সর্বার্থ মুখোপাধ্যায়, অনুরাগ দাস

‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে এক নরপতির স্নিগ্ধ এক চিত্র অঙ্কন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ত্রিপুরারাজ গোবিন্দ মানিক্যর মাধ্যমে ‘রাজা’ (যিনি রক্ষক ও পালক) এবং ঋষির (যিনি জ্ঞানমার্গের যাত্রী) এক যথার্থ সমাস রচিত হয়। তেমনই তৎকালীন ত্রিপুরার রাজসভা সাক্ষী হয়ে থাকে এক খর্বদেহ মানবের প্রজ্ঞার সম্মুখে সমগ্র ভারতের পাঁচশতের অধিক পণ্ডিত ও সমাজপতিদের স্বেচ্ছায় মাথা নত করবার ঘটনার। সর্বজনগ্রাহ্য হয় রবীন্দ্রনাথ আরোপিত ‘সার্বভৌম’ উপাধি। এক কলেবরে, এক ব্যক্তিত্বে আবদ্ধ হয় ‘রাজা’ ও ‘ঋষি’— সার্বভৌম উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে।

কালের যাত্রায় তখন পরাধীন ভারতে শৃঙ্খলের শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে। সময়টি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে।  ‘গীতাঞ্জলি’ পৌঁছেছে পশ্চিমে, জানান দিয়েছে বঙ্গের মননের অভ্যুদয়ের। কল্লোল যুগের প্রারম্ভ দেখছে বঙ্গ। এই সময় ‘কালীঘাট ইতিবৃত্ত’ প্রকাশের মাধ্যমে (১৩৩২) ইতিহাস ও শাস্ত্রচর্চার এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নিদর্শন পেশ করেন গুণাকর উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর প্রজ্ঞার বার্তা কড়া নাড়ে ঠাকুরবাড়িতেও। রবীন্দ্রনাথের দস্তখত সম্বলিত পত্র আসে উপেন্দ্র-ভবনে। সেই চিঠি অবশ্য কালের গ্রাসে বিলুপ্ত। তবে তারপর সাক্ষাতে কবিগুরু গুণাকরকে অনুরোধ করেন নিজের নামের প্রত্যেক অক্ষর দিয়ে দেবী বন্দনা করতে। তৎক্ষণাৎ রচিত হয় এক অনন্য দেবী বন্দনা। উদ্বেলিত কবিগুরু তাঁকে ভূষিত করেন ‘সার্বভৌম’ উপাধিতে। যদিও সেই উপাধি গ্রাহ্য হবে কিনা তার মীমাংসা করার জন্য সভা বসেছিল ত্রিপুরায়। পরে পণ্ডিত ও সমাজপতিরা মেনে নিয়েছিলেন উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রজ্ঞা। তিনি হয়েছিলেন সার্বভৌম।

উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর সাবর্ণ দুহিতা কাত্যায়নী দেবীর মধ্যম গর্ভে আবির্ভূত হন উপেন্দ্রনাথ। পিতা বাবু ভগবতী চরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ঘাশিয়ারা এস্টেটের জমিদার। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা খগেন্দ্রনাথ শাস্ত্রী ছিলেন গীতা শোভার প্রধান, সংস্কৃত সাহিত্য, দর্শন এবং হিন্দুশাস্ত্রের সুপণ্ডিত। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার মাধ্যমে ভদ্রাসন থেকে দাক্ষায়ণী অবতীর্ণ হন সবার মাঝে। রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা হয়ে ওঠে সার্বজনীন বঙ্গের লৌকিক কন্যা। দুর্গোৎসবের এক নব রূপ প্রচারিত হয় আদিগঙ্গার তীরে।

জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পদচিহ্ন অনুসরণ করেন তাঁর সুযোগ্য ভ্রাতা উপেন্দ্রনাথ। ‘কালীঘাট ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা প্রকাশিত’— “অগ্রজ খগেন্দ্রনাথ বিখ্যাত বিদ্বান্‌।। গুণ বুঝি গুণীগণ শাস্ত্রী উপাধিতে। ভূষিত করিল যাঁরে সম্মান রাখিতে।।’’ মাতুল পরিবারের উত্তরাধিকার সূত্রে উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কালীঘাটের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিকার সেবাইতের অধিকার লাভ করেন। তাঁর জ্ঞান পিপাসা ও ইতিহাস জিজ্ঞাসা তাঁকে কালীঘাটের ইতিহাস সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু করে তোলে। তিনি গবেষণায় ব্রতী হন।

তাঁর গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারছি, পীঠস্থানের আদি প্রতিষ্ঠাতা ব্রহ্মানন্দ গিরি এবং আত্মারাম ব্রহ্মচারীর সুদূর দাক্ষিণাত্য থেকে স্বপ্নাদেশ অনুসারে নদীপথে বঙ্গে যাত্রার ঐতিহাসিক আখ্যান। নীলগিরি পর্বতে আকস্মিক প্রলয়ের কালে মহামায়া স্বপ্নাদেশ দেন, তাঁর অধিষ্ঠিত শিলাখণ্ডে আরোহণ করে জল প্রবাহে যাত্রা করতে এবং যে স্থানে সেই শিলাখণ্ডের যাত্রা স্তিমিত হবে সেই স্থানে প্রতিষ্ঠিত হবে দেবীর ক্ষেত্র। সেই ‘কলিক্ষেত্র’ থেকে অপভ্রংশ হয়ে স্থানের নামকরণ হয় ‘কালীকাঁথা’ এবং তার উত্তরে সেই গ্রামের নামকরণ হয় ‘কালিকাতা’ এবং নদীকূলের নামকরণ হয় ‘কালীঘাট’। সেই জলধারাই ভাগীরথী গঙ্গার আদি যাত্রাপথ। তাই একথা সত্য যে, কালীঘাটের ইতিহাসের সঙ্গে ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে গঙ্গার ভৌগোলিক, পৌরাণিক ও নান্দনিক বিবর্তন এবং ‘কলিকাতা’ নগরীর সামগ্রিক ইতিহাস ।

‘কালীঘাট ইতিবৃত্ত’-র ভূমিকা অংশে উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এই গ্রন্থ লেখার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যা বলেছেন তা হল— “কালীঘাটের সন্নিকট দিয়ে পূর্ব্বে গঙ্গা প্রবাহিত হইতেন। কিন্তু সেখানে সম্প্রতি গঙ্গা অতি সংকীর্ণা. এখনও প্রাচীনেরা তাহাকে আদিগঙ্গা বলেন, কিন্তু আধুনিকের নিকট উহা “টালীর নালা” নামে পরিচিত। কালচক্রে অদূর ভবিষ্যতে এমনও হইতে পারে যে ভবিষ্যদবংশীয়েরা কালীঘাটের নিকট দিয়া গঙ্গা প্রবাহিতা হইতেন একথা বিশ্বাসও করিবেন না। এখনও হয়ত অনেকে মনে করেন না সুতরাং এই কালীঘাট সম্বন্ধে একখানি ইতিহাস লিখা প্রয়োজন মনে করিয়া আমি এই কার্য্যে ব্রতী হই।’’

স্বর্গের তটিনী গঙ্গা শশীশেখরের শিরোভূষণ। তিনি জরা ব্যাধি নিরাময়কারিণী। তাঁর পবিত্র জলধারায় সাগররাজের ষাট সহস্র পূর্বপুরুষের মুক্তির জন্য তাই ভগীরথ ধরাতলে আবাহন করেন গঙ্গাকে। ‘ভাগীরথী’ নামে পরিচিত হয় গঙ্গা। ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটেও এই নামেই খ্যাত গঙ্গার বহুল বিবর্তিত প্রবাহপথ।

