অমলেন্দু চক্রবর্তী-র জন্ম ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৩৪-এ, ঢাকা জেলার বাঘৈ গ্রামে। শৈশবে স্বাধীনতার আগেই চলে আসতে বাধ্য হন কলকাতায় মাতুলালয়ে। প্রখ্যাত কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে মাতুল হিসাবে কাছে পাওয়া বাল্যজীবনের সাহিত্যচর্চায় তাঁর কাছে আশীর্বাদস্বরূপ।

লেখকজীবনের হাতেখড়ি কৈশোরে, ১৯৪৮ থেকে। মাত্রই ১৯ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সাহানা’।

প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘বিপন্ন সময়’ (১৯৬২)।

এ ছাড়াও গ্রন্থাকারে এতাবৎ প্রকাশিত পাঁচটি উপন্যাস—‘গোষ্ঠবিহারীর জীবনযাপন’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘যাবজ্জীবন’, ‘রাধিকাসুন্দরী’ এবং ‘চাঁদ মনসার জোট’। ‘সাহানা’ ছাড়াও প্রকাশিত গল্পসংকলন ‘অবিরত চেনামুখ’, ‘গৃহে গ্রহান্তরে’ এবং ‘গল্পসমগ্র ১’।

প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক মৃণাল সেন অমলেন্দু-র ‘অবিরত চেনামুখ’ গল্পটি অবলম্বনে তৈরি করেছিলেন চলচ্চিত্র ‘একদিন প্রতিদিন’।  এছাড়াও অমলেন্দুর ‘আকালের সন্ধানে’ ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছিল মৃণাল সেনের অপর এক প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ‘আকালের সন্ধানে’।

২০০৯-এর ১৫ই জুন দায়বদ্ধ অথচ নিভৃত এবং প্রচারবিমুখ এই সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে।

এখানে প্রকাশিত গল্পটি ১৯৬৮ সালে লেখা এবং এখনও পর্যন্ত অগ্রন্থিত।


সোনামণি মারা গেছে। চোখের সামনে খোলা ছিল চুমকি আঁটা বিশাল আকাশ, উজ্জ্বল নক্ষত্রপুঞ্জ, এয়ো দৃষ্টির চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভরে ছিল মাঠ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছিল, কোথাও কেউ ছিল না; গাই–বলদ মানুষজন কেউ না, কিছু না। দূরে ধামোরের টিলাটার ধারে ভাগাড়, টিলার উপরে–নিচে শকুনেরা বাস করে, হয়তো সেই বিষণ্ণ নির্জন মাঠে, সেই ভয়ঙ্কর স্তব্ধতায় ওদের ডানা ঝাপটানির শব্দ ছিল, আর ছিল বাতাস, বাতাসের শব্দ। কার্তিকের শেষে খোলা মাঠে শীতের বাতাস আর মাঠ জুড়ে কুয়াশার স্তর। সোমত্তা মেয়ের মতো তর্‌তর্‌ করে বেড়ে উঠেছে ধান–গাছ, ধানের শীষে দুধ জমছে সবে, যেন বুকের ভারে নুইয়ে আসছে শরীর। বাতাসের আদর আর শিশিরের চুম্বনও যেন চোখ বুজিয়ে দেয়, নেতিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, ঢলে পড়ে। সার খোলে তালিম দেওয়া আকবর মিঞার ডাগর–ডোগর কার্তিক শালির ক্ষেতটার ঠিক মাঝখানে কেমন একটা টাক পড়েছিল, শুয়ে পড়েছে গাছগুলি। সোনামণিকে ওরা ওইখানেই টেনে এনে ফেলল, শুইয়ে দিলো। চিৎকার করতে পারেনি সোনামণি, ওদের গলার মাফলার দিয়ে ওর মুখ শক্ত করে বাঁধা ছিলো, ওদের শক্ত হিংস্র থাবার কাছে সোনামণির দুটো নরম হাতের অক্ষম প্রতিরোধও বুঝি ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু একবার, শুধু একটি মুহূর্তের জন্যেই হয়তো বা আচমকা নাড়া খেয়েছিল মেয়েটা। চোখের উপর আবিষ্কার করে ফেলেছিল ওই নীল চাঁদোয়ার মতো উদার আকাশ, ওই হীরের মতো উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলি, ওই ত্রয়োদশীর চাঁদের মতো আলো আর জ্যোৎস্না। বাতাসে পাকা ধানের ঘ্রাণ পেয়েছিল, আশে পাশে চারদিকে কতো উঁচু উঁচু ধানগাছ, তাল, সুন্দরি নারকেল গাছের মতো উঁচু। বাতাসে একপেশে হয়ে নেতিয়ে পড়ে শিরশির শিরশির করে করে কাঁপছে, ঝির–ঝির ঝির–ঝির শব্দ, মায়ের হাতের শাঁখা আর নোয়া আর চুড়ির মতো বাজছিল বুঝি। বোধ হয় সেই এক মুহূর্তের জন্য বড়ো বেশি সুন্দর, বড়ো মনোরম বলে মনে হয়েছিল এই পৃথিবী। বেঁচে থাকার জন্য একটা তীব্র আকাঙ্খা বুক ঠেলে চাগিয়ে উঠছিল হয়তো বা। আর হয়তো বা তখনই সতের বছরের ওই কিশোরী কুমারী শরীরটার কি এক অদ্ভুত শিহরণ পায়ের গোড়ালি থেকে আস্তে আস্তে উঠে এসে, সমস্ত শিরা উপশিরার অলি–গলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে গোটা শরীর অবশ করে তুলল, প্রাণপণ শক্তিতে দু’হাত দিয়ে বুকের উপর থেকে প্রচণ্ড পাথরের ঢালটাকে সরাতে গিয়ে হাত দুটোই শিথিল হয়ে এলো। হয়তো তখনই ধামোরের ভাগাড় থেকে একপাল শকুনের ডানা–ঝাপটানির শব্দ শুনতে পেয়েছিল, সেই সঙ্গে একটা বীভৎস উল্লাসের হাসি। আর শেষবারের মতো আকাশের শুক্লা ত্রয়োদশীর চাঁদের দিকে তাকিয়ে মা–বাবা–ছোটভাই নান্টুর মুখের কথা ভাবতে ভাবতে, সাত নম্বরের জন্য প্রি–টেস্টে সেকেন্ড হয়ে আগামী টেস্টে ফার্স্ট হবার গোপন শপথটার কথা মনে করে, নিজের জন্য শুরু করা অসমাপ্ত উলের কার্ডিগানটার কথা ভেবে অসহায়ভাবে চোখ বুজে ফেলেছিল একসময়। আর জাগেনি। তারপর সেই হেমন্তের রাতে আকবর মিঞার কার্তিকশালি ক্ষেতে পাকা ধানের শয্যায় শুয়ে বাতাসের আদর আর শিশিরের চুম্বনে ভিজে ঘুমোল সোনামণি। শিয়াল আর শকুনের খাদ্য হয়ে একেবারে নিঃশেষ হবার আগে, সোনামণির রক্তাক্ত ধর্ষিতা দেহটা আবিষ্কার করল রাধামাধব ঘোষালের ভাড়াটে লোকেরা। শেষরাতে তারা চোরের মতো এসেছিল ভাগচাষী আকবর মিঞার ধান কেটে নিতে।

সোনামণির আততায়ীকে আমি খুঁজছি। সে আজও ফেরার। সোনামণি আমাদের বড় আদরের মেয়ে। বড়দার প্রথম সন্তান, আমাদের পরবর্তী বংশধরের প্রথম মুখ, আমাদের রক্তের উত্তরাধিকার। সোনামণিকে আমরা সবাই ভালোবাসতাম, গ্রামের বড়ো একান্নবর্তী পরিবারে আমাদের অনেক বিরোধ আছে, অনেক কলহ, কিন্তু সোনামণির জন্য ছিল এক অখণ্ড ভালোবাসা। একটি শিশুকে আমরা সবাই একসঙ্গে সমবেতভাবে স্নেহে, অনুরাগে লালন–পালন করেছি, বড়ো হবার পরও ওকে ঘিরে আমরা সবাই একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতাম— সোনামণি বড়ো হবে, অনেক বড়ো। এই সেদিনও বাংলাদেশের পাঁজর ভাঙ্গতে ভারি ভারি বুটের হিংস্র উন্মত্ত উল্লাসে, লাঠি, কাঁদুনে গ্যাস আর রাইফেলের গুলির হৃদয়হীন নিষ্ঠুরতায় দানবশক্তির প্রেতনৃত্য শুরু হয়েছিল, তারই মুখে অপ্রতিরোধ্য যৌবনের উত্তাল-উদ্দাম ঝড়ের মতো ছুটে এসেছিল ছাত্র–ছাত্রী যুবশক্তি। সুস্থ পবিত্র মানবিক অধিকারের দাবিতে, ধর্ষিতা গণতন্ত্রের আততায়ীর মোকাবিলায় দুর্বার ঝড়ের গতি। লক্ষ লক্ষ মানুষের উত্তোলিত বাহুতে থরথর করে কাঁপছে দেশকে ভালোবাসার আবেগ, চারদিকের প্রাসাদের চূড়া ছাপিয়ে উর্ধ্বে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে জনতার দৃপ্ত হুঙ্কার— ‘মানি না, মানব না।’

