এখানে নদীর ধারে ধারে অনেক হাট বসে। উত্তরে দামোদর, দক্ষিণে শালী নদী। একটু পশ্চিমে দ্বারকেশ্বর, কংসাবতী। খরার জেলা হলেও নদী–নালা কম নেই। নদীর কোলে কোলে যেমন অনেক জনপদ তেমনই হাট-বাজারও গুনতিতে কম নয়। উচ্ছে-বেগুন-পটল থেকে শুরু করে মাটির হাঁড়িকুড়ি, বেতের ঝুড়ি-কুলো, সস্তার জামা-কাপড়, জুতো সবই পাওয়া যায়। প্রধানত সাপ্তাহিক হাট। নদীর যে পাড়ে বসে, শুধু যে সে পাড়ের মানুষরাই ভিড় জমায় তেমনটা নয় কিন্তু। দুই পাড় থেকেই খদ্দের আসে। আসে হাটুরেরা।

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

রাঙামাটির হাটে আসতে গেলে যেমন ওপারের মানুষকে ছিলামপুরের খেয়াঘাটে নৌকায় উঠতে হয় তেমনই চাকতেঁতুলের হাটে যেতে গেলেও এপারের মানুষের ভরসা রণডিহার ঘাট। দামোদর শুখা নদ। মাইথনের ড্যাম থেকে জল এসে দুর্গাপুরের ব্রিজের পাশ হয়ে বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে চলে যায় দূরদূরান্তের মাঠে। তাই খরা মাটিতেও কোথাও কোথাও দু’বার সোনা ফলে। আর ব্রিজ থেকে ওপরে ছলকে পড়া জল সরু লিকলিকে একফালি স্রোত হয়ে বালি কেটে কেটে পথ করে নেয়। শুধু বর্ষায় দামোদর জলে ভরপুর।

খেয়াঘাটগুলোর কাছে নদীর দহ পড়ে পড়ে অনেক গভীরতার সৃষ্টি হয়েছে। হাটের দিনগুলোয় সকাল থেকেই ঘাটের মাঝিদের দম ফেলার জো নেই। হাটুরেদের বিভিন্নরকম পশরায় ঠাসাঠাসি। কেউ হাঁস-মুরগি-ছাগল বিক্রি করতে নিয়ে যাবে। কেউ বা যাবে খেতের আনাজপাতি, আলু-পেঁয়াজ-আদা-রসুন নিয়ে। আর যারা খালি হাতে থলে নিয়ে কিনতে আসে তাদের কিন্তু বর্ষাকাল ছাড়া খেয়ায় পয়সা খরচ করতে হয় না। নদীর যেখানে আধহাঁটু জল সেখানে কাপড়, প্যান্ট গুটিয়ে হপর হপর করে পেরিয়ে যায় জুতোজোড়া হাতে নিয়ে। তারপর তপ্ত বালির ওপর হেঁটে হেঁটে মরুভূমি পাড়ি দেওয়া। এত দীর্ঘ আর চওড়া নদীটির দিনকে দিন যা দশা, মরুভূমি নয়তো কী!

শিবদাসকে নৌকাতে উঠতে হয় না আবার মরুভূমি পাড়ি দিতেও হয় না। ওর বাড়ি এপারেই। সাইকেলে থলে-টলে ঝুলিয়ে এপারের হাটগুলোতে যায়। একশো দশ কোটির দেশে পড়াশোনা করে সবাই যদি ডাক্তার, মাস্টার, উকিল, ব্যারিস্টার হবে তাহলে বাকি কাজকর্ম কারা করবে! বছর দুই কর্মখালির বিজ্ঞাপন বেরোনো কাগজগুলো কিনে কিনে ঘরের একটা কোণ চুড়ো করে দিল শিবদাস। একদিন বাবা রেগে বলল, ‘অনেক হয়েছে শিবে, আর লয়। কিছু একটা ব্যবসা কর দিনি।’

সপ্তাহের ছয়টা দিন শিবদাস নদীপাড়ের হাটগুলোয় প্রথমে বই বিক্রি করত। ঠাকুর-দেবতার পাঁচালি, ছোটদের নানারকম গল্প, শায়েরি, গান, ধাঁধা, হস্তপরীক্ষা, বিভিন্ন স্বল্প মূল্যের চটি বই। কিছুদিন ভালোই বিক্রি-বাট্টা চলল। মাস ছয়েক ধুঁকিয়ে ধুঁকিয়ে চলার পর কেউ বই ছুঁয়েও দেখত না তেমন।

বাবা দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিল, ‘তোর ছোট ভাই লোকের মুনিষ খেটে এত টাকা রোজকার করে আনছে, আর তুই ধেড়ে মরদ হয়ে কী করছিস শুনি! কোথাও যে বিয়ে-শাদিও লাগানো যাবেক নাই রে!’

