রূপাঞ্জন গোস্বামী

এই পৃথিবীর প্রায় ২৭% বা ৪ কোটি বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে আছে নানান পর্বতশ্রেণী। ৩ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস করেন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ মিটার উচ্চতারও ওপরের ভূভাগে। প্রায় ১০ কোটি লোক প্রত্যেক বছর পেশা ও ভ্রমণের জন্য পাহাড়ে যান। এঁদের মধ্যে এক দল যান পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে। পৃথিবীতে যাঁদের নাম পর্বতারোহী।

পর্বতারোহণ আধুনিক কোনও বিষয় নয়

আদিমকাল থেকেই পাহাড়ে মানুষের আনাগোনা ছিল। ১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, আল্পস পর্বতের ১০ হাজার ৫৩০ ফুট উচ্চতায় পাওয়া গিয়েছিল জমে কাঠ হওয়া এক মানবদেহ। বরফের নীচে ৫৩০০ বছর শুয়ে থাকা মানুষটির নাম দেওয়া হয়েছিল ওয়েটজি। কারণ দেহটি পাওয়া যায় আল্পসের ওটজাল এলাকায়। মানুষটির পেটে হরিণের ঝলসানো মাংস পাওয়া গিয়েছিল। প্রতিপক্ষের তিরের আঘাতে মৃত্যু হয়েছিল তার।

হাজার হাজার বছর আগে থেকে ধর্মীয় কারণে সুউচ্চ পর্বতে আরোহণ করতে শুরু করেছিলেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মের পুরোহিত ও সাধুসন্তরা। তাঁদের ধারণা ছিল পর্বতের ওপর বাস করেন ঈশ্বর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের নিজস্ব এক্সপ্লোরার জোহান রেইনহার্ড আন্দিজ পর্বতমালার অন্তর্গত এল লুল্লাইল্লাকো (৬৭৩৯ মিটার) পর্বত শৃঙ্গে ওঠার পর স্তম্ভিত হয়ে যান।

লুল্লাইল্লাকো মমি

সেখানে রেইনহার্ড খুঁজে পেয়েছিলেন ধর্মীয় সমাধিক্ষেত্র। যেখানে পেয়েছিলেন তিন নাবালক নাবালিকার মমি, যাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। ইনকা দেবতাদের তুষ্ট করতে, কষ্ট দিয়ে, তিলে তিলে মারা হয়েছিল তাদের। দেবতাদের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য জীবন্ত শিশুদের পাহাড়ের চূড়ায় উৎসর্গ করাকে ইনকা সভ্যতায় বলা হতো কাপাকোচা’

১৯৪২ সালে নন্দাদেবী গেম রিজার্ভের রেঞ্জার হরিকিষণ মাধওয়াল হিমালয়ের প্রত্যন্তে লুকিয়ে থাকা এক তুষারাচ্ছাদিত হ্রদে খুঁজে পান শত শত বছরের পুরনো অজস্র কঙ্কাল। হ্রদের জলে পাওয়া যায়, ত্রিশুল, কমন্ডুলু ও অন্যান্য সামগ্রী। যা থেকে ধারণা করা হয় কঙ্কালগুলি কোনও ধর্মীয় যাত্রায় অংশগ্রহণকারী মানুষদের। কোনও এক অভিশপ্ত দিনে, তীর্থযাত্রীদের দলটি তুষার ঝড় ও তুষার ধসের কবলে পড়ে। তুষার ধস ভাগ্যহত তীর্থযাত্রীদের আছড়ে ফেলে ১৬৪৭০ ফুট উচ্চতায় থাকা রহস্যময় হ্রদ রূপকুণ্ডের বুকে।

রূপকুণ্ড

অ্যাডভেঞ্চারের টানে পাহাড়ে চড়া শুরু প্রায় সাতশ বছর আগে

ইতালির কবি ফ্রান্সিসকো পেত্রার্কা ১৩৩৬ সালের ২৬ জুলাই মাউন্ট ভেনটক্স (৬২৭৩ ফুট) আরোহণ করেন ম্যাসিডোনিয়ার রাজা পঞ্চম ফিলিপের মাউন্ট হায়মো আরোহণের কথা শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে। সে দিক থেকে দেখতে গেলে সম্ভবত কবি পেত্রার্কাই বিশ্বের প্রথম মাউন্টেনিয়ার। তবে আধুনিক বা টেকনিক্যাল মাউন্টেনিয়ারিং শুরু হয়েছিল অনেক পরে একটি মজার ঘটনার মধ্যে দিয়ে।

জেনিভার বিজ্ঞানী হোরাস বেনেডিক্ট ১৭৬০ সালে ফ্রান্সের চ্যামনিক্স (Chamonix) ঘুরতে গিয়ে ১৫৫৭১ ফুট উঁচু ম ব্লাঁ (Mont Blanc) শৃঙ্গ দেখেন।  অভিভূত হোরাস ঘোষণা করেন,  যে ব্যক্তি ম ব্লাঁ শৃঙ্গে আরোহণ করতে পারবেন তিনি পাবেন বড় অঙ্কের পুরস্কার। ঘোষণাটির ২৫ বছর পরে, ১৭৮৬ সালে, চ্যামনিক্স-এর ডাক্তার মিচেল গ্যাব্রিয়েল প্যাকার্ড ও তাঁর পোর্টার জ্যাকুইস বালমেট ম ব্লাঁ শৃঙ্গে আরোহণ করেন। এর ঠিক একবছর পর হোরাস বেনেডিক্ট নিজেই ম ব্লাঁ আরোহণ করেছিলেন। 

ভন মিচেলের ছবিতে হোরাস বেনেডিক্টের ম ব্লাঁ আরোহণ

ক্রমশ ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পর্বতারোহণ। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ইউরোপের আল্পস ছাড়াও ককেশাস, পাইরেনিস, রিলা, টাত্রা, সুডেটেস পর্বতশ্রেণী, উত্তর আমেরিকার রকি, সিয়েরা নেভাদা, কাস্কেডস, আলাস্কা রেঞ্জ, সেন্ট এলিয়াস পর্বতশ্রেণী ও দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ।

