জয়ন্ত দে

মেয়েমানুষটা কথা বলতে দেয় না।

আজিবলাল ওকে বার বার বলেছে। বার বার, বার বার বলেছে, ‘মেরা বাত শুন লে সুন্দরী! আমার কথা শোন—।’

কিন্তু সুন্দরী নাছোড়, সে শুনবে না। সে বলবে। তোতার মতো বকবক করবে। চাপা কলে জল আসার মতো বকবক করবে। মেছোবাজার, শুঁড়িখানা, রেল ইস্টিশানের মতো বকবক করবে।

তবু তারমধ্যেই আজিবলাল কথা বলতে চাইছিল সুন্দরীর সঙ্গে। পায়রার মতো বকবকম করতে চাইছিল, বজ্র আর বিদ্যুতের মতো একসঙ্গে বাজতে চেয়েছিল, কথার সঙ্গে যেমন সুর, পায়ের সঙ্গে যেমন মল—। কিন্তু সুন্দরী ওকে কথা বলতে দিল না। আসলে আজিবলাল ওকে সামলাতে পারে না। তার থেকে বয়েসে ছোট সুন্দরী। বেশ ছোট, অনেক ছোট। তাকে সামলানো ছাপ্পানের  আজিবলালের বহুত মুশকিল। তা সত্ত্বেও সে যে বলেছিল, ‘রুখ যা। রুখ যা সুন্দরী।’

সুন্দরী থামল না, এগিয়ে এল, আরও এগিয়ে এল, কথায় কথায় এগিয়ে এল। আর আজিবলাল তার কোনও কথাই বলতে পারল না।

সুন্দরীর সঙ্গে আজিবলাল সারা সন্ধে কথা বলেছে। কথা বলেনি, শুনেছে। কথা শুরু হয়েছে সেই বিকেল থেকে। শুরু করেছে সুন্দরী। ক’টা সামান্য কথাই তো বলবে। সেই সামান্য কথাই বলার জন্য সুন্দরী ডেকে নিয়ে এসেছে তাকে। সেই বিকেলবেলা। তার বহুত কাজ ছিল। কিন্তু সুন্দরী বলল, না এলে সে মরবে।

সুন্দরীর ভারী গুসসা, ঠোঁট ফোলানো রাগ, ওরা সারা শরীর ছমছম করে, ঘাড় শক্ত জেদ। আজিবলাল বার বার তাকে বুঝিয়েছে, মেয়েমানুষের এত রাগ ভালো নয়, এত জেদ ভালো নয়। রাগ জেদ না থাকলে সুন্দরী কাঁদবে, চুপচাপ কেঁদেই যাবে, এত কাঁদবে দু’চোখ লাল হয়ে, সারা মুখে রক্ত জমে যাবে। সুন্দরী কাঁদলে আজিবলালের খুব কষ্ট হয়। তার দু’হাতে যদি গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা কড়া না থাকত, আজিবলাল দু’হাতে ওর মুখ সাফা করে দিত। আজিবলাল তাই দৌড়ে এসেছে, গুসসা করতে দেয়নি, কাঁদতে দেয়নি। এসে একমুখ হাসি নিয়ে সুন্দরীকে জড়িয়ে ধরেছে। আর সুন্দরী কথা শুরু করেছে। যে কথা একবারও থামল না। মাঝে তাকে বসিয়ে রেখে গা ধুয়ে এল সুন্দরী। কথাগুলোকে যেন ধুয়ে আরও তাজা করে আনল। তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে গা মুছল। এত জোরে জোরে মুছল যে সারা গায়ে লাল লাল দাগ ছড়িয়ে পড়ল। যেমন ভাবে কথা ছড়িয়ে পড়ে। ছোট টুলের ওপর পা তুলে থাই মুছল। আজিবলাল দেখছিল, একদম মার্বেলের মতো, আলো ঠিকরে এল তার চোখে। কথাগুলোও তো ঠিকরে আসছে আজিবলালের কানে। তার মধ্যে স্টিলের আলমারি থেকে শায়া, ব্লাউজ নিল, ব্রা নিল, শাড়ি নিল। ব্লাউজ আর শাড়ির রং মিলিয়ে নিল। ম্যাচিং। কথার ভেতর সুন্দরী ঠোঁট মোচড়ায়, নাক ফোলায়, চোখ ছোট ও বড় করে, ম্যাচিং!