আরও কিছু টাকা নিয়ে শিবদাস তখন ষ্টিলের ব্যবসাটায় নামল। হেঁশেলের থালাবাসন, বাটি-গ্লাস থেকে শুরু করে সবরকম নিত্যপ্রয়োজনীয় আইটেম। তাতে খাওয়াপরা চলে কোনওরকমে।

তবে আজকাল আর ব্যবসায় তেমন উন্নতি করতে পারছে না শিবদাস। কেননা সবখানেই বেঁচে থাকার যুদ্ধ। একইরকম আইটেম নিয়ে চারজন-পাঁচজন ব্যবসাদারের রেষারেষি। শুধু তো বাঙালি নয়। বিহার থেকে দলে দলে এসে আশপাশের শহরগুলোতে ঘাঁটি গাড়ছে। কেউ বা দেশ-গাঁয়ের পাট চুকিয়ে দিয়ে বউ–ছেলে নিয়ে বাসা বাঁধছে। তাদের কাজ কী? না সকাল হলেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্যবসায় বেরিয়ে পড়ে।

শিবদাস আজ খুব সকাল সকাল হাটে এল। বিস্তর গরম পড়েছে। তাই হাটও ভেঙে যাচ্ছে বারোটার মধ্যেই। রোদে রোদে বোঝ-সাইকেল চালিয়ে এতদূরের পথ পাড়ি দেওয়া খুব কষ্টের।

হিরাগঞ্জের হাটটি বসে পঞ্চায়েত অফিসের পেছনে বিশাল মাঠে। অনেকটা এলাকা জুড়ে হাট। অফিসের দেওয়াল ঘেঁষে জামাকাপড়, জুতো, মনিহারি সামগ্রীর দোকান। দোকান বলতে তিরপল টাঙিয়ে বস্তার চটের ওপরে জিনিস পেতে বিক্রি। মাঠের ধারে ধারে পুরাতন বট-শিরীষ-নিমগাছের ছায়ায় সবজি, ফলমুলের বাজার।

শিবদাস হেঁট হয়ে থলে থেকে একে একে জিনিস বের করে সাজাচ্ছে। হঠাৎ দেখল পাশেই লাল্টুদার জায়গাটায় দুটো মেয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগগুলো নামিয়ে হাঁফ ছেড়ে দাঁড়াল। একজন বেশ মোটাসোটা বয়স্ক। অন্যটা ছিপছিপে মাগুরে রঙের, অবিবাহিত। পোশাক পরিচ্ছদ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভিন্ন রাজ্যের। ওরা মা-বেটি হবে বোধহয়। দু’জনের পায়েই মল। হাতে- পায়ে-গলায় সর্বত্রই গহনা।

শিবদাস বলল, ‘এখানে একজন জুতো নিয়ে বসে। অন্য জায়গা দ্যাখো।’

শিবদাসের কথাটা শুনেও ওরা না শোনার ভান করল। জায়গাটায় লাল্টু নামের একজন ব্যবসাদার জুতো বিক্রি করে। কিছুদিন আগেই বিয়ে করেছে। বেশ কয়েক হাট আসেনি।

পঞ্চায়েত অফিসের দেওয়ালের ধারেই শিবদাসের বসার জায়গা। সামনে খদ্দের পেরোনোর সরু রাস্তা ছাড়া থাকে। ওধারে নিমাইচাঁদ নামে একজন বয়স্ক লোক কাপড়ের দোকান দেয় এদিকে মুখ করে। শিবদাস বলল, ‘নিমাই কাকা, এরা যে কথা কানে লেয় না গো। লাল্টুদা আজ যদি চলে আসে, তখন তো উঠতে হবেক!’  

