পীযূষ রায়চৌধুরী 

ওয়েসিস ওভারল্যান্ড ট্রান্স আফ্রিকা এক্সপিডিশনে তখন আমি  পূর্ব আফ্রিকার উগান্ডায়। উদ্দেশ্য, দুষ্প্রাপ্য মাউন্টেন গরিলা চাক্ষুষ করা। তবে তার দেখা পাওয়া কি সহজ কথা ! ট্রেক করে পৌঁছতে হবে রোয়ান্ডা-উগান্ডা সীমান্তের রুহেঙ্গিরি এলাকার বিউয়িন্ডি ইম্পেনিট্রেবল জঙ্গলে। এটা সেই অঞ্চল যেখানে তেনারা থাকে। ঝরাতে হবে অনেক ঘাম, খেতে হবে জ্বালা ধরানো পোকার কামড়, কাঁটার খোঁচা, পথ আটকাবে দুর্ভেদ্য লতা। তাঁবু পড়েছে লেক বিউনিয়নির পাশে। রাজধানী কাম্পালার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৪৭০ কিলোমিটার দূরে এই সরোবর। বিউনিয়নি পিগমি কমিউনিটি সেন্টারের রোয়েন্ডিরে ফ্রান্সিসের সঙ্গে যাব বাটওয়া (পিগমিদের সাব গ্রুপ) গ্রামে। উপজাতির মুখপাত্র ফ্রান্সিস বলছিল, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, রোয়ান্ডা আর উগান্ডার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ঘন জঙ্গলে মোড়া আগ্নেয়গিরিময় পাহাড়ে দুনিয়ার তাবৎ গরিলারা থাকে। এদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। কারণ পোচিং। বহু পুরনো রোগ। একসময় এই গরিলা মাংসের বিরাট চাহিদা ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে। ব্রিটিশ উপনিবেশে  থাকাকালীন উগান্ডা, রোয়ান্ডা থেকে লন্ডনের বাজারে রফতানি হত এই দুষ্প্রাপ্য গরিলা মাংস। গভীর জঙ্গলে ছিল পিগমিদের সঙ্গে গরিলাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সীমিত ক্ষমতা নিয়েও চোরাশিকারীদের (মূলত বান্টু উপজাতিদের লোক) হাত থেকে তারা গরিলাদের বাঁচানোর চেষ্টা করত। ১৯৯১ সালে উগান্ডার এমগাহিঙ্গা ও বিউয়িন্ডি অঞ্চলকে সরকারি ইস্তেহারে সংরক্ষিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করা হল। উদ্দেশ্য, জঙ্গলে এক অভয়ারণ্য গড়ে তুলে চোরাগোপ্তা শিকার থেকে বিলুপ্তপ্রায় গরিলাদের রক্ষা করা। গরিলারা এখন ডলার-পণ্য। ফলে সরকারি মনোভাবে গরিলার থেকেও ‘নিকৃষ্ট প্রাণী’ পিগমিরা বলির পশু হয়ে আজ বেজায় ক্ষতিগ্রস্ত। উৎখাত হওয়া এই হতভাগ্যরা এখন টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে।

 উগান্ডার যাযাবর বাটওয়া গোষ্ঠী অন্য পিগমি সম্প্রদায়ের মতোই শিকারি। এটাই এদের একমাত্র জীবিকা। কৃষ্ণসার হরিণ, খরগোশ বা বানর রয়েছে সেই তালিকায়। আছে অন্য খাবার বুনো মধু, জংলি ফলমূল, গুটিপোকা বা উইপোকা। যুগ যুগ ধরে জঙ্গলের সঙ্গে সখ্যতা। এদের দেশ বা রাজ্য বলে কিছু নেই। পিগমিদের কাছে পৃথিবী মানে গভীর জঙ্গল। প্রেততত্ত্ব আঁকড়ে থাকা পিগমিরা বস্তুবাদে বিশ্বাসী নয়। তাই কখনও জমি-জায়গার মালিক হওয়ার চেষ্টা করেনি। ফলে উচ্ছেদ হওয়ার পর ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হল। স্থানচ্যুত হয়ে পুরো একটা গোষ্ঠী এখন লুপ্ত হওয়ার মুখে। জঙ্গলের বাইরের জীবনে এরা অনভ্যস্ত। জঙ্গল জীবনে টিকে থাকার চিরাচরিত দক্ষতা কোনও কাজেই লাগছে না। জমি-জায়গা নেই। মাথার ওপর ছাদ নেই। কৃষিকাজে রপ্ত নয়। শিকার করে বেঁচে থাকার রাস্তাও বন্ধ। এদের জন্য ভাববার কেউ নেই। শুধু অন্যের অনুকম্পায় বেঁচে থাকা। যে জঙ্গলে পিগমিদের বসতি ছিল সেখান থেকে তাদের উৎখাত করে বিদেশি ট্যুরিস্টদের গরিলা দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন চলছে। গরীব দেশটার এ ছাড়া করারও কিছু নেই। রাজস্ব আদায়ের অন্যতম সেরা রাস্তা এটা।

পিগমিরা গরীব হলেও নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গৌরবান্বিত। দুর্বল, প্রতিরোধ শক্তিহীন হতভাগ্য মানুষগুলো অন্য জঙ্গলজীবী সংখ্যাগুরু বান্টু সম্প্রদায়েরও ঘৃণ্য বর্ণবৈষম্যের শিকার। মুচলেকায় আবদ্ধ গোলাম। অনন্তকাল ধরে নির্মম অত্যুষ্ণ রেইন ফরেস্টের মধ্যে বেঁচে থাকার কুশলী পন্থা এদের জানা। গভীর জঙ্গলে স্বচ্ছন্দে নড়াচড়া করবার উপযোগী ছোটখাটো ছিপছিপে ওদের শরীর। বিজ্ঞানীরা বলেন, রোদহীন ঘন জঙ্গলে বংশপরম্পরায় দিনযাপন করায় এদের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি। অতএব হাড়ের বৃদ্ধি রোধ, সঙ্গে অপুষ্টি। তারই প্রতিফলন চেহারায়। নাক উঁচু অন্য অনেক জাতির চোখে এরা মানুষের পর্যায়ে পড়ে না।

