত করে কলকাতা ফেরার কিছু দিন পরে হঠাৎ একদিন ফোন এল রাজধানীর বরেন রায়ের। সেন্ট স্টিফেন (St. Stephen) কলেজের প্রাক্তনী, সেই সূত্রে আমাদের আলাপ। ফোনে তিনি আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর সঙ্গে উত্তর কলকাতায় কোনও একটা কলেজের সাহিত্যানুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। নীহারবাবু ছাড়া সে অনুষ্ঠানে বক্তা থাকবেন সৌমেন ঠাকুরও। বলা বাহুল্য আগ্রহের সঙ্গেই গিয়েছিলাম। প্রায় সাত দশক পরেও স্পষ্ট মনে পড়ে বঙ্গ সংস্কৃতির সেই দুজন সৌম্যকান্তি মনীষীর কথা। দু’জনই ছিলেন সমবয়সি, যত দূর মনে হয়। উভয়ের বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। মঞ্চের উপর দু’জনের অঙ্গভঙ্গি ছিল মধ্য বয়েসের আত্মপ্রত্যয়ের পরিচায়ক। দীর্ঘায়তন সৌমেন ঠাকুর ছিলেন অনিন্দ্যসুন্দর পুরুষ। সুপুষ্টু দেহের উপর একমাথা অবিন্যস্ত চুল, রবীন্দ্রনাথের ওই বয়েসের মূর্তির মতন তবে দাড়িহীন। আর নীহারবাবু একটু খাটো, গায়ের রং আমাদের মতন মাজা, কিন্তু মুখের গড়ন সুশ্রী এবং অভিব্যক্তিপূর্ণ। দুজনেই ধুতি পাঞ্জাবি ও চাদর পরিহিত; আদর্শ সাহিত্যিক ভাবপূর্ণ মূর্তি।

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ায় উভয়ের ছিল অসাধারণ স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যুৎপত্তি। সত্যি বলতে কী এরকম প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধ বাংলায় বক্তৃতা আমি কখনও আগেও শুনিনি এবং পরেও না। ১৯৬২ সালেই দেশ ছাড়া হয়ে বাইরে কাটিয়েছি জীবনটা। কাশীতে এবং দিল্লিতে দু–একজন হিন্দিভাষী বক্তার সাবলীল ভঙ্গিতে বক্তৃতা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে কিন্তু বিনা প্রস্তুতিতে বঙ্গ ভাষায় এরকম সহজ ও স্বচ্ছন্দ বাকপটুতার পরিচয় আমার জীবনে বিরল। বাংলায় নীহারবাবুর স্বাভাবিক অথচ অসামান্য কুশলতার পরিচয় পাই বহুদিন পরে যখন তাঁর লেখা দু’খানা বই পড়ি। সে প্রসঙ্গ একটু পরে।

দুই

নীহারবাবু আমাদের পড়াতেন অবশ্য ইংরেজি ভাষায়। সব অধ্যাপকরাই তখন ইংরেজিতেই পড়াতেন তবে সেই ভাষায় দক্ষতা সবার সমান ছিল না। সব থেকে ভালো ইংরেজি বলতেন বিনয়চন্দ্র সেন মহাশয়, যাকে সবাই B.C. Sen বলে জানত। বঙ্গ সাহিত্যের দিকপাল আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের পুত্র ছিলেন তিনি। তাঁর ভাই শ্রীশচন্দ্রও তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। সেন ভ্রাতৃদ্বয়ের শিক্ষা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানি না, তবে মনে হয় দীনেশবাবু নিশ্চয়ই পুত্রদ্বয়কে সাহেবি স্কুলে পড়িয়েছিলেন, আমাদের স্বদেশী পিতৃদেবের মতন। বিনয়চন্দ্র সেনের পরেই নীহারবাবুর ইংরেজি ভাষায় বাকপটুতা ছিল সর্বাধিক। তবে যেহেতু ক্লাসে (class শব্দটি কেন বাংলায় ‘ক্লাশ’ লেখা হয় তা আজও বোধগম্য হল না) আমরা সবাই ছিলাম বাঙালি, মাঝে মাঝে উনি বাংলাতেও আলাপ আলোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। দু–একটা উদাহরণ দিই।

নীহারবাবু ক্লাস নিতেন সবসময় বিকেলের দিকে বেলা তিনটের পর। প্রথম দিনের ক্লাসের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে এত বছর পরেও। আশুতোষ বিল্ডিংয়ের দক্ষিণ প্রান্তের ঘরে ছিল নীহারবাবুর অফিস এবং উত্তর প্রান্তের একটি ছোট ঘরে ক্লাস নিতেন। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও স্বল্প ছিল। বড়জোর জনা দশেক।

চেয়ারে বসেই সবার শুকনো মুখের দিকে চেয়ে বাংলায় বললেন যে তিনি চায়ের অর্ডার দেবেন কারণ ওই সময় এক কাপ চা না খেলে সবার ঘুম এসে যাবে। তাঁর নিজেরও। তারপর চা পানে আগ্রহীদের হাত তুলতে বললেন। একটি মেয়ে ছাড়া আমরা সবাই হাত তুললাম। নীহারবাবু তখন সেই মেয়েটির দিকে তাকাতে সে বেচারি অপ্রস্তুত হয়ে লজ্জিত আরক্ত মুখে বলল যে সে চা খায় না। নীহারবাবুর ঠাট্টা করে তাৎক্ষণিক উত্তর, ‘সে কী, চা খাও না? ভাত খাও তো?’

পেছনের বেঞ্চে যে ছাত্রটি বসেছিল তাকে বললেন কাছাকাছি শিক্ষকদের বসার ঘরে গিয়ে ধীরেনকে বলতে অত কাপ চা দিয়ে যেতে। সেই প্রথম ধীরেনের নাম শুনলাম। তার কাজই ছিল দিনভর মাস্টারমশায়দের (তখন শিক্ষিকা প্রায় ছিল না বলা যায়) চায়ের তৃষ্ণা মেটানো। পরবর্তীকালে আমিও পাঁচ বছর ধীরেনের হাতের চা খেয়েছি এবং অস্বীকার করব না যে এরকম স্বাদু চা কোথাও পেয়েছি বলে মনে পড়ে না।