‘তুই নিজের মাল পাত তো। কে আসবেক, না আসবেক বুঝে করুক গো!’ পাশ ফিরে দড়িতে জামা-প্যান্ট ঝোলাতে ঝোলাতে নিমাইচাঁদ এবার বলল, ‘লাল্টু এখন আসবেক সেটা তুই ভাবলি কী করে? এখনও তো বিয়ে করলি নাই, তাইলে মর্ম কী আর বুঝবি!

নিমাইচাঁদ কথায় কথায় বিয়ে না করার জন্য শিবদাসকে খোঁচা দেয়। বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘদিন ধরে হাটে হাটে ব্যবসা করছে। রোদে গরমে পরিশ্রম করে ছেলেটাকে মেডিকেলে পড়াচ্ছে।

শিবদাস কথাটা হাসির ছলেই নিল। বলল, ‘কেউ করে, কারও হয়। সবই বরাত কাকা।’

নিমাইচাঁদ পাশে বসা মেয়েটাকে দেখিয়ে চোখ ইশারা করল। ‘দ্যাখ রে শিবে, যদি লেগে যায়।’

শিবদাস টের পেল মেয়েটা তার দিকে তাকাচ্ছে। নিমাইকাকার সঙ্গে বলা কথাগুলো বুঝতে পেরেছে কী! শিবদাস আড়চোখে দেখল। এবার হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমলোক কাঁহাসে আ রাহা হ্যায়?’

বয়স্ক মেয়েটা জবাব দিল, ‘হামরা রাজস্থানি আছি বাবু।’

ওরা মাথার ওপর তিরপল টাঙায়নি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করে। এখানে হাটের সন্ধান পেয়ে বসে পড়েছে। বস্তার চট বিছিয়ে পেতেছে ছোট ছোট প্লেটে লাল-নীল-সবুজ পাথর বসানো আঙটি। বিভিন্নরকম পাহাড়ি গাছগাছড়ার শেকড়বাকড়, মাদুলি। একটা বাক্সে কতকগুলো গোল গোল লোমযুক্ত কী যেন! খুব সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছে জিনিসটি। একই জিনিস তালের মতো সাইজের দু’ধারে দুটো সিঁদুর লেপে নামিয়ে রেখেছে। এমন জিনিস শিবদাস কখনও দেখেনি। কী ওগুলো! কৌতূহল নিয়ে জানতে চায় সে। বয়স্কজন জবাব দেয়, ‘ইয়ে হিরণকা কস্তুরী আছে বাবু। মৃগনাভি। কাছে রাখেগা তো সব বালা মসিবত দূর হো যায়েগা।’

শিবদাস মৃগনাভি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত, কোনওদিন স্বচক্ষে দেখেনি। অনেক জায়গায় পড়েছে বা শুনেছে, আগেকার রাজারা নাকি সুগন্ধি হিসাবে ব্যবহার করতেন। এত সুগন্ধ আর বলবর্ধক যে পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়েও খেতেন। রাজা যখন সেই পান খেয়ে পিক ফেলতেন, সেই পিকটা নেওয়ার জন্যও অনেকে অপেক্ষা করে থাকত। সেই মহামূল্যবান জিনিস আজ হিরাগঞ্জের হাটে!

নিমাইচাঁদ বলল, ‘একটা নিবি তো নে রে শিবে, গলায় ঝোলা। বরাত ভালো থাকলে তুর উন্নতি আর দেখে কে!’

শিবদাস জবাব দিল, ‘আমার লাগবেক নাই কাকা, যদি তুমার দরকার, ঝোলাতে পারো।’

যারা দীর্ঘদিন ব্যবসা করছে তাদের পারমানেন্ট বসার জায়গা আছে। যে কেউ বসে যেতে পারে না। ফাঁকা পেয়ে বসলেও পরে ছেড়ে দিতে হয়। ব্যবসাদার বেশি কামাই করলে তখন অনেকে জায়গা ছাড়তে চায় না। ঝামেলা করে।

বেলা যত বাড়তে থাকে, মানুষজনের ভিড়ও বাড়ে। সবাই হাটে এসে প্রথমে শাকসবজির বাজারে ঢুকে পড়ে। যাবার সময় ঘুরেফিরে অন্য জিনিস কেনে। ওই গোল গোল দেখতে জিনিসগুলির প্রতিই সবার কৌতূহল। অনেকেই যেতে যেতে থমকে দাঁড়াচ্ছে।