এশিয়ার হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকুশ, পামির, তিয়েন শান ও কুনলুন পর্বতশ্রেণী। নিউজিল্যান্ডের সাউদার্ন আলপ্স। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কোস্ট মাউন্টেনস। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ ফোল্ড মাউন্টেনস। স্ক্যানডেনেভিয়ার স্ক্যান্ডেস ও অ্যান্টার্কটিকার বিভিন্ন পর্বতশ্রেণীতে পর্বতারোহীদের ভিড় বেড়েই চলেছে। আজ, প্রত্যেকবছর সারা পৃথিবীর প্রায় ৫০০০০এর বেশি পর্বতারোহী বিভিন্ন শৃঙ্গ আরোহণ করতে বেরিয়ে পড়েন। 

কতটা কঠিন পর্বতারোহণ

পর্বতারোহণ সর্বসাধারণের জন্য নয়। কারণ এই খেলার পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি।  এটি এমন একটি খেলা, যে খেলায় পর্বতারোহীদের লড়াই করতে হয় উচ্চতা, অক্সিজেনের ঘাটতি, হাড়হিম করা তাপমাত্রা, উন্মত্ত বাতাস ও মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা একটু কঠিন।

বাড়ছে উচ্চতা, কমছে অক্সিজেন

সমুদ্রপৃষ্ঠে যা অক্সিজেন থাকে, মাউন্ট এভারেস্টের (২৯০২৮ ফুট/৮৮৫০মি) মাথায় তার মাত্র ৩২% অক্সিজেন পাওয়া যায়। আপনি ৫০০০ মিটার উচ্চতা থেকে যত ওপরে উঠবেন, বাতাস দ্রুত পাতলা হতে শুরু করবে। শরীরে অক্সিজেনের যোগান দ্রুত কমে যাবে। দেখা দেবে Hypoxia

 ৮০০০ মিটার উচ্চতার পর আরোহণ করা প্রায় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়, সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন না থাকা আরোহীর কাছে। আপনাকে এক পা এগিয়ে পাঁচবার গভীর শ্বাস নিয়ে আবার এক পা এগোতে হবে। ১০ পা হাঁটার পর ৫ মিনিট রেস্ট নিতে হবে। এই রেস্ট নেওয়ার সময়ও আপনার মাথা ঘুরবে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে থাকবে। অক্সিজেনের অভাবে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিস্ক কাজ করা বন্ধ করতে থাকবে ধীরে ধীরে। ভীষণ ঘুম পাবে আপনার। ঘুমিয়ে পড়লে সেটাই হবে আপনার শেষ ঘুম।

টেন্টে সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন নিচ্ছেন এক আরোহী

কমছে তাপমাত্রা, বাড়ছে বাতাস

প্রতি ১০০০ ফুট উচ্চতা উঠলে, আপনার চারপাশের তাপমাত্রা কমে ১.৬৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তাই যত উচ্চতায় উঠবেন ঠান্ডা তত বাড়বে। তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দেবে বাতাসের গতি। যেমন, এভারেস্টের নরম্যাল রুটে প্রতি ঘন্টায় ৮০ কিমি বেগে হাওয়া বয়। ফলে দ্রুতগতির বাতাস পরিবেশের তাপমাত্রাকে আতঙ্কজনক স্তরে নামিয়ে দেয়।

আপনার শরীর এই অবস্থাকে সামাল দেওয়ার জন্য দ্রুত ক্যালোরি পুড়িয়ে উত্তাপ যোগায়। ফলে দ্রুত শেষ হতে থাকে আপনার জীবনীশক্তি। উচ্চতা, অক্সিজেনের ঘাটতি, ঠান্ডা ও বাতাসের চতুর্মুখী ও চরম আক্রমণের জন্য ২৬০০০ ফুটের ওপরে থাকা পর্বতের অংশের হয়েছে এক বিশেষ নাম, ডেথ জোন। যেখানে শরীর তার ইচ্ছামত কাজ করতে পারে না। যেখানে মৃত্যু হওয়া একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নিয়েছে পর্বতারোহী সমাজ।

ডেথ জোন-এ প্রবল বাতাসের মুখোমুখী এক আরোহী

কমছে দৃশ্যমানতা , টানছে মাধ্যাকর্ষণ

উন্মত্ত বাতাস, ঝাপটা মারা তুষার এবং নীচে নেমে আসা মেঘের দল আপনাকে কয়েক ফুট দুরের বেশি দেখতে দেবে না। ফলে আপনি ল্যান্ডমার্ক হারিয়ে ফেলবেন,  ভৌগলিক অবস্থান হারিয়ে ফেলবেন।

এছাড়া, পর্বত হল ভূপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অতিকায় খাড়া বস্তু। খাড়া পথে বা ঢাল বেয়ে  আপনাকে ভূপৃষ্ঠ ছেড়ে ওপরে উঠতে হবে। সেই সময় আপনাকে টানবে মাধ্যাকর্ষণ। একটা ভুল পদক্ষেপ আপনার জীবন নিয়ে নিতে পারে। তবুও এ সব বাধা জয় করেই অনেকে ফিরে আসেন সফল ভাবে শৃঙ্গ আরোহণ করে। কেউ ফিরে আসেন কফিন বন্দি হয়ে, কেউ পাহাড়েই রয়ে যান চিরতরে।

 নাঙ্গা পর্বতে হারিয়ে গিয়েছিলেন মামেরি  

কিংবদন্তী পর্বতারোহী হার্মান বুলের মতে, সর্বকালের অন্যতম সেরা আরোহী ছিলেন ইংল্যান্ডের কবি ও প্রবাদপ্রতিম মাউন্টেনিয়ার অ্যালবার্ট মামেরি। তিনিই প্রথম পর্বতারোহী, যিনি সর্বপ্রথম ৮০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গ আরোহণের প্রয়াস করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন নর্ম্যান কলি, হেস্টিংস ও দুই শেরপা রঘুবীর থাপা ও গোমান সিং।

পাহাড়টা ছিল  নাঙ্গা পর্বত। পৃথিবীর নবম উচ্চতম শৃঙ্গ। মামেরির পরিকল্পনায় নতুনত্ব ছিল। কিন্তু ৮০০০ মিটারের শৃঙ্গ আরোহণের সম্যক ধারণা না থাকার জন্য অভিযানের প্রস্তুতি ততটা নিখুঁত ছিল না।