গাইড ফ্রান্সিস

ফ্রান্সিসের মুখে কথাগুলো শুনছিলাম। ও আমাকে নাড়িয়ে দিল। পিগমি ভিলেজে যাওয়ার আর উৎসাহ পাচ্ছি না। সীমিত ক্ষমতায় আমি যখন এদের জন্য কিছু করতেই পারব না তখন পিগমি ভিলেজে যাওয়া মানে খরচা করে হিউম্যান-জু দেখতে যাওয়া। আমার মনোভাব ফ্রান্সিসকে জানাতে ও একটু মুষড়ে পড়ে বলল, ‘দ্যাখো, ট্যুরিস্টরা গরিলা দেখবার জন্য হাজার হাজার আমেরিকান ডলার খরচ করছে। তোমরা ভিলেজে গেলে পয়সাটা সরাসরি ওদের হিতে লাগবে। এই ব্যবস্থা আমরা অনেক কষ্ট করে করতে পেরেছি। আগে দালালরা মাঝে থেকে সব পয়সা লুটে নিত। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যতম গরীব দেশের সব থেকে গরীব মানুষদেরও একটা উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক দিক আছে। সেটা দেখতে ভালো লাগবে। তোমাদের ওখানে যাওয়া মানে এই চরম দুর্দশাগ্রস্ত মানুষরা দেশের পর্যটন শিল্পের প্রত্যক্ষ স্টেকহোলডার হবে।’

বিউনিয়নির এঁদো জলে ভোর হচ্ছে। পান্‌সে সূর্য। গাছের মাথায় খেলে বেড়াচ্ছে মেঘবালিকা। আঁধারতাড়ুয়া আলো চরাচরে এখনও কায়েম করতে পারেনি তার অস্তিত্ব। ফ্রান্সিসের সঙ্গে আমরা ক’জন পাড়ি দিয়েছি এক ডোঙা নৌকায়। নিস্তব্ধ সকাল। শুধু বইঠায় জল কাটবার আওয়াজ— ছলাৎ ছল। সরোবরে উনত্রিশটা ছোট-বড় সবুজ দ্বীপ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। দু’পাশে টিলার ঢালে কলার কুঞ্জবন, সারি বেধে ঢ্যাঙা ইউক্যালিপটাস সরোবরের খাড়া পাড়ে। মাথায় ঝুটিবাঁধা পাপিরাস ভোরের হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। হ্রদের আরশিতে তার প্রতিবিম্ব। টলটলে স্বচ্ছ জলে গ্রামের কচি-কাঁচারা।  উদ্দাম সাঁতারে ধেয়ে আসছে আমাদের ডিঙির দিকে। বাচ্চাগুলোর বুকে দম আছে বটে। শখ আহ্লাদে এটা ওদের প্রাত্যহিক  বিনোদন। মিষ্টি জলের সরোবরে ভাগ্যিস কোনও জলহস্তি বা কু্মির নেই। তবে ভোঁদড়ের উপস্থিতি থেকে থেকেই টের পাচ্ছি। প্রায় সাড়ে ছ’হাজার ফুট উচ্চতায় প্রভাতি সরোবরে তুলোর মতো কুয়াশার স্রোত। ঢিবি পাহাড়ের সবুজে উগান্ডার জাতীয় পাখি একজোড়া গর্বিত গ্রীবা ‘গ্রে-ক্রাউন্ড ক্রেন,’  গাছের মগডালে বসে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে হলুদ ঠোঁটের আত্মজ্ঞানী ‘ফিশ ঈগল’। একটা ‘পাইড কিং ফিশার’ থেকে থেকেই  মিসাইল গতিতে জলে ঝাঁপ দিচ্ছে মাছের খোঁজে। কুয়াশায় চান করা ‘আফ্রিকান ডারটার’ গা শুকোচ্ছে তার ভেজা পাখনা মেলে। গাছে গাছে ঝুলছে পাপিরাস পাতায় তাঁতি পাখির বয়নশিল্প। বিউনিয়নি মানেই তো পাখিরালয়। সার্থক নাম। ফ্রান্সিসের কাছে শোনা— প্রায় দুশো প্রজাতির পাখির নাকি নিশ্চিন্ত আশ্রয় এই সরোবর। পঁচিশ কিলোমিটার লম্বা এঁকেবেঁকে চলা সরোবরের গভীর জলে হরেক মাছ— তাদের ভরপুর সংসার।

আকামপেনে- পানিশমেন্ট আইল্যান্ড

দ্বীপগুলোকে পাশে ফেলে মোচড় খেয়ে খেয়ে চলেছে নৌকা। প্রত্যেক দ্বীপের সঙ্গে এক একটি লোককাহিনি জড়িয়ে। একটা  ন্যাড়া পুঁচকে দ্বীপ দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল ‘আকামপেনে’ বা পানিশমেন্ট আইল্যান্ড। ভয়ংকর কুখ্যাত এই দ্বীপের সঙ্গে জড়িয়ে অনেক অন্যায়। অবিবাহিত কোনও মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে শাস্তি দেওয়া হত। সমাজপ্রভুদের চোখ রাঙানিতে পরিবারের লোক হতভাগ্য মেয়েগুলোকে জবরদস্তি নৌকা করে নিয়ে এসে এই দ্বীপে ছেড়ে দিত। অনাহারে মারা যাওয়ার জন্য। এই তালিবানি প্রথা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও বলবৎ ছিল। কান পাতলে এখনও শোনা যায় পরিজনদের বুকফাটা কান্না। সাঁতরে পালিয়ে আসার চেষ্টা করলে জলে ডুবিয়ে হত্যা করা হত। ফ্রান্সিসের সহযোগী বইঠা হাতে স্টিভেন, ওর মা এরকম একজন দ্বীপে ছেড়ে আসা সমাজচ্যুত হতভাগ্য নারী, যাকে ওর বাবা লুকিয়ে নৌকা নিয়ে দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে বিয়ে করে। গরীব বাবার ‘লোবলা’ বা কন্যাপণ দিয়ে বিয়ে করার ক্ষমতা ছিল না। স্টিভেনের মা এখনও বেঁচে আর স্টিভেনের দিদি সেই বেজন্মা।