বয়স্ক মেয়েটিই কথা বলছে বেশি। পাশের মেয়েটি চুপচাপ বসে আছে। শিবদাস আড়চোখে তাকাল। সাজের বাহার খুব। মেয়েটিও বুঝে ফেলল শিবদাস তাকে দেখছে। লজ্জা পাচ্ছে খুব। টিকালো রোদের মধ্যে বসে বসে পুড়ছে। খুব মায়া হল শিবদাসের। থলের ভেতর থেকে ছাতাটা বের করল। মেয়েটিকে দেবে কি? যদি না নেয়!

ছাতাটা একবার ফোটাল শিবদাস। ফুটোগুলো দেখেই বন্ধ করে রেখে দিল। ফেরার পথে এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে ছাতা ফুটিয়ে বাড়ি ফেরে সে। অনেক পুরনো ছাতা। এটাতেই গ্রীষ্মকালটা কাটিয়ে বর্ষায় নতুন নেবে বলে এখনও কেনেনি। ফুটো দিয়ে রোদ গলে যায়। মাথার ওপর টাঙানো তিরপলের অবস্থাও একই।

নিমাইচাঁদ ফিক ফিক করে হাসল। ‘কী রে শিবে, দিতে পারলি নাই?’

শিবদাসও লাজুক হাসি দিল। খদ্দের ছাড়তে ছাড়তে সারাদিনই ওর পেছনে লেগে থাকে নিমাইচাঁদ। আজ বাড়তি একটা বিষয় পেয়ে গেছে।

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজনকে হাতটা বাড়াতে বলল বয়স্ক মেয়েটি। লোকটির হাতে একটি মৃগনাভি দিয়ে মুঠো বন্ধ করাল। এবার মুঠো হাতটির তলদেশ দিয়ে অন্য একজনের হাতে ঘষতে বলা হয়। কী আশ্চর্য! ওর হাতেও সুগন্ধ উঠছে। কী ব্যাপার দেখার জন্য অনেকেই ভিড় জমাচ্ছে। কেউ কেউ নিজেই পরীক্ষা করে দেখছে। আর তত বাড়ছে বিক্রিবাট্টা। দুশো-তিনশো টাকা পিস। যেটার যেমন সাইজ সেটার তেমন দাম। যারা এর গুণাগুণ জানে তারা তো লুফে নিচ্ছে।

বয়স্ক মেয়েটি মাঝে মাঝেই চেঁচিয়ে বলে উঠছে, ‘কস্তুরী আছে বাবু। দুনিয়া কা সবচেয়ে মিঠা খুশবু। দেখ যা সব। উপরওয়ালাকা কেয়া খেল। দেখনেকে লিয়ে পয়সা নাহি লাগে গা।’

জড়ো হওয়া মানুষগুলো মৃগনাভি সম্বন্ধে বিভিন্নজন বিভিন্নরকম কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। একজন বলল, মোগল রাজা শেরশাহের কাছে যুদ্ধে পরাজয় হলে হুমায়ুন নাকি আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে ঘুরতে যখন অমরকোটে ওঠেন, সেখানেই আকবরের জন্ম হয়। পুত্রসন্তান জন্ম হওয়ার আনন্দে হুমায়ুন সেনাবাহিনীর হাতে তার সর্বশেষ সম্বল একটি মৃগনাভি তুলে দিয়ে বলেন, একদিন আমার ছেলের নাম যেন এই মৃগনাভির সুগন্ধের মতোই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্য একজন চ্যাংড়া ছেলে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘কিন্তু চাচা, এটা কি আসল জিনিস বটে? তার তো অনেক দাম গো! ক্যামিকেল না কী সব বটে, দ্যাখো গা কস্তুরীর পারফিউম দিয়ে স্প্রে করে নিয়ে চলে এসেছে।’

‘এই জগতে আসল জিনিস কোনটা আছে বলদিনি ভাইপো! সবই তো ক্যামিকেল, ক্যামিকেলির যুগ। কম দামে দিচ্ছে, দুধের স্বাদ ঘোলেই মেটা।’