নাঙ্গাপর্বত

নাঙ্গা পর্বতের রাখিওট ফেসটিকে আজও বলা হয় মানুষ খেকো। পরবর্তীকালে ৩১ জন পর্বতারোহীর প্রাণ গেছে এই ফেসটি আরোহণ করতে গিয়ে। ১৮৮৫ সালের ২৪ অগস্ট, নাঙ্গা পর্বতের কুখ্যাত রাখিওট ফেসে সর্বপ্রথম রেকি করছিলেন মামেরি ও তাঁর দুই সঙ্গী।

রেকি করার সময় অসীম ঝুঁকি নিয়ে রাখিওট ফেসের কঠিনতম অংশটিতে রোপ লাগাবার চেষ্টা করছিলেন মামেরি। হঠাৎ কানে আসে বাজ পড়ার মতো শব্দ। ওপর থেকে নেমে আসে ভয়ঙ্কর তুষার-ধস। নড়বার সময় দেয়নি তিন আরোহীকে। দুই শেরপা রঘুবীর থাপা গোমান সিং ও মামেরিকে কয়েক হাজার ফুট নীচে আছড়ে ফেলে অ্যাভেলাঞ্চটি। তাঁদের দেহ আজ অবধি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মামেরি

চো ইয়ুকেড়ে নিয়েছিল ভারতের প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী নন্দু জয়ালকে

ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী ছিলেন ভারতের সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার নরেন্দ্রধর জয়াল। যাঁকে বলা হয়  ‘Marco Polo of Indian Mountaineering‘। যাঁর হাত ধরে ভারতে অসামরিক পর্বতারোহণ হাঁটতে শিখেছে।

১৯৫৮ সালের এপ্রিল, প্রথম প্রিন্সিপাল হিসেবে দার্জিলিং-এর হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সবে দায়িত্ব নিয়েছেন নন্দু জয়াল। স্বয়ং জওহরলাল নেহেরুর কাছ থেকে এসেছিল সরকারি অভিযানে যোগদানের অনুরোধ। নেহেরু ভীষণ পছন্দ করতেন অত্যন্ত মার্জিত ও সাহসী এই পর্বতারোহীকে।

প্রিন্সিপালের সদ্য নেওয়া দায়িত্ব কিছুদিনের জন্য অন্যকে বুঝিয়ে দিতে দেরি হয়ে গিয়েছিল নন্দু জয়ালের। ততদিনে এভারেস্ট অঙ্গনে থাকা পৃথিবীর ষষ্ঠ উচ্চতম শৃঙ্গ চো ইয়ু’ পর্বতে (৮১৫৬ মি) ভারতীয় অভিযান শুরু হয়ে গেছে। কেকি বানশা, জগজিৎ সিং, জন ডায়াস, সোনাম গিয়াতসো ও পাসাং দাওয়া ইতিমধ্যে বেসক্যাম্প ছেড়ে ক্যাম্প-১ এর পথে রওনা হয়ে গেছেন।

দার্জিলিং থেকে রওনা দিলেন নন্দু। এভারেস্ট বেসক্যাম্পে পৌঁছে গেলেন ২৩ এপ্রিল। গাড়ির জার্নির পর অবিশ্বাস্য গতিতে ট্রেক করে বেসক্যাম্পে আসার জন্য একটু অসুস্থ বোধ করেছিলেন, প্রচণ্ড ক্লান্তও ছিলেন।

নন্দু জয়াল

কিন্তু বেসক্যাম্পে মাত্র একদিন রেস্ট দেওয়ার পর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ২০৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ক্যাম্প-১। কারণ তিনি স্টার মাউন্টেনিয়ার। পাহাড়ে তিনি সব পারেন, এমন ধারণা ছিল অভিযানটির পৃষ্টপোষকদের।

কিন্তু কেউ বোঝেননি তিনিও মানুষই ছিলেন। ফলে, যে উচ্চতা ও আবহাওয়ার সঙ্গে শরীরের খাপ খাওয়াতে পর্বতারোহীরা কয়েক সপ্তাহ সময় নেন, নন্দু পেয়েছিলেন ২৪ ঘন্টারও কম সময়।

তবুও সেনাবাহিনীর শৃংখলাপরায়ণ অফিসার নন্দু জীবনের সর্বশক্তি একত্রিত করে ক্যাম্প-১ পৌঁছেছিলেন চূড়ান্ত অসুস্থ অবস্থায়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁকে ওষুধ ও অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল।

তবে শোনা যায় ঠিক মতো চিকিৎসা দেওয়া যায়নি নন্দু জয়ালকে। কারণ অভিযান শুরুর আগে অভিযানের মালপত্র নিয়ে আসা প্লেনটি নেপালেই এক দুর্ঘটনায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ফলে অনেক জীবনদায়ী ওষুধ অভিযানে ছিল না।

২৮ এপ্রিল ভোরে পালমোনারি ইডিমাতে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩২ বছর বয়েসে ক্যাম্প-১ এর টেন্টের মধ্যে শুয়ে চির বিশ্রামে চলে গেলেন কিংবদন্তী পর্বতারোহী নন্দু জয়াল। তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে ক্যাম্প-১ এর কাছেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

বাঁদিক থেকে চতুর্থ নন্দু জয়াল, পঞ্চম তেনজিং নোরগে

বিভিন্ন শৃঙ্গে মৃত্যুর হার

প্রত্যেক বছর বিশ্বের বিভিন্ন পর্বতে পর্বতারোহীদের মৃত্যু ঘটে। একনজরে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বের সেরা কিছু পর্বত শৃঙ্গে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হার।
অন্নপূর্ণা-১ শৃঙ্গে মৃত্যুর হার ৩৮%, কে-টু– ২৯.৫%, নাঙ্গাপর্বত– ২০.৭%, ধৌলাগিরি– ১৫.৭%, কাঞ্চনজঙ্ঘা -১৪.৫%, মানসলু– ৯.৯%, গাসেরব্রুম-১– ৮.৯%, মাকালু -৮.৯%, শিশাপাংমা- ৮.৪%,  ব্রড পিক- ৫.৩%, এভারেস্ট- ৬%, লোত্সে- ২.৮%, গাসেরব্রুম-২  ২.৩%, চো-য়ু -১.৪%, মাউন্ট রেইনার- ১.৪%, ডেনালি– ০.৩%।

