গৌতমকুমার দে

সে দিন আর নেই। তা প্রায় পৌনে এক শতক হতে চলল। যখন বাবু ট্যাঁকঘড়ি খুলে দেখলেন সময় উতরে গেছে তখন ‘ট্যাঁক–ঘড়ির ডালা খুলতে খুলতেই এ দেশে দিন চলে যায়’। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৮৮১)। ঘড়ির সঙ্গে লেগে থাকা সংক্ষিপ্ত দু’অক্ষরের শব্দটি ঘড়ির টাইমলাইন। স্পষ্টতই সে ছিল পকেটহীন বাঙালির ট্যাঁক-এর সঙ্গী। ট্যাঁক কালচারের সাক্ষী।

ট্যাঁক অর্থাৎ কোমরের কাপড়ে গুঁজে রাখা যায় এমন ঘড়িই ট্যাঁকঘড়ি। জন্ম ট্যাঁক–এর যুগে। জনপ্রিয় হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। যতদিন ছিল আমাদের বঙ্গে, ছিল সে টঙ্কা–শয্যায়। ট্যাঁকে থাকা টাকা–পয়সার কোলে–কাঁখে মুড়ে কাটত সে জীবন। ঠিক যেন ক্যাশ বাক্সে রাখা চেকটি। অত্যন্ত মূল্যবান। অবস্থান বিচারে বুঝি বা নগদ অর্থের সমতুল। যাকে ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ এক ট্র্যাডিশনাল বেশবাসের আবহ। বস্তুত, এই ট্যাঁক হল ধুতির কষিতেই দু-চারটে পাক বা মোচড় দিয়ে তৈরি আটপৌরে আধার বা থলিবিশেষ।

দিব্যি চলছিল। কাল হল আধুনিকতা। বাঙালির গায়ে চড়ল পকেটওয়ালা পাঞ্জাবি, স-পকেট প্যান্ট–শার্ট। ট্যাঁক থেকে মুখ ফিরিয়ে বাঙালি হল পকেটমুখী। সেই সঙ্গে বাসাবাড়ি বদলের মতো ট্যাঁকে থাকা মালপত্তর স্থানান্তরিত হল পকেটে। স্বভাবতই ট্যাঁকঘড়িকেও চলে আসতে হল পকেটে। ঈষৎ রূপবদল-সহ। সে কথায় পরে আসছি। নতুন নাম হল তার পকেট-ঘড়ি। ট্যাঁকঘড়ির পকেট এডিশন আর কি! এই অবস্থান বদল সত্ত্বেও কিছু নস্ট্যালজিক মানুষজনের সৌজন্যে পকেট-ঘড়ি অর্থে ট্যাঁকঘড়ি শব্দবন্ধটিও জিইয়ে থাকল বহুকাল।

ইউরোপে পকেট ঘড়িকে বলা হত, বিশেষত সৈন্য ব্যারাকে, ট্রেঞ্চ ওয়াচ (trench watch)। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে পরিখায় থাকা সৈন্যদের কাছে তা ছিল অপরিহার্য সঙ্গী। ট্যাঁকঘড়ির সঙ্গে পকেট-ঘড়ির অবশ্য কিছু তফাত ছিল। এই পার্থক্যটা অবশ্য মূলত বহিরঙ্গে। প্রথমত, পুরনোটি তার ঘরোয়া ভাব ঝেড়ে ফেলে একধাক্কায় কিছুটা অভিজাত হয়ে উঠল। গ্রামভারী লকেট হয়ে গেল। সোনার চেনে ঝুলে শোভিত হল সে। ক্রমে সেই চেনেও বদল এল। ঘড়ি কিন্তু সেই নিকেল কি বড়জোর রুপোরই থাকল বরাবরের মতো। কিন্তু চেন প্রায়শই হত সোনার। চুল দিয়ে বোনা একধরনের সরু চেনও ব্যবহারের রেওয়াজ ছিল। তার নাম ছিল গার্ড চেন (guard chain) বা চুলের গার্ড চেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ–র ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-য় এক ব্রাহ্মবাবুর পোশাকের বর্ণনায় পড়বেন : ‘কারুর কফ্ ও কলারওয়ালা কামিজ, রুপোর বগলস আঁটা সাইনিং লেদর, কারও ইন্ডিয়া রবর চায়না কোট, হাতে ইষ্টিক, ক্রেপের চাদর, চুলের গার্ড চেন গলায়, আলবার্ট ফেসানে চুল ফেরানো।’ অবশ্য পরের দিকে অনেকে শক্তপোক্ত মোটা কালো (কারণ যাতে অন্যের নজর না লাগে) কারের সুতো, গোল্ড প্লেটেড বা রুপোর ওপর সোনার জল করা বা আরও পরে স্টিলের চেন ব্যবহার করত। লক্ষণীয়, নিভৃতে থাকা ঘড়ি ট্যাঁক থেকে পকেটস্থ হওয়ার পর অনেকটাই প্রকাশ্যে এল। লুকিয়ে থাকার বদলে হয়ে উঠল দর্শনীয়। পর্দানশিন থেকে একেবারে আব্রু যায় যায় অবস্থা আর কি! যতটা না প্রয়োজনীয় তার থেকেও বেশি। হয়ে উঠল বড়লোকের চাল, বাবুগিরির হাতিয়ার। যেন আত্মসম্মান, কুল, মান খুইয়ে হয়ে উঠল অন্যের হাতের ক্রীড়নক। সেই সঙ্গে ট্যাঁকঘড়ি শব্দটি শোনা মাত্র যে সহজিয়া বাঙালি রূপটি ভেসে উঠত চোখের সামনে, তাও অন্তর্হিত হল। তার জায়গায় আসা পকেট-ঘড়ির সঙ্গে সাহেবিয়ানার সম্পর্কটি অনেক ঘনিষ্ট। বাঙালি আত্মার সঙ্গে তার সম্বন্ধটি মোটেই আর আগের মতো জোরালো হল না। তবে বাঁধনটি একবারে আলগাও হল না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ট্রেঞ্চ ওয়াচ