একটু বেলা হতেই শিবদাস বাড়ি থেকে আনা টিফিন বক্সের কৌটো খুলে খাবার খেতে বসল। রুটি–আলুভাজা, কোনওদিন মুড়ি ভরে দেয় মা। বোতলে জল। এক-দুই দিন সকাল সকাল মা উঠতে পারে না। সেদিন হাটে কিছু কিনে খেয়ে নেয়।

প্রথম প্রথম যখন ব্যবসা শুরু করেছিল শিবদাস, তখন এত লোকজনের মাঝে বসে খাবার খেতে লজ্জা পেত খুব। সবাই সামনে দিয়ে ধুলো উড়িয়ে জুতো পরে মশমশ হেঁটে যাবে, ওর দিকে নাক সিঁটকে তাকাবে, সেটা ভাবতেই গলা দিয়ে খাবার নামত না। তাই ও দোকান থেকে সরে গিয়ে অন্য জায়গায় খেয়ে আসত। তাতে খুব অসুবিধায় পড়তে হচ্ছিল। খদ্দের এলে ঘুরে যেত। ব্যাপারটা টের পেয়ে লাল্টুদা একদিন বলল, ‘দ্যাখ ভাই, আমাদের শুয়োর-কুকুরের মতো জীবন। ভি আই পি-র মতো কারবার করলে চলবেকনি। পশুর মতোই থাকতে হবেক। খেয়াল করে দেখবি, যখন বসে খাবার খাবি তখনও কতজন সামনেই কফ, থুতু ফেলে পেরিয়ে যায়। মানুষ বলে ভাবে কি? নীচে যে একটা মানুষ বসে খাচ্ছে সেটা চোখ থাকতেও চেয়ে দ্যাখে না।’

নিমাইকাকা বলেছিল, ‘তুদের মতো ছেলেদের এই জীবন লয় রে বাপ। তার থেকে লোকের মুনিষ খেটে খা গা, তাতেও সম্মান আছে।

ভালো না লাগলেও কী আর করার আছে! শিবদাস ধীরে ধীরে সবই মানিয়ে নিয়েছে। এখন নীচে বসেই খাবার খেতে পারে। খেতে খেতেও খদ্দের ছাড়ে। এক-দুই সময় ভিড়, গ্যাঞ্জাম, হইহট্টগোল দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠে মন। তার রেশ খদ্দেরের ওপরে গিয়ে পড়ে।

‘কী রে বিটিয়া, ভুখ লাগা কিয়া?’ ব্যাগ থেকে টাকা বের করে মেয়েটার হাতে দিল বয়স্কজন। মেয়েটি উঠে গিয়ে বুড়ির দোকান থেকে চপ কিনে আনল। হাটে বেশ কয়েকটি চা, চপের দোকান আছে। তবে সব থেকে বেশি ভিড় বুড়ির চা আর চপের দোকানে। এর কারণটা উদ্ধার করেছে লাল্টুদা।

একদিন বলেছিল, ‘বুড়ির দোকানে এত ভিড় কেনে বলদিনি?’

‘কেন? কেন?’ বেশ উৎসুক হয়ে শিবদাস জানতে চায়।

‘এমনি কী সব ছুটে যায় রে পাগলা! বুড়ির ছেলের বউ যদি না বসে দোকানে, তাইলে দেখবি একদম ফাঁকা!’

ওদের খাওয়া দেখে শিবদাস অবাক হয়। এখানে সবাই চপ খেলেও মুড়ি দিয়ে মেখে খায়। ওরা বসে বসে শুধুই দশ-বারোটা চপ নিমেষে খেয়ে নিল। এত রোদ-গরম! এখন চপ খেলে পেটখারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শিবদাস গরমে কুলকুল করে ঘামতে থাকে। গায়ের জামা থেকে ঘেমো গন্ধ বেরোয়।

শিবদাস জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, পলাশডাঙার স্কুলের মাঠে তাঁবু ফেলে রয়েছে ওরা। ওদের সঙ্গে এসেছে মেয়েটির বাবা। আরও বেশ কয়েকজনের একটি দল। গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন ধান্দায় ঘুরছে সবাই। কেউ বা ব্যবসা করে, কেউ বা জাদু খেলা দেখায়। বছরের কয়েকটা মাস বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়ে বর্ষা পড়লেই সবাই ফিরে যাবে।