নেপাল হিমালয়ে আরোহণ ও মৃত্যু সংক্রান্ত কিছু তথ্য

বিশ্বের ১৪ টি উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে ৮ টি আছে নেপালে। এছাড়াও প্রায় ১৩১০ টি শৃঙ্গ আছে যাদের উচ্চতা ৬০০০ মিটারের ওপরে। তাই পৃথিবীর প্রত্যেক পর্বতারোহীদের মনে অন্তত একবার নেপালে পর্বতারোহণ করার স্বপ্ন থাকে। নেপাল হিমালয়ে আরোহণ সংক্রান্ত কিছু তথ্য আপনাদের বিশ্ব পর্বতারোহণের পরিস্থিতি সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিতে পারে।

●  প্রতিবছর প্রায় ১৬০০ জনের বেশি পর্বতারোহী নেপাল হিমালয়ে ৬০০০ মিটারের ওপরের শৃঙ্গগুলিতে আরোহণ করতে আসেন।

 ● সাধারণত ১৫ থেকে ৬৯ বছর বয়সি নারী ও পুরুষরা আরোহণ করতে আসেন।।

 ● মোট পর্বতারোহীর ৮৮.৮% হলেন পুরুষ। 

●  মোট পর্বতারোহীর ৩৮.১% নেপালের শৃঙ্গে আগে আরোহণ করার অভিজ্ঞতা আছে।

● মোট পর্বতারোহীর ৫০% এর বয়েস ৩১ থেকে ৪৩ এর মধ্যে।

● মোট পর্বতারোহীর ৩০.৭% সামিট করেন এবং এঁদের মধ্যে মারা যান ১.৫%।

● ৪০ বছরের নীচে থাকা আরোহীদের সামিট করার সম্ভাবনা বেশি।

● অভিজ্ঞ আরোহীদের মৃত্যু হার কম।

কে-টু

কে-২ ট্রাজেডি

২ আগস্ট ২০০৮, অনান্য বছরের তুলনায় সে বছর কে-টু’তে আরোহীদের ভিড় বেশি ছিল। এজেন্সিদের রোপ ফিক্সড করার টিম তাড়াহুড়োতে একটা মারাত্মক ভুল করে বসে। কুখ্যাত ও সংকীর্ণ বটল-নেক অংশে রোপ ফিক্সড করে ফেলেছিল যে অংশটি দিয়ে খুব সাবধানে এক এক করে উঠতে হয়। যেখানে একবার ভুল পা ফেলা মানেই মৃত্যু।

দিনটা ছিল ভীষণ উজ্জ্বল। তাই সামিট ফিভারে আক্রান্ত মরিয়া আরোহীদের ভিড় লেগে গেছিল সংকীর্ণ স্থানটিতে। হঠাৎ শৃঙ্গ থেকে ১১৪৮ ফুট নীচে থাকা একটা বরফের স্তম্ভ(serac) ভেঙে পড়েছিল আরোহীদের ওপরে।

ধসের ধাক্কায়  বটল-নেক পথে আরোহণ করতে থাকা একজন নরওয়ের আরোহী ও দুজন নেপালি শেরপা মুহূর্তের মধ্যে কয়েক হাজার ফুট নীচে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন। হতভম্ভ হয়ে বাকি আরোহীরা হুড়মুড় করে নীচে নামতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু নামবেন কী করে! নীচ থেকে শৃঙ্গের দিকে উঠে আসছেন আরও আরোহী।

প্রথম ধসের কম্পনে আরও ধস নামছিল চারদিক থেকে। প্রাণে বাঁচার জন্য, নামতে থাকা আরোহীরা যে যেদিকে পারেন সেদিক দিয়ে নামবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না কোথায় যাচ্ছেন। তাই অনেক আরোহী হারিয়ে গেছিলেন ভুল দিকে, ভুল রুটে গিয়ে।

উইলকো রুইজেন নামে একজন ডাচ ক্লাইম্বার নামবার পথে দেখেছিলেন একজন কোরিয়ান আরোহীকে। পা ওপরে মাথা নীচে অবস্থায় রোপ থেকে ঝুলছিলেন। একই রোপের দ্বিতীয় আরোহী কোনও মতে বেঁকে একটি পাথর আঁকড়ে  দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু পায়ের তলার বরফ ধীরে ধীরে খসে পড়ছে অনেক নীচে। রোপের তৃতীয় আরোহী, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দুজনকে বাঁচানোর।

রুইজেন তাঁদের তিনজনকে বলেছিলেন, কী করলে তাঁরা বিপদমুক্ত হবেন। কিন্তু তাঁরা শোনেননি। ভুল চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। যা ছিল আত্মহত্যার সামিল।

আরও কিছু আরোহী নীচে দ্রুত নেমে আসছিলেন। তাঁদের নজর ছিল রুইজেনের সঙ্গে থাকা রোপ ও অক্সিজেন সিলিন্ডারের দিকে। বিপদ বুঝে রুইজেন নিজেকে বাঁচাতে দ্রুত নীচে নেমে এসেছিলেন। কে-২ তে তখন প্রাণে বাঁচার মরিয়া যুদ্ধ চলছিল। প্রত্যেকে বিভিন্নভাবে বাঁচার জন্য লড়াই করছিলেন। কে-২ সেদিন কেড়ে নিয়েছিল ১১ টি প্রাণ।

লেনিন পিক

লেনিন পিক ট্র্যাজেডি

১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে এলভিরা সাতিয়েভার নেতৃত্বে, আটজন মহিলার একটি দল লেনিন পিক (৭১৩৪ মি) আরোহণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন পর্বতারোহণে মহিলারাও পুরুষদের সমান ক্ষমতা রাখেন। তাই পুরো অভিযানে একজনও পুরুষের সাহায্য নেননি তাঁরা।

বেসক্যাম্পে থাকা আবহাওয়াবিদরা টিমটিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। আবহাওয়া ক্রমশ খারাপ হয়ে উঠছিল। তা সত্বেও দলটি ৫ আগস্ট ‘লেনিন পিক’ আরোহণ করেছিল। টিমটি সাফল্য পাওয়ার জন্য খুব মরিয়া ছিল।

দলটি যখন  শৃঙ্গে তখন প্রবল ঝড় শুরু হয়। বেসক্যাম্প থেকে রেডিও মেসেজে দলটিকে বলা হয় শৃঙ্গের ওপরেই টেন্ট পেতে ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু লাগাতে গিয়ে ঝড়ের ঝাপটায় সুতি কাপড়ের ছোট্ট ridge tent  উড়ে গেছিল। তুষার বেলচা (snow shovel) দলটির সঙ্গে না থাকায় আরোহীরা বরফে গর্ত করে তার ভেতরে আশ্রয় নিতেও পারেননি।