‘গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরী সরস্বতী নর্মদা সিন্ধু কাবেরী জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু।’ পরাশর-পুত্রকৃত ঋক বেদের এই শ্লোকে ভারতের সপ্ত পবিত্র জলধারার পরিচয় পাওয়া যায়। ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি এই বারিধারার যে অপরিসীম প্রভাব সেকথা অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। “এইসব নদনদীর ইতিহাসই বাঙালির ইতিহাস। ইহাদেরই তীরে তীরে মানুষ-সৃষ্ট সভ্যতার জয়যাত্রায়, মানুষের বসতি, কৃষির, পত্তন, গ্রাম, নগর, বাজার, সম্পদ, সমৃদ্ধি, শিল্প, সাহিত্য, ধর্মকর্ম সবকিছুরই বিকাশ”।

বঙ্গের প্রাচীন নদী হিসেবে রয়ে গিয়েছে গঙ্গা। ভ্যান ডেন ব্রুক-এর নকশায় দেখা যায় রাজমহল পর্বতের দক্ষিণ থেকে আরম্ভ হয়ে মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারের মাঝে গঙ্গার তিনটি দক্ষিণবাহিনী জলধারা কাশিমবাজারের একটু উত্তর থেকে প্রবাহিত হয়ে সোজা দক্ষিণে গিয়ে মিশেছে সাগরে। অবশ্য এই জলধারার গঙ্গা নামের উত্তরাধিকার সূত্র নিয়ে  ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে।

কৃত্তিবাসী লিখনে বড় গঙ্গা ও ছোট গঙ্গা নামক দুই জলধারার উল্লেখ রয়েছে। তা এইরকম—

“পিতা বনমালী মাতা মানিক উদরে।

জনম লভিল ওঝা ছয় সহোদরে ।।

ছোটগঙ্গা বড়গঙ্গা বড় বলিন্দা পার।

যথা তথা কর‍্যা বেড়ায় বিদ্যার উদ্ধার ।।

রাঢ়ামধৈ বন্দিনু আচার্য চূড়ামণি

যার ঠাঁই কৃত্তিবাস পরিলা আপনি ।।”

(কৃত্তিবাসী রামায়ণ)

দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত অপরিসীম জলধারাকে (বর্তমান পদ্মা) তিনি বড়গঙ্গা বলে অভিহিত করেছেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রবাহমান অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ জলধারাকে ছোটগঙ্গা বলে সম্বোধন করেছেন। তবে দেখা গিয়েছে, পঞ্চদশ শতকে বৃহত্তর নদীর ঐতিহ্য মহিমায় এবং মানুষের শ্রদ্ধায় বড়গঙ্গা অপেক্ষা ছোটগঙ্গা অধিক মান্যতা পেয়েছে।

পদ্মার বিপুল জলধারা এবং অহরহ প্লাবনের কারণে পদ্মা মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে, গঙ্গার পরিচয় হ্রাস হয়ে পদ্মা হয়ে উঠেছে ভীষণা, ভয়ংকরী, কীর্তিনাশা। অপর দিকে ছোটগঙ্গা হয়েছে স্নিগ্ধ, পাপহরা, জাহ্নবী, ভাগীরথী। এই ভাগীরথী যে প্রাচীনতর এবং পরম তীর্থ জাহ্নবী সেই প্রসঙ্গে প্রাচীন সংস্কৃত এবং লিপি একমত।