উজান বেয়ে নৌকায় সওয়ার হয়ে চলেছে আশপাশের গ্রামের লোক। মনোরম প্রকৃতি। রঙ-রূপে বাড়তি মাত্রা। পার্বত্য কিগেজির ছাদে একটুকরো একগুঁয়ে মেঘ আটকে। সেখানে অকুতোভয় জেব্রা, কৃষ্ণসার হরিণ আর বানর বাহিনীর অবাধ বিচরণ। ঘণ্টা দেড়েক যাত্রার শেষে দুরবীন দূরত্বে বৃক্ষহীন পাহাড়ের মাথায় কিয়েভু গ্রাম। সেখানে আকাশের গায়ে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে হাড়গোড় বার করা কয়েকটা কুঁড়ে। এটাই আমাদের গন্তব্যের পিগমি গ্রাম। দূর থেকে আমাদের দেখতে পেয়ে একঝাঁক কিশোর-কিশোরী বনবিড়ালের মতো পাহাড়ের কঠিন ঢালে বিদ্যুৎগতিতে নেমে আসছে। প্রত্যাশাকে আঁকড়ে ধরা দৌড়। ঘাটে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে— ‘ময়েবাওয়ে কুরিজা, ময়েবাওয়ে কুরিজা।’ এটা এদের অভ্যর্থনার ভাষা। নৌকা থেকে নেমে ওদের বাঁধনহাঁরা উচ্ছ্বাসের স্রোতে যেন আমরা হারিয়ে গেলাম। সবার যে চামড়া আবলুস কালো বা চেহারায় বুনো ভাব তা কিন্তু নয়। ফ্রান্সিসের কাছেই শোনা— এটা পিগমি মেয়েদের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের পুরুষদের মিলনের ফল। প্রায় প্রত্যেকেরই ধুলোমাখা খালি পা, পরনে শতছিদ্র  মলিন জামা-প্যান্ট। একটাই পোশাক, সাবানের অভাবে কাচাকাচি বন্ধ। কারও কারও গা একদম খালি। পুষ্টির অভাবে থমকে যাওয়া বাড়। রক্তাল্পতা। শরীরে প্রোটিন ঘাটতিতে বড় পেট। তবুও কী যে আন্তরিক হাসি সবার মুখে! মুষ্টিতে ধরা হাতে প্রগাঢ বন্ধুত্ব। পাহাড়ের মাথায় শিকড় উপড়ানো গোটা ষাটেক মানুষের বাস। হাঁপধরা বুকে পাহাড় চড়া। ইতস্তত ছড়িয়ে সামান্য চাষের জমি। সেখানে কড়াইশুঁটি, কাসাভা, ভুট্টার খেত। অনভ্যস্ত হাতে গ্রামের মহিলাদের মরিয়া সংগ্রাম জমিতে। বাঁশের কাঠামোয় লাল মাটি লেপে মামুলি চালাঘর। এটা ওদের সবে চালু হওয়া স্কুল। ক্রমবিবর্তনের ধারায় তথাকথিত এই ‘নিকৃষ্ট’ জাতির জন্য সরকারের তরফে শিক্ষার কোনও ব্যবস্থা নেই। পিগমি কমিউনিটি সেন্টারের উদ্যোগে সামান্য এই স্কুল।

আঁতুড় ঘর

গ্রামে তখন একটা উৎসবের মেজাজ। সদ্য একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় একটা জাতি, তাই বড্ড দামি এই শিশু। বাঁশের চ্যাঁচারি আর শুকনো পাতায় মোড়া আদিম নেংটি গম্বুজ ঘরে আঁতুড়। এক বুড়ি দাইমার জিম্মায় বাচ্চা, ক্লান্ত প্রসূতি মা তোশক বা কম্বলের অভাবে খালি মাটিতে আলগা শরীরে বিশ্রামে। ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞাসা করে সন্তান জন্মানোর চমকপ্রদ তথ্য পেলাম। গর্ভাবস্থায় প্রসববেদনা আরম্ভ হলে দাইমার সাহায্যে প্রসূতি মা নদীর পাড়ে উবু হয়ে বসে। সে তখন নাকি ব্যথা উপশমের জন্য গান গাইতে থাকে। কলজে ফাটা সেই গান। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে এক দাই-মা বাচ্চাকে উলটে ঝুলিয়ে রাখে, শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হওয়া অবধি। অন্য দাইমা দাঁত দিয়ে নাড়ি কেটে গিঁট লাগিয়ে দেয়। চিরাচরিত জংলি পদ্ধতি। সহজ, স্বাভাবিক, ঝামেলাহীন দ্রুত প্রসব। উপায়ই বা কী! চিকিৎসায় কোনও তরফেই কোনও সাহায্য নেই। প্রসবে জটিলতা দেখা দিলে মা ও সন্তান উভয়েরই মৃত্যু অবধারিত। সন্তানের বাবা বাচ্চার মায়ের তুতো-ভাই। কখনও কখনও কোণঠাসা হওয়া সমাজে ভাই-বোনের মধ্যেও বিয়ে হওয়ার রেওয়াজ আছে। এ বিয়ে ওদের চোখে ব্যভিচার নয়।

উৎসব শুরু হল। গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচ। কেমানজি পিগমি গানের সঙ্গে কিকিগা আদিবাসী নাচ।

বাচ্চাদের কিগিগা নাচ

‘ওরেবে আক্কারিগিটো কেমানজি ড্যিওয়ে। ওরেবে আবাগিয়েনি বেইটু বেরিনেজা। আয়ি এগো নযানিরা।’

‘দ্যাখো ভয়ডরহীন মানুষের সাহস। তাকিয়ে দ্যাখো অতিথিদের দিকে, তারা কেমন সুন্দর। এখানে সব কিছুই সুন্দর।’ 

‘সু বনগিসা নডুরু, নডুরু পিসু একেমি। আকেমি আমু মুকিরা, আকেমি আমু নডুরা।’

‘আমরা অরণ্যকে ভালোবাসি, অরণ্য আমাদের শান্তি দেয়। উচ্চকোটির শব্দ শিকারে বিঘ্ন ঘটায়, কোলাহল অরণ্যকে ধ্বংস করে।’

মেয়ে-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো, সবাই ছন্দে গাইছে। নাচছে। পায়ে পায়ে দাপানো উদ্দাম নাচ। সহজে খুশি থাকার নাচ। শরীরী ভাষায় না বলা কথা। পেঁচার ডাকে ইয়ডলিং বা গলার স্বর সরু করে উলুধ্বনি দিয়ে নিজেদেরকে তাতানোর চেষ্টা। একসঙ্গে অনেকগুলো স্বরযন্ত্রের জটিলতা। কাঁপা স্বরে সম্মোহক গীত। নাচে আদিম ঠমক। একটা প্লাস্টিকের ডিব্বার ওপর লাঠির বাড়ি মেরে তাল ঠিক রাখা। সঙ্গে পেঁপে ফেঁকড়ির বাঁশি। মারামাস রোগের শিকার, শীর্ণকায় শিশু যারা, তারাও পা মেলাচ্ছে। জীবনে সঙ্গীতই একমাত্র প্রমোদ। ওদের কাছে কোলাহল মানে ধ্বংস। নৈঃশব্দ— মৃত্যু।