খোলা আকাশের নীচে, শূন্যের অনেক নীচে থাকা তাপমাত্রায়, একের পর এক দামাল নারী আত্মসমর্পণ করতে থাকেন মৃত্যুর কাছে। যাঁরা সুস্থ ছিলেন তাঁরাও অসুস্থ সাথীকে ছেড়ে যাবেন না বলে ঠিক করেছিলেন। ফলে ইতিহাস সৃষ্টি করা আট নারী একসময় সত্যি সত্যিই বরফে জমে ইতিহাস হয়ে গিয়েছিলেন।

৩১ বছর পর উদ্ধার হয়েছিল এলিনা বাসিকিনার দেহ

যে সমস্ত  কারণে অভিযানের সময় পর্বতারোহীদের মৃত্যু ঘটে

কমতে থাকা বায়ুচাপ, অক্সিজেনের অভাব, প্রচণ্ড ঠান্ডা, কড়া সূর্যালোক ও বাতাসের অসহনীয় গতি মানুষের শরীরে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, শ্বসনতন্ত্র, রক্ত সংবহন তন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও রেচনতন্ত্রের ওপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে।

ফলে কিছু মারাত্মক শারীরিক উপসর্গ দেখা যায়। যেগুলি থেকে অনেক সময় মৃত্যু হয় পর্বতারোহীদের। এছাড়াও পর্বতারোহণকালে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ, অনিচ্ছাকৃত ও নিজের ভুলে ঘটা কিছু দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় অসংখ্য পর্বতারোহীর।

প্রাকৃতিক কারণ

পর্বতারোহণে বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটে তুষারধসের ( Avalanche) কারণে। এছাড়া মৃত্যু ঘটে তুষার ঝড় (Blizzard), পাথর পড়া( rock fall), তুষার-ফাটলের (Crevasse) কবলে পড়ে, তুষার-স্তম্ভ(serac), বরফের কার্নিশ (Cornice) ভেঙে এবং বাজ পড়ে (Lightning)।   

 শারীরিক কারণ

মৃত্যু হয় অবসাদে (Exhaustion), উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় (Altitude sickness), উচ্চতায় হওয়া সেরিব্রাল ইডিমায় (HACE), উচ্চতায় হওয়া পালমোনারি ইডিমা (HAPE), অত্যাধিক ঠান্ডায় শরীরের তাপমাত্রা কমে (Hypothermia), রক্ত ও কলাকোষে অক্সিজেনের অভাবে(Hypoxia), হৃদপিণ্ডের সমস্যায় (Cardiac Insufficiency), দমবন্ধ হয়ে (Suffocation), স্ট্রোকে, নিউমোনিয়ায়, শরীরে অস্বাভাবিক জলাভাবে (Dehydration), রক্ত জমাট বেঁধে (Blood Clots) প্রখর রোদ বরফে ঠিকরে খালি চোখে পড়লে তুষার-অন্ধত্ব (Snow Blindness) দেখা দেয়, এর ফলেও পাহাড় থেকে পড়ে মৃত্যু ঘটে অনেক পর্বতারোহীর।

বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটে তুষারধসের কারণে

অসাবধানতার ফলে ও অনিচ্ছাকৃত ভুলে মৃত্যু

রোপ ছিঁড়ে, ক্রাম্পন (জুতোর তলায় লাগানোর ধাতব কাঁটা যুক্ত ফ্রেম) খুলে পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়া (Fall), ও বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট বিকল ও হারিয়ে যাওয়ার জন্য।

পর্বতারোহীদের নিজস্ব কিছু ত্রুটির কারণে

দৈনন্দিন জীবনের গ্লানি থেকে বেরিয়ে একটু নিজেকে পরিশ্রম ও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে জীবনটাকে একটু উত্তেজনার স্বাদ দেওয়াই অ্যাডভেঞ্চার। স্বেচ্ছায় চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার মধ্যে মেলে এক অবিশ্বাস্য আনন্দ। 

পর্বতারোহণের মূল অভিপ্রায় কিন্তু পৃথিবীর উচ্চতম অংশে পৌঁছে, সেখান থেকে প্রকৃতি মায়ের অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করা। নিজের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, ঝুঁকি বাছার ক্ষমতা, দল হিসাবে কাজ করার মানসিকতা, শৃঙ্খলাপরায়ণতা যাচাই করার একটি আদর্শ জায়গা হল পর্বত।

কিন্তু বর্তমানকালের বেশিরভাগ পর্বতারোহীর একমাত্র লক্ষ্য হল সামিট। একটি পর্বতারোহণ কেরিয়ারে কটি শৃঙ্গ আরোহণ করা গেল, তার মধ্যে কটি আটহাজারি পিক সামিট করা গেল ওই দিকেই নজর বেশি থাকে। তারপর আছে কম সময়ে বেশি শৃঙ্গ আরোহণ করার চেষ্টা। একই অভিযানে একাধিক শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা। এছাড়াও আছে নানাবিধ রেকর্ড গড়ার বাসনা।

এসবের পিছনে সম্ভবত একটাই কারণ আছে। প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রকৃতিকে নয়, মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিপক্ষ পর্বতারোহীরা আরোহণ সংখ্যায় মর্যাদায় এগিয়ে যাচ্ছেন, সেটা হতে দেওয়া যাবে না। সমাজে কৌলিন্যহানির ভূতও তাড়া করে কাউকে কাউকে। ফলে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেন কেউ কেউ। এবং চরম বিপদ ঘটে যায়।

ক্ষমতার বাইরে গেলে পরিণতি হয় মর্মান্তিক

যে যে জায়গায় ভুলগুলি হয়

●  নিজেদের ক্ষমতা না জেনেই কঠিন শৃঙ্গ ও কঠিন রুট নির্বাচন।

● অভিযানের আগে শৃঙ্গটি সম্পর্কে বিশদ পড়াশুনা না করা।

● শৃঙ্গটির ভয়াবহতাকে আন্ডার এস্টিমেট করা।

● নিজের ক্ষমতাকে ওভার এস্টিমেট করা।

● আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া। 

● দ্রুত আরোহণের চেষ্টা।

● বিপজ্জনক জায়গায় রোপ ব্যবহার না করা।

● আরোহণকালে মনোমালিন্য।

 ● জেদের বশে টিমের সিদ্ধান্ত ও টিমমেটদের কথা না শোনা।

● অর্থাভাবের জন্য প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ছাড়া বা খারাপ ইকুইপমেন্ট নিয়ে অভিযানে অংশগ্রহণ করা।