একটু পর তলাওয়ালা বুধন ঘোষ হাটে বসার চাঁদা নিতে এল। যে গ্রামে হাট বসে তাদের একটা কমিটি থাকে। বছরের শেষের দিন ডাক হয় জায়গাটার। যে বেশি টাকা দিতে পারে তাকেই দেওয়া হয়। সেই তলাওয়ালা ব্যবসাদারদের কাছ থেকে বসার দরুন এবং সাইকেল, মোটরসাইকেলের স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা আদায় করে লাভসমেত টাকা তুলে নেয়।

শিবদাস আবার মেয়েটার দিকে তাকাল। এবার কিন্তু চোখ নামিয়ে নিল না। মেয়েটাও ওর দিকে তাকাল কেমন মায়াবী চোখে। শিবদাস বেশিক্ষণ চোখে চোখ রাখতে পারল না। ওই চোখদুটি কী যেন বলতে চাইছে। শিবদাস চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করে।

পঞ্চায়েত অফিসে কাজ করে যে লোকটি, অফিসে ঢোকার আগে মাঝেমধ্যেই ফলমূল কিনে নিয়ে যায়। লোকটা মৃগনাভিগুলো দেখে থমকে দাঁড়াল। ওদের সামনে হেঁট হয়ে বসে একটা মৃগনাভি তুলে গন্ধ শুঁকল।

চকচকে মানুষ দেখে মেয়েটির মা বেশ উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘লে যা না বাবু, হিরণকা কস্তুরী। ইয়ে শুভ জিনিস আছে। কৌটো কা অন্দর সিঁদুর দিয়ে রাখেগা তো, ধীরে ধীরে বড় হোতা।’

লোকটি পাশে নামানো তালের মতো সাইজের মৃগনাভিটি দেখিয়ে বলল, ‘হুঁ, ম্যায় সামাঝ গিয়া। ইতনা বড় হোতা, ঠিক হ্যায় না?’

‘হ বাবু, ইয়ে পেহেলে ছোটা থা। দেখ কিতনা বড় হুয়া।’

লোকটা এবার উঠে শিবদাসের সামনে তিরপলের ছায়ায় দাঁড়াল। শিবদাসের কাছ থেকেও মাঝেমধ্যে জিনিস কিনে যায়।

শিবদাস বলল, ‘কী হল? মৃগনাভি নেবেন না?’

‘ধুর ভাই, এগুলো কেউ নেয়! একটা আসল মৃগনাভির দাম কত জান? লাখ টাকার ওপরে। এই নকল মাল বেঁচে মানুষদের ঠকাচ্ছে।’

শিবদাস বলল, ‘নিচ্ছেও তো সবাই।’

‘না জানলে যা হয় আর কি! পুলিশে খবর দিলে বারোটা বাজিয়ে দেবে এদের।’ বলে লোকটা ওর শ্বশুরবাড়ির ওধারের একটা ঘটনা শোনাল। এরকম বেশ কয়েকজন ব্যবসাদারকে নাকি পুলিশে পিটিয়ে গাড়িতে তুলেছে।

শিবদাস অবাক হল শুনে।

লোকটা আবার বলল, ‘একটা আসল মৃগনাভি যদি এখানে থাকে, তো সারা হাটের মানুষ গন্ধ পাবে।’

শিবদাস আরও কৌতূহলী হয়ে ওঠে। বলে, ‘হরিণের কোথায় থাকে বলুন তো এগুলো?’

‘হরিণের পেটের কাছে থাকে। তবে সব হরিণের তো হয় না। বিশেষ একধরনের পুরুষ হরিণের দেহে এই গ্রন্থি পাওয়া যায়। হরিণের যখন দশ মাস বয়স হয়, তখন মিলন ঋতুর সময় এর নাভিগ্রন্থি পরিপক্ক হয়, এর গন্ধ স্ত্রী হরিণকে আকর্ষণ করে। একসময় এত গন্ধ ছড়ায় যে হরিণটি পাগলের মতো সারা বনময় ছুটে বেড়ায়। তার দেহেই যে এই গন্ধের উৎস সেটা বুঝতে পারে না। চোরা শিকারীরা হরিণ মেরে এই বিশেষ গ্রন্থিটি কেটে বের করে নেয়। আর এরা বলে কিনা মৃগনাভি এনেছে! চোখে দেখেছে কখনও!’

লোকটি চলে গেলেও শিবদাসের মাথা থেকে মৃগনাভির বিষয়টি যায় না। পুলিশে নাকি এদের ধরে! তাহলে এত রিস্ক নিয়ে এই ব্যবসা করে কেন! গরিব মানুষ করে খাচ্ছে। এরা তো আসল দোষী নয়। নিশ্চয়ই কোনও না কোনও দোকান থেকেই কিনে বিক্রি করছে। আসল মালিককে না ধরলে এই ব্যবসা বন্ধ হবে কি?

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি ফলমূলের বাজার দিকে গেল। শিবদাস দেখল, ফেরার সময় হাতে কয়েকটি পাকা আম নিয়ে আসছে। হঠাৎ একটা আম হাত থেকে পড়ে গেল। মেয়েটি হেঁট হয়ে আমটি কুড়োনোর সময় দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে শিবদাসের দিকে তাকাল। শিবদাসের বুকটা হুহু করে উঠল। আমটা ইচ্ছে করে ফেলল না তো!

নিমাইচাঁদ দেখে ফেলেছে। আঙুলে চুটকি মেরে বলল, ‘জমে ক্ষীর! চালিয়ে যা শিবে। চালিয়ে যা।’

মেয়েটির মা ওর দিকে খুব নজর রাখছে। তাই ও ভয়ে তাকাতে পারছে না শিবদাসের দিকে। এতগুলো চপ খেয়ে আমগুলোও বসে বসে প্রায় খেয়েই নিল। আমের আঁটি চুষতে চুষতে শিবদাসের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে।

নিমাইচাঁদ আবার টিপ্পনী কাটল, ‘কই রে শিবে, আমাদিকেও একটু দ্যাখ বাপ। এখন থেকেই ভুলে গেলি যে!’

‘তোমাদিকে ভুললে চলবেক কাকা? তোমরা ছাড়া আছে কে? এগুলো সব শরতের মেঘের মতো গো। খালি একটু ছায়া দিয়ে চলে যাবেক। তারপর আবার গনগনে রোদ!’

‘বেড়ে বলেছিস কথাটা। তবে এই মেঘে একবার ভিজে গেলে সবই সম্ভব। তুইও মেঘ হ বাপ। ভিজিয়ে দে।’

নিমাইচাঁদের মুখে হাসি। শিবদাস বলল, ‘দোকানটা একবার নজর রাখবে কাকা। তরিতরকারি কিছু কিনে আনি।’

‘শুধু দোকানটায় নজর রাখলে হবেক তো?’

শিবদাস হেসে জবাব দিল, ‘পারলে ওটাও দেখো।’

হাটে হাটেই টাটকা জিনিস কিনে নিয়ে যায় শিবদাস। গরিবের শাকসবজি ছাড়া আছে কী! প্রতিদিন মাছটি, ডিমটি খাব বললেই তো আর খাওয়া যায় না। তাও শিবদাস নিজের দিকে চেয়ে দেখে না।

হাটের শেষে অশ্বথতলায় সকাল হলেই পাইকারদের ভিড়। ওখানে হাঁস, মুরগি, ছাগল বেচাকেনা হয়। ওধারেই হাটের কমিটি থেকে বাথরুম, কলতলা বসিয়েছে। শিবদাসের সবজি কেনা হয়ে গেলে কলতলায় গেল। ঘামে মুখটা কেমন প্যাচ প্যাচ করছে। হাত-মুখ ধুলে যদি একটু স্বস্তি লাগে, তাই শিবদাস হেঁট হয়ে কল টিপে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা নিল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে, হঠাৎ দেখল পুলিশ! শিবদাসের বুকটা ধক করে উঠল। ব্যপার কী বুঝতে পারে না। এখানে আগে মোরগ লড়াই হত। আর বসত ঝান্ডির আসর। তখন প্রায়ই হাটে পুলিশ ঢুকত। এখন তলাওয়ালা বসতে দেয় না। থানা থেকে চাপ। কিন্তু আজ পুলিশ কিসের জন্য?