প্রাপ্তবয়স্ক কারও কারও গায়ে সস্তা মদের গন্ধ। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করি, এত দারিদ্র যেখানে, সেখানে নেশা করার মতো পয়সা এরা পায় কোত্থেকে? অবাক হওয়ার মতো কিছু তথ্য পাওয়া গেল ফ্রান্সিসের কাছে। ছিন্নমূল হতভাগ্য এই বাটোয়া পিগমিদের মধ্যে ইদানিং শহুরে বিষ ঢুকতে শুরু করেছে। কাজকর্ম নেই। সময় কাটাতে নেশা। আদি অনন্ত কাল ধরে বাঁচিয়ে রাখা কৃষ্টি অধঃপাতে। না জানে কৃষিকাজ, না পারে শিকার। সামাজিক অবক্ষয়ে এরা পরিবারের দায়িত্ব নিতে অক্ষম। সামান্য কিছু আয় হয় জঙ্গলের কাটা কাঠে কাঠকয়লা বানিয়ে।

যে সমাজ হিংসা, ঘৃণা, রেষারেষি বর্জিত ছিল এখন সেখানে নেশাগ্রস্ত মরদদের গার্হস্থ্য জুলুম চলছে পরিবারের মেয়েদের ওপর। পরম্পরাগতভাবে জঙ্গলজীবনে নারী-পুরুষের বিধিসঙ্গত সমান অধিকার ছিল। কেউ কারও ওপর কর্তৃত্ব ফলাত না। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিবারের মঙ্গলে নারীরাই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত। পরিস্থিতি পালটেছে। প্রেক্ষাপট বদলেছে। জুলুমবাজি থেকে বাঁচতে মেয়েরা বেপরোয়া হয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার খোঁজে বাড়ির বাইরে। জমিতে কোদাল চালানোই ভরসা। জমি না পেলে বাজারে গিয়ে দাঁড়ানো। সেখানে হয় ভিক্ষে করা নয়তো আবর্জনায় উচ্ছিষ্ট খোঁজা। উঁচু জাতের লোচ্চা পুরুষদের খপ্পরে ক্ষুধার্ত পেটের নিরন্তর আত্মসমর্পণ চলছেই। এটাই এখন সমাজস্বীকৃত অভ্যস্থ কর্ম। লম্পটরা বেশিরভাগ হয় পুলিশ নয়তো ক্ষমতাবান। নিজেদের প্রয়োজনে আদিম পৌরাণিক কাহিনিতে ওদের বিশ্বাস। পিগমি নারীর সঙ্গে যৌন সঙ্গম ওদের এইচ আই ভি জাতীয় কঠিন রোগ থেকে নাকি মুক্তি দেবে। পরিণাম, এখন বাটোয়া মেয়েদের মধ্যে এই মারণ রোগ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।

নাচের আসরে একটি পঙ্গু মেয়ে তার নিম্নাঙ্গ মাটিতে ঘষটে ঘষটে হাজির হল। মেয়েটি হাঁটতে পারে না। মলিন ছেঁড়া টেপ জামা গায়ে। পঙ্গু হয়ে সে জন্মায়নি। ও গিয়েছিল বিউনিয়নি সরোবরে চান করতে। নদী বা সরোবরের জলে কোনও পুরুষমানুষের সঙ্গে কোনও নারীর ঘটনাক্রমে যদি সাক্ষাৎ হয়, চাপিয়ে দেওয়া স্থানীয় রীতি অনুযায়ী তক্ষুনি সেই নারী উপস্থিত পুরুষের ভোগ্যবস্তু হয়ে উঠবে। নারীর ইচ্ছাত-অনিচ্ছা এখানে গৌণ। সরোবরের পাড়েই হতভাগ্য মেয়েটি গ্যাং রেপের শিকার হয়। দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণে এবং কোনওরকম চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে মেয়েটি আজ শারীরিক প্রতিবন্ধী। এমনকি নিজের সমাজেও সে পরিত্যক্তা। জঙ্গলজীবনের সহমর্মিতার অভাব এখানে। বাটোয়া পিগমিদের অশিক্ষা ও আত্মসম্মানের অভাব ওদের প্রতিবাদ বিমুখ করে তুলেছে। প্রতিবাদ বা অভিযোগ করা ওদের ধাতে নেই। ফ্রান্সিসের মুখে যত শুনছি তত হতাশ হচ্ছি। অতিকষ্টে ট্যুরিস্টদের কাছ থেকে পাওয়া টাকায় একটা স্কুল তৈরি হয়েছে। মাস্টারের অভাবে এখন বন্ধ। এখানেও একই নিপীড়নের কাহিনি। লম্পট মাস্টার শিশু ছাত্রীদের ওপর যৌন নির্যাতন করত। গ্রামের ধারে ধারে গাঁজা গাছ। ঘরে খাবার না থাকলে, খিদেতে বাচ্চারা কাঁদলে ভাং খাইয়ে ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। চোখ বড় বড় করে শুনছিলাম গাঁজা পাতার মাহাত্ম্য।  খাদ্য বা চিকিৎসায় এদের কাছে গাঁজা গাছের গুরুত্ব অপরিসীম।

জঙ্গল থেকে বহিষ্কৃত প্রকৃত-পূজারি পিগমিরা আজ নিজধর্মচ্যুত। সামাজিক চাপে সবাই এখন একেশ্বরবাদী ক্যাথলিক খ্রিস্টান। গ্রামে কঞ্চির ওপর পাতার ছাউনি দেওয়া এক অস্থায়ী চার্চ। সেখানে টাঙানো যিশুখ্রিস্টের পোস্টার ছবি। সঙ্গে ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। গ্রামের নেতা ডেমবে। ফ্রান্সিসের মাধ্যমে আমাদের কাছে অনুরোধ করল, আমরা যাতে ওদের সাহায্যে এগিয়ে আসি। ডেমবের কোলে ওর শিশুপুত্র। নাম রেখেছে নাকিমুরা। নামের মানে ঈশ্বরের দান। এখানে বাটোয়া পিগমিরা অবক্ষয়ে তলিয়ে যাওয়ায় ডেমবে চিন্তিত। অবাক হয়ে দেখছিলাম শিশুটি ডেমবের স্তনাগ্র আপনমনে চুষে চলেছে। সম্ভবত পিগমিরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পিতা। ওর কাছে শুনলাম, এক বছর অবধি শিশুদের ওরা কাছছাড়া করে না। মা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে বাবারা শিশুদের পরিচর্যা করে। সম্ভবত এই কারণেই পিগমি বাচ্চারা নাকি কখনও কাঁদে না।