এ তো গেল বাংলার কথা। ইউরোপে ট্যাঁকঘড়ির সঙ্গে পকেট-ঘড়ির তফাৎ একটা চেনের। ঘড়ি চুরি বা অজান্তে পকেট থেকে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এসেছে চেন। যা দিয়ে ঘড়িটাকে আটকে রাখা হত ল্যাপেল (lapel), ওয়েস্টকোট (ফতুয়া জাতীয় জামাবিশেষ) বা কোমরবন্ধ (belt)-র ছিদ্রের সঙ্গে। প্রসঙ্গত, ল্যাপেল হল জ্যাকেট, সুট জ্যাকেট বা কোটের কলারের ভাঁজ করা অংশ। ঘড়ির চেন থেকে প্রায়শই ঝুলতে দেখা যেত ঘড়ি দম দেওয়ার চাবি, দেশলাই রাখার বাক্স, রুপো বা এনামেল করা পেনড্যান্ট, সিগার সমান করে কাটার ছোট যন্ত্রবিশেষ যা দেখতে হত পেনড্যান্টের মতো। এগুলোর গায়ে নানান রকমের চিত্তাকর্ষক অলংকরণ থাকত।

ট্যাঁকঘড়ি এবং পকেট-ঘড়ি— দুটোতেই দম দিতে হত। এজন্য আলাদা চাবি ছিল। দেখতে অনেকটা দম দেওয়া খেলনা পুতুলের চাবির মতন। চওড়া ছোট হাতল থেকে বেরিয়ে আসা সরু ফাঁপা (বা নিরেট) নলবিশেষ। চেহারাটা ইংরাজি অক্ষর ‘T’-র মতন। ট্যাঁকঘড়ির ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুসারে বাঙালি ঘড়িবাবুকে চাবিটা ট্যাঁকে বা সঙ্গে করে ঘুরতে হত অথবা আলাদা করে বাড়িতে নিরাপদ জায়গায় রাখতে হত। এতে ভুলে যাওয়া এবং হারানো— দুটো সম্ভাবনাই থাকত। কিন্তু পকেট-ঘড়ির ক্ষেত্রে ঘড়ির চাবিটা ঝুলত সাধারণত চেন থেকে। ঘড়ি ও ঘড়ির চাবির এই সহাবস্থান নিঃসন্দেহে মানসিকভাবে অনেকটা স্বস্তি দিয়েছিল ঘড়ির মালিককে। ইংরেজদের দেখাদেখি অনেকে চেনে একটা লকেটও ঝোলাত। এভাবে বিদেশি ঘড়ির অনুষঙ্গে অনুসারী দেশি চেন-শিল্প গড়ে উঠেছিল এদেশে।

আমাদের বাংলায় পকেট-ঘড়ি আসার বহু আগে থেকেই ইউরোপে এর ব্যবহার চালু ছিল। সবচেয়ে পুরনো যে নথিতে এই ঘড়ির কথা পাওয়া গেছে সেটি একটি চিঠি। ১৪৬২ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে চিঠিটা লেখেন ইতালীয় ঘড়ি নির্মাতা বার্থেলোমিউ মানফ্রেডি (Bartholomew Manfredi), জনৈক মানতোভা ফেডেরিকো গনজাগা (Mantova Federico Gonzaga)-কে। পত্রলেখক চিঠিতে একটা পকেট-ঘড়ির অফার দিয়েছেন। যা গুণমান বিচারে তখনকার মোদেনা (Modena)-র ডিউকের কাছে থাকা পকেট-ঘড়ি থেকে অনেক উন্নত। পঞ্চদশ শতাব্দীর একেবারে শেষে স্প্রিং চালিত পকেট-ঘড়ি এসেছিল ইতালি ও জার্মানির বাজারে।