● লাগবে না ভেবে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ও ওষুধপত্র না নেওয়া। 

● উপযুক্ত ট্রেনিং না থাকা।

● আগেই অক্সিজেন ও জল ফুরিয়ে ফেলা।

●  সামিট আরোহণের আশা ত্যাগ করে কখন ফিরতে হবে, সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেরি করে ফেলা।

 ● স্পন্সরকে খুশি করতে ক্ষমতার বাইরে ঝুঁকি নেওয়া।

 ● সফল ভাবে পাহাড় থেকে নেমে আসাকে অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে না রাখা। সামিট ফিভারে আক্রান্ত আরোহীরা আরোহণে সময় পুরো শারীরিক ও মানসিক শক্তি খরচ করে ফেলেন। ফেরার পথে জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তাই পর্বতাভিযানে মৃত্যু বেশি ঘটে পাহাড় থেকে নামতে গিয়েই।

 ● বিপদে পড়া আরোহীকে রেসকিউ করতে গড়িমসি হওয়ার জন্য।

 ● নিজের সক্ষমতার চেয়ে এজেন্সির পরিষেবার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা।

● সামিট ফিভার (শৃঙ্গ আরোহণের উদগ্র ও অস্বাভাবিক বাসনা)।

সামিট ফিভার

লোৎসে থেকে ফেরেননি  কুকোজকা

অনেক কিছু না পেয়েও পর্বতারোহণে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন পোল্যান্ডের পর্বতারোহী জুরেক কুকোজকা। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৭, আটবছরেরও কম সময়ে পৃথিবীর উচ্চতম ১৪ টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন।

যে রুটে তাঁর আগে কোনও অভিযাত্রী আরোহণ করেছেন সেই রুটে কুকোজকা আরোহণ করতে উৎসাহ পেতেন না। তাই, ১৪টি শৃঙ্গের মধ্যে ১১টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন নতুন রুটে। তিনিই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সর্বোচ্চ ১১ টি নতুন রুট আবিষ্কার করেছিলেন।

পৃথিবীর উচ্চতম ১৪ টি শৃঙ্গের মধ্যে আবার ৭ টি শৃঙ্গ আরোহণ করেন একা একাই। এবং তিনটে শৃঙ্গ আরোহণ করেন শীতকালে। এভারেস্ট বাদ দিয়ে বাকি ১৩টি শৃঙ্গ আরোহণের সময় বোতলের অক্সিজেন ব্যাবহার করেননি। ভাবুন, সে সময়ে অক্সিজেনবিহীন আরোহণের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারতেন না। তাই ইতিহাস আজও কুর্নিশ জানায় কুকোজকাকে।

লোৎসের সাউথ ফেস

২৪ অক্টোবর ১৯৮৯, পৃথিবীর চতুর্থ উচ্চতম শৃঙ্গ লোৎসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাউথ ফেস রুট দিয়ে শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা করছিলেন কুকোজকা। দিনটা খুবই ভালো কাটছিল। সঙ্গী পাওলোস্কিকে নিয়ে বেশ দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছিলেন শিখরের দিকে।

চূড়ার ঠিক ৩০০ মিটার নিচে (৮২০০ মি) তিনি ৬ মিমি রোপ ফিক্সড করার চেষ্টা করছিলেন। সঙ্গী পাওলোস্কি একটু নীচে দাঁড়িয়ে। দুজনের মধ্যে কোনও রোপের সংযোগ নেই। অর্থাভাবে বেশি রোপও আনতে পারেননি কুকোজকা। কাঠমান্ডুর দোকান থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড ক্লাইম্বিং রোপ কিনেছিলেন।

এই রোপটা লাগাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কুকোজকা। রোপটা লাগাতে পারলেই শৃঙ্গ আরোহণ নিশ্চিত। হঠাৎ ঘটে গেছিল সেই মর্মান্তিক ঘটনা। ঝুলে থাকা অবস্থায় শরীরের ভারে পাথরে ঘষা লেগে ছিঁড়ে গেছিল সেকেন্ড হ্যান্ড রোপ। সঙ্গী পাওলোস্কি চিৎকার করে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিল না।

লোৎসের অভিশপ্ত সাউথ ফেস দিয়ে তীব্র গতিতে নীচের দিকে গড়াতে থাকেন কুকোজকা। অজস্র পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে চলে যান কয়েক হাজার মিটার গভীর খাদের অতলে। কুকোজকার দেহ আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী জুরেক কুকোজকা

সাসের কাংরি শৃঙ্গ অভিযানে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেলেন পেমবা শেরপা

আট বার এভারেস্ট, এক বার কাঞ্চনজঙ্ঘা, এক বার অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ আরোহণ করা পেমবা শেরপা। যিনি না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের বহু পর্বতারোহীর ৮০০০ মিটার শৃঙ্গে পা রাখার স্বপ্ন আক্ষরিক অর্থেই স্বপ্ন হয়ে থাকত। তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন কারাকোরাম রেঞ্জের ৭৪১৫ মিটার উঁচু সাসের কাংরি শৃঙ্গ অভিযানে গিয়ে।

সাফল্যের সঙ্গে সাসের কাংরি শৃঙ্গ ছুঁয়ে ক্যাম্প-৩, সেখানে রাত কাটিয়ে পরের দিন সরাসরি ক্যাম্প-১ এ দল নিয়ে নেমে আসছিলেন পেমবা শেরপা। ক্যাম্প-১ নামবার আগে টিমটি পেরিয়ে আসছিল আপাত দৃষ্টিতে নির্বিষ ও হাল্কা ঢালের এক হিমবাহ। বরফ-পথ শেষ হতে বাকি ছিল আর বড় জোর ৫০০ মিটার পথ। দূরে দেখা যাচ্ছিল ক্যাম্প-১।

