১৯৬১ সালসে সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষপূর্তির উৎসব পালন করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে থমথমে পরিবেশে একত্রিত হয়েছিলেন বেশ কিছু বাঙালিকারণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তখন অস্বীকার করেছিল কবিগুরুকেকিন্তু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কিছু রবীন্দ্র অনুরাগী রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রভাবনা অবলম্বন থেকে পরিবর্তন করেননি নিজেদের অবস্থানসেবার রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর সেই আয়োজন বাংলার এ প্রান্তের সংস্কৃতি-সচেতন মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেএই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একজন হচ্ছেন সনজীদা খাতুন

সনজীদা খাতুনের জন্ম ৪ এপ্রিল, ১৯৩৩তিনি একাধারে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ এবং শিক্ষকতিনি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমানে সভাপতিএছাড়া তিনি ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’-এরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যপ্রচলিত ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী একটি শিশুশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নালন্দা’-র সভাপতি

১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মান-সহ স্নাতক এবং ১৯৫৫ সালে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেনপরে ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি লাভ করেন

তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষক হিসেবেশান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হনদীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অবসরগ্রহণ করেন

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেনএর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), দেশিকোত্তম পুরস্কার ( ভারত)এছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাঁকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি প্রদান করে

তিনি মোট ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেছেনতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, ধ্বনি থেকে কবিতা, অতীত দিনের স্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ : বিবিধ সন্ধান, ধ্বনির কথা আবৃত্তির কথা, স্বাধীনতার অভিযাত্রা, সাহিত্য কথা সংস্কৃতি কথা, জননী জন্মভূমি, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ

ছিয়াশি বছর পার করেও তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশেপয়লা বৈশাখে ঢাকার রমনা বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজনের পথিকৃৎ এই গুণীজনের সঙ্গে কথা বলেছেন ঝুমকি বসু

আজকের বাংলাদেশ আর স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়সে সময় রবীন্দ্রসংগীত ছিল পাকিস্তানি শাসকদের কাছে নিষিদ্ধসেই নিষেধের বাতাবরণ ভেঙে কী করে রবীন্দ্রচর্চা করেছেন, সে সম্পর্কে জানতে চাই শুরুতে

’৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পর পর আব্দুল আহাদ (প্রখ্যাত সংগীতকার) ঢাকায় আসেন। তিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষিত। তিনি এসে রেডিওতে কাজ আরম্ভ করেন। রেডিওতে তিনি রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন। অতি সুন্দর করে ভাববিশ্লেষণ করে শেখাতেন। আমরা খুব আনন্দের সাথে গান শিখতাম। তাছাড়া আব্দুল আহাদ যখনই রবীন্দ্র জন্মবর্ষে বা মৃত্যুদিনে অনুষ্ঠান করতেন, যাঁরা ঢাকায় রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন তাদের সবাইকে ডেকে খুব সুন্দর করে অনুষ্ঠানগুলো করতেন। উনি রেডিওতে যে মান বজায় রেখেছিলেন সেটা ছিল খুবই ভালো। কিন্তু ক্রমে ক্রমে একটা সময় এল যখন আমরা দেখতে পেলাম পাকিস্তান সরকার ঠিক চাইছে না যে রবীন্দ্রসংগীত এখানে প্রচার হোক। রেডিওতে শুধু না, বাইরেও গাওয়া হোক, এটাও তারা চাইছিল না। কিন্তু সেটা যে তারা খুব স্পষ্ট করে বলত, এমনও নয়। কিন্তু বুঝতে পারতাম যে মানুষের মধ্যেও একটা অন্য চাহিদা এসেছিল। বড়জোর গিটারে রবীন্দ্রসংগীত বাজালে লোকে শুনত। তবে আমাদের গান গাইবার সুযোগ খুব একটা মিলত না। পঞ্চাশ দশকে একবার— আমার খুব ভালো করে মনে আছে, কার্জন হলে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবন) একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। আমাকে গান গাইতে বলা হল। আমি খুব বিস্মিত হয়ে গেলাম। কী গান গাইব? এমন সময় দেখা গেল সেখানে বঙ্গবন্ধু (শেখ মুজিবুর রহমান)। তখন তো তাঁকে কেউ ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে ডাকেন না— তখনও তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি লোক দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন আমি যেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটা গাই।

আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। এত লম্বা একটা গান! পুরো গানটা আমি কেমন করে শোনাব? তখনও তো সেটি জাতীয় সংগীত হয়নি। যা হোক, আমি তখন চেষ্টা করে গীতবিতান সংগ্রহ করে সে গান গেয়েছিলাম কোনওমতে। জানি না কতটা শুদ্ধ গেয়েছিলাম কিন্তু তাঁর (শেখ মুজিবুর রহমান) এইভাবে গান শুনতে চাওয়ার একটা কারণ ছিল। তিনি যে অনুষ্ঠান করছিলেন, সেখানে পাকিস্তানিরাও ছিল। তিনি তাদেরকে দেখাতে চেষ্টা করছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ কথাটা আমরা কত সুন্দর করে উচ্চারণ করি; সমস্ত গানটার ভিতরে যে অনুভূতি সেটা তিনি তাদের কাছে পৌঁছাবার চেষ্টা করেছিলেন। এবং আমার তো মনে হয়, তখনই তাঁর মনে বোধহয় এই গানটিকে জাতীয় সংগীত করবার কথা মনে এসেছিল।

বাহান্ন সালে যখন আমরা রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করি তখন কিন্তু ওই বাহান্নর পরে পরে শহিদ মিনারে প্রভাতফেরিতে আমরা রবীন্দ্রসংগীত গাইতাম। এবং এইভাবে রবীন্দ্রসংগীত কিন্তু তখন বেশ চলেছে। আরও পরে কেমন যেন একটা অলিখিত বাধা এল। ’৬১ সালে যখন রবীন্দ্র শতবর্ষ হল ততদিনে আমি সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা। কাজেই আমার পক্ষে বাইরের অনুষ্ঠানে গান গাওয়া খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল। রেডিওতে গাইতাম। শতবর্ষ উপলক্ষে ‘তাসের দেশ’ নাটক করা হচ্ছিল মঞ্চে। গান গাইতে হবে। আমি গান গাইতে বসে গেলাম। কিন্তু মুখের মধ্যে একটা রুমাল পুরে দিয়ে আমি গান গেয়েছিলাম। কারণ গলা চিনে ফেললে আমার সরকারি চাকরিতে অসুবিধা ছিল। ওই অনুষ্ঠানে গানটা গেয়ে আমি বেরিয়ে আসছি, আহাদ সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘কে গাইল বল তো? ভালই তো লাগল।’ আমি তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেলাম সামনে থেকে। কারণ আমি গেয়েছি এটা যদি প্রচার হয়ে যায় তাহলে চাকরিতে খুব সমস্যা হবে৷ এইসব দিন তখন আমরা পার করেছি৷ ’৬১ সালে যখন আমাদের অনুষ্ঠান সব পর পর হয়ে গেল, সরকারের লোক এসে সামনে বসে থাকত চেয়ারে৷ দেখত আমরা কী করছি? কিন্তু আমরা অনুষ্ঠান করে গিয়েছি। তারও পরে যেটা হয়েছিল শেষ দিকে, মোনেম খাঁর (তৎকালীন আইয়ুব খানের অনুগত ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনায়েম খান) লোকজন বাধা দেবার জন্য এসেছে এবং কৌশলে আমাদের সেখান থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। আমরা সবাই দ্রুত সেখান থেকে চলে গিয়েছি। পরে মোনেম খাঁর পুত্র এবং অন্যরা এসে ভাঙচুর করেছে। কিছু ফুলের টব ভেঙে চলে গেছে। কাজেই এই বাধাগুলো আমরা দেখেছি।

বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের যে বৈষম্য তার বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদ ছিল পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনসেটি কী করে বাস্তবায়ন করেছেন? ওই সময়ে এ তো রীতিমতো দুঃসাহসিক কাজ!