যতদূর জানা গেছে, পকেট-ঘড়ি নিয়মিতভাবে তৈরি করা শুরু হয়েছিল ১৫২৪ সালে। কে করেছিলেন জানেন? এক জার্মান তালাওয়ালা। জার্মানির বাভারিয়ার অন্তর্গত ন্যুরেমবার্গ–এর বাসিন্দা পিটার হেনেলিন (Peter Henlein)। ন্যুরেমবার্গ–এর এই কৃতি ভূমিপুত্রের সম্মানে তাঁর জন্মস্থানে একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপন করা হয় ১৯০৫ সালে। ইনি কেবল বিশ্বের প্রথম আধুনিক পকেট-ঘড়ি নির্মাণকারীই নন, সেইসঙ্গে প্রথম ব্যক্তি যিনি আকারে ছোট অলংকরণ করা ঘড়ি যা শুধু অলংকার বা পেনডেন্ট হিসাবেই ব্যবহার করা যায়, তা দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করতে সফল হন। তালার কারিগর হিসাবে জীবন শুরু করে পকেট-ঘড়ির উদ্ভাবক হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে এক চমকপ্রদ ঘটনা।

দিনটা ছিল ১৫০৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। আর এক তালাওয়াল জর্জ গ্লাসের (George Glaser)-এর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন পিটার। পরে জর্জের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। জর্জের অন্যতম খুনি হিসাবে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন পিটার। তখন ন্যুরেমবার্গের ফ্রান্সিসকান মনাস্ট্রিতে আশ্রয় ভিসা চান তিনি। পিটারের আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল। এই অ্যাসাইলামে থাকাকালীন (১৫০৪–১৫০৮) ঘড়ি সংক্রান্ত নানান খবরাখবর এবং গভীর জ্ঞানার্জন করেন পিটার।

ন্যুরেমবার্গ থেকেই পকেট-ঘড়ি তৈরির কলাকৌশল ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপের অন্যান্য দেশে, গোটা ষোড়শ শতাব্দী জুড়ে। প্রথম দিকে পকেট-ঘড়িতে কেবল একটা কাঁটা থাকত। সেটা ঘণ্টার কাঁটা। মিনিট সেকেন্ড তখন আয়ত্বের বাইরে। আজকের মতো সেকেন্ডের ভগ্নাংশের হিসেব নেওয়ার প্রয়োজন তখনও দেখা দেয়নি। ঘড়ি তখনও যতটা সময়ের পরিমাপকারী তার থেকেও বেশি অলংকার। ঘড়িতে মিনিটের কাঁটা যুক্ত হতে হতে সতেরো শতকের অর্ধেকেরও বেশি পেরিয়ে গেল। দেখতে দেখতে ১৮৩০। আমেরিকার কানেক্টিকাটের হার্টফোর্ড নিবাসী হেনরি পিটকিন তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করলেন প্রথম আমেরিকান পকেট-ঘড়ি ‘উইথ মেশিন মেড পার্টস’।

চিকাগোতে বিবেকানন্দের বক্তৃতা দিতে যাওয়ার বছর আড়াই আগের কথা। দিনটা ছিল ১৮৯১ সালের ১৯ এপ্রিল। স্থান আমেরিকার ওহিও প্রদেশের কিপটন। এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটল। তখন সেখানে ট্রেন চালাবার দায়িত্বে ছিল লেক শোর অ্যান্ড মিশিগান সার্দান রেলওয়ে। তদন্ত করে কর্তৃপক্ষ দেখলেন কর্মরত এক ইঞ্জিনিয়ারের ঘড়ি চার মিনিটের জন্য বন্ধ ছিল। আর তাতেই যত বিপত্তি! কর্মরত রেলকর্মীদের পরস্পরের ঘড়িতে সময়ের পার্থক্যজনিত কারণে ভবিষ্যতে যাতে এরকম অবাঞ্ছিত ঘটনা না ঘটে সেদিকে নজর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রেল কর্তৃপক্ষ। সেই অনুযায়ী ওয়েবস্টার ক্লে বল (১৮৪৮–১৯২২)–কে নিয়োগ করা হয় চিফ টাইম ইন্সপেক্টর পদে। ইনি ছিলেন স্বর্ণকার এবং ঘড়ি প্রস্তুকারক। বলওয়াচ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। দায়িত্ব গ্রহণের পর সব দিক খতিয়ে দেখে ইনি রেলওয়ে স্ট্যান্ডার্ড টাইম চালুর প্রস্তাব দেন। যা গৃহীত হয় ১৮৯৩ সালে। তখন থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির রেল রোড নির্মাণ এবং রেল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক রেলকর্মী যে পকেট-ঘড়ি ব্যবহার করতেন সেগুলি তৈরি করা হত জেনারেল রেল রোড টাইমপিস স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে। কেমন ছিল সেটি? একটু নমুনা দিই : ‘… open faced, size 16 or 18, have a minimum of 17 jewels, adjusted to at least five positions, keep time accurately to within 30 seconds a week, adjusted to temps of 340F (10C) to 1000F (380C), have a double roller, steel escape wheel, lever set, regulator, winding stem at 12 o’clock, and have bold black Arabic numerals on a white dial, with black hands.’

ওপেন ফেস্‌ড বা Lepine তৈরি হয়েছিল ফরাসি ঘড়ি নির্মাতা Jean_Antoine Lepine (১৭৮০-১৮৪০)-র নামানুসারে। এই ঘড়িতে ঘড়ির মুখটা আঢাকা অবস্থায় থাকত। ক্রিস্টালের সুরক্ষার্থে তার ওপর কোনও ধাতব আবরণ থাকত না। দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন : পেনড্যান্টের মতো বুকের ওপর ওপেন ফেস্‌ড ঘড়ি ঝুলিয়ে রাজকীয় চালে হেঁটে চলেছেন আর ঘড়িতে তখন বারোটা বাজে!