আদি গঙ্গা (টালির নালা) ১৮৬০

ধোয়ীর ‘পবনদূত’-এ ত্রিবেণী সঙ্গমের ভাগীরথীকেই বলা হয়ছে গঙ্গা। বল্লাল সেনের নৈহাটি লিপিতে গঙ্গা ভাগীরথীকেই বলা হয়েছে ‘স্বর্গনদী সুরসরিৎ’। জাও দ্যা ব্যারোজ (১৫৫০) কৃত নকশা থেকে জানা যায়, পঞ্চদশ শতকের ভাগীরথী সংকীর্ণতোয়া হলেও তার যাত্রাপথের প্রবাহ বর্তমানের মতো ক্ষীণ নয়, বাণিজ্যতরীর চলাচল তখনও অব্যাহত। ভ্যান ডেন ব্রুক-এর নকশায় এই গতিপথের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। বিপ্রদাস পিপলাই রচিত ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে এই প্রবাহপথের বিবরণ রয়েছে। চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যতরী সাগরমুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে পূর্বে কাঁকিনাড়া, মুলাজোড়া, গাড়ুলিয়া, পশ্চিমে পাইকপাড়া, ভদ্রেশ্বর, বামে ইছাপুর, খড়দহ, শ্রীপাট ও ডাইনে রিসিড়া, সুকচর, পশ্চিমে কোন্নগর, ঘুষুড়ি (ঘাষিয়াড়া)। তারপর পূর্বকূলে চিৎপুর ও পশ্চিমে কলিকাতা, কালীঘাট, চুড়াঘাট, বারুইপুর, চৌমুখী, শতমুখী এবং সাগরসঙ্গমতীর্থ। ভ্যান ডেন ব্রুক-এর নকশার বিবরণের সঙ্গে যা প্রায় এক। তিনি Tripeni, Coatgam/Satigam (সপ্তগ্রাম— গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীর সঙ্গম), Oegil (হুগলি) এবং তারপর ‘Collecate’ এবং ‘Calcutta’ নামে প্রায় সংলগ্ন দুটি বন্দরের উল্লেখ করেছেন। ‘Collecate’ হয়তো কালীঘাট আর ‘Calcutta’ কলিকাতা। এই সমস্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, ‘কালীঘাটের পার্শ্বে ভাগীরথী প্রবাহিত হইতেন।’ সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই গতিপথেই ছিল ভাগীরথীর সমুদ্রযাত্রা। ধীরে ধীরে পলি পড়ার কারণে এই গতিপথ ক্ষীণ হয়ে আসে। রেনেলের নকশায় (১৭৬৪-১৭৭৪) ভাগীরথীর এই গতিপথ আর পাওয়া যায় না। সময়কালে সপ্তগ্রামের দক্ষিণে সরস্বতী নদীর ধারা ক্ষীণকায় হয়। ভাগীরথীর প্রধান প্রবাহপথ পলি পড়ে বাণিজ্যতরীর চলাচল রুদ্ধ হলে বঙ্গের নবাব আলীবর্দী খান দক্ষিণমুখী প্রবাহ উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন এবং সময়ের সঙ্গে ভৌগোলিক বিবর্তনের ফলে ভাগীরথীর মূল জলধারা প্রবাহিত হয় সরস্বতীর দক্ষিণ প্রবাহে। উইলিয়াম টলি ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ভাগীরথীর আদি প্রবাহের সংস্কার করেন কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে আদিগঙ্গা নালায় পরিণত হয় এবং শব্দের অপকর্ষে এই প্রবাহ টালির নালা নামে পরিচিত হয়।

কালীঘাটের মন্দির প্রতিষ্ঠার অন্তরালে যে বিস্তীর্ণ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা, লৌকিক ও ঐতিহাসিক আখ্যান এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব— তা সবই উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ব্যক্ত করেছেন সুনিপুণভাবে। পৌরাণিক আখ্যান বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা তাঁর বিস্তৃত শাস্ত্রীয় জ্ঞানের পরিচয় বাহক। দেবী ভাগবত পুরাণে কথিত সৃষ্টি প্রকরণ, দক্ষযজ্ঞ এবং তাঁর ফলস্বরূপ শক্তিপীঠের প্রতিষ্ঠা ও তার মাহাত্ম্য ও পথনির্দেশকাও বর্ণনা করেছেন। কলিক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমানাও বর্ণিত হয়েছে এই গ্রন্থে। “শিবকর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া ভগবতী বলিতেছেন :— দক্ষিণেশ্বর হইতে বহুলাপুর পর্য্যন্ত দুই যোজন ব্যাপী ধনুকাকার কালীক্ষেত্র। তন্মধ্যে একক্রোশ বিস্তৃত ত্রিকোণাকার স্থানের মধ্যে ত্রিকোণে ত্রিগুণাত্মক ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব এবং মধ্য স্থলে মহাকালী নামে কালিকাদেবী বিরাজ করেন। যেস্থানে নকুলেশ্বর ভৈরব ও গঙ্গা বিরাজিতা, সেইস্থান মহাপুণ্যক্ষেত্র এবং দেবতা দুর্ল্লভ। হে মহেশ্বর! কাশীক্ষেত্র ও কলিক্ষেত্র এতদুভয়ের মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই, বিশেষতঃ পরোক্ত স্থানে ভৈরবী, বগলা, বিদ্যা, মাতঙ্গী, কমলা, ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী ও  সনাতনী শক্তি চণ্ডী সর্ব্বদাই বিরাজ করেন। এস্থানে কীট, পতঙ্গ মরিলেও সে মুক্ত হইয়া যায়, মানুষ মরিলে সে ত মুক্ত হইবেই।’’ এই বর্ণনা যতটা পৌরাণিক প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক ততটাই ভৌগোলিক প্রেক্ষিতেও।

ইতালীয় শিল্পী Gaetano Zancon অঙ্কিত কালীঘাটের চিত্র

পৌরাণিক উপাখ্যান এবং সক্রিয় ব্যাখ্যা ছাড়াও ঐতিহাসিক উপাখ্যান এবং যথাযথ প্রামাণ্য ইতিহাসের নিদর্শন এই গ্রন্থ। পঞ্চদশ শতাব্দীর অন্তিম ভাগের পটভূমিতে বর্ণিত ব্রহ্মানন্দ গিরি ও আত্মারাম ব্রহ্মচারীর কলিক্ষেত্রে আগমনের ঘটনা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে গৃহীত হলেও এই ঘটনার বর্ণনা লৌকিক আখ্যান বলেই মনে হয়। তবে কালীঘাটের মন্দির প্রতিষ্ঠার অন্তর্গত যে রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে তা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে যথার্থই গ্রহণযোগ্য। পীঠস্থান রূপে কলিক্ষেত্রের দেবোত্তর সম্পত্তিতে রূপান্তরের বিষয়ে নানাবিধ মত আছে। কারও মতে তা বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী মহাশয়গণের প্রদত্ত। আবার কারও মতে, সেনবংশীয় রাজাদের প্রদত্ত। আর এক মত অনুসারে তা বীরভূমের জমিদারগণ কর্তৃক দেবীর নামে উৎসর্গীকৃত। কিন্তু এই বিষয়ে কোনও লিখিত সনদ পাওয়া যায় না। এই বিভ্রান্তির ঘনঘটায় তাঁর গবেষণার ফলস্বরূপ ঐতিহাসিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য এক মত প্রকাশ করেছেন উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের অব্যবহিত পরের ঘটনা। সম্রাট আকবরের সুদীর্ঘ ৪৯ বৎসরের রাজত্বকালের অবসানে দিল্লির মসনদে অধিষ্ঠিত জাহাঙ্গীর। সেই সময় মুঘল শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন শক্তি রূপে পরিচিত হওয়ার এক প্রবল চেষ্টা করেন বঙ্গের যশোহররাজ প্রতাপাদিত্য। বঙ্গের নবাব সেই বিদ্রোহ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে জাহাঙ্গীর কাশীর সুবেদার রাজা মানসিংহকে বঙ্গে পাঠান। রাজা মানসিংহ কাশী প্রদেশে কামদেব গঙ্গোপাধ্যায়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাজা প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করে তাঁর রাজ্যের অন্তর্গত এই কলিক্ষেত্র অংশ গুরুর আদেশে গুরুপুত্র লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়কে নিবেদন করেন। এই সূত্রে গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের হস্তগত হয় কালীঘাটের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার। এই লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের বংশধররাই বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী হিসেবে পরিচিত হন। এই রায়চৌধুরী পরিবার কর্তৃক নির্মিত হয় কালীঘাট মন্দিরের বর্তমান রূপ। বসন্ত রায় কর্তৃক নির্মিত খড়ের চালা বিবর্তিত হয় জাপানি পাথরের চূড়ায় । নাটমন্দিরও এই বংশের উত্তরপুরুষ কর্তৃক নির্মিত। এই সাবর্ণ বংশের কন্যা কাত্যায়নী দেবী ঘাষিয়াড়ার কুমার ভগবতী চরণ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহযোগে আবদ্ধ হন। তাঁদেরই মধ্যম পুত্র সার্বভৌম উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।