দলটির একেবারে সামনে ছিলেন পেমবা। দলের অভিজ্ঞতম এই পর্বতারোহীর ঘাড়েই ছিল রোপ ও অনান্য ইকুইপমেন্টের ভার। হঠাৎ নির্বিষ হিমবাহ তার স্বরূপ প্রকাশ করেছিল। অভিজ্ঞ পেমবা শেরপা বুঝতেই পারেননি পায়ের তলায় অপেক্ষা করছিল মৃত্যু। গভীর ও সংকীর্ণ এক ক্রিভাসে হুড়মুড়িয়ে নেমে গিয়েছিল পেমবা শেরপার ভারী শরীরটা। মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে গেছিলেন গভীর থেকে আরও গভীরে।

এই ক্রিভাসেই পড়ে গেছিলেন পেমবা শেরপা

পেমবার ভাইপো পেমবা শিরিং এবং পেমবার নিজের দাদা পাসাং শেরপাও ছিলেন দলটিতে। তাঁরা দুজন ও বাকি শেরপারা সঙ্গে সঙ্গে ক্রিভাসে  নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে কারও কাছে রোপ ছিল না। কারণ সেগুলো সঙ্গে নিয়েই ক্রিভাসে তলিয়ে গেছিলেন পেমবা শেরপা।

প্রায় খালি হাতেই তুখোড় দক্ষতা ও গভীর অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রায় ২০-২৫ ফুট গভীর পর্যন্ত নামেন শেরপারা। নাম ধরে ডাকেন। কোনও সাড়া পর্যন্ত মেলেনি, খুঁজে পাওয়া দূরের কথা।

ক্যাম্প ওয়ানে নেমে এসে, রোপ ও সরঞ্জাম নিয়ে ফের যাওয়া হয় দুর্ঘটনাস্থলে। আরও নীচে নেমে খোঁজা হয় পেমবা শেরপাকে। কিন্তু ক্রিভাসের নীচে এতই অন্ধকার এবং গহ্বর এতই সঙ্কীর্ণ, একটা সময়ের পরে হাল ছেড়ে দিতেই হয়। খবর দেওয়া হয় নীচে, বেস ক্যাম্পে। ততক্ষণে  ক্রিভাসের নীচে অজানা মৃত্যুশীতল বিছানায় শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন বাংলার অন্যতম সেরা এই পর্বতারোহী।

পেমবা শেরপা

অভিযানের সময় বয়স্ক পর্বতারোহীদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে

বিগত দুই দশকে বয়স্ক পর্বতারোহীদের সংখ্যা সারা বিশ্বেই বৃদ্ধি পেয়েছে। দু’দশক আগেও মাত্র ২০% পর্বতারোহীর বয়স ছিল ৪০ বছরের ওপর। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রায় ৫০% পর্বতারোহীর বয়স কমপক্ষে ৪০। এভারেস্ট আরোহণের সময় হিলারির বয়েস ছিল ৩৩ এবং তেনজিং-এর ৩৯। কিন্তু এখন  প্রতি ৩০ জন আরোহীর মধ্যে এক জনের বয়স ৬০ বছরের বেশি।

জাপানের ইউইচিরো মিউরা ২০১৩ সালের ২৩ মে এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণ করেন। শীর্ষে আরোহণ করার সময় তাঁর বয়েস ছিল ৮০ বছর ২২৪ দিন। স্পেনের কার্লোস সরিয়া ফনটান ২০০৪ সালে ৬৪ বছর বয়েসে আরোহণ করেন বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম ও অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ কে-২। এই ফনটানই কাঞ্চনজঙ্ঘা আরোহণ করেন ৭৫ বছর বয়েসে।

আজও পাহাড় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জাপানের তামায় ওয়াতানাবে (৮০), কাটসুসুকে ইয়ানাগিসাওয়া (৮১), তোমিয়াসু ইসিকাওয়া (৮২), স্পেনের  সরিয়া ফনটান (৮০), আমেরিকার বিল বারকে (৭৭), শেরমান বুল (৭৫) ও আরও কত পর্বতারোহী। বয়েসকে হেলায় হারিয়ে। কিন্তু এঁরা ব্যাতিক্রম।

পর্বতারোহণের সঙ্গে বয়েসের সম্পর্ক মোটেই মধুর নয়। দেখা গেছে ৫০ বছরের একজন পর্বতারোহীর মৃত্যুর সম্ভাবনা একজন তরুণ পর্বতারোহীর চেয়ে তিনগুণ বেশি। সামিট করে ফিরে আসার পথে নবীনদের মৃত্যুর হার যেখানে ২.২% সেখানে এঁদের মৃত্যু হার ২৫%।

গবেষকরা বলে থাকেন, বয়স্ক পর্বতারোহীরা আরোহণের সময় একটু বেশিমাত্রায় সতর্ক থাকেন। এই অতিরিক্ত সতর্কতা, কমে যাওয়া ফিটনেস সাফল্যের হার কমিয়ে দেয়। বাড়িয়ে দেয় মৃত্যুর ঝুঁকি। কিন্তু তবুও বয়স্ক পর্বতারোহীরা কিছুতেই মানতে চান না, বয়স পর্বতে সাফল্য ও মৃত্যুর সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলে।

পর্বতারোহণের প্রেক্ষাপটে, মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে ফেরার প্রতিযোগিতায়, যৌবনের তেজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়েস ও অভিজ্ঞতাকে হারিয়ে দেয়, এমনটাই গবেষকদের মত।

বয়স্কতম এভারেস্টার ইউইচিরো মিউরা

আরোহীদের অবহেলায় এভারেস্টের বরফে জমে গিয়েছিলেন  ডেভিড শার্প

২০০৬ সালের মে মাসে তৃতীয়বার আরোহণের জন্য এভারেস্টে ফিরে আসেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পর্বতারোহী ডেভিড শার্প। মে মাসের ১৩ তারিখে এভারেস্টের উত্তর দিক দিয়ে সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছাড়া একক আরোহণ শুরু করেন।

পরের দিন, ১৪ মে, বিভিন্ন দলের আরোহীরা রিপোর্ট করেছিলেন, একজন  অভিযাত্রীকে এভারেস্টের ডেথ জোনের বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। কেউ জানেন না তিনি ১৪ তারিখে সামিট করেছেন কিনা। তবে সম্ভবত তিনি নীচে নামতে চাইছিলেন।