Jean-Antoine Leapine পকেট ঘড়ি

আর এক রকমের ঘড়ি হত যাতে ঘড়ির ডায়ালের ওপরে থাকা ক্রিস্টালকে বাঁচাতে বা তার ওপর যাতে ধুলো না জমে বা কোনওরকম দাগ না পড়ে সেজন্য থাকত একটা গোলাকার ধাতব ঢাকনা। এগুলোকে বলা হতো হান্টার কেস ওয়াচ। এমন অদ্ভুত নামের উদ্ভব ইংল্যান্ডে। কারণ, সেদেশে শিয়াল শিকারিদের মধ্যে এই ঘড়ি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। শিকারের সময় এক হাতে এই ঘড়ি খুলে সময় দেখা (অন্য হাতটা তখন ব্যস্ত থাকত ঘোড়ার লাগাম সামলাতে) যেত সহজেই। গোলাকার সাবানের মতো দেখতে ছিল বলে একে অনেকে ‘savonnette’ (ফরাসিতে সাবানকে বলে savon) বলেও ডাকতেন।

এছাড়া ছিল হাফ হান্টার বা ডেমি হান্টার পকেট-ঘড়ি। এক্ষেত্রে বাইরের ঢাকনার ঠিক কেন্দ্রে একটা কাচ বসানো বা ফুটো থাকত, যাতে ভেতরের ঘণ্টার কাঁটাটা দেখা যায়। ঢাকনার ওপরে সময়-সংখ্যা লেখা থাকত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা করা হত নীল এনামেলে। ফলে ঢাকা খুলেও সময় বুঝতে কোনও অসুবিধে হত না।

বাঙালিবাবুরা পূর্বোক্ত প্রথম দু’ধরনের ঘড়িই ব্যবহার করতেন বেশি। কুরু ভায়াজিয়ের এবং ওয়েস্ট অ্যান্ড ওয়াচ–এর খুব চল ছিল। McCabe & Co.-এর ঢাকনাওয়ালা হান্টিং মডেলের ছোট পকেট-ঘড়িকে লোকে বলত ‘মেকাবী হন্টিং’। ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’–য় এর উল্লেখ আছে— ‘প্যালানাথ বাবুর হীরের ওয়াচ গারডে ঝোলান আধুলির মত মেকাবী হন্টিংএর কাঁটা নটা পেরিয়েচে।’ গত শতাব্দীর নয়ের দশকের আধাআধি সময়কার কথা। শিয়ালদায় এন আর এস হাসপাতালের উলটোদিকে একটা ঘড়ি সারাইয়ের দোকানে (যেটা আজও আছে) দেখা একটা পকেট-ঘড়ির কথা কোনওদিন ভুলব না। যার ডায়ালটা ছিল একেবারে স্বচ্ছ। পরে জেনেছি, এধরনের ট্রান্সপারেন্ট পকেট ওয়াচ প্রথম তৈরি হয় ১৮৯০ সালে। তখন একে বলা হত ‘মিস্ট্রি ওয়াচ’।

পকেট-ঘড়ির জনপ্রিয়তা সেকালে এক শ্রেণির লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিল। এই বঙ্গে কিছু লোক, যারা তখনই পকেটমারিতে হাত পাকিয়েছিল, তাদের মধ্যে একদল কেবল পকেট-ঘড়ি চুরিতে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠল। স্রেফ পকেট-ঘড়ি চুরি করেই সংসার চলত তাদের। ঘড়ি বাঁচাতে তৎপর হলেন মালিকরা। চেনের সঙ্গে ক্লিপ জাতীয় একটা বস্তু ব্যবহার করতে শুরু করলেন। অনেকে এতেও ভরসা করতে না পেরে নিজের মুণ্ডুটাই গলিয়ে দিলেন চেনের মধ্যে। গলায় ঝোলানো চেন আঁকড়ে থাকা ঘড়ি আশ্রয় পেত পাঞ্জাবি বা জামার বুকপকেটে। ফতুয়াপন্থীরা সঙ্গে থাকা পকেট-ঘড়িটাকে নিরাপদে গ্যারেজ করার জন্য ফতুয়ার সামনের অংশে বামদিকে একটা বুকপকেট বানিয়ে নিতেন। অতিরিক্ত সতর্কতাবশত অনেকে এই পকেটটা একটি ‘ডিপ’ করে বানাতেন। যাতে সহজে ‘কুয়ো–পকেট’ থেকে ঘড়িটা চট করে তুলতে না পারে চোর।