বাবা ডেম্বে, ছেলে নাকিমুরা

গ্রামের মহিলারা হাতের কাজের নানারকম শিল্পসামগ্রী আমাদের সামনে মেলে ধরল। শিল্পকর্মে অনভ্যস্ত আনাড়ি কিন্তু চেষ্টায় মরিয়া। নিজেদের সীমাবদ্ধতায় যতটুকু পারা যায়। আমি জানি, স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে সামান্য কিছু সংগ্রহ ওদের অসীম সংগ্রামী জীবনের আগুন নেভাতে এক চামচ জলও নয়। ফ্রান্সিস আগেই সাবধান করে দিয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে আমরা যেন কাউকে কোনও টাকাপয়সা না দিই। এতে ওদের অভ্যাস খারাপ হবে। সেই বাচ্চাটি, যে আমাকে খাড়া রাস্তায় পাহাড়ের মাথায় উঠতে সাহায্য করেছিল, বিদায়বেলায় ঘাটে ভিড়ের মধ্যে একটা প্রত্যাশাভরা দৃষ্টি নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে। খর্বাকৃতি পেটমোটা বাচ্চাটি, যে আমাকে তীর-ধনুক চালানোর হাতেকলমে শিক্ষা দিচ্ছিল, তারও অভিব্যক্তিতে কিছু পাওয়ার আশা। সামান্য পারিতোষিকেই এরা খুশি। আমরা যারা বিশেষ সুবিধার অধিকারী, যাদের আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই, তারা আরও বেশি ভিখিরি। ফ্রান্সিসের বারণ সত্ত্বেও কিছু উগান্ডান শিলিং ওদের হাতে তুলে দিয়ে নিজেকেই যেন সামাজিক স্বীকৃতি দিলাম—  আমি এদের থেকে ভালো আছি।

নৌকায় আমাদের সঙ্গে ফিরছে কঙ্গোর জঙ্গল থেকে পালিয়ে আসা কারামৌহোচে। ও থাকে কাগোনিয়া পিগমি ভিলেজে। কয়েক দিন ছিল কিয়েভু গ্রামে। কঙ্গোর জঙ্গলে গরিলাদের সঙ্গে সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা থাকার জন্য ‘গরিলা মাউন্টেন ট্রেক’-এর অস্থায়ী গাইডের কাজ পেয়েছে। দলে দলে ভাগ হয়ে উৎখাত হওয়া বা কঙ্গোর জঙ্গল থেকে পালিয়ে আসা পিগমিরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। নিওম্বে, কাশাগা, এঙ্কেরিঙ্গো, রুহিজা, রুবুগিরি, মুটান্ডা এমন সব গ্রামে। এখানেও অশান্তি। জমির অধিকার নিয়ে স্থানীয় উঁচু জাতের মানুষের সঙ্গে সংঘাত। সাব-হিউম্যান ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া পিগমিদের এরা আশপাশে থাকতে দেবে না। যতই সে জমি নিষ্ফলা হোক বা পরিত্যক্ত। ফ্রান্সিস বলল, মাঝে অশান্তি চরম পর্যায় চলে গিয়েছিল। তখন অনেকে পালিয়ে রোয়ান্ডা সীমার কাছে ‘কিসোরো’ অঞ্চলে এমগারহিঙ্গা পাহাড়ের ‘মুগাটিঙ্গা’ গুহায় আত্মগোপন করে ছিল। ফ্রান্সিস চাইছে সমস্ত পিগমি উপজাতিকে একাট্টা করে একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে। এই অসাধ্যসাধন যে ও কীভাবে করবে তা এখনও নিজেরই অজানা।

ইকুয়েটোরিয়াল মধ্য-পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পিগমি সম্প্রদায়। স্থানবিশেষে তাদের ভাষা আলাদা, শিকার করার পদ্ধতি আলাদা, কখনওসখনও কৃষ্টি-সংস্কৃতিও ভিন্ন। কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারণের গতিপ্রকৃতি, নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা  তিন হাজার বছর আগে পর্যন্ত ছিল একইরকম। উচ্চবর্ণের আবাদকারী জোতদাররা পিগমি এলাকায় অনধিকার প্রবেশ করে জমি দখল করা শুরু করল। দুর্বল হওয়ায় পিগমিরা বাধা দিতে পারল না। পুরো গোষ্ঠীটাই টুকরো টুকরো হয়ে জঙ্গলের  বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। কৃষিকাজে অভ্যস্থ উচ্চবর্ণ বান্টু পুরুষদের সঙ্গে একপেশে পিগমি মেয়েদের যৌন মিলনে এক মিশ্রজাতীয় বাচ্চার জন্ম হতে লাগল। শরীরের গড়ন ভিন্ন, চেহারায় অমিল। তবুও তারা সাব-হিউম্যান হিসেবে জঙ্গলে একঘরে হয়ে রইল। এবার শুরু হল আধুনিক যুগের রাজনৈতিক হিংসা। কোনও কারণ ছাড়াই বলি হল জঙ্গলবাসী পিগমিরা। ১৯৯৪ সালে রোয়ান্ডায় সংখ্যাগুরু দাম্ভিক, উন্নাসিক, ক্ষমতাশালী ‘হুটু’ সম্প্রদায় সংখ্যালঘু ‘টুটসিদের’ ওপর ওসকানো উন্মত্ততায় নৃশংস গণহত্যা চালাল প্রায় একশো দিন ধরে। ইতিহাসের পাতায় উঠে আসা বিংশ শতাব্দীর সব থেকে জঘন্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল আফ্রিকা। নারী- পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে প্রায় আট লক্ষ অসহায় মানুষ এই বলির শিকার।

পিগমি মা ও ছেলে

শান্তি ফিরে আসার পর আবার ক্ষমতায় ফিরে এসে টুটসি সংখ্যাধিক্য রোয়ান্ডান আর্মি গণহত্যার অপরাধীদের খোঁজা শুরু করল। এবার কুকর্মকারী হুটুদের পালানোর পালা। বড় সংখ্যক হুটু অপরাধী ইন্টারাহাম্বে গ্রুপ পালিয়ে জাইরের রেইন ফরেস্টে আশ্রয় নিল। এখন যেটা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো। বেশিরভাগ তরুণের হাতে কালাশনিকভ বন্দুক, সঙ্গে পর্যাপ্ত কার্তুজ। ওরা ধর্ষণে অভিজ্ঞ, মারিজুয়ানার নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে নাবালক দুষ্কৃতীরা। ১৯৬০ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাইরে তখন প্রেসিডেন্ট মবুটুর অপশাসন। দেশের কোষাগার লুঠ হয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। সাধারণ মানুষ অতীব দুর্দশায়। ‘হুটু’ অপরাধীদের অভয়ারণ্য তখন কঙ্গোর রেইন ফরেস্ট। যেখানে আগে থেকেই ডেরা বেঁধে বসে আছে কঙ্গোলিস লিবারেশন মুভমেন্টের ‘লেন্ডু’ বিদ্রোহী সৈন্যরা। ওরাও জাতে হুটু।  হীনমন্যতায় ভোগা নিরস্ত্র পিগমিরা ভয়ে সেঁধিয়ে থাকত। শিকারে অনভ্যস্থ কুলাঙ্গারগুলো পিগমিদের ধরে আনা শিকার কেড়ে খেত। শিকার থেকে খালি হাতে ফিরলে শুরু হত অমানুষিক অত্যাচার, মেয়েদের গণধর্ষণ। বয়স নির্বিশেষে সব মেয়ে মহিলাদের ঠাঁই ওদের হারেমে।