১৫ তারিখ ভোর একটার সময় একদল আরোহী ৮৫০০ মিটার (২৭৯০০ ফুট) উঁচুতে থাকা চুনাপাথরের বিখ্যাত গুহার কাছে পৌঁছান। গুহার ভিতর বাম পাশ ফিরে ঘুমিয়েছিলেন এক পর্বতারোহী। পায়ে জ্বলজ্বল করছিল ফ্লুরোসেন্ট রঙের দু’টি সবুজ ক্লাইম্বিং বুট।

শুয়ে আছেন ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশের জওয়ান তেসোয়াং পালজোর। শুয়ে আছেন কয়েক দশক ধরে। সারা বিশ্ব যে মৃতদেহটিকে চেনে গ্রিন বুট নামে। গুহাটির নামই হয়ে গেছে গ্রিন বুট কেভ

গ্রিন বুট

কেভের ভেতরে আলো ফেলেই স্তম্ভিত হয়ে যান আরোহীরা। গুহার ভেতর, গ্রিনবুটের দেহের পাশে আরেকজন পা মুড়ে বসে আছেন। হাঁটুর ওপর দুই হাত। মাথা ঝুঁকে পড়েছে। বরফে ঢেকে গেছে পুরো শরীর।

আরোহীরা ডেভিড শার্পকে চিনতে পারেননি। ডেকে সাড়া না পেয়ে তাঁরা শৃঙ্গের পথে উঠে যান। কুড়ি মিনিট পরে আবার একদল আরোহী উঠে আসেন। তাঁদের ডাকে ডেভিড শার্প নাকি সাড়া দেন। হাত নেড়ে নাকি এগিয়ে যেতেও বলেন।

এর কিছু পরে ৩৬ জন সদস্য নিয়ে উঠে আসে বিখ্যাত পর্বতারোহী রাসেল ব্রাইসের এক্সপিডিশন টিম। ডিসকভারি চ্যানেলের জন্য পুরো অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের শুটিং করতে করতে। তাঁরা অজস্র হেড ল্যাম্পের আলোয় গ্রিনবুটের কেভের দৃশ্য তুলেছিলেন। তুলেছিলেন মরতে থাকা ডেভিড শার্পের ছবি।

তারপর তাঁকে মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দিয়ে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে টিমটি চলে গেছিল শৃঙ্গের দিকে। শৃঙ্গ আরোহণ করে ফেরার সময় লেবাননের পর্বতারোহী ম্যাক্সিম ছায়া ও তাঁর টিম ডেভিড শার্পকে দেখতে পান। টিম নামার পথে এগিয়ে গেলেও ম্যাক্সিম ছায়া রয়ে যান শার্পের পাশে।

শার্পের মুখ ততক্ষণে কালো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও প্রাণ ছিল। নামতে থাকা সবাইকে ম্যাক্সিম কাতর অনুরোধ করেছিলেন। ডেভিড শার্পকে নিচে নামাতে তাঁকে সাহায্য করার জন্য। সাহায্য চেয়ে বার বার রেডিও মেসেজ পাঠিয়েছিলেন নীচের ক্যাম্পগুলিতে।

একসময় ম্যাক্সিমকে নীচে নেমে আসতে বলে তাঁর টিম। নিজের অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছিল। অবশেষে হাল ছেড়ে ফেরার পথ ধরেন ম্যাক্সিম একরাশ অপরাধবোধ নিয়ে। যা সেদিনে এভারেস্টে থাকা বাকি ৪৬ জন আরোহীর মধ্যে দেখা যায়নি। সেই রাতেই চলে গিয়েছিলেন ডেভিড শার্প। ফেরার সময় সে দৃশ্যের শুটিংও করেছিল ডিসকভারি চ্যানেলের ভাড়া নেওয়া পেশাদার পর্বতারোহীরা।

মৃত্যুর প্রতীক্ষায় বসে আছেন ডেভিড শার্প

স্যার এডমন্ড হিলারি এভাবে ডেভিড শার্পকে মৃত্যুর মুখে ফেলে মাউন্টেনিয়ারদের পালিয়ে আসার মনোভাবে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, “এখন কেবল চূড়ায় ওঠার হ্যাংলামি। কাউকে মৃত্যুর জন্য ফেলে রেখে শৃঙ্গে উঠব, আমার অভিযানগুলির সময় একথা ভাবতেই পারিনি।”

সত্যিই ভাবতেই অবাক লাগে, International Climbing and Mountaineering Federation পর্বতারোহীদের code of ethics-এ বলছে “helping someone in trouble has absolute priority over reaching goals we set for ourselves in the mountain”। তবুও মরতে হয়  ডেভিড শার্প থেকে শুরু করে বাংলার সুভাষ পাল, গৌতম ঘোষ, পরেশ পাল, কুন্তল কাঁড়ারদের।

পর্বতারোহণে মৃত্যু কি বন্ধ করা যাবে?

পর্বতাভিযানে মৃত্যু নিয়ে অনেকে বিচলিত হন, পর্বতারোহণ নিয়ে মাতামাতিতে অনেকে বিরক্ত হন। পর্বতারোহণ বিষয়টির সঙ্গে জড়িত নন এমন বহু মানুষ অনেকে পর্বতারোহণ বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন। না, কোনও মতেই পর্বতারোহণে মৃত্যু বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে কমানো যেতে পারে।

পর্বতাভিযান চলবেই

কিন্তু পর্বতারোহণে কিছু মানুষের মৃত্যু হয় বলে পর্বতারোহণের মত ঐতিহাসিক একটি খেলা বন্ধ করা অসম্ভব। পর্বতারোহণে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে বলেই পর্বতারোহণ এত আকর্ষণীয়। সব অ্যাডভেঞ্চারের সেরা অ্যাডভেঞ্চার।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সব দেশের সব বুনিয়াদী শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ব্র্যাডম্যান-গাভাস্কার, পেলে-মারাদানা থাকতেও পারেন, আবার নাও থাকতে পারেন। কিন্তু তেনজিং ও হিলারি থাকবেনই। পর্বতারোহণের উচ্চতা এতটাই।

সূত্র: https://faculty.washington.edu, https://www.researchgate.net,   https://www.himalayandatabase.com,  https://marvelmountain.com , www.alanarnette.com , ,https://www.sciencedaily.com,  www.mounteverest.net