গত শতকের নয়ের দশকে অশীতিপর দর্জির কাছে শোনা, মাত্রাতিরিক্ত সাবধানী এবং শৌখিন ব্যক্তিদের জন্য পাঁচের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্তও তিনি নিজের হাতে ছেলেদের জামায় তৈরি করেছেন ‘ঘড়ি–পকেট’। পকেট-ঘড়ি রাখার চেম্বারবিশেষ। কেমন হত তা? এককথায়, সাধারণ বুকপকেটের ভেতর আর একটা বুকপকেট। লম্বাটে গড়নের। চওড়ায় ঘড়ির ব্যাসের থেকে একটু বড়। অতঃপর সেই অন্ধকূপের তলায় ঘড়ির পড়ে থাকা প্রায় নট নড়নচড়ন অবস্থায়। যেন ক্ষমাহীন কোনও অপরাধীকে আটকে রাখা কনডেম্‌ড সেলে। মালিকের মর্জি অথবা দক্ষ গ্রন্থিকীট–এর সূক্ষ্ম হাতসাফাই তখন সেখান থেকে বাইরে আসার একমাত্র ভরসা। এই ব্যবস্থায় সুবিধে হল ক্লিপ জাতীয় বস্তুটির অস্তিত্ব বাইরে থেকে টের পাওয়া যেত না। তাকে আড়াল করত ছোট পকেটের বড়ভাই। তা ছাড়া, চেনের সঙ্গে একটা অদৃশ্য যোগ থাকত ঘড়ি মালিকের মগ্ন চৈতন্যের। ফলে চেনে নূন্যতম অবাঞ্ছিত টান পড়লেই নিমেষে সজাগ হয়ে যেত ঘড়ির মালিক। সেই দর্জিদার কাছেই শোনা, কেউ কেউ বুকপকেটে চেন লাগিয়ে নিত। অথবা ঢাকনাওয়ালা বুকপকেট, যা বোতাম দিয়ে আটকানো যায়, তার ব্যবস্থা করত।

পেশায় দর্জি সেই ভদ্রলোকের নাম ছিল নীলকমল বিশ্বাস। তাঁর কথারই প্রতিধ্বনি শুনেছিলাম ধর্মতলার বিখ্যাত ‘আকবর আলী’–র প্রাচীন কারিগরদের সঙ্গে কথা বলার সময়। অতিরিক্ত যেটুকু জানা গেছে, পকেট-ঘড়ির ক্যারিয়াররা সকলেই যে প্রচারবিমুখ ছিলেন তা নয়। কারও সুপ্ত বাসনা, নিজের সঙ্গে যে সেটি রয়েছে তার অস্তিত্ব মুখে না বললেও সহজেই যাতে অন্যের গোচরে আসে। বর্তমান সময়ে মোবাইলই যখন ঘড়ির কাজ করে দিচ্ছে আরও সুচারুরূপে তখন ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক মনে হলেও সেকালের পারিপার্শ্বিকতার নিরিখে এটাই ছিল স্বাভাবিক। তখনও ঘরে ঘরে ঘড়ির চল হয়নি। বিশ শতকের মাঝামাঝি এসেও বিকেলবেলা বেড়ার ধারে ঝিঙেফুল ফুটে উঠলেই গাঁ–গঞ্জের সাধারণ ঘরের গিন্নিরা চুল বাঁধার নিত্যপাট সেরে নেওয়ার জন্য বাড়ির বউ–ঝিদের হাঁক পাড়তেন, ‘ঝিঙেফুল ফুটে গেল, বেলা আর বেশি নাই গো, সুয্যিঠাকুর পাটে বসবেন– তরন্ত কাজ সারো সকলে।‘ (আমার মা’র বাপের বাড়ি, রানী চন্দ, বিশ্বভারতী)। তাছাড়া, ট্যাঁক বা পকেট নিবাসী ঘড়ি তখনও আভিজাত্য, মর্যাদা, স্বচ্ছলতা ও শৌখিনতার প্রতীক। অন্যের থেকে নিজের তফাত বোঝানোর সূচক। পাশ্চাত্যে বিশ শতকে মেয়েদের মধ্যে পেনড্যান্ট হিসেবে ঘড়ি পরার চল বজায় থাকলেও এ বঙ্গের ছবিটা ছিল তার উলটো। বলতে গেলে নারীর ছোঁয়া বর্জিত। মেয়েদের পোশাকে পকেট না থাকাটা তার অন্যতম কারণ। যাই হোক, প্রচারলোভী ঘড়ি মালিকদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে তৎকালীন দর্জিরা পকেটের পাশে একটা বা দুটো সরু ফিতে (জামা যে কাপড়ের হত সাধারণত সেই কাপড় দিয়েই) লাগিয়ে দিতেন। যা দিয়ে বেঁধে রাখা হত ঘড়ির চেনকে। বা বুকপকেটের ওপর জামার গায়েও লাগানো হত ফিতে। ফিতে–ব্যবস্থা উঠতি বড়লোকদের মধ্যেই বেশি দেখা যেত। এই রীতি ছিল স্বল্পায়ু। অন্য একটা কায়দা ছিল— বড় বুকপকেটের গর্ভে আর একটা ছোট পকেট। এতে ঘড়ির প্রবেশপথটি থাকত পাশের দিকে, যে দিকে বোতামের ঘর থাকে সেদিকে। ছোট পকেটটা অবশ্যই লম্বাটে ধরনের হত যাতে প্রবেশপথ দিয়ে ঘড়িটা একবার ঢুকিয়ে দিলে সেটা সমকোণে বেশ খনিকটা নেমে তবে থিতু হত।