কঙ্গোর উত্তর-পূর্বে ‘ইতুরি’ রেইন ফরেস্টে থাকা ‘এমবুটি পিগমি’ কারামৌহোচে গাইড হওয়ার সুবাদে কথাবার্তায় পাকা। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, কঙ্গোর জঙ্গলে ওর থাকার অভিজ্ঞতা। সেখানে ক্যানিবলরা আদৌ ছিল কিনা। প্রথমে কোনও উত্তর নেই। এরকম স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে চায় না। পিগমিদের ভেতরে একই রক্তের ভাই-বোনের বিবাহ ও সন্তানের জন্ম দেওয়ার যে অজাচার, সেই সংবেদনশীল বিষয়ে কথা বলাতেও আপত্তি। দলের মধ্যে আমারই বাড়তি উৎসাহ দেখে ফ্রান্সিস ওকে অনুরোধ করল ক্যানিবলদের গল্প বলার জন্য। ওকে মনে করিয়ে দিল উগান্ডার গল্প-বলিয়েদের কদরের কথা। স্কুলে মাস্টাররা গল্প বলে ছাত্রদের দিয়ে একই গল্প বলার পুনরাবৃত্তি করায়। এতে ছাত্ররা শেখে ভাল। নিমরাজি কারামৌহোচে শেষে বলল, ‘বলতে পারি, তবে টাকা দিতে হবে, সঙ্গে একটা টি-শার্ট।’ সহযাত্রী বব হ্যালান্ডের টি-শার্টের ওপর ওর নজর। টাকার অঙ্ক ভালই, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় হাজারখানেক। প্রথমে ইতস্তত করেও শেষে আমরা রাজি হলাম। এবার শর্ত আরোপ। ছবি তোলা বা কথা টেপ করা যাবে না। আমরা অবাক। পরনের প্যান্ট আর টি-শার্টে ওর যাযাবর জীবন শেষ হওয়ার ইঙ্গিত। ও এখন শহুরে নাগরিক। যুদ্ধ, অরণ্যবিনাশ আর পর্যটক— পিগমিদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও তাদের যাযাবর জীবনকে শেষ করার আসামী। কারামৌহোচে আলাপে দক্ষ, চুক্তি করায় ধূর্ত। নৌকায় বসে ভাঙা ইংরেজিতে ওর জীবনের এক রোমহর্ষক কাহিনি শোনাল।

‘১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি। রোয়ান্ডায় গণহত্যার অপরাধী হুটু ইনটেরাহাম্বে গ্রুপের এক নেতার নির্দেশে প্রকাশ্যে এক কিশোরীর ওপর গণধর্ষণ চলছে। ধর্ষণকারীরা বেশিরভাগ নাবালক। দলের বিকৃত রুচির এক নেতার নির্দেশে এই গণধর্ষণ। আমাদের অপরাধ সেদিন শিকারে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা। কিশোরীর ভাই সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ করে ওঠে— প্রথম পিগমি প্রতিবাদ। পরিণাম ভয়ংকর। নৃশংস। ভাইটিকে তৎক্ষনাৎ হত্যা করে কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ওরা পুড়িয়ে খেতে শুরু করল। চোখের সামনে দেখছি আমার এক স্বজাতিকে পুড়িয়ে, সেই মাংস নুন মিশিয়ে খাচ্ছে। ওদের বিশ্বাস, পিগমি মেয়ের যৌনাঙ্গ ভক্ষণে কামশক্তি বৃদ্ধি পায়। তাজা কলজে দেহের শক্তি বাড়ায়। আমরা নিরুপায়। পালাবার পথ বন্ধ। কয়েক দিন বাদে আমার আর এক জ্ঞাতিকে হত্যা করে হৃদপিণ্ড পুড়িয়ে খাবার পর তারই পোড়া অংশ আমাদের খেতে বাধ্য করল। সেই রাতে পিশাচগুলো বানানা বিয়ারের সঙ্গে বানগুই ঘাস খেয়ে নেশায় বুঁদ। সুযোগ বুঝে সব কিছু ফেলে আমরা পালাতে আরম্ভ করলাম। ওরা টের পেয়ে গুলি চালাল। কয়েকজন ওখানেই মারা গেল। আহতরা পেছনে পড়ে রইল। আজও জানি না ওদের কি পরিণতি হয়েছে। রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। কতটা পথ পাড়ি দিয়েছি তার কোনও ধারণা নেই। দলে ছিলাম জনা চল্লিশ। ঘন জঙ্গলে কাদা-পাথরের ভয়ংকর পাহাড়ি রাস্তা। পথে কয়েকজন খিদেয় প্রাণশক্তি হারিয়ে মারা গেল। সুযোগ বা  সামর্থ না থাকায় মৃতদের মাটিতে পুঁতে দেওয়ার বদলে গাছে ঝুলিয়ে পালাতে থাকলাম। ওরা শকুনদের খাদ্য হবে। দিন পাঁচেক বাদে জঙ্গলের বাইরে এসে দেখি মাত্র বারোজন পৌঁছতে পেরেছি। আমি আমার দুই সন্তান-সহ স্ত্রীকে হারালাম। আজও জানি না ওদের কী হল।’ 

নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কারামৌহোচের কথা শুনতে শুনতে। দূরে কুয়াশায় অস্পষ্ট পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা দিনের শেষ আলো সরোবরের শরীরে আত্মগোপন করছে। নিস্তেজ আলো তখন হাহাকার হয়ে কারামৌহোচের ভাঙাচোরা মুখে আটকে।

আফ্রিকার নরমাংসভোজী মানুষের কথা শুনেছি কিন্তু কোনওদিন ভাবিনি এমন একজনকে পাব যে ক্যানিবলদের হাঁড়িকাঠে বাঁধা বলির সামগ্রী হয়েও পালিয়ে আসতে পারবে। আমার আর শুনতে ভালো লাগছে না। হিংসে হচ্ছিল সেইসব সহযাত্রীকে যারা সেই  মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে নৌকায় নেই। কারণ তাদের শুনতে হচ্ছে না। ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এদের নিয়ে তোমার পরিকল্পনা কী?’ ও বলল, ‘জান, আফ্রিকায় একটা কথা আছে, যদি তুমি একটা পাহাড় সরাতে চাও তাহলে একটা নুড়িপাথর সরিয়ে তার শুরুটা করতে হবে। আমি সবার সাহায্য নিয়ে সেটাই  করার চেষ্টা করছি। শুরু করে যদি বিফলও হই, তবু বলতে পারব আমি নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকিনি।’