পয়লা বৈশাখ ছিল আমাদের বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন। পোশাক-আশাকে, আচার-আচরণে বাঙালিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা হত সেদিন। বাঙালির কবিতা, বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির নৃত্যগীতে আমাদের অধিকার চিরন্তন— এসব কথা বলতে, বুঝে নিতে, বুঝিয়ে দিতে রমনার বটমূলের প্রভাতী সমাবেশ। সাতষট্টির সেই পাকিস্তান আমলে বছরের প্রথম দিনের এ উপলব্ধি যে কত জরুরি ছিল তা তাঁরাই মনে করতে পারবেন যাঁরা বাঙালিত্ব ভোলানোর জন্য পাকিস্তানি নিগ্রহ প্রত্যক্ষ করেছেন। পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরো, কলেজ শিক্ষকদের বেতন সে সময় কমই ছিল। তবু সাংবাদিকদের চেয়ে ঢের বেশি। তুলনা করে দেখা যায়, সরকারি মর্নিং নিউজের সাব-এডিটর যেখানে পেতেন ৮০ টাকা বেতন+৪০ টাকা সানডে অ্যালাউন্স, কনভেন্স ছিল ২০ টাকা। কলেজ শিক্ষক যেখানে পেতেন ২৪৮ টাকা+৫০ টাকা ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স। যতদূর মনে পড়ে, সাতান্ন সাল থেকে নিয়ে ষাট সালের পর পর্যন্ত সাংবাদিক ও কলেজ  প্রভাষকদের বেতনের এই পার্থক্য বহাল ছিল। অবস্থা বদল হল ক্রমে। খবরের কাগজের সবরকমের সংবাদ দেশের ভেতর চাউর করে দেয়। তাই সাংবাদিকদের হাতে রাখার পন্থা উদ্ভাবন হতে লাগল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সস্তায় মোটরগাড়ি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হল তাদের। সরকারি জমি বরাদ্দের সুবিধা এল। তারপর বেতনও বৃদ্ধি হল। সে এমনই বৃদ্ধি যে শিক্ষকদের আসন এক ধাক্কায় সাংবাদিকদের চেয়ে কয়েক হাত নীচে নেমে গেল। সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড চালু করা হয়।

এছাড়া সাংবাদিকরা পশ্চিম পাকিস্তানে তো বটেই, বিদেশেও ট্রেনিংয়ের সুবিধা পেতে লাগল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজন বোঝা গেছিল ক্রমে, যখন ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ [১৯৪৮ সালে পাকিস্তান অধিরাজ্য সরকার (মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ) ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা] ইত্যাদি ঘোষণা আমাদের আপন সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট করে দিল। প্রিয় বাংলাভাষা আর বাঙালি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের দিকে চোখ পড়ল তখন ভালো করে। মুসলমান হওয়া যেমন অসত্য নয়, বাঙালি হওয়াও নয় তেমনই অসত্য! কিন্তু শুধু মুসলমান হতে হবে আর বাঙালি সত্তাকে সম্পূর্ণ নিধন করে, আপন ভাষা ভুলে, তবেই হওয়া যাবে খাঁটি পাকিস্তানি— এ বিষয়গুলো শৈশব থেকেই একধরনের পীড়া দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে মুসলমান বাঙালিতে বা পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বিরোধের কিছুমাত্র কারণ না থাকলেও কর্তাদের ইচ্ছায় কর্ম হল, পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বেঁধে গেল দ্বন্দ্ব।

বাঙালির বৈশিষ্ট্যগুলো চিনে নিতে হল বাঙালিকে। কয়েকটি বিষয় ঘিরে বাঙালি মানস পরস্পর সন্নিহিত হল। প্রথমটি তার ভাষা। ভাষার জন্য ভালোবাসা। একুশ ফেব্রুয়ারির স্মারক শহিদ মিনারকে কেন্দ্র করে একত্র হল বাঙালি। দ্বিতীয় বিষয় পয়লা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ বাংলা নতুন বছরের উৎসব আয়োজনটি বাঙালিকে আর এক বিন্দুতে ঘনিষ্ঠ করল।

বাংলাদেশ হওয়ার পর কখনও কোনও বাধা আসেনি?