গাড়িটা দাঁড়িয়েছে রাস্তার ধারেই। হাটের পথে ঢুকছে একটা পেটভুটকো পুলিশ, আরও দু’জন তার পিছু পিছু।

শিবদাসের মনে পড়ল সেই পঞ্চায়েতের অফিসারটির কথা। নিমেষেই ভিড় ঠেলে শর্টকাট রাস্তা দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে হাজির হল মেয়েগুলোর সামনে। শিবদাসকে অমন করে আচমকা আসতে দেখে ওরা খুব অবাক হল। শিবদাসের গলা দিয়ে কথা বেরোতে চাইছে না। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘পুলিশ! পুলিশ!’

মুখগুলো ভয়ে শুকিয়ে গেল ওদের। নিমেষেই সচল হয়ে উঠল। টাকার ব্যাগটি হাতে নিয়ে, তাড়াহুড়ো করে কতক জিনিস ব্যাগে ভরে, হাটের পেছন দিয়ে বেরোনোর পথটায় মিশে গেল ভিড়ের মধ্যে।

নিমাইচাঁদ বলল, ‘বাঁচিয়ে দিলি!’

শিবদাস জবাব দিল না। ফ্যাকাশে মুখে পথের দিকে চেয়ে রইল। অনেকক্ষণ কেটে গেল, তবুও পুলিশগুলো এল না।

নিমাইচাঁদ বলল, ‘কই রে শিবে! পুলিশ এল কই? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখিসনি তো?’

‘স্বপ্ন কেনে দেখব গো! নিজের চোখে দেখলাম, বিশ্বাস করো। হয়তো অন্য কোনও কারণে এসেছিল।’

‘এবার বসে বসে আঁটি চুষ। এই জমেছিল। দিলি তো সব মাটি করে!’

শিবদাসেরও মনটা খারাপ হয়ে গেল। তার জন্যই ওদের পালাতে হল। ওরা কি পালিয়েছে? না কি কোথাও লুকিয়ে আছে? হয়তো একটু পরেই ফিরে আসবে!

হাট ফাঁকা হয়ে গেল। মেয়েগুলো আর ফিরল না। অন্যদিন বারোটার আগেই জিনিস গোটানো হয়ে যায় শিবদাসের। আজ গোটানোর কোনও লক্ষণই দেখা গেল না। তা দেখে নিমাইচাঁদ বলল, ‘কী হল রে শিবে? আজ কি হাটেই থাকবি নাকি!’

যতদিন হাটে ব্যবসা করছে ততদিন শিবদাসের স্নান, খাওয়ার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। শীতকালে হাট থেকে বাড়ি ফিরতে এক–দুইদিন সন্ধ্যা হয়ে যায়। শরীরটা ধকল শয়ে শয়ে দিনকে দিন ক্যাংলাস হয়ে যাচ্ছে।

বাড়ি ফিরেই সাইকেল থেকে জিনিসগুলো নামিয়ে শিবদাস নিজের ঘরটায় ঢুকল। ক্লান্তিতে গা থেকে জামা-গেঞ্জি খুলে ছুড়ে ফেলল। এই ঘরটায় শিবদাসের অবসর সময়ের আশ্রম। হাওয়া-বাতাস তেমন ঢুকতে পায় না। মা রোগধরা মানুষ, প্রতিদিন ঝাঁট দিতেও পারে না। ঝুল–ময়লা আর কড়িবরগায় মাকড়সার জালে জড়াজড়ি। ময়লা তেলচিটে, ঘেমো গন্ধ ওঠা কাঁথা বালিশগুলোর জন্য এক–দুই সময় দম বন্ধ হয়ে আসে। শিবদাস মাদুরের ওপর গা–টাকে এলিয়ে দিল।

চোখ লেগেছিল কি লাগেনি, হঠাৎ অনুভব করল সারা ঘর কেমন এক মিঠে গন্ধে ম-ম করছে।

শিবদাস তড়াক করে উঠে পড়ল। এই গন্ধ এখানে কী করে এল? ও তো মৃগনাভি ছোঁয়নি! তাহলে! গন্ধটা আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে সারা ঘর ভরিয়ে তুলছে। শিবদাস টের পেল তার নিজের গা থেকেই এই গন্ধ বের হচ্ছে।

চিত্রকর: মৃণাল শীল