বিপুল দাস

এক

পুকুরের চারপাশে বড় বড় পা ফেলে হাঁটছিলেন মিশিরজি। রিটায়ার্ড ফৌজি মথুরাপ্রসাদ মিশ্র। সবে তিন পাক হয়েছে, এখনও সাত পাক বাকি। টের পাচ্ছিলেন, ভেতরে সামান্য ঘামের ভাব এসেছে। দশ পাক কমপ্লিট হলে বেশ একটা নদী বয়ে যায় ঘাড়, বুক, পেট, পিঠ হয়ে কুঁচকির দিকে। তখন মনে বেশ একটা জোশ আসে। মনে পড়ে যায় সেই ট্রেনিংয়ের দিনগুলির কথা। কাঁধে ভারী রাইফেল নিয়ে দৌড়, পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে দৌড়। এই পার্কে সকাল–বিকেল যেসব বুড়োরা হাঁটতে আসে, তাদের আতুপতু করে হাঁটা দেখে তার হাসি পায়। চার–পাঁচজন মিলে গল্প করে আর টুকুস টুকুস করে হাঁটে। প্রথম কয়েক দিন ওদের সঙ্গে হেঁটেছিলেন। পোষায়নি। যতসব ফালতু বকোয়াস করবে আর ধীরেসুস্থে হাওয়া খেতে খেতে হাঁটবে। মনে হয় যেন শালিকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে। অর্শ, কারেন্ট পাস করানো তামার আংটি। হোমিওপ্যাথি, পাখিবাবা, বউয়ের গ্যাস, নিজের অ্যাসিড। এ ছাড়া আর কোনও গল্প নেই। সিভিলিয়ানগুলোও পারে। গুচ্ছের তেলমশলা দেওয়া খাবার খাবে, ঘেউ ঘেউ করে বিশ্রী ঢেকুর তুলবে আর অ্যাসিডের গল্প করবে।। ঠিকঠাকভাবে হাঁটার জন্য ঠিকঠাক পোশাক দরকার, সে বুদ্ধিও নেই এদের। কেউ ধুতি পরে তো কেউ হাফপ্যান্ট। কেউ ট্র্যাকস্যুটের সঙ্গে চপ্পল পরে আসে। একজন আছে, খুব বাজে কথা বলে। সে আসে ওই জামা আর প্যান্ট একরকম কাপড় দিয়ে তৈরি, সেই পোশাক পড়ে। সাফারি না কী! খুব ফরফর করে ইংরেজি বলে। শাস্ত্রেই আছে, সাফারি ফরফরাতে।

শুধু ভোরে নয়, ইদানীং তিনি বিকেলেও হাঁটতে শুরু করেছেন। কিন্তু বিকেল একটু গড়িয়ে সন্ধের দিকে গেলেই পার্কের এখানে সেখানে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা বসতে শুরু করে। মাঠের মাঝে মাঝে ঘাসের ওপর যারা বসে তারা বেশ ভদ্রসভ্য। কিন্তু ঝোপের আড়ালে যারা বসে তাদের আর কোনও জ্ঞান থাকে না। একেবারে মধু বৃন্দাবন। সেজন্য অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আজকাল সন্ধে নামার আগেই বাড়ি ফিরে যান।