সেই প্রথম ক্লাসের আর একটা মজার কথা বলি নীহারবাবুর আত্মপ্রত্যয়ের উদাহরণস্বরূপ। ওঁর পড়ানোর বিষয় ছিল ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাস ও নান্দনিক তত্ত্ব। চা খেতে খেতে উনি আমাদের প্রত্যেকের আদিবাস কোথায় জানতে চাইলেন। আমরা যে যার উত্তর দিচ্ছি আর আর উনি গড়গড় করে সেই স্থান সম্বন্ধে নানারকম তথ্য পরিবেশন করে আমাদের অবাক করে দিচ্ছিলেন। আলোচনা শেষ হলে বললেন, ‘জান, বাংলা দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমির তথ্য আমার নখদর্পণে প্রতিফলিত।’ তখন ভেবেছিলেম বুঝি অতিরঞ্জন করছেন। পরে তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ পড়ে বুঝতে পেরেছিলাম যে এরকম আপাত আত্মম্ভরিতাপূর্ণ মন্তব্য করার যোগ্যতা তাঁর ছিল।

নীহাররঞ্জন রায় (১৯৬০)

আমার জন্ম সিলেট শহরে শুনে বললেন, ‘আমিও সিলেটে ছিলাম ছাত্রাবস্থায়। সিলেটে মুরারিচাঁদ কলেজে পড়াশোনা করেছি।’ শুনে আমি বললাম যে আমার পিতৃদেবও (গোপেশ চন্দ্র পাল, ১৯০০–৭০) ওই কলেজের ছাত্র ছিলেন। উনি বাবার নাম জিজ্ঞেস করলেন। বলার পর বললেন যে যদিও আলাপ নেই, নামটা পরিচিত। এরপর মাঝে মাঝে বাবা কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেন। পিতৃদেবও নীহারবাবুর নাম জানতেন। প্রায় সমসাময়িক ছাত্র ছিলেন সিলেটে দু’জনে।

বছর দুই পরে এম এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমাদের মনোহরপুকুর রোডের বাড়িতে যখন একটা আস্ত ভোজের আয়োজন হয় তখন নীহারবাবুও আমন্ত্রিত হন। অন্যান্য আমন্ত্রিতদের মধ্যে অবিভক্ত বঙ্গের এবং ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ নেতা ফজলুল হক সাহেবও ছিলেন। বোধহয় কিছুদিন আগেও (১৯৪৬ সালে সিলেট সদর থেকে কংগ্রেস পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়ে) বাবা পূর্ব পাকিস্তান বিধানসভার সভ্য ছিলেন। ফজলুল হকের সঙ্গে বাবার দহরম মহরম ছিল এবং ওই অনুষ্ঠানের সময় হক সাহেব কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। সবাই আশা করেছিলাম যে নীহারবাবুও একই সময় খেতে আসবেন কিন্তু উনি এলেন সব অতিথি বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পর রাত সাড়ে দশটায়। তখন আলাদা টেবিলে একা বসিয়ে ওঁকে খাওয়ানো হল। মনে আছে যে লুচি বা পোলাও সম্পূর্ণ বর্জন করে মাছ–মাংস, তরিতরকারি খেলেন শুধু। সেই প্রথম দেখলাম একজন বঙ্গসন্তানের carbohydrate বা শালি জাতীয় পদার্থ বর্জিত ভোজন। মনে পড়ল নীহারবাবুর ওই তরুণীকে ‘ভাত খাও তো’ বলে পরিহাস করার কথা। প্রায় মধ্যরাত্রি পর্যন্ত মা–বাবার সঙ্গে নীহারবাবু সিলেটের স্মৃতিচারণ করেছিলেন সে রাতে। সে সব আজ আর মনে নেই।

তবে এখানে স্বীকারোক্তি করে নিই যে, এই পারিবারিক যোগাযোগ অথবা সিলেটের সূত্রে নীহারবাবুর সঙ্গে কোনওদিন হৃদ্যতার সম্পর্ক হয়নি। বরং আমাদের সমঝোতা বরাবর অম্লমধুর ছিল বলা যায়।

তিন

আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লাইড সহকারে শিল্প পড়ানোর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। নীহারবাবুও ক্লাসে বক্তৃতা দিতেন কোনওরকম ছবির সাহায্য না নিয়ে। এখন ভাবলেও আশ্চর্য হয়ে যাই। অন্য যে ক’জন শিক্ষক আমাদের শিল্প ইতিহাস পড়াতেন তাঁরা ছিলেন দেবপ্রসাদ ঘোষ, সরসীকুমার সরস্বতী, চারুচন্দ্র দাশগুপ্ত এবং কল্যাণকুমার গাঙ্গুলী। কার্মাইকেল অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিষয় ছিল ভারতীয় মূর্তিতত্ত্ব এবং এই বিষয়ে তিনি তখন ছিলেন সব থেকে প্রসিদ্ধ বিশেষজ্ঞ। কিন্তু কোনও কারণে তিনি তখন আর মূর্তিতত্ত্ব পড়াতেন না।

দেববাবু ছিলেন নীহারবাবুর সমসাময়িক এবং সবসময় ওঁকে নীহার বলে উল্লেখ করতেন। শুনতে বেশ মজা লাগত, কারণ নীহারবাবু তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাতব্বরস্থানীয় ও একইসঙ্গে বহু উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। রানি বাগীশ্বরী অধ্যাপক ছাড়াও যতদূর মনে হয় উনি ছিলেন আর্টস ফ্যাকালটির (Arts Faculty) অধ্যক্ষ (Dean) এবং সেনেট (Senate) ও সিন্ডিকেটের (Syndicate) কেউকেটা সদস্য। তাছাড়া সম্ভবত দিল্লির রাজ্যসভার সভ্যও ছিলেন। এতগুলো শিরোভূষণ থাকায় ক্লাস নিতে অনিয়ম হওয়াটা স্বাভাবিক। যখন ক্লাসে আসতেন তখন বক্তৃতা দিতেন আকর্ষণীয়ভাবে, ইংরেজি বলতেন স্পষ্টভাবে এবং দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল প্রশস্ত। ওঁর কাছেই প্রথম শুনি যে শিল্পের ইতিহাস হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানের অঙ্গ।