ঘড়ি উচ্চারণটাই (পকেট-ঘড়ি অর্থে) হারিয়ে গেল স্রেফ পকেট-ঘড়ি ব্যবহারের চল উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। পুরনো বাংলা, হিন্দি এমনকি হলিউডি সিনেমার রিলে ধরা আছে ট্যাঁকঘড়ির স্মৃতি। পিরিয়ড সিনেমা তৈরির সময় এখনও ডাক পড়ে ট্যাঁকঘড়ির। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ সিনেমায় পৃথ্বীরাজের শ্বশুরমশাইয়ের ভূমিকায় উৎপল দত্তকে একটা ট্যাঁকঘড়ি ব্যবহার করতে দেখে থাকবেন। সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে তরুণ মজুমদার পরিচালিত ‘দাদার কীর্তি’, পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত ‘স্ত্রী’র পত্র’ ও ‘মালঞ্চ’ সিনেমায় লেগে আছে পকেট-ঘড়ির স্মৃতি। ‘সমাপ্তি’–তে নায়ক সৌমিত্রর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ যেন এই ঘড়ি। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘চারুলতা’–য় ভূপতি এবং অরুন্ধতী দেবীর পরিচালনায় ‘মেঘ ও রৌদ্র’–তে স্বরূপ দত্তকে দেখা গেছে এই ঘড়ি ব্যবহার করতে। ‘মণিহারা’-য় কালী ব্যানার্জিরও সঙ্গী ছিল ট্যাঁকঘড়ি। বিভিন্ন সিনেমায় চ্যাপলিনকে নানান মডেলের পকেট-ঘড়ি ব্যবহার করতে দেখার স্মৃতি তো সতত উজ্জ্বল।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’-র অপূর্বকৃষ্ণকে মনে আছে? বি এ পাশ, কলকাতা থেকে এসেছে দেশের বাড়িতে। যাবে পাড়ারই সম্ভাব্য শ্বশুরবাড়িতে। বিধবা মায়ের আগে থাকতে দেখে রাখা পাত্রী মৃন্ময়ীর মুখোমুখি হবে। সেজন্য অপূর্ব নিজেকে প্রস্তুত করল পরিপাটি সাজে। সঙ্গে পকেট-ঘড়িটা নিতে কিন্তু ভোলেনি। সরাসরি পকেট-ঘড়ি কথাটি গল্পকার ব্যবহার না করলেও গল্পটির রচনাকাল (আশ্বিন ১৩০০ বঙ্গাব্দ) এবং বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট ঘড়ির ঘরানাটি। ‘কনের এক বালক ভাই তাহাদের পরিবারের মধ্যে এই এক নূতন অনধিকার–প্রবেশোদ্যত লোকটির পাগড়ি, ঘড়ির চেন… একমনে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।’ ব্রীড়াবনত কুণ্ঠিত পাত্রীর সামনে ‘অপূর্বকৃষ্ণ আপনার সমস্ত গাম্ভীর্য এবং গৌরব একত্র করিয়া পাগড়ি–পরা মস্তকে অভ্রভেদী হইয়া বসিয়া রহিল এবং পেটের কাছে ঘড়ির চেন নাড়িতে লাগিল।‘ লক্ষণীয়, অপূর্ব ছিল সেকালের কৃতবিদ্য, শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত বাঙালি তরুণ। ‘প্রজাপতির নির্বন্ধ’–তে রবীন্দ্রনাথ যে পূর্ণ চরিত্রটিকে এনেছেন তাকে ঘড়ির চেন নাড়তে নাড়তে সংলাপ বলতে দেখা যায়। পরশুরাম এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাতেও এসেছে ট্যাঁকঘড়ির কথা।

লালমোহনবাবু তাঁর থেকে বয়েসে সাড়ে তিন বছরের ছোট গোয়েন্দা ফেলু মিত্তিরকে একটা ট্যাঁকঘড়ি দিয়েছিলেন ‘উইথ হিজ ব্লেসিংস অ্যান্ড বেস্ট কমপ্লিমেন্টস’। ঘড়িটা ছিল দাতার ঠাকুরদার। বস্তুত, এটি ছিল পকেট-ঘড়ি। সত্যজিতের লেখার মধ্যে তার ইঙ্গিত রয়েছে। ‘রুপোর ট্যাঁকঘড়ি, তার সঙ্গে ঝুলছে রুপোর চেন’ (গোরস্থানে সাবধান)। ‘চেন’ শব্দটাই পকেট-ঘড়ির সূত্র। প্রথম দর্শনে ফেলু ভেবেছিল ওটা কুক অ্যান্ড কেলভি-র তৈরি। আসলে কলকাতায় তৈরি। উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৭৭। তার সঙ্গে ঠাকুরদার আমলকে পাশাপাশি রেখে দেখলে বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, ঘড়িটা গত শতকের প্রায় মাঝামাঝি সময়কার। এমনকি আরও ১৫-২০ বছর আগেরও হতে পারে। অর্থাৎ দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়কার। যখন ট্যাঁকঘড়ি এবং/অথবা পকেট-ঘড়ি— কোনওটাই একেবারে দুর্লভ হয়ে ওঠেনি। তা ছাড়া দু’ধরনের ঘড়িকেই যে ট্যাঁকঘড়ি বলা হত, বিশেষত প্রবল জনসমর্থন পাওয়ার পরেও, তার প্রমাণ সত্যজিতবাবুর শব্দচয়ন।