কারও মুখে কথা নেই। ঝাঁকি উপুড় করা দিনের শেষ আলোয় নৌকা চলছে। হঠাৎ নিজেকেই প্রশ্ন করে বসি, কেন আমি এলাম এখানে। পিগমি মানুষ, তাদের জীবনধারা, লোকাচার— এসব জানতে উৎসাহিত হওয়ার পেছনে সূত্রপাতটা কোথায়? মনে পড়ে গেল সেই বইটার কথা। ‘ওটা বাঙ্গা, দ্য পিগমি ইন দ্য জু।’ ফিলিপ ভার্নার ব্র্যাডফোর্ডের লেখা, আদিম মানুষ অরণ্যবাসী এক বামন পিগমিকে নিয়ে লেখা।

লেখকের বর্ণনায়— কাতারে কাতারে লোক চলেছে ন্যু-ইয়র্কের ব্রনক্স চিড়িয়াখানায়। ভাবতে কষ্ট হয়, যেখানে বাঁদর, ওরাং ওটাং, শিম্পাঞ্জির পাশাপাশি খাঁচায় একটা জলজ্যান্ত মানুষকে প্রদর্শন করা হয়েছে— জংলি, অসভ্য, সাব-হিউম্যানের তকমা লাগিয়ে। মানুষটি আফ্রিকার এক পিগমি উপজাতিভুক্ত। উচ্চতায় ও মাথার গড়নে ওরাং ওটাং-এর কাছাকাছি। ওর খুশির হাসিও ওরাং ওটাং-এরই মতো। ভিড় করে থাকা জনতা হাসছে, চেঁচাচ্ছে, বিদ্রূপ করছে। কঙ্গোর ‘এমবুটি’ পিগমি উপজাতির খর্বাকৃতি মানুষ বেচারা ওটা বাঙ্গা। ছিল মধ্য আফ্রিকায় কঙ্গোর কাসাই নদীর পাশে রেইন ফরেস্টে পরিবার নিয়ে। স্রেফ ব্যবসা আর নৃতাত্ত্বিক চমক দেওয়ার জন্য তাকে ধরে নিয়ে আসা হল আমেরিকায়। অন্ধকার জঙ্গল থেকে তথাকথিত সভ্য জগৎ আমেরিকায় তার ঠাঁই হল। ধরে নিয়ে এলেন ব্র্যাডফোর্ডের দাদু, একাধারে ধর্মপ্রচারক ও অনুসন্ধানকারী, অন্যদিকে ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ফিলিপ ভার্নার, ১৯০৪ সালে।

ওটা বাঙ্গা

লিভিংস্টোনের দেখানো পথে ইউরোপীয় লুটেরা দেশগুলো তখন সমস্ত আফ্রিকাকে সুবিধেমতো নিজের নিজের উপনিবেশ বানিয়ে ফেলেছে। সেসময় বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপল্ডের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল কঙ্গো। তার ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী পাবলিক মিলিশিয়া কঙ্গোর গভীর জঙ্গলে নেটিভ পিগমি ‘বাঁকা’ উপজাতিদের ধরে ধরে চালান করা শুরু করল। ওর রাবার ব্যবসায়ে বেগার খাটবে তারা। যারা নিমরাজি, তাদের বন্দুকের সামনে মরতে হল। মারা পড়ল দুই সন্তান-সহ ওটা বাঙ্গার স্ত্রী। নিজে বেঁচে গেল। কারণ, সেই সময় ও গিয়েছিল শিকারে। প্রাণে বাঁচলেও লাভ হল না। জঙ্গলে অন্য সংখ্যাগুরু বান্টু উপজাতিদের বশ্যতা স্বীকার করে খাঁচায় পোরা ক্রীতদাস হয়ে রইল। স্যামুয়েল ভার্নার নুন ও জামাকাপড়ের বিনিময়ে এক শিম্পাঞ্জির সঙ্গে বছর তেইশের ওটা বাঙ্গাকে ক্রীতদাস ফড়েদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এলেন আমেরিকায়। স্থান হল চিড়িয়াখানায় উল্লুকদের সঙ্গে। ব্যস, তারপরেই এই অর্ধমানব অদ্ভুত প্রাণীটিকে নিয়ে তুমুল উৎসাহ জনগণের। নৃতত্ত্ববিদরা এবার মাঠে। মানুষের ক্রমবিবর্তনে ডারউইনবাদকে ঢাল করে মিথ্যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব পেশ করা হল। আধুনিক মনুষ্যজাতি সৃষ্টির শুরু থেকেই নাকি পিগমিরা বিপথগামী। এরা সাব-হিউম্যান। খোলাখুলি বর্ণবৈষম্যের পক্ষপাতিত্ব।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এই ভ্রান্ত কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্ব বিজ্ঞানজগতে স্বীকৃতি পেল। ওটা বাঙ্গার দাঁত ছিল ছুঁচলো, বর্শার ফলার মতো। শুধুমাত্র প্রকৃতি-পূজায় বিশ্বাসী পাগানিস্ট পিগমিদের একমাত্র আরাধ্য দেবতা ‘বিহেকো’। পিগমি সংস্কৃতির বিশ্বাস অনুযায়ী কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেওয়ার সময় অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতিতে ছুরি, বাটালির সাহায্যে  দাঁত ছুঁচলো করতে হয়। এটাই দস্তুর। সম্পূর্ণ ভিন্ন বিবরণী দিয়ে ব্রনক্স চিড়িয়াখানায় দাঁত দেখিয়ে পয়সা উপার্জন শুরু হল। ব্যবসা জমে গেল। বলা হল, ওটা বাঙ্গা আসলে আফ্রিকার একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রস্তরযুগের মানুষের নমুনা মাত্র। আমেরিকায় আফ্রিকা থেকে আনা ক্রীতদাসদের উত্তরপুরুষ নিগ্রোরা হইচই শুরু করে দিল। মুক্ত হয়ে ওটা বাঙ্গা চিড়িয়াখানায় অন্য প্রাণীদের অভিভাবকের চাকরি পেল। সামাজিক অবহেলায় ওটা বাঙ্গা তখন বিষণ্ণ, মনমরা, বিচারশক্তিহীন। মাঝে মাঝে মারমুখী হয়ে দর্শকদের দিকে ইট পাটকেল বা তির ছুড়ত। দর্শকদের জঘন্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে ওর প্রতিবাদ। ওর করুণ পরিণতিতে অনুতপ্ত স্যামুয়েল ভার্নার। ফিরিয়ে নিয়ে এলেন আবার আফ্রিকার জঙ্গলে। ফিরে এসেও মন টিকল না। নিজের জাতভাইদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারল না। বিয়ে করা দ্বিতীয় স্ত্রীও আবার মারা গেল সাপের কামড়ে। ফিরে গেল আমেরিকায়। চরম হতাশা। নানা টানাপোড়েন। শেষে চুরি করা বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা। বয়স তখন বত্রিশ।