দেবপ্রসাদ ঘোষ ছিলেন আশুতোষ মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা ও অধিকর্তা (Curator)। প্রাচীন সেনেট হল তখনও হয়নি। সেনেট হলের পেছনের দিকটায় তখন মিউজিয়ামের অমূল্য সংগ্রহ প্রদর্শিত হত এবং তারই উত্তর প্রান্তের একটি ঘরে দেববাবু আমাদের দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার শিল্পের ইতিহাস পড়াতেন। বলা বাহুল্য, সংগ্রহে ওই অঞ্চলের কোনও শিল্পসামগ্রী ছিল না। দেববাবুও তাই দু–একটি বইতে ছাপা ছবির সাহায্যে জাভা, বর্মা, শ্যামদেশ, কাম্বোজ ও চম্পার শিল্প ইতিহাস পড়াতেন। দেববাবুর নিজের পক্ষপাত ছিল জাভার প্রতি। তাই বহুদিন পর্যন্ত ওই দেশের শিল্প নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বর্মা পড়িয়েছিলেন সব থেকে কম সময় এবং গোড়াতেই বলে দিয়েছিলেন ‘নীহারের’ বইগুলো পড়ে নিতে।

তখন এসব নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাইনি। কিন্তু পরে যখন ভারতশিল্পের ইতিহাসচর্চা ঐকান্তিকভাবে শুরু করলাম তখন আশ্চর্য হয়েছিলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিতে। জিতেনবাবু ছিলেন মূর্তিতত্ত্বে পণ্ডিত কিন্তু সে বিষয়ে তাঁর কাছে শেখার সুযোগ পাইনি (পরে অবশ্য ১৯৬৫ সালে যখন তিনি বাংলায় ‘পঞ্চোপাসনা’ বইটি লিখছিলেন তখন তাঁকে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম এবং তাঁর পাণ্ডিত্যের সমুদ্রে অবগাহন করার সৌভাগ্য হয়েছিল)। নীহারবাবু ছিলেন বর্মার শিল্প, ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে তখন ভারতবর্ষের সব থেকে প্রসিদ্ধ বিশেষজ্ঞ, অথচ ছাত্ররা সে বিষয়ে ওঁর কাছে শিক্ষার কোনও সুযোগ পেল না। একেই বোধহয় বলে ভাগ্যের পরিহাস। ১৯৩২ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে নীহারবাবু বর্মা সম্বন্ধে একখানা নয়, চার চারটে বই লেখেন যেগুলোর মূল্য এখনও অকাট্য। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয় Brahmanical Gods in Burma, ১৯৩৬ সালে Sanskrit Buddhism in Burma আর ১৯৪৬ সালে Theravada Buddhism in Burma এবং Introduction to the study of Theravada Buddhism in Burma.

আশ্চর্য হতে হয় যে এই সময়েই (ইংরেজি ১৯৪১, বাংলা ১৩৩৮) প্রকাশ করেন বঙ্গ ভাষায় ‘রবীন্দ্র সাহিত্যের ভূমিকা’। গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের নিবেদনে তিনি লেখেন যে, ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের (ইংরেজি ১৯২৪) পরে লেখা কবির রচনার কোনও আলোচনা তিনি করেননি। মোটামুটি তিরিশের দশকে যখন তিনি বর্মার সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণারত তখন তিনি রবীন্দ্র সাহিত্যেও বিচরণ করছেন। বই যখন প্রকাশিত হয় কবিগুরু তখন জীবিত। মুখবন্ধ থেকে এও জানা যায় যে, ১৯৩৯ সালেই গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত হয় এবং ছাপাতে দু’বছর লাগে। এটা তাঁর অসামান্য বুদ্ধিবেত্তার এবং একইসঙ্গে ইংরেজি ও বাংলাতে সাবলীলভাবে লিখনশক্তির পরিচায়ক। তবে তুলনামূলকভাবে বিচার করলে অনস্বীকার্য যে তিনি আদতে চিন্তা করতেন বাংলায়। বাংলা ভাষায় তাঁর রবীন্দ্র সাহিত্যের ভূমিকায় নীহারবাবুর বঙ্গভাষায় যে লালিত্য ও নান্দনিকতার পরিচয় পাই সে রকম তাঁর ইংরেজিতে লেখা বর্মীয় সংস্কৃতির বইগুলিতে পাওয়া যায় না। কাজেই এটা স্বীকার করতে পারি না যে তিনি ইংরেজি ও বাংলায় সমান দক্ষতা নিয়ে লিখতেন। বাংলায় তাঁর যে স্বাচ্ছন্দ্য ও সুষমার পরিচয় পাই তার তুলনায় ইংরেজিতে দক্ষতা কিছুটা দুর্বল। অবশ্য বাংলা তাঁর মাতৃভাষা এবং আমাদের দেশে ইংরেজিতে ছাপা বইয়ে লিখনরীতির সম্পাদনা করতে সম্পাদকরা যে অবহেলা করেন তা বিলেতে বা আমেরিকায় অভাবনীয়।

চার

১৯৫৮ সালে এম এ পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খয়রা বৃত্তি লাভ করি। বৃত্তির শর্ত বাগীশ্বরী অধ্যাপকের অধীনে গবেষণা করা। নেপালের শিল্পকলা নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছে। সরসীকুমার সরস্বতী নেপালে গিয়েছেন এবং নেপাল সম্বন্ধে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর অধীনে গবেষণা করাই ছিল শ্রেয় কিন্তু তাহলে বৃত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। অগত্যা নীহারবাবুর অধীনেই শুরু করলাম গবেষণা। আমার থিসিস নেপালের স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাস। বিষয়টা ছিল মৌলিক। তখন এ বিষয়ে পার্সি ব্রাউন (Percy Brown) ছাড়া বিশেষ কেউ মাথা ঘামাননি। নীহারবাবু আপত্তি করলেন না তবে খুব একটা উৎসাহ দিলেন না। সত্যি বলতে কী, যে তিন বছর গবেষণা করেছিলাম নীহারবাবুর সাহায্য খুবই কম পেয়েছি। প্রথমত উনি প্রায়ই বাইরে চলে যেতেন, বিশেষত দিল্লিতে। দ্বিতীয়ত, এত ছাত্রছাত্রী ও দর্শনপ্রার্থী ও নানা ধান্দার লোকজন তাঁর সঙ্গ চাইত যে কলকাতা থাকার সময় সহজে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়া যেত না। দেখা করার সময় তো সেই সকালবেলা শুধু পূর্ণ দাস রোডের বাড়িতে। তৃতীয়ত, স্থাপত্যশিল্পে নীহারবাবুর সে রকম আগ্রহ ছিল না এবং যতদূর জানি এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞান থাকলেও তিনি বিশেষ কোনও অবদান রেখে যাননি। ভাগ্যিস সরসীবাবু সেরকম ব্যস্ত ছিলেন না। তাছাড়া তিনিই আমাদের এম এ ক্লাসে ভারতীয় স্থাপত্যের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস পড়িয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য ও উৎসাহ ছিল প্রচুর। গম্ভীর হলেও সরসীবাবুর ধৈর্য ও সহানুভূতি ছিল অশেষ। গবেষণার ও গুছিয়ে লেখার পদ্ধতি এবং অন্যান্য যান্ত্রিক ব্যাপার তাঁর কাছেই শিখেছিলাম। উনিই এশিয়াটিক সোসাইটির নেপালের অমূল্য তালপাতার হাতে লেখা প্রাচীন পুথির সাহায্যে নেবারী ভাষা ও অক্ষর পড়তে শেখান। থিসিসের প্রথম পরিচ্ছেদ সরসীবাবুকে দেখিয়ে নীহারবাবুকে জমা দিই এবং সপ্তাহ দুয়েক পর তিনিই আমায় অক্ষত অবস্থায় সেটা ফেরত দেন, ‘ঠিক হয়েছে’ বলে।