উঠে যাচ্ছে, উঠে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারা বাংলাদেশে, রাজধানীর ডাক– ‘মানি না, মানব না।’ ঢল নামুক উত্তরের হিমালয় থেকে, দক্ষিণ থেকে প্লাবন উত্থিত হোক বঙ্গোপসাগরের ক্রুদ্ধ তরঙ্গে। এস্‌প্লানেডের জনতার ভিড়ে সে ছিল, আমিও ছিলাম। এক লহমায় চমকে উঠেছিলাম; ‘সোনামণি, সোনামণি তুই। সোনামণি, মা আমার।’ চারদিকের উষ্ণ উত্তেজনার মধ্যে অকস্মাৎ একঝলক আগুন ছিটকে এসে আছড়ে পড়ল পুলিস আর জনতার মাঝখানে ফাঁকা জায়গাটায়। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল, লেলিহান আগুনের মতোই কাঁপতে লাগল লাল–শাড়ির আঁচল, উত্তোলিত দুই হাতে লাল নিশান, কণ্ঠে সেই বলিষ্ঠ হুঙ্কার— ‘মানি না, মানব না।’ বিমূঢ় পুলিসবাহিনী, জনতার লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে উচ্ছসিত অভিনন্দন— মহিষাসুর বধের সঙ্কল্পে স্থির প্রতিজ্ঞ কে এই যুবতী? আমাদেরই ঘরের মেয়ে, আমাদেরই বোন অথবা কন্যা। চারদিক থেকে ছুটে এলো সাংবাদিক ফটোগ্রাফার। রাস্তায় শুয়ে পড়ে হাঁটু ভেঙ্গে বসে অসংখ্য ক্যামেরা তুলে নিলো সেই আগুনের ছবি।

সোনামণি গ্রামের স্কুলেই পড়ত, এ বারেই হায়ার সেকেন্ডারি দেবে কথা ছিল। প্রতিদিনের অভ্যাসে সেদিনও স্কুলের পর কোচিং এর পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, কোনাকুনি মাঠ পেরোতে হয়। শীতের বিকেলে দিন ফুরোবার আগেই সন্ধ্যে নামে। জানত না অন্ধকারে ঘুপটি  মেরে বসে ছিল শয়তান। অতর্কিত আক্রমণ, মাঠ থেকে টেনে নিয়ে গেল আরও গভীর নির্জন মাঠে। তারপর বেপরোয়া লুণ্ঠনের পর উপভোগের শেষে উচ্ছিষ্টের মতো শবদেহটা রেখে গেল আকবর মিঞার কার্তিকশাল ধানের ক্ষেতে।

অসহায় মেয়ে। মূর্খের মতো ভাবত, সে নির্দোষ, জানত না, একটা শরীর ছিল ওর, যে শরীর দুর্বৃত্তের লোভ জাগায়। আকবর মিঞাও ভাবত, সে নিরপরাধ, জানত না, গরীব হওয়াটা অপরাধ। কার্তিকশালের ধানের আশায় বসে ছিল মানুষটা। কিন্তু মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে ভাগের ধান ঠকিয়ে রাতারাতি প্রায় কাঁচাধান কেটে নিয়ে গেল জমির মালিক। সারা বছরের গা–গতরের দাম নেই।

দুর্ভাগ্য এই পোড়া বাংলা দেশটার। পলাশীর যুদ্ধের পরই রোগটা ধরা পড়েছিল, তারপর এই দু’শ বছরে এত কিছু হলো কিন্তু রোগটার চিকিৎসা হয়নি এতকাল।

সোনামণির মৃত্যুর খবর পেয়ে গ্রামে গিয়েছিলাম। বিস্বাদ লেগেছিল সবকিছু। কেমন অর্থহীন। ঘটনার দু’দিন পর ভরাট পূর্ণিমার রাতে সেই মাঠে গিয়েছিলাম আমি। সোনামণির শেষ শয্যার মাঠ। জ্যোৎস্নায় ভরে আছে মাঠ, একঝাঁক ভাগাড়ের শকুন উড়ছে মাঠের উপর। আকবর মিঞার ক্ষেতে লুণ্ঠনের শূন্যতা, নারী হত্যার পাপ। ধান কেটে নিয়ে গেছে। শূন্য মাঠে সারি বাঁধা শিকড়ের গোছ। চমকে উঠলাম। ক্ষেতের আলের উপর হাঁটু গেঁথে বসে আছে একটা মানুষ। কে? অনুতপ্ত দুর্বৃত্ত নয় তো? এই আধো আবছা আলোয় লোকটা আমাকে চিনল। পাগলের মতো ছুটে এলো— ‘আমার ধান, সোনার ধান গো বাবু।’

‘আকবর!’ ওর দুঃখের কথা আমি আগেই শুনেছি। বলতে পারলাম না কিছুই। দু’জনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম শুধু। মাটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সোনামণির আততায়ী আজও গ্রেপ্তার হয়নি।

লেখাটির পূর্বের বানান অপরিবর্তিত।   

চিত্রকর: দেবাশীস সাহা