ট্যাঁক টু হাত ভায়া পকেট রুটে ঘড়ির ভ্রমণকাল সম্পর্কিত বক্তব্যের সমর্থনে পরিমল গোস্বামীর লেখা ‘বিলোপের পথে ট্যাঁকঘড়ি’–র কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এই রম্য নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় ‘কথাসাহিত্য’ পত্রিকায়। প্রকাশকাল ১৯৫০। সেখানে এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘ট্যাঁকঘড়ি–চোর সম্প্রদায়ের শেষ চোর, ভারতবর্ষের শেষ ট্যাঁকঘড়িটি চুরি করেছে মহাত্মা গান্ধীর ট্যাঁক থেকে। ব্যস যুগের শেষ হল এইখানে— একটা অভিজাত যুগের।’

গান্ধীজির চুরি যাওয়া এবং পরে ফিরে পাওয়া ট্যাঁকঘড়ি

লেখার প্রকাশকালের কথা মনে রাখলে পরিমলবাবু প্রদত্ত উপরোক্ত তথ্য হয়তো ঠিক। তবে তারপরেও ট্যাঁকঘড়ি-চোর যে ছিল তার প্রমাণ হল আমার জ্যাঠামশাই প্রয়াত মৃত্যুঞ্জয় দে-র বড় আদরের ট্যাঁকঘড়িটি তাঁর নিজের পকেটে থাকাকালীন হাপিস করেছিল ট্যাঁকঘড়ি–চোর। এটা ১৯৭৩ সালের কথা। সেদিন ছিল বড়দিন। নিউ মার্কেটে একটা কেকের দোকান থেকে বেরিয়ে জ্যাঠামশাই দেখলেন, তাঁর বহুদিনের সঙ্গী ট্যাঁকঘড়িটি তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে। জানি না, অকৃতদার জ্যাঠার সঙ্গে ঘর করে ঘড়িটার বিরাগ জন্মেছিল কিনা! তবে এই ঘটনার পর থেকে তিনি আর কোনওদিন ট্যাঁকঘড়ি ছুঁয়েও দেখেননি। বইপ্রেমিকরা যেমন জন্মদিন কিংবা বিয়েবাড়িতে বই উপহার দেন, জ্যাঠাও নেমন্তন্ন বাড়িতে গেলে উপহারস্বরূপ নিয়ে যেতেন ট্যাঁকঘড়ি। চেনওয়ালা পকেট-ঘড়িও নয়। ঘড়ি চুরির পর সেই তিনি নিমন্ত্রণ বাড়িতে সশরীরে আর যেতেন না। কারও হাত দিয়ে আশীর্বাণী-সহ নগদ অর্থ খামে ভরে পাঠিয়ে দিতেন।  তার পরিমাণ এমন হত যা দিয়ে অনায়াসে একটা ট্যাঁকঘড়ি কেনা সম্ভব ছিল। ট্যাঁকঘড়ির প্রতি এমন প্লেটোনিক টান আর কারও মধ্যে দেখিনি। জ্যাঠার সেই ঘড়িটা ছিল অ্যাংলো সুইস কোম্পানির। অকালপ্রয়াণের পর জ্যাঠার বালিশের নীচে থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ পাওয়া গিয়েছিল যাতে একেবারেই অনভ্যস্ত হাতে আঁকা একটা ট্যাঁকঘড়ির ছবি ছিল। যার নীচে লেখা ছিল— ‘আমার অ্যাংলো সুইস’।

চিরকালের অহিংসাপন্থী গান্ধীজির ট্যাঁকঘড়ি চুরিটা ছিল নেহাতই প্রতীকী। তৎকালীন ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশে অনাগত দুর্দিনের অশনি সংকেত। ভারতবাসীর নৈতিক অধঃপতনের বিশিষ্ট মাইলফলক। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক চুরির মতোই এ আমাদের চিরকালীন লজ্জা। সমাজের প্রায় সর্বস্তরে নির্লজ্জ লোভ, অসদুপায়ে অর্থোপার্জন, যেনতেনপ্রকারেন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার নীতিজ্ঞানবর্জিত উগ্র মানসিকতার যে বিষাক্ত বীজ রোপিত হয়েছিল তার নীরব সাক্ষী। খুল্লামখুল্লা যা আজ ছড়িয়ে সমাজের প্রায় প্রতিটি খাঁজে–ভাঁজে। ক্রমশ আরও তীক্ষ্ণ আর লম্বা হচ্ছে সেই পকেটমার থুড়ি গান্ধীজির ট্যাঁকঘড়ি-চোরের উত্তরসূরীদের কালো হাত।