এরপর মাঝেমধ্যে নিয়মিত তাঁর সঙ্গে পরিচয় বজায় রাখতে দেখা করতে যেতাম, বা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও প্রয়োজনে দেখা হত। আলোচনা বা আড্ডা হত নানা বিষয়ে কিন্তু আমার থিসিস সম্বন্ধে তাঁর কোনও সমালোচনা বা মন্তব্য মনে আসে না। এটা তাঁর অনীহা না আমার যোগ্যতার পরিচায়ক তা আজ বার্ধক্যে পৌঁছেও রহস্য রয়ে গেছে।

তবে ১৯৬২ সালের শরৎকালে যখন লন্ডনে কলকাতার থিসিসের দুই বাইরের পরীক্ষকের সামনে মৌখিক পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম— পরীক্ষক ছিলেন এ. এল. ব্যাশাম (A. L. Basham) এবং এফ. আর. অলচিন (F. R. Allchin) তখন তাঁরা থিসিসের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। ব্যাশাম তাঁর চিঠিতে সুপারিশ করেছিলেন যে থিসিসটা D. Phil-এর চেয়ে উচ্চতর ডিগ্রি পাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে।

খুব সম্ভবত ১৯৬০ সালে নীহারবাবুর উৎসাহে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ শুরু করে। ডাক পড়ল একদিন তাঁর অফিসে। ঘরে ঢুকে দেখি সুবেশা এক মধ্যবয়সি মহিলা বসে আছেন। আলাপ করিয়ে দিলেন, ‘প্রতাপ, ইনি হচ্ছেন ড. অমিতা রায়। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে যোগ দিয়েছেন।’ কিছুক্ষণের আলাপ-আলোচনায় জানলাম যে ভদ্রমহিলা সবে লাইডেন (Leiden) থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে ফিরেছেন। নীহারবাবু বললেন যে আমাকেও ওই নতুন বিভাগে ক্লাস নিতে হবে। আমি সহজেই রাজি হয়ে গেলাম এই সুবর্ণসুযোগ পেয়ে (অবশ্য বিনা পারিশ্রমিকে)। আলোচনা হল কে কী পড়াবেন। আমি প্রস্তাব করলাম আমি মূর্তিতত্ত্ব বিষয়ে পড়াতে চাই। নীহারবাবু অমিতা রায়কে বললেন, ‘তাহলে তুমি স্থাপত্য পড়াও।’ অমিতা রাজি হলেন না এবং মূর্তিতত্ত্ব পড়াতে চাইলেন। অগত্যা আমাকে ওর অনুরোধ মেনে নিতে হল।

দু’জনে যখন একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম নীহারবাবুর অফিস থেকে তখন অমিতা রায় বললেন, ‘চলুন, কমনরুমে চা খাওয়া যাক।’ কমনরুমে গিয়ে ধীরেনের হাতের চা খেতে খেতে অমিতা রায় বললেন যে, মূর্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে ওঁর জ্ঞান স্বল্প, (এম এ ক্লাসে উনি চারুকলা বিভাগের ছাত্রী ছিলেন না। যতদূর মনে হয় সামাজিক ইতিহাস নিয়ে পড়ছিলেন।) সেজন্য এই সুযোগে মূর্তিতত্ত্বটা তাঁরও শেখা হয়ে যাবে। তবে আরও অনুরোধ করলেন, ওঁর ক্লাসের আগে যদি আমি রোজ এক ঘণ্টা ধীরেনের চায়ের সঙ্গে বিষয়টা বুঝিয়ে দিই। আপত্তি করার উপায় নেই। আমি তো বিষয়টা পড়াতেই চেয়েছিলাম। শুধু চারজন ছাত্রের বদলে একজন ছাত্রীকে পড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে দুটি বিষয়ের— স্থাপত্য ও মূর্তিতত্ত্বের জ্ঞানার্জন হবে।

একদিকে উপকার হল যে কমনরুমে বহু প্রসিদ্ধ পণ্ডিতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলাম। যেমন, বাংলা সাহিত্যের দিকপাল ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য ও ড. সুকুমার সেন, ঐতিহাসিক কালিদাস নাগ (যিনি ছিলেন নীহারবাবুর অন্যতম গুরু) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতিক ড. অতীন্দ্রনাথ বসু। অতীনবাবু ছিলেন আমাদের মধ্যমগ্রামের প্রতিবেশী এবং বাবার বন্ধু। মধ্যমগ্রামের কথায় মনে পড়ে যে, একবার শীতকালে ওখানে আমাদের বাগানে বিভাগীয় বনভোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, নীহারবাবুও উপস্থিত ছিলেন এবং সবার সঙ্গে মিলেমিশে জমিয়ে আড্ডা দিয়েছিলেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে ওঁর ব্যবহার ছিল স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও অমায়িক।

পাঁচ

কেমব্রিজে তিন বছর থাকাকালীন নীহারবাবুর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না। ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি যখন ওখানকার পাট গুটিয়ে দেশে ফেরার সময় আসন্ন তখন ওঁকে লিখলাম চাকরির ব্যাপারে। বরাবরই ইচ্ছে ছিল ফিরে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব আর আশুতোষ ভবনে শিক্ষকদের বসার ঘরে বসে ধীরেনের হাতের অনবদ্য চা পান করব। দেশে ফেরার আগেই বিদেশে দু–তিনটি কাজের প্রস্তাবও হাতে ছিল। কিন্তু নীহারবাবুর কাছ থেকে কোনও উৎসাহ পেলাম না। উত্তরে তিনি লিখলেন যে, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়ে সিমলা যাত্রার পথে, তাই ওখানে সুবিধা করতে পারবেন না। তবে সিমলায় যদি যেতে চাই তাহলে তাঁকে জানাতে।