খড়দহ নিবাসী রাজা কালাচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র ছিলেন শম্ভুচরণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর দুই ভার্যা সখী দেবী ও দেবী দেবী তৎকালীন সমাজের অকথ্য নিষ্ঠুরতার ফল হিসেবে শম্ভুচরণের মৃত্যুর পর সহমৃতা হন। যে ঘাটে তাঁরা সহমৃতা হয়েছিলেন সেই ঘাটের নাম হয় সতীদাহ ঘাট। পরবর্তীকালে ঘাটের নাম বদল করে বলরাম বসু তা নিজের নামে স্থাপিত করেন। এই ঘটনার উল্লেখ আছে ‘কালীঘাট ইতিবৃত্ত’-র উৎসর্গপত্রে। শম্ভুচরণ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র ছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর পুত্র ভগবতী চরণ মুখোপাধ্যায় কালীঘাটের কাছে আদিগঙ্গার তীরে বলরাম বসু ঘাট রোডে ভগবতী কাত্যায়ানীধাম নির্মাণ করেন। এই কুলের আদি পুরুষ ছিলেন ভরদ্বাজ  গোত্রীয় নৈষধ-চরিত রচয়িতা কবি শ্রীহর্ষ ।

বড়িশা থেকে কালীঘাট বেশ দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় রায়চৌধুরীরা হালদার বংশকে তাঁদের দেবত্র রক্ষা করার দায়িত্ব দেন। ইতিমধ্যে বর্গীর আক্রমণ নেমে আসে। কালীমন্দিরে বর্গীর সনন্দ পত্র দ্বারা রামকৃষ্ণ হালদার কালীঘাট মৌজার হাওলাদার রূপে পরিচিত হন। পরবর্তীকালে এই হালদারবংশ দু’ভাগে বিভক্ত হয়। একাংশ দক্ষিণে বহুলা গ্রামে যাত্রা করেন এবং সেখানকার জমিদাররূপে পরিচিত হন। অপর অংশ কালীঘাটের সেবাইতের ভূমিকা পালন করেন। এই বহুলা গ্রামনিবাসী হালদারবংশীয় কন্যা মেনকা সুন্দরী দেবীকে তাঁর প্রথম ভার্যার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় ভার্যারূপে গ্রহণ করেন উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর এবং তাঁর পিতা ভগবতী চরণ মুখোপাধ্যায়ের এই অন্তর্জাত বিবাহ করার হেতু তাঁরা ভঙ্গকুলীনে রূপান্তরিত হন। এই ভিন্ন জাতে বিবাহের সিদ্ধান্ত সেই সময়কালের পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক।

এই গ্রন্থে মধ্যযুগীয় বঙ্গের ইতিহাস ও কালীঘাটের ইতিহাসের সুগঠিত আলোচনা থাকলেও অনেক জায়গায় বন্দনা এবং ভক্তি প্রকাশের কারণে শক্তিভক্ত উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রকোপ ঐতিহাসিক উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের অনুসন্ধিৎসা কিছুটা খর্ব হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে লেখকের মধ্যেই এই গ্রন্থের পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। তাই এই গ্রন্থের পরিচয় ‘ইতিহাস’ এবং ‘ধর্মগ্রন্থ’— দুই অর্থেই প্রযোজ্য। ‘কালীঘাট ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ ঐতিহাসিক উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় পেলেও শাস্ত্রীয় পণ্ডিত উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় অন্য দুই গ্রন্থ ‘শিবতত্ত্ব প্রদীপিকা’ এবং ‘সর্ব দেব দেবীর মন্ত্রকোষ’-এ পাওয়া যায়।

উপেন্দ্রনাথকে লেখা ত্রিপুরার মানিক্যরাজের চিঠি

ঘাষিয়াড়া, সোনারপুর, খড়দহ, দেওগড়ে এবং ভবানীপুরে মুখোপাধ্যায় কুলের সামন্ততান্ত্রিক শাসন বিস্তার লাভ করলেও উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সেই ব্যবস্থায় শোষকের প্রতিভূ হতে পারেননি। বরং তিনি প্রজাবৎসল পালক হিসেবেই প্রজাদের মধ্যে খ্যাত হয়েছেন। তিনি প্রজাদের রাজকর মুকুব করে দিয়েছিলেন এবং ইংরেজ সরকারের খাতে নিজের আয় থেকে কর জমা করাতেন। তা ছাড়াও তিনি কালীঘাটে ‘উপেন্দ্র কুটির চতুষ্পাঠী’ স্থাপন করেন যেখানে বিনা বেতনে ছাত্রদের প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বহু জায়গা থেকে অধ্যাপকদের আহ্বান করেছিলেন। স্থাপন করেছিলেন ‘উপেন্দ্র কুটির ধর্মশালা’, যেখানে তীর্থযাত্রীদের জন্য তিন দিন বিনা খরচে খাদ্য ও বসবাসের পূর্ণ সুবিধা দেওয়া হত। তাঁর এইসকল কীর্তি তৎকালীন বঙ্গীয় সামন্ততান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে প্রগতিশীল বলা চলে। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ৫ই কার্তিক ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার লগ্নে উপেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। তারপর তাঁর এই দুটি প্রতিষ্ঠান কলকাতা পৌরসভার মাধ্যমে চালিত হত।

এ ছাড়াও পিতৃ আদেশ অনুসারে তিনি কালীঘাটের ভুবনেশ্বরী মন্দির ও অকালমৃত অনুজ ভ্রাতা হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে বারাণসীতে হরিনারায়ণ মঠ এবং প্রথম ভার্যা সরলা দেবীর ইচ্ছা অনুযায়ী দশাশ্বমেধ ঘাটে বৈধব্যনাশিনী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ভবানীপুরের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে নবগ্রহ মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা তিনি পরবর্তীকালে সেই মন্দিরের পূজারিকে দান করে যান।

উপেন্দ্রনাথকে লেখা খোরসান রাজের চিঠি

ভারত ও ব্রহ্মদেশ (বর্মা— যা বর্তমানে মায়ানমার)-এ তাঁর পাঁচ হাজারেরও বেশি শিষ্য ছিল। ত্রিপুরার মানিক্যরাজ, খোরাসানরাজ, পাটনারাজ-সহ বহু রাজ এস্টেটের কুলপণ্ডিতরূপে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং নথিতে তার প্রমাণ রয়েছে ।

এই ব্যক্তিত্বের কর্মজীবনের বিষয়ে তাই সেই কথাটি এখনও প্রযোজ্য।

‘স্বদেশে পূজ্যতে রাজা

বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।’