সংক্ষিপ্ত এই কাহিনি একসময় মনের মধ্যে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তখনও ভাবিনি কঙ্গোর পিগমিদের খোঁজে কোনওদিন আমি সেই আফ্রিকায় পাড়ি দেব।

আদিম পিগমিদের সত্তর হাজার বছরের ইতিহাস গুপ্তরহস্যে ভরা। যেন পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো হিচককের গোয়েন্দা গল্প। এরা কোথা থেকে এল তা এখনও ধোঁয়াশায়। এদের জীবনের পরতে পরতে যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা। একদিকে যেমন পাই গ্রীক কবি হোমারের ইলিয়াড-এর পৌরাণিক কাহিনীর বর্ণনায়। যেখানে পিগমির সঙ্গে দেবী হেনা রূপান্তরিত সারস পাখি হয়ে যুদ্ধ করছেন। অন্যদিকে নৃতত্ত্ববিদরা বলছেন মানবজাতির ক্রম বিবর্তনের ইতিহাসে পিগমিরা হল প্রস্তরযুগের একেবারে প্রথম দিকের মানুষ। রহস্যের আংশিক সমাধান। পিগমি লোকশ্রুতিতে জানা যায়, স্বর্গে বসে ভগবান ‘খোনভৌম’ চাইলেন পৃথিবীতে প্রথম মানুষের সৃষ্টি। তাঁর নির্দেশে স্বর্গদূত মর্তে এসে মানুষের এক মাটির মূর্তি গড়লেন। তাকে গাছের ছাল পরালেন, শরীরে কয়েকটা ফুটো করে নাক, কান, চোখ, মুখ বানালেন। শেষে নাভির নীচে আর এক গর্ত তৈরি করে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বসিয়ে শরীরে রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করলেন। মৃন্ময় মূর্তিতে ফুঁ দিয়ে সঞ্জীবনী সুধা প্রদান করার পর মধ্য আফ্রিকার কঙ্গোর জঙ্গলে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদমের সৃষ্টি হল। ইনি পিগমি, ইফি উপজাতিভুক্ত। সমস্ত মানবজাতির পিতা। ঈশ্বর বললেন,  অরণ্যে আরও মানুষ সৃষ্টি করো। আমি তাদের সব দেব। কোনওরকম কায়িক পরিশ্রম না করেও তারা সুখে শান্তিতে থাকতে পারবে। অনন্তকাল ধরে পৃথিবীতে তারাই হবে প্রভু। একমাত্র নিষেধাজ্ঞা— গভীর জঙ্গলে পবিত্র তাহু ফল ভক্ষণ করা চলবে না। বংশপরম্পরায় সবাইকে এই নির্দেশ পালন করে যেতে হবে। কোনও অবস্থাতেই এর যেন অন্যথা না হয়। বহুবছর অতিক্রান্ত। ঈশ্বরের আহ্বানে প্রথম মানবসন্তান স্বর্গে গেলেন। বংশধরেরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চললেন ভগবানের নির্দেশ। শেষে এল সেই ভয়ংকর দিন। এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর প্ররোচনায় তার স্বামী অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবং চরম পরিণতির কথা মাথায় রেখেও গভীর জঙ্গল থেকে সেই নিষিদ্ধ ফল পেড়ে এনে স্ত্রীকে খাওয়ালেন। স্ত্রীর একান্ত অনুরোধে নিজে খেলেন ও অন্য পিগমিদেরও খাওয়ালেন। সবাই ভাবল, ঈশ্বর টের পাবেন না। স্বর্গদূতের মাধ্যমে খবর পেয়ে ভগবান কূপিত হয়ে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারীদের অভিশাপ দিলেন। শাস্তি হল— আজীবন বেঁচে থাকতে হবে কঠিন সংগ্রাম করে। অসুস্থ অবস্থায় অন্যের সাহায্য ব্যতীত অকালে মরতে হবে। পুরুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য নারীদের শাস্তি আরও বেশি। কঠিন প্রসব যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়ে মরতে হবে আর আমৃত্যু পুরুষের সেবা করে যেতে হবে।

লেক বিউনিয়নি

স্বর্গীয় উদ্যান, নিষিদ্ধ ফল, নিবিড় অরণ্য, মানবজাতির বিপর্যয়ে চিহ্নিত নারী— বাইবেলের সব উপাদানই এখানে মজুত। পিগমিরা বিশ্বাস করত, ওদের প্রভুপিতা নিহত হন পাপাচারীদের হাতে। কুমারী মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া, পিগমিদের মুক্তির দিশারী যিশুর আত্মা মারা যাওয়ার পর স্বর্গে বিলীন হলেন। খ্রিস্টিয়ানিটি শুরু হওয়ার আগেই আর এক যিশুর জন্ম হয়েছিল আদিম পিগমি সমাজে। সময়ের বিচারে যিনি খ্রিস্টের চাইতেও প্রাচীন। কিন্তু পোড়া কপাল। সেই নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের শাস্তি এখনও চলছে। পৃথিবীর প্রথম মানব অভিশপ্ত পিগমিরা এখন অচ্ছুত। যাদের প্রভুত্ব করার কথা ছিল পৃথিবীর বুকে তারা এখন উপেক্ষিত। বিলোপ হওয়ার মুখে। কষ্টে দিন গুজরান আবর্জনা হয়ে। অসুস্থ হয়ে, অকালে ঝরে গিয়ে। খলনায়ক উদাসীন সমাজ আর দেশের ক্যানিবল সরকার।

ঠুলি পরা সংযুক্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের কর্তাদের উদ্দেশে একটাই অনুরোধ— গরিলা সংরক্ষণের কারণে বাস্তুচ্যুত আফ্রিকার এই আদিম নিরীহ ও বিশিষ্ট প্রান্তিক উপজাতিটিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করুন। বাঁচার অধিকার এদেরও আছে। এরাও বাঁচতে চায়।