বলা বাহুল্য, কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। কারণ, তিন বছর দেশে ফিরে কলকাতায় থাকাই আমার অভিপ্রায় ছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না যে সিমলায় নীহারবাবুকে ভারতের Advanced Institute-এর প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষের জন্য মনোনীত করেন তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন। তিনিই বড়লাটের রাজপ্রাসাদে মানবধর্মে (Humanitics) উচ্চমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনা করেন। এই সম্মান উভয়ের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় একসঙ্গে অধ্যাপনার পরিচায়ক নয় শুধু, নীহারবাবুর মানবধর্ম বিষয়ে পাণ্ডিত্যেরও স্বীকৃতি।

যাই হোক, আমার ভাগ্যে সে যাত্রা শিকে ছিঁড়ল না। সিমলাতে যে নিম্নমানের পদ (Junior Fellowship) তিনি আমাকে দিতে চাইলেন তা আমার নেওয়া সম্ভব হল না।

এর পরই আমি আমেরিকার বস্টন নগরীর বিখ্যাত বস্টন মিউজিয়াম থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে আনন্দ কুমারস্বামী অধ্যুষিত ভারতীয় শিল্পের প্রতিপালক (Keeper of Indian Art) হয়ে আবার দেশছাড়া হলাম। ভবিতব্য কেউ এড়াতে পারে না। এজন্য আমি বরাবরই নীহারবাবুর প্রতি কৃতজ্ঞ। এখন মনে হয় যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেলে জীবনে অনেক কিছুই অপূর্ণ থেকে যেত।

তবে মার্কিন মুলুকে এসে ধীরেনের হাতের চা কেন, কারও হাতেই চায়ের সেরকম স্বাদ পাইনি। সবাই জানে বিপ্লবের সময় থেকেই চায়ের সঙ্গে এ দেশের আড়াআড়ি।

দেশত্যাগের পর নীহারবাবুর সঙ্গে একবারই শুধু দেখা হয়। সত্তরের দশকে উনি আমেরিকায় আসেন একবার কোনও এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অধিবেশনে ভারতীয় প্রতিনিধিদের নেতা হিসেবে। তখন লস অ্যাঞ্জেলসে আসেন দু–চার দিনের জন্য। আমাদের সংগ্রহশালার ভারতীয় সংগ্রহ ও প্রদর্শনী দেখে আনন্দিত হয়েছিলেন। আমার বাসস্থানে তাঁর জন্য সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেছিলাম স্থানীয় শিল্পরসিকদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য। উপাদেয় পান-ভোজন ও আলাপ আলোচনায় খুবই উপভোগ্য হয়েছিল সেই অনুষ্ঠান। আমার বয়স তখন প্রায় চল্লিশ তবুও তাঁর সামনে কোনও কিছুই পান করতে পারিনি।

পরে দেশে ফিরে নিজের হাতে বাংলায় একটি চিঠি লিখেছিলেন তাঁর পরিতৃপ্তি ও ছাত্রের উন্নতির জন্য অভিনন্দন জানিয়ে। অনুপম ভাষায় এবং রাবীন্দ্রিক রীতিতে লিখিত সেটাই আমাকে লেখা তাঁর একমাত্র হস্তলিখিত পত্র।  

ছয়

২০০৩ সালে নীহাররঞ্জন রায়ের শততম জয়ন্তী উপলক্ষে শ্রদ্ধেয় সত্যজিত চৌধুরীর সুষম সম্পাদনায় বঙ্গদর্শনের একটি বিশেষ যুগ্মসংখ্যা প্রকাশিত হয় []। অনেক মূল্যবান প্রবন্ধ এবং আলোচনায় সমৃদ্ধ এই সংখ্যাটি প্রকাশ করে সত্যজিতবাবু ঋণী করেছেন। দুই প্রচ্ছদের মধ্যে এত তথ্য ও তত্ত্বসমৃদ্ধ নীহারবাবুর প্রতিভার পরিচয় দেওয়া হয়েছে যে অধিকন্তু তাঁর যোগ্য আমার কোনও আলোচনা অবান্তর মনে হয়। তবু সত্যজিতবাবুর অনুরোধ রক্ষার প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক কিছু লিখছি।

নীহারবাবুর সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় গুরু ছিলেন অস্ট্রিয়ান শিল্প পণ্ডিত স্টেলা ক্রামরিশ (Stela Kramrish)। স্টেলা ক্রামরিশের জন্ম ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে। নীহারবাবুর থেকে সাত বছরের বড় ছিলেন। ১৯২৪ সালে যখন নীহারবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একুশ বছর বয়সে স্নাতকোত্তর ক্লাসে ভর্তি হন তখন স্টেলাও বিদ্যালয়ে নতুন। ক্লাসে ক’জন ছাত্র ছিল জানা নেই তবে নীহারবাবু ছাড়া ছিলেন দেবপ্রসাদ ঘোষ। কাজেই ছাত্র ও শিক্ষিকার মধ্যে যে একটা অন্তরঙ্গ ও মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠবে তা বলাই বাহুল্য। শান্তিনিকেতনে দু’বছর কাটলেও এই বিদেশিনী মহিলা যে কলকাতায় প্রথম প্রথম নিঃসঙ্গতা অনুভব করতেন তা সহজেই অনুমেয়। তাছাড়া নীহারবাবু যে একজন বলিয়ে-কইয়ে এবং আকর্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন (যাকে ইংরেজিতে বলে charming এবং charismatic) যুবক ছিলেন তা অনস্বীকার্য। সবার সঙ্গে সহভাবে মেলামেশার স্বাভাবিক ক্ষমতা ছিল নীহারবাবুর।

স্টেলা ক্রামরিশ (ছবি: ডরোথি নরম্যান)

বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত এক সমীক্ষণে নীহারবাবুর ভাষাতেই শোনা যাক তাঁর স্বীকারোক্তি—