মিশিরজি বড় সাত্ত্বিক মানুষ। তার ওপর তার লাইফস্টাইল একদম কাঁটায় কাঁটায় বাঁধা। বিশৃঙ্খলা একদম বরদাস্ত হয় না। তার সংসার চলে একদম তেলখাওয়ানো মেশিনের মতো। কোথাও একচুল এদিক ওদিক হওয়ার উপায় নেই। সমস্ত জীবন একদম নির্ভুল ছন্দে। লেফট-রাইট করে কাটিয়ে এসেছেন। ওপরওয়ালার কম্যান্ড মানে ভগবানের নির্দেশ। শুধু ওপরওয়ালার কম্যান্ড শুনে কতবার বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বরফ, চাঁদিফাটা রোদ্দুর, জোঁক, সাপ, বন্যার জল— এসব চ্যালেঞ্জ পার করে এসেছেন। আর এইসব পেটরোগা সিভিলিয়ানদের দল শুধু অ্যাসিড আর বাতের গল্প করেই দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। দু-চারদিন ওদের সঙ্গে হেঁটেছিলেন। তার হল ফৌজি কদম, পারে নাকি ওরা! ওদের ওসব অর্শ আর অম্বলের গল্প শুনে তিনি একদিন কারগিলের গল্প বলতে শুরু করেছিলেন। মহা কুচুটে লোক এরা। এত আজেবাজে বকতা পারে! তিনি শুধু বলেছিলেন ফ্রস্ট বাইট হলে অনেক সময় পা কেটে ফেলতে হয়। দলে খেঁকুরে চেহারার একজন অম্বলের রোগ আছে। নাকি কলেজে পড়ায়। তার কথা শুনে খ্যা খ্যা করে হেসে উঠেছে।

‘ফর্স্ট তো রবার্ট ফর্স্ট! ও বাবা, সে কামড়ালে তো কাটতেই হবে। সে কী যে কবিতা! রক্তের ভেতর বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কারগিলেও কি তার প্রাদুর্ভাব হয়েছে? একবার রবার্ট ফর্স্ট বাইট করলে শেক্সপিয়ারের বাবাও বাঁচাতে পারবে না।’

মিশিরজি একটু ধন্দে পড়ে গেলেন। কথাটা এরা অন্য ফ্রন্টে নিয়ে যেতে চাইছে। রবার্ট ফর্স্ট না শুনলেও শেক্সপিয়ারের নাম শুনেছেন। মশহুর কবি ছিলেন। কিন্তু তার বাবা ডাক্তার ছিলেন কিনা, সেটা ঠিক ক্লিয়ার হল না। মিশিরজি টের পাচ্ছিলেন, সারাজীবন ডিসিপ্লিন মেনে এখন এসব লোকজনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারছেন না। তা ছাড়া, এরা যেসব আলোচনা করে তার কিছুরই তিনি থই পান না। আলোচনায় ঢোকার জন্য কোনও ফাঁকফোঁকরই খুঁজে পান না। আরও একটা ব্যাপার তিনি লক্ষ করেছেন। এরা তাকে একদম বাইরের লোক মনে করে। এক কমপ্লেক্সে আছেন, সব কিরিয়াকরমে অংশ নিচ্ছেন, পন্দরই অগস্টের অনুষ্ঠানে সোভাপতি হলেন, তবু তাকে এরা একটু ছোট নজরেই দেখে। তার ফৌজিত্ব নিয়ে কখনও হালকা ঠাট্টাও করে।

এই তো ক’দিন আগে তিনি বলেছিলেন কাঁচাকলা খাওয়ার উপকারিতার কথা। এইসব পেটরোগা মছলিখোরদের ভালোর জন্যই বলেছিলেন। কাঁচকলায় বহুত আইরন আছে শুনে হাফপ্যান্ট দাসবাবুর সে কী হাসি!

‘হাসছেন কেন?’ মিশিরজি জানতে চেয়েছিলেন।

‘দুর মশাই, কচু আছে আয়রন।’

‘কেমনে বুঝলেন কাঁচকলায় আইরন নাই?’

‘খুবই সোজা। একদিন আপনি বাজার থেকে কাঁচকলা কিনে একটা ম্যাগনেট, মানে চুম্বক ওটার গায়ে লাগান তো! দেখুন টানে কিনা! কাঁচকলায় আয়রন থাকলে সাঁই করে গিয়ে চুম্বকে ঝুলে থাকবে। চুম্বক লাগলে বলবেন, আমার ছেলের স্কুলের প্রোজেক্টের জন্য কিনেছিলাম।’

দাসবাবুর কথা শুনে আর সবাই ফিচিক ফিচিক হাসছিল। কথাটা মিথ্যে নয়, আবার ভেতরে কোথাও প্যাঁচ আছে— সেটা ধরতে না পেরে মেজাজটা বেশ বিগড়ে গেল তার। রাতে আটটা রুটি বেশি খেলেন। বুঝতে পারছিলেন, এরা তাকে সূক্ষ্মভাবে অপদস্থ করে। তারপর থেকে দল ছেড়ে একাই সকাল–সন্ধে পার্কের চারপাশে হাঁটতে শুরু করেছেন।

রিটায়ার্ড ফৌজি মথুরা মিশ্রর মেজাজ ভালো নেই। বিশৃঙ্খলা তার মোটে বরদাস্ত হয় না। আরে বাবা দুনিয়া ঘুরছে নিয়মের তালে। কোথাও এতটুকু গড়বড় হওয়ার উপায় নেই। একদম ছন্দে ছন্দে ঘুরে চলেছে দুনিয়া। শুধু খেয়াল রাখতে হবে কখন গ্রুপ ক্যাপ্টেন বলবে— হল্ট! কখন বলবে ডাইনে মুড়, বাঁয়ে মুড়। যে জাতির জীবনে শৃঙ্খলা নেই তাদের কোনওদিন উন্নতি হবে না।

কিন্তু কথায় বলে না, বেশি হিসেবির কড়ি বাঘে খায়। এখন মিশিরজির হয়েছে তাই। সারাজীবন শুদ্ধ নিয়মমতে ডিসিপ্লিন পালন করলেন। তার সংসারে পান এবং চুন যথা পরিমাণে যথাস্থানে বিরাজ করে। অথচ কখন যে সংসারেই মূর্তিমান বেনিয়ম বড় হয়ে উঠেছে— বুঝতেই পারেননি। হঠাৎ একদিন দেখলেন তার সুপুত্র মোহনের মাথার চুলগুলো চারপাশে ছোট করে ছাঁটা। মাঝখানে ফুলকপির মতো থোকা ধরে আছে। তাও হয়তো মানা যেত। কিন্তু শীতের ডাঁটালো ফুলকপি কেন সিংহের কেশরের রঙের হবে! এটা পুরো বেনিয়ম। কোথাও কালো, কোথাও সাদা, কোথাও লালচে, কোথাও পাউরুটি কালার। না–মুমকিন! ফুলকপির রঙ এরকম হয় না। তার কলেজ দূরে বলে ঘ্যান ঘ্যান করে একটা বাইক আদায় করেছে। সেই বাইক নিয়ে ভটভট করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইদানীং। তার ওপর মাথায় ফুলকপি! এ কী অনাচার! নিয়মশৃঙ্খলা বলে আর কিছু রইল না। তার নিজের ঘরেই এই অনাচার। রাতে স্বপ্ন দেখলেন তার ছেলে মোহন দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে লাইভ সিংহ সেজে হালুম দিচ্ছে। প্রত্যেক হালুমে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। এরকম তো হওয়ার কথা নয়। রাতে সলিড ঘুমও জীবনে ডিসিপ্লিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

ঘুম আর আসবে না আজ রাতে। নিজের ছেলে যদি সিংহ সেজে বাপকে হালুম দেয় তবে মাথা কি আর ঠান্ডা থাকে? হোক স্বপ্ন, তিনি স্পষ্ট গর্জন শুনেছেন। কীসব দিনকাল পড়ল। স্বপ্নের ভেতরেও কোনও নিয়মকানুন থাকছে না। তিনি দু–একবার যথোচিত ভয়েসে ‘হল্ট’ বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন শুধু ঠোঁট দুটোই নড়ছে। আওয়াজ বেরোচ্ছে না।

উঠে পড়লেন। আলো জ্বালিয়ে হাঁটার পোশাক পরে বাইরে এসে দেখলেন পুব আকাশে সামান্য হালকা ভাব। কোথাও কোনও লোকজনের সাড়াশব্দ নেই। পুরো মহল্লা ঘুমিয়ে আছে। পার্কের দিকে রওয়ানা হলেন মথুরা মিশ্র। হালকা ঠান্ডা আছে। মাথায় ফৌজি টুপিটা পরে নিলেন। এটা মাথায় দিলেই সমস্ত শরীরজুড়ে ডিসিপ্লিনের একটা বাতাবরণ অটোমেটিক কাজ করে। বুকের ভেতরে গান বেজে ওঠে— কদম কদম বড়হায়ে যা…

দুই

পার্কের পশ্চিম পাড়ে ঝাঁকড়া ঝোপের আড়ালে বসে ছিল মোহন। শুভাঙ্গীর সঙ্গে দেখা করার জন্য এই জায়গা এবং এই সময় সে খুব বুদ্ধিমানের মতো বেছে নিয়েছে। বেশ অনেকক্ষণ কথা ইত্যাদি বলা যায়। একটু ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, লোকজন আজকাল একটু দেরি করেই পার্কে আসছে। সামান্য কুয়াশাও পড়তে শুরু করেছে। ফলে ভিজিবিলিটির এই কমি হওয়ায় ওরাও নিশ্চিন্ত।

সবে শুভাঙ্গী এসে মোহনের পাশে বসেছে, মোহন এমন ভাব করছে যেন তার খুব শীত করছে— এমন সময় মোহন দেখল কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একটা ছায়ামূর্তি তাদের এদিকেই আসছে। বেশ জোরে জোরেই হাঁটছে। এত ভোরে, এই প্রায় অন্ধকারেও লোকজন হাঁটতে শুরু করেছে। ছায়ামূর্তি আবার এদিকেই আসছে। শুভাঙ্গী ভয় পেয়েছে। তার হাঁটুর কাছে জিন্‌সের ছেঁড়া জায়গাটা খামচে ধরেছে।  

‘ভয় পেয়ো না, মানুষই হবে। একদম চুপ করে থাকো।’

‘সোজা এদিকেই আসছে তো!’ ফিসফিস করে বলল শুভাঙ্গী।

এক্স ফৌজি মথুরা মিশ্রর আজ কিছু গড়বড় লাগছিল। হতে পারে চোখে ঘুম ছিল, খারাপ স্বপ্ন দেখার জন্য মাথাগরম ছিল। রোজকার পথ ছেড়ে কুয়াশার ভেতরে অন্য দিকে চলে এসেছিলেন। সামনে একটা ঘন ঝোপ। হাঁটার পথে কোনওদিন এরকম ঝোপ ছিল না যতদূর মনে পড়ে। নাহ্, চারিদিকে, চারও তরফ শুধু বিশৃঙ্খলা আর অনাচার। হবেই তো। মানুষ যদি মাথায় ফুলকপির চাষ করে, এমনই হবে। এমন সময় তিনি হঠাৎ শুনতে পেলেন—

‘সর্বনাশ, বাবা।’ শুভাঙ্গীর হাত খামচে ধরল মোহন।

‘কী করে বুঝলে? অন্য কেউও হতে পারে।’

‘ধুস, সেম টুপি। নাহ্, আর সামনে আসতে দেওয়া ঠিক হবে না।’

‘কী করবে? চলো পালাই।’

‘হল্ট’— আচমকা কম্যান্ড দিল মোহন। যন্ত্রের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল মথুরা মিশ্র। আহা, বড় ভালো হল তো আওয়াজটা। অনেকটা সুবেদার তারক সিংয়ের মতো।

‘পিছে মুড়… এক দো তিন, এক…’ দম দেওয়া কলের সেপাইয়ের মতো পেছনে ঘুরল ফৌজি।

‘প্লাটুন, ফরোয়ার্ড মার্চ। এক দো এক, লেফট রাইট লেফট…’

কুয়াশার ভেতর দিয়ে এক প্রাক্তন সেপাই মিথ্যে কম্যান্ড শুনে হেঁটে যাচ্ছে শৃঙ্খলার দিকে।

চিত্রকর: মৃণাল শীল