আয়নার সামনে মুখ দিয়ে, শায়া পরে আজিবলালের দিকে খোলা পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। হয়তো আয়নার দেখল নিজেকে। কোনও টোল খেয়ে গেছে কিনা। ভুল বলল না তো কিছু! আগের মতোই খুবসুরত লাগছে কিনা! তারপর ব্রা পরল। আজিবলালকে ধমক দিয়ে বলল ব্রায়ের হুক লাগিয়ে দিতে। আজিবলাল সারাজীবন ব্রায়ের হুক খুলেছে, আজ সে লাগাল। খোলা সহজ, লাগানো কী কঠিন!

সুন্দরী ব্লাউজ পরে এবার আজিবলালের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। থুতনিটা যতটা পারল বুকের কাছে ঠেকিয়ে সে ব্লাউজের হুকগুলো লাগাল। আজিবলাল কথার হুকে আটকে থাকল। এই শায়া ও ব্লাউজ পরা অবস্থায় সুন্দরী ঘরের ভেতর কয়েক পাক ঘুরল। সেই মেলায় ঘোরা পুতুলের মতো। আজিবলাল পরে বুঝল সুন্দরী চিরুনি খুঁজছে।  

চুল আঁচড়ে সুন্দরী সাজল। মুখে ক্রিম ঘষল। বুকে পাউডার ছড়াল। সুন্দরীর কথার ভেতর কখনও কখনও সুর থাকে, গানের সুর—। আজিবলালকে আবার কাছে ডাকল, কাছে আসতে তার হাত টেনে এক খাবলা ক্রিম দিয়ে বলল পিঠে পালিশ করতে। আজিবলাল তার কড়া-পড়া হাত নরম করে পালিশ করল। এবার পরিপাটি করে শাড়ি পরে তার সামনে বসল সুন্দরী। আহা কথামালা!  

বসে আবার কথা শুরু করল। তখনও আজিবলাল তাকে বলল, ‘মেরা বাত শুন লে সুন্দরী!’

সুন্দরী শুনল না, সে বলবে।

দিনের আলো চলে গেলে সুন্দরী আলো জ্বেলে দিল। নাইট ল্যাম্প। সারা ঘরে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল। আজিবলাল বলছিল, ‘টিউবলাইট জ্বালা।’ ও শুনল না। ও নাইট ল্যাম্পে মুখোমুখি বসল। আর কথা বলে চলল। আজিবলাল নিজে উঠে গিয়ে টিউবলাইটের সুইচ দিতে চাইছিল। সুন্দরী নাছোড়, তাকে উঠতে দিল না। আজিবলালের কথা সে শুনবে না, সে বলবে। শুধু বলে যাবে।

সন্ধে পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। ঘরের ভেতর চাঁদের আলো এল। মিঠি হাওয়া এল। বাপ রে বাপ, কিতনা সারি বাত!

আজিবলাল তার ট্রান্সপোর্টের অফিসে বলে এসেছিল, আজ আর আসবে না। বলে এসেছিল, ঝুনুক আর প্রসাদকে সামলে নিতে। বলে এসেছিল, দরকার পড়লেই তাকে ফোন লাগাতে।

ঝুনুক ফোন করেছিল দু’বার। প্রসাদ তিনবার। আজিবলাল সে ফোন তুলতে পারেনি। ওরা ছাড়াও আরও কিছু ফোন এসেছিল। সে ফোনও বেজে গেছে। বাজতে বাজতে একসময় কেটে গেছে। সেগুলো হয়তো পার্টির ফোন ছিল। মাল লোডিং-আনলোডিংয়ের ফোন। কাজের। আজ বহুত লস হয়ে গেল তার।

গেল তো গেল, আজিবলাল এখন সুন্দরীকে জড়িয়ে ধরবে। মস্তি করবে। লাভ-ক্ষতি সব ভুলে যাবে।

ইচ্ছে ছিল, একটু নেশা করবে। ফ্রিজে বোতল আছে। সে বলতে চাইল, রুখ যা সুন্দরী , মেরা বাত শুন লে। কে শোনে কার কথা? আজিবলাল সুন্দরীকে ছেড়ে উঠতে পারল না। এ ঘরের বাইরেই ফ্রিজ। তাতে দারু আছে। ঠান্ডি পানি আছে। বরফ মিলবে। ফ্রিজের পাশে শোকেসে ঝকঝকে কাচের গেলাস। গেলাসে লাভ সাইন। দিলওয়ালে! মাল ঢাললে, পানি মিশলে হার্ট সাইন ভেসে ওঠে। সব আছে রেডি হয়ে। কিন্তু সে যেতে পারল না। সুন্দরী তাকে চুম্বকের মতো আটকে রেখেছে। সে বলার চেষ্টা করল। সুন্দরী শুনল না। তার দারুতৃষ্ণা মুছে গেল।

সুন্দরী কথা বলেই চলল। আজ সে খাবে না, দাবে না। শুধু কথা বলবে। আজিবলাল অন্যসময় হলে বলত, রোটি আনা, তড়কা আনা, চিকেন আনা। বিরিয়ানি, চিকেন চাঁপ—  খানা লাগা। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। সুন্দরী যে নড়ল না। কথাই চলল। কথা।

দারুতৃষ্ণা মুছে গেলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরতৃষ্ণা জাগে। সুন্দরী যেদিন থেকে দেখেছে, সেদিন থেকেই তার একই তৃষ্ণা। একই ঘোর। আহাহাহা!

তখন সবে লাইনে এসেছিল সুন্দরী। একদম ফার্স্ট টাইম তাকে পেয়েছিল আজিবলাল। নিয়ে এসেছিল পানাগড়ের জগৎ সিংয়ের বিবি। বলেছিল, ‘আজিবভাই, মেয়েটার বড় কষ্ট। বর কিছু করে না, শুধু মদ খায় আর পিটাই করে। ও বলল, কাম করবে। এই ফার্স্ট টাইম, কোনও দিন অন্যলোকের ট্রাকে চড়েনি। বহুত লোক ওকে চেয়েছে। ও যায়নি। ওকে পায়নি। আজ আমার কাছে নিজে এসে বলেছে। কাম দাও। টাকা চাই। আমি তোমার কাছে নিয়ে এলাম। আজিবভাই থোড়া সামহালকে।’

আজিবলাল ওকে ট্রাকে তোলেনি। হোটেলঘর ভাড়া নিয়েছিল।

হোটেলের ঘরে সুন্দরীকে প্রথমবার দেখেছিল আজিবলাল! দেখে বুঢ়বাক বনে গিয়েছিল। সারারাত ঘরে আলো নেভায়নি, অথবা আলো জ্বালানোর প্রযোজন পড়েনি। এত চমকাই।

সুন্দরী খাটের এক কোণে এসে বসেছিল। দু’চোখে জল। সারারাত আজিবলাল ওকে টাচ করেনি। কিন্তু অনেক কথা বলেছিল। অনেক কথা শুনতে চেয়েছিল। সুন্দরী কোনও কথা বলেনি। শুধু কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে গেল সেদিন, টুপ করে গড়িয়ে গিয়েছিল বিছানায়। আজিবলাল খুব যত্ন করে চোখে-মুখে জল দিল। ওর মাথার কাছে সারারাত জাগল। পরের দিন ফুল টাকা দিল। আর জগৎ সিংয়ের বউকে বলেছিল, ‘সুন্দরী এখন থেকে আমার। ও কোনও কাম করবে না। কোনও ট্রাকে চড়বে না। কোনও হোটেলে যাবে না। ওকে কোথাও পাঠাবি না। আমি টাকা দেব। ও আমার। ওর সঙ্গে আমার বাতচিত হয়েছে। ওর সংসার আমার।’

এমন করে মাস ছয়েক চলেছিল। তারপর সুন্দরীকে নিয়ে চলে এল আজিবলাল। ওর বরকে পুরো টাকা মিটিয়ে। বলেছিল বিয়ে করবে, করেনি। কিন্তু কোনও কষ্ট রাখেনি। শাড়ি, গয়না, টিভি, ফ্রিজ, আদর, ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিল। তবে মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেত সুন্দরী। ডাক্তার দেখিয়েছিল, ডাক্তার বলেছিল, ওর হার্টের বিমার আছে। অপারেশন করতে হবে। সুন্দরী ভয় পেয়ে গেল। বলত হাসপাতাল গেলেই সে মরেই যাবে। সেই মরে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে আজ সে টেনে এনেছিল আজিবলালকে। বলেছিল, ‘এখুনি আসতে হবে। নইলে আমি মরে যাব। আমাকে আর জিন্দা পাবে না। আমার হাঁফ উঠেছে।’

আজিবলাল এসে দেখল হাঁফ নয়, কথা উঠেছে। গিলা পাথর যেমন গড়িয়ে যায়, কলকল জল যেমন চলে। ঝড়ে চাল যেমন ওড়ে। তার থেকে তিরিশ বছরের ছোট সুন্দরী। আজিবলাল দৌড়ে এসেছিল। এসে অন্যদিনের মতোই জড়িয়ে ধরেছিল। আর সুন্দরী শুরু করেছিল তার কথা। আজিবলাল মাঝে মাঝে তাকে থামাতে চেয়েছিল। বলতে চেয়েছিল তার কিছু কথা। হয়তো দারুতৃষ্ণ, হয়তো আলো চমকা, হয়তো খানা লাগা, হয়তো মস্তি সে মস্তি! কিন্তু সুন্দরী শোনেনি। তারপর সেই থেকে বসে আছে আজিবলাল।



তারপর সকালবেলা কাজের মাসি এসে আওয়াজ দিল। কেউ দরজা খুলল না। সে দাঁড়িয়ে থাকল। মোবাইলে কল করল।  ঘরের ভেতর মোবাইল বাজছে। ঘরের ভেতর থেকে ক্ষীণ হয়ে ভেসে আসছে— আ গলে লাগ যা…। সে পাশের ঘরে গিয়ে বলল। তারা এসেও দরজা চাপড়াল। খুলল না। ডাল মে কালা! দু’জন চারজন লোক জমে গেল। মারো দরজায় লাথি, ভাঙো দরজা। দরজায় লাথি মারল। দুটো, চারটে। ছিটকিনি ভেঙে হাট হয়ে দরজা খুলে গেল। সবাই দেখল আজিবলাল বসে। হাত-মুখ নেড়ে এক কথা বলে যাচ্ছে, বা সে বার বার বলার চেষ্টা করছে, ‘মেরা বাত শুন লে সুন্দরী!’

আর সুন্দরী ওর পাশে সেজেগুজে, মাথায় বালিশ নিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে।

ওরা এসে আজিবলালকে থামানোর চেষ্টা করল।

‘আরে, কার সঙ্গে তুমি কথা বলছ আজিবলাল?’

সে থামল না। গিলা পাথরের ধস নেমেছে। নামছে তো নামছে।

‘আরে, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে আজিবলাল?’

সে অন্য কথা বলল না।  

ওরা সুন্দরীকে ডেকে তোলার চেষ্টা করল। সুন্দরী উঠল না।  মরে গেছে। মরে শক্ত হয়ে আছে।

পুলিশ এল। ডাক্তার এল। ডাক্তার এসে বলল, হার্ট ফেল!

‘একটা টাটকা ছাব্বিশ বছরের মেয়ের হার্টফেল হল কী করে?’

সবার খুব সন্দেহ। লাগাও কেস!

‘এই আজিবলালই সুন্দরীকে খতম করেছে।’

ঠিক কথাই, ওরই রাখেল ছিল সুন্দরী। মেয়েটা বর, বাচ্চা ছেড়ে ট্রান্সপোর্টওয়ালা আজিবলালের সঙ্গে চলে আসে। আজিবলালের ট্রাক খাটে। আজিবলাল বলেছিল ওকে বিয়ে করবে। করেনি। রাখেল করেছে। ওর বড় দুঃখ ছিল। খুব কাঁদত। আজিবলাল ওকে ভালোবাসে কিন্তু তা সত্ত্বেও ওকে ধোঁকা দিয়েছে। পুলিশের খুব সন্দেহ। কেস গোলমেলে। আজিবলাল কেন মৃতদেহ পাশে নিয়ে সারারাত বসে থাকল? কেন কাউকে ডাকল না? কেন চিৎকার করল না?

আজিবলাল উত্তর দিতে পারল না। তাই পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গেল। পুলিশ কাস্টডি। বহুত পুছতাছ হল। সুন্দরীর পোস্টমর্টেম হল। ডাক্তারের রায়ই বহাল। একদম স্বাভাবিক মৃত্যু। হার্ট ফেল! আগের দিন দুপুর চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যেই মারা গেছে।

আজিবলালের হিসেব করার মতো মন নেই। সে আসার আগেই কি সুন্দরী শুয়ে ছিল? অথচ আজিবলাল বলেছে, সুন্দরী তার সঙ্গে সেই বিকেল থেকে কথা বলেছে, সারারাত কথা বলেছে, এত কথা বলেছে যে সে কথা বলার কোনও চান্সই পাইনি। বহুত বাত করেছে। বহুত। ভোরে নিদ গেছে। কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আজিবলাল অপেক্ষা করছিল, সুন্দরীর ঘুম ভাঙলে সে কথা বলবে—। তার কিছু কথা বাকি থেকে গেল।

কী কথা? আজিবলাল এখন মনে করতে পারছে না। তার মন নেই। তার মন কথা হয়ে বলা হয়ে গেছে। না কি কিছু কথা বাকি রয়ে গেল?

চিত্রকর: সৌজন্য চক্রবর্তী