যেটুকু সামান্য জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি, তার জন্য আমার তিনজন শিক্ষকের কাছে আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ : প্রফেসর হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী, প্রফেসর বেণীমাধব বড়ুয়া এবং প্রফেসর স্টেলা ক্রামরিশ তুমি তো বিশেষ করে ক্রামরিশ সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করেছিলে আমি গর্ব করে বলতে চাই; তিনিই ভারতীয় শিল্পের ইন্দ্রজাল এবং রহস্য সম্পর্কে আমার চোখ খুলে দিয়েছিলেন, এই বিষয়টি সম্পর্কে আমার মধ্যে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দৃঢ়মূল করে দিয়েছিলেন আজও যা আমি ধারণ করে রয়েছি আমার উপলব্ধি তিনিই প্রখর করে তুলেছিলেন এবং যতটা অন্তর্দৃষ্টি আমি অর্জন করতে পেরেছি সে সম্ভব হয়েছে তাঁরই দেওয়া প্রাথমিক শিক্ষার ফলে পরে তার সহকর্মী হবার সুযোগও হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বড় কথা আমাদের নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল তবুও তাঁকে বরাবর, যেমন এখনও আমার শিক্ষক বলে মনে করি তিনি আমার কাছে আজও স্নেহময়ী এক প্রেরণাদাত্রী, যা মহার্ঘ মনে করি []

স্টেলা ক্রামরিশও যে নীহারবাবুকে স্নেহ করতেন তার সাক্ষ্য আমিও দিতে পারি। সত্তরের দশকে যখন ক্রামরিশের সঙ্গে একবার এক সপ্তাহের জন্য জার্মানিতে ঘোরার সুযোগ পাই তখন একসময় তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, জান প্রতাপ, যেহেতু তুমি নীহারের ছাত্র, তুমি আমার ছাত্র–নাতি (Grand-Student)।

২০১৩ সালে যখন আমি স্টেলা বিষয়ে গবেষণা করি ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়ামে (Philadelphia Museum of Art) যেখানে তিনি আমৃত্যু ভারতীয় শিল্পসংগ্রহের অধিকর্তা ছিলেন (পঞ্চাশের দশকে ভারত ছেড়ে আসার পর)— ফেজখানায় (Archives) তখন একটা চিঠি আবিষ্কার করি যা থেকে বোঝা যায় মাঝে কোনও একটা কারণে দুজনের মনোমালিন্য হয়েছিল একবার। চিঠি থেকে সময় ও কারণ বোঝা যায় না। তবে মনে হয় ক্রামরিশের ভারত ত্যাগের (১৯৫৪) আগেই মনান্তর হয়।

টাইপ করা চিঠির শিরোনামায় নীহারবাবুর নামের নীচে লেখা শুধু Emeritus Professor, University of Calcutta। ছাপার হরফে এই শুধু পরিচিতি। ঠিকানা : C-17, Green Park Extension, New Delhi- 16 (India) এবং তারিখ ১১ জুন, ১৯৭৩।

ক্রামরিশকে Dear Dr. Kramrish বলে সম্বোধন করে শুধু লেখেন—

যদি আপনি ভুল বোঝেন সেজন্য আমি আমাদের পূর্বের অন্তরঙ্গতার রীতিতে আপনাকে সম্বোধন করতে সাহস পেলাম না আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে কিছু একটা ছিল যা আজ গত দু’দশকের ধূসর আন্তরিকতাশূন্য এবং টানাপোড়েন সত্ত্বেও টিকে আছে, অন্তত আমার দিক থেকে আপনি যে ভাবে আমার দেশের জনসাধারণের শিল্পকলা উপলব্ধি করার যে দীক্ষা দিয়েছিলেন তা আমার পক্ষে ভোলা বা অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয় আমার প্রতি আপনার আচরণের চরম পরিণতি যাই হোক না এবং সেটা কোনও কারণে বা অকারণে হোক না কেন, আমি সর্বদাই কৃতজ্ঞ থাকব যে আপনিই যৌবনের প্রারম্ভে আমার চোখ খুলে দিয়েছিলেন এবং আমার অপুষ্ট মনকে প্রথম পরিপুষ্ট করেছিলেন পরবর্তী তিন দশক ধরে যে ভাবে প্রেমময় বন্ধুসুলভ ব্যবহার করেছেন আমার প্রতি, সে সম্পর্কে আর কী বলা যায়?

পুরনো সেই দিনগুলির প্রীতিপূর্ণ সকৃতজ্ঞ স্মরণে আমি আপনার অনুমতি ছাড়াই উৎসর্গ করছি আমার সম্প্রতি প্রকাশিত পুস্তক Idea and Image in Indian Art— যার প্রথম কপি আপনাকে রেজেস্ট্রি ডাকে পাঠানো হয়েছে

যদি আপনি এই গ্রন্থটি আমার সাদর শ্রদ্ধার প্রতীকস্বরূপ গ্রহণ করেন তাহলে আমি খুবই আনন্দিত হই

আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমি এখনও দাবি করতে পারি যে আমি আপনার স্নেহধন্য (Yours affectionately)

নীহাররঞ্জন রায় []

বলাই বাহুল্য যে ভাষার কৃত্রিমতায় (বিশেষত ইংরেজিতে) এবং মানসিক আবেগে পত্রটি অভিনব। নীহারবাবুর আবেগপ্রবণতার আর একটি উদাহরণ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে লেখা একখানা চিঠি। ১৯৪১ সালে লেখা চিঠি ছোট্ট হলে কী হবে, লেখকের চিত্ত চঞ্চলতায় পত্রটি উত্তাল। শুধু প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃতি করি। গুরুদেব বলে কবিকে সম্বোধন করে লিখেছেন, ‘গুরুদেব, গুরুদেব, গুরুদেব, শতবার গুরুদেব বলিয়া ডাকিলেও বুঝি তৃপ্তি হয়না। শতবার পায়ের ধূলা মাথায় লইলেও বুঝি মন ভরিতে চায়না।’ [৪] স্টেলা ক্রামরিশকে লেখা চিঠিতেও একইরকমের ভাষা ও উচ্ছ্বাসের পরিচয় পাই। নীহারবাবুর অভিমান এত প্রকট ছিল যে পত্রের অন্তে ‘নীহার’ না লিখে পুরো নামটাই লিখেছিলেন।

লেখকের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে স্টেলা ক্রামরিশ সহ অন্যান্যরা (১৯৮২)

সেই সময়— ইংরেজ আমলে— একজন সত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধা, তায় আবার শিক্ষয়িত্রী এবং মেমসাহেবের সঙ্গে এরকম অন্তরঙ্গতা শুধু বিরল নয়, দু’জনের প্রগাঢ় সখ্যতারও পরিচায়ক।

যাই হোক, ছাত্রের শ্রদ্ধা ও অকুণ্ঠিত হৃদ্যতার পরিচয় পেয়ে মেমসাহেবের মানভঙ্গ হয়েছিল কিনা জানার উপায় নেই। ফেজখানার ফাইলে ক্রামরিশের কোনও উত্তরের কার্বনকপি নেই। হয়তো বা হস্তলিখিত চিঠি পাঠিয়ে বইয়ের প্রাপ্তিসংবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে দু’জনের সম্পর্ক এককালে খুবই অন্তরঙ্গ ছিল। এবং এও অনুমেয় যে দু’জন দু’জনের প্রথম নাম ধরে সম্বোধন করতেন।

আমার মনে হয় দু’জনের মনান্তর হয়েছিল বাগীশ্বরী অধ্যাপকের পদ নিয়ে। ক্রামরিশ যে বাগীশ্বরী অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করেছিলেন তার প্রমাণও পেয়েছি ফিলাডেলফিয়ার ফেজখানায়। ১৩/৭/১৯৪৪ তারিখের এক চিঠিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার জে. চক্রবর্তী লিখেছেন—

Madam,

I am directed by the Vice Chancellor and Syndicate to state that on the recommendation of the Exicutive Commitee this council of Post Graduate Training in the Arts and the Selection Commitee for the appointment of the Rani Bagiswari Professor of Indian Fine Arts, the Senate at their meeting held on the 26th June 1944, conferred on you the personal distinction of a University Proffessor.

I have the honour to be

Madam

Your most obedient servant,

signed

Register []

ইতিপূর্বে চেয়ারটা দেওয়া হত সাময়িকভাবে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে শুরু করে। মনে হয় নীহারবাবুর সময় থেকেই পদটি স্থায়ী করা হয়। যতদূর জানি পদটির জন্য একটি শর্ত ছিল যে, কোনও অ–ভারতীয় পদটির জন্য বিবেচিত হবেন না। কাজেই নীহারবাবুর কোনও দোষ নেই এ ব্যাপারে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অবগত ছিল যে ক্রামরিশকে ডিঙিয়ে নীহারবাবুকে বাগীশ্বরী দেওয়া একটু বিব্রতকারক (যে জন্য তাঁকে একটা বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের পদ দিতে হয়)। দু’দশক কাজ করার পর ক্রামরিশের অসন্তুষ্ট হওয়া আশ্চর্যজনক নয়। বয়স, কর্ম-অভিজ্ঞতা (Seniority) এবং পাণ্ডিত্যে ক্রামরিশ তাঁর প্রিয় ছাত্রের চেয়ে যোগ্যতর প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু ক্রামরিশ সম্ভবত একমাত্র বিদেশি এবং মহিলা শিক্ষক হওয়ার জন্য খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না বলে ধারণা হয় তখনকার পুরুষ প্রাধান্য শিক্ষক মহলে। বিশেষত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের যুগের সমাপ্তির পরে। অন্যান্য উৎস থেকে জানতে পারি যে, স্যার আশুতোষের পুত্র শ্যামাপ্রসাদ উপাচার্য থাকাকালীন দু’জনের মনান্তর বৃদ্ধি হয়। পরে ১৯৫৩ সালে ক্রামরিশ আমেরিকা থেকে পূজাবকাশের সময় অতিরিক্ত ছুটির আবেদন করেছিলেন এবং তা নামঞ্জুর হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। এ সময় হয়তো তাঁর মনে আঘাত লাগতে পারে যে, নীহারবাবু তাঁকে সেরকম সাহায্য করেননি। হয়তো উভয়ের মনোমালিন্য এইসব ব্যাপারে পরিপুষ্টতা লাভ করে।

তবে অন্য কোনও কারণেও দু’জনের সম্পর্কচ্ছেদ হয়ে থাকতে পারে। ক্রামরিশ সহজ মানুষ ছিলেন না তা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের কাছেই শুনেছি যাঁরা তাঁকে ভালো করে চিনতেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যে বনিবনা হয়নি তা আগেই উল্লেখ করেছি। তিরিশ দশকের গোড়ার দিকে Indian Society of Art নিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং সুপ্রসিদ্ধ শিল্প-ঐতিহাসিক অর্ধেন্দুকুমার গাঙ্গুলির সঙ্গে মনোমালিন্য হয়। অর্ধেন্দুবাবু তাঁর আত্মস্মৃতিতে লেখেন যে, যদিও তিনি ক্রামরিশের ‘শিল্পচর্চার গভীর নিষ্ঠার কথা প্রচার করেছেন অকুণ্ঠিত চিত্তে’ তার পরিবর্তে মহিলার কাছ থেকে কোনও যোগ্য প্রতিদান পাননি। গাঙ্গুলি মহোদয়ের ভাষায়—

আমার দুর্ভাগ্যবশত এই বিদূষী মহিলা আমার সাহায্যের বিনিময়ে অবশেষে ক্ষতি সাধনে ব্যাপৃত হয়েছিলেন রূপম পত্রিকা যাতে বন্ধ হয়ে যায় (১৯৩০ সালেই রূপমের শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়), অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে যাতে আমার হৃদ্যতার হানি হয়, এই সকল বিষয়ে তিনি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন তাঁর এই কার্যকলাপ দেখেশুনে বিখ্যাত একজন ইংরেজী কবির একটি উক্তিই আমার বারংবার মনে পড়েছিল ”Alas! The ingratitude of men has left me mourning!” (হায়, মানুষের অকৃতজ্ঞতা আমাকে শোকাতুর করেছে!) []

গুরু–শিষ্যের প্রায় তিন দশকের মধুর সম্পর্কে বিচ্ছেদ হওয়ার জন্যই হয়তো আমি অন্তত যে পাঁচ বছর নীহারবাবুর সান্নিধ্যের সুযোগ পেয়েছিলাম সে সময় ক্রামরিশ সম্পর্কে তাঁর মুখে কোনও মতামত শুনিনি। পরে জার্মানিতে শুধু একবারই ক্রামরিশ নীহারবাবুর নামোল্লেখ করেন যখন আমাকে তাঁর ‘ছাত্র–নাতি’ বলে অভিহিত করেন।

আজ দু’জনেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমারও বিদায় নেওয়ার সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। পরিশেষে মনে হয় বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসের এই দু’জন পথিকৃতের উত্তরাধিকারী হই বা না হই, এঁদের সংস্পর্শে আমি ধন্য। যা পেয়েছি তার হিসাব মিলাতে আজ মন মোর হয়তো রাজি নয় কিন্তু তাঁদের স্মৃতিচারণ করাটাই তো নীহারবাবুর ভাষায় এক প্রকারের ‘মহার্ঘ’।

সাত

পরিশেষে নীহারবাবুর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস— আদিপর্ব’ সম্পর্কে কিছু মতামত ও প্রশ্ন তুলে এই স্মৃতিচারণের সমাপ্তি টানব। মনে পড়ে, ছাত্রাবস্থায় অনেকেই মৌখিকভাবে বইটার তথ্যগত ভুল–ত্রুটির সমালোচনা করতেন। তথ্যসমৃদ্ধ এই বৃহৎ গ্রন্থে ভুল–ত্রুটি তো থাকবেই কিন্তু বাংলায় কেন, সারাদেশের কোনও আঞ্চলিক ভাষাতেই এরকম একটি রচনা, ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের ভাষায় যা ‘অনন্যপূর্ব’—  বিরল।

ভাষার সুষমা এবং লিখনরীতির লালিত্যে এই সুপাঠ্য গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের অতুলনীয় ও অমূল্য সম্পদ যার তুলনা শুধু রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিক্ষিপ্ত প্রবন্ধসমূহ। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, বঙ্গদর্শনের নীহাররঞ্জনের স্মারক সংখ্যায় (৬ ও ৭) প্রকাশিত বাঙ্গালীর ইতিহাসের মূল পাণ্ডুলিপির রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে পরিমার্জিত অংশের আলোকচিত্র। সত্যি বলতে কী পরিশোধনের পরিমাণ দেখে একটু বিস্মিত হতে হয়। সমগ্র পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা না করে সংশোধনের মাত্রার প্রকৃত মূল্যায়ন করা অনুচিত।

এখানে আমার প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে যে, গ্রন্থের পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত ‘সাক্ষরতা’ সংস্করণের (১৯৫৯) পরেও উভয় বাংলায় যে পরিমাণ নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছে তা সত্ত্বেও নীহারবাবুর ইতিহাসের মূল্য কমে যায়নি। আমার সমস্যা বইয়ের নামকরণ নিয়ে। আমাদের বাঙালিত্ব কত প্রাচীন? বাংলাভাষা প্রচলিত হওয়ার পূর্বে কি ভৌগোলিক যুক্তবঙ্গের বাসিন্দাদের বাঙালি বলে অভিহিত করা যায়? মৌর্যযুগে (খ্রিস্টপূর্ব ২য় ও ৩য় শতাব্দীতে) নিম্নবঙ্গের তাম্রলিপ্ত (বর্তমানে তমলুক) বন্দর থেকে যারা নৌকা ভাসিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে ‘হেলায় লঙ্কা করিল জয়’ তারা কি প্রকৃত বাঙালি? বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার চন্দ্রকেতুগড়ের (যার শিল্পসামগ্রী আজ সারা বিশ্বে ভারতীয় শিল্পরসিকদের মধ্যে চাঞ্চল্যের ঢেউ তুলেছে) স্রষ্টাদের কি বাঙালি বলা যায়?

চন্দ্রকেতুগড়ের কথায় মনে পড়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় বেঁড়াচাপা অঞ্চলে (চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নতত্ত্ব প্রাপ্তির বর্তমান নাম) অধ্যাপক কুঞ্জগোবিন্দ গোস্বামীর পরিচালনায় খুব জোর খননকার্য চালাচ্ছিলেন আশুতোষ মিউজিয়ামের কর্মচারীরা। দু–চারবার গিয়েছিলাম সেখানে তখন এবং মধ্যমগ্রাম নিবাসী দেবজ্যোতি বমর্ণের অনুরোধে তাঁর সম্পাদিত ‘যুগবাণী’ পত্রিকায় চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে প্রবন্ধও লিখেছিলাম []। চন্দ্রকেতুগড় নিয়ে আলোচনাও হত আশুতোষ মিউজিয়ামে। কিন্তু কোনও ক্লাসে ওখানে প্রাপ্ত শিল্পবস্তু নিয়ে কোনও প্রথানুযায়ী আলোচনার সৌভাগ্য হয়নি।

যাই হোক, চন্দ্রকেতুগড় এবং উভয় বঙ্গে অর্ধ শতাব্দীতে যে সব নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক ও অন্যান্য আবিষ্কার হয়েছে তাতে যে প্রাচীন বঙ্গের ভৌগোলিক সীমার মধ্যস্থিত মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাস মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

বাঙালির বা অবিভক্ত বঙ্গদেশের ইতিহাস রচনার সময় এখন আবার উপস্থিত। কিন্তু নতুন নীহাররঞ্জন রায়ের কি আবির্ভাব হয়েছে এপার বা ওপার বাংলায়? []

টীকা

১। বঙ্গদর্শন ৬ ও ৭ যুগ্ম সংখ্যা, নীহাররঞ্জন রায় : শততম জয়ন্তী (২০০৫) বঙ্কিমভবন গবেষণা কেন্দ্র, কাঁঠালপাড়া (নৈহাটি)।

২। বঙ্গদর্শন (৬ ও ৭), পৃষ্ঠা ৩০৫–৬।

৩। ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অফ আর্ট, স্টেলা ক্রামরিশ আর্কাইভ, ফাইল নং SKP 93।

৪। বঙ্গদর্শন (৬ ও ৭), পৃষ্ঠা ৩৪।

৫। ৩ নং টীকা দ্রষ্টব্য।

৬। অর্ধেন্দুকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, ‘ভারতের শিল্পকথা ও আমার কথা’, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃষ্ঠা ৩১৫। ভারতবর্ষে আসার আগে ১৯২১ সালের জুন মাসে ক্রামরিশ লন্ডন থেকে চিঠি মারফত অর্ধেন্দুবাবুকে অনুরোধ করেন তাঁর পাসপোর্টের ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে (পৃষ্ঠা ৩১৪–৩১৬)

৭। চন্দ্রকেতুগড়, যুগবাণী (১৭ ও ১৯) ১৯৫৭।

৮। এই প্রবন্ধ প্রস্তুত করতে আমায় অকুণ্ঠিত ও প্রফুল্লচিত্তে অশেষ সাহায্য করেছেন আমার বিশেষ সুহৃদ ও সুসাহিত্যিক ড. মদনগোপাল মুখোপাধ্যায়। তাঁকে জানাই আমার ঐকান্তিক কৃতজ্ঞতা।