গান্ধীজির ট্যাঁকঘড়িটি যখন চুরি যায় তখন সময়ের সংকেত হিসেবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আম–আদমির জন্য তোপধ্বনি দেওয়ার দিন গিয়েছে। তবে চটকলের ভোঁ পড়ত সকাল ৮টা, দুপুর ১টা, বিকেল ৫টা আর রাত ৯টায়। ভোর চারটের প্রথম ট্রামে চড়ে গঙ্গাস্নানে যাওয়ার সময় ঘড়িবিলাসী বাবুরা রাখতেন ট্যাঁকঘড়ি। পকেট-ঘড়ি ব্যবহার করতেন রবীন্দ্রনাথও। তিনটে ছবি আছে যেখানে পকেটের বাইরে বেরিয়ে থাকা ট্যাঁকঘড়ির চেনটি দৃশ্যমান (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ স্মৃতির ছবি, অভীককুমার দে, পুনশ্চ)। বিশিষ্ট সংস্কৃতজ্ঞ মহামহোপাধ্যায় মধুসূদন চক্রবর্তী বেদান্তশাস্ত্রী মহাশয় ব্যবহার করতেন ‘ফেবার লুবা’-র পকেট-ঘড়ি।

ফেবার লুবা’র পকেট ঘড়ি

ট্যাঁকঘড়িকে বলা যেতে পারে প্রথম জনতা ঘড়ি। অন্তত উপযোগিতা, ব্যবহারকারীর প্রকৃতি ও সংখ্যা বিচারে। রাজা–বাদশা, জমিদার, সম্পন্ন ব্যবসায়ী, অবস্থাপন্ন এমনকি একটু শৌখিন প্রকৃতির মানুষের পক্ষপাতিত্ব যখন পকেট-ঘড়ির প্রতি তখন সাধারণ মানুষের ঝোঁকটা ট্যাঁকঘড়ির দিকে। তার আগে পর্যন্ত ঘড়ি ছিল ‘কমিউনিটি ক্লক’। একটা শহরে হাতে গোনা ঘড়ি থাকত। গির্জা বা প্রাসাদের চূড়োয়। ঘণ্টাধ্বনি শুনে বোঝা যেত তার অস্তিত্ব। যে শহরে যত ঘড়ি সে শহরে ব্যবসায়ীদের ভিড়ও তত বেশি। পর্যটকদের কাছে দর্শনীয়। আস্তে আস্তে শহরগুলোয় ঘড়ির সংখ্যা বাড়তে লাগল। তবে চরিত্রগতভাবে সেগুলো সবই বারোয়ারি, সাধারণ মানুষ কখনই যাকে পুরোপুরি নিজের বলে ভাবতে পারেনি। তার সঙ্গে একটা সমীহ জাগানো দূরত্ব থেকেই যেত। দ্রষ্টব্য ও দর্শকের মাঝে এই ব্যবধান প্রথম সার্থকভাবে ঘোচাল ট্যাঁকঘড়ি। বন্ধন আরও নিবিড় হল পকেট-ঘড়িতে এসে। আভিজাত্যের কঠিন বর্ম ঝেড়ে ফেলে সময় মাপার যন্ত্রটি প্রলেতারিয়েতের হয়ে ওঠার যাত্রায় একধাক্কায় এগিয়ে গেল অনেকটা। রীতিমতো এও এক ঘড়ি-বিপ্লব। কার্যকারিতার কথা ভাবলে যার মধ্যে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই বারোয়ারি ঘড়ি হয়ে উঠল ব্যক্তিগত অলংকার, ক্রমে কাজের ঘড়ি, পরবর্তীকালে জনতা হাতঘড়ির আদি সংস্করণ। যে হাতঘড়ির আসনও আজ টলমল করছে মোবাইল ফোনের সমুদ্রে।

মাত্র একশো বছর আগে ট্যাঁকঘড়ির আঁতুড়ঘর হামবুর্গের প্রোফেসর ডক্টর এইচ বক (H. Bock)-এর বলা কথাগুলো খুব মনে পড়ছে। তাঁর কথায়— ‘the modern habit of wearing a watch on a bracelate on the most active part of the body will, it is to be hoped, soon disappear।’ হাতঘড়ি আজ যেটুকু টিকে আছে তা অনেকটাই অলংকার হিসেবে।

আজকে যাঁরা ট্যাঁকঘড়ির কথায় একরাশ বিস্ময় ছড়িয়ে দেবেন, চোখ থেকে ভেসে আসবে ফাঁকা দৃষ্টি তাঁরা জেনে রাখুন, আজকের দিনেও ট্যাঁকঘড়ি তথা পকেট-ঘড়ি যাঁদের নিত্যসঙ্গী তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন— কিংবদন্তী দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভ, পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফ, উত্তর কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট কিম, বিশ্বজয়ী স্নুকার প্লেয়ার পাকিস্তানের জাহাঙ্গীর খান, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আদ্যন্ত বাঙালি প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

ঢ্যাড়া টানার আগে সকলের উদ্দেশে রাখছি এই বিনম্র প্রশ্ন, অনেক খুঁজেও যার উত্তর পাইনি— বোম্বাগড়ের রাজা সবসময় ‘রাতে কেন ট্যাঁকঘড়িটা ডুবিয়ে রাখে ঘিয়ে?’ উত্তর জানা থাকলে অথবা তার হদিশ পেলে জানাতে ভুলবে না কিন্তু।