আসেনি আবার? অনেকবার এসেছে।

কেমন? দু-একটা ঘটনা যদি একটু শেয়ার করতেন…

পঁচাত্তরের (সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা) পটপরিবর্তনের পর একবার আমাদের মঞ্চের পাশে উঠল জগদ্দল চেহারার মঞ্চ। লোকজন জায়গাই পায় না। দুটো মঞ্চের পর আর কতটুকু জায়গা থাকে। তামাশা দেখার ভাব নিয়ে গাছের উপর উঠল অনেক লোক। আমাদের মঞ্চের উপর ছুড়ে ফেলল মরা কাক। তার কিছুক্ষণ পর মোড়ের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল কারা। মাইক্রোফোন বেকার হল। জেনারেটর চালু করতে করতে সময় ব্যয় হল, অনুষ্ঠানের বিশৃঙ্খলা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেবার অনুষ্ঠান শেষে আলমগীর কবির (বাংলাদেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব) এসে বলেছিলেন, ‘আপনি চালিয়ে যান… থামবেন না… আমরা আছি।’ আরেকবার বিকেল থেকে টেলিফোন আসতে শুরু হল, ‘যাবেন না, মঞ্চে যাবেন না, নীচে টাইম বম্ব রাখা আছে। সাবধান!’ তারপর মনে হল পুলিশে খবর দেওয়া যাক। টাইম বোমা আছে কিনা তা চেক করে দেখার দায়িত্ব তো পুলিশের। ফোন করে হয়রান হয়ে জানা গেল, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে শিশুদের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকবেন বলে পুলিশ ফোর্স সব সেখানে নিয়োজিত হয়েছে। আমাদের জন্য পুলিশের ব্যবস্থা করা যাবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় তাদের ওপর বর্তাবে বলে ফোন রেখে দিলাম। ভোরে ছায়ানট সম্পাদক ফরিদা হাসানের সঙ্গে কথা হল। এত ছেলেমেয়ের দায়িত্ব নেবে কে? তিনি নিষেধ করলেন ‘বটমূল’-এ যেতে। কিন্তু মনকে মানাব কী করে? গুটি গুটি গিয়ে হাজির হলাম সকালে। মজার কথা, সম্পাদক নিজে গেছেন সেখানে ঠিকই! ছেলেমেয়েদের ঘুণাক্ষরে কিছু না জানিয়ে মঞ্চে গিয়ে বসলাম। পুলিশ ছিল। তারা মঞ্চের তলাটা ভালো করে দেখেছে বলল। অনুষ্ঠান শেষে সম্পাদককে বললাম, দেখলেন তো, ভয় না করে ভুল হয়নি।

যে বছর মঞ্চের তলায় বোমার কথা বললাম তার পরের বছর মার্চের শেষে জারি হল সামরিক আইন। নববর্ষ উৎসবের মহড়া চলছে। কিন্তু সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি পাওয়া যাবে কোত্থেকে! পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না কিছু। বিমান বাহিনীর প্রধান সুলতান মাহমুদ সাহেব আমার পূর্বপরিচিত ছিল। তার পরিচিত এক ব্যক্তির সূত্রে জানা গেল যে, তিনি বলেছেন, এ অনুষ্ঠান না হওয়ার কী আছে? তিনি নিজে প্রতিবার রমনা বটমূলে আসেন! যা হোক, শেষ পর্যন্ত অনুমতি মিলল। সেই নববর্ষে অনেক রাজনৈতিক নেতা রমনায় উপস্থিত হয়েছিলেন। জমায়েত হওয়ার এমন সুযোগ পাওয়া যাবে কেউ ভাবতে পারেনি। পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা আমাদের কয়েকবার বিব্রত করেছে। এখন মনে হয় সবাই বুঝেছে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সমবেত হওয়াটাই বড় কথা। এই দিন বাঙালিত্বের শপথ নেওয়াটাই জরুরি।

আপনি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্বরত আছেসেই ছায়ানটের গোড়ার ইতিহাসটুকু জানতে আগ্রহী

বাহান্ন সালে যখন ভাষা আন্দোলন হয়েছে তখন তো মোটামুটি কাছাকাছি থেকেই জেনেছি। একুশ ফেব্রুয়ারি ক্লাসের পর বাড়ি চলে এসেছি। বিকেলবেলায় শুনলাম গুলি হয়েছে। আজাদ পত্রিকার সান্ধ্য-সংখ্যা বেরিয়েছিল। সেটায় দেখলাম, মেয়েদের একটা সভা হবে ২২ ফেব্রুয়ারি কামরুন্নেসা স্কুলের গলিতে। টিকাটুলিতে। আমার মা আমাকে নিয়ে ভয় পেতেন। আমি যাচ্ছি শুনে তিনিও আমার সঙ্গে গেলেন। পথে সেনারা পা দাপিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। মা উলটো দিকে দৌড় দিচ্ছেন। আবার এগিয়ে যাচ্ছি। সেই সভায় আমি জীবনের প্রথম বক্তৃতা করি। আমি বলি, একুশ আমাকে ভাষা দিয়েছে। আমার মা ভয় পেয়ে আমার সঙ্গে গেলেন অথচ তিনিই হলেন সেই সভার সভাপতি। সেই সভায় অনেক নারীনেত্রী ছিলেন কিন্তু রক্তপাতের আশঙ্কায় কেউই সভাপতি হতে রাজি হননি।

ঐতিহাসিক রমনার বটমূল। স্মৃতিবিজড়িত সেই স্থানে একাকী হাঁটছেন সনজীদা খাতুন।

১৯৬১ সালে আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ পালন করব বলে। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (মননশীল প্রবন্ধকার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবী) চিঠি দিয়েছিলেন আমাকে যাওয়ার জন্য। জি সি দেবের (গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জি সি দেব নামেই সমধিক পরিচিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনবিদ্যার অধ্যাপক) বাড়িতে এই সভা হয়েছিল। তারপর সবাই মহড়া করছে। ডাক্তার নন্দীর (খ্যাতিমান চিকিৎসক ডাক্তার মন্নথনাথ নন্দী) বাড়িতে রিহার্সাল হচ্ছে। আমি সেই রিহার্সাল দেখতাম। শ্যামার মহড়া দেখতাম। মাঝেমধ্যে বলতাম, এই জায়গাটা এ রকম না। শ্যামা যখন প্রেমের ভাবে গান গাইছে ‘নহে নহে এ নহে কৌতুক’ তখন যে মেয়েটি নাচছে, সে খুব বিষণ্নভাবে নাচছে। বললাম, না, এটা বিষণ্ন নয়। ও একটু ছলের ভাবে ঘুরে ঘুরে নাচছে। তো, বুঝেছিল তারা কথাটা। র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে মোখলেসুর রহমান সিধুভাইয়ের  (সাংস্কৃতিক-সংগঠক) বাড়িতে যেতাম। সরকারি চাকরি করি, তাই ওয়াহিদুল হকের (লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি রবীন্দ্রসংগীতে বিশেষজ্ঞ বলে খ্যাতিমান ছিলেন) পিছনে পিছনে আমি থাকি। হঠাৎ একবার দেখা গেল, চিত্রাঙ্গদার গান গাওয়ার কেউ নেই। বাফা (বুলবুল ললিতকলা একাডেমি) থেকে চিত্রাঙ্গদা হবে। দু’দিনের নোটিশে গান তৈরি করে আমাকে গাইতে হল। কোনওরকমে সে যাত্রা উত্তীর্ণ হলাম। এসব অনুষ্ঠানের পর সিধুভাই বললেন, ‘চলো আমরা সবাই মিলে একটা সংগঠন গড়ি, না হলে হবে না।’

জয়দেবপুরে গিয়েছিলাম আমরা বনভোজনে। খাওয়াদাওয়া করলাম। সিধুভাই বলে উঠলেন, আমি যেন এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক হই। বললাম, সিধুভাই, আমি সরকারি চাকরি করি, আমি পারব না। সাধারণ সম্পাদক হলেন ফরিদা হাসান, সাইদুল হাসান সাহেবের স্ত্রী।

ছায়ানটে প্রথমে শ্রোতার আসর হত। প্রথম আসরে গাইলেন ফিরোজা বেগম (বাংলাদেশের প্রথিতযশা নজরুলসংগীত শিল্পী)। দ্বিতীয়টায় গাইল আমার বোন ফাহমিদা। এরপর বারীন মজুমদার, ইলা মজুমদার। কখনও সেতার বাজালেন খাদেম হোসেন খান। এরকম হয়েছে। এগুলো হওয়ার পর একসময় অনুভব করলাম, আর বিশেষ শিল্পী নেই যাঁদের দিয়ে গান গাওয়াব। আমি কিন্তু কখনও গাইতাম না। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা করতাম। ওয়াহিদুল হক বলে বসলেন, ‘আমরা একটা স্কুল করব।’ এ কথা সভায় পাশ করানো কঠিন। হাতে তো নেই কানাকড়ি। চলে সিধুসভাইয়ের টাকায়। ওয়াহিদুল হক বললেন, ‘আমরা সবাই চাঁদা দেব।’ আস্তে আস্তে কে কত দেবেন, কথা হল। প্রস্তাবটা পাশ হয়ে গেল। এভাবে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন হল। সেই সংগীতবিদ্যায়তনে আমরা যে কেবল রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করেছি, তা নয়। ততদিনে আমরা বুঝেছি, বাঙালি সংস্কৃতিটাই একটা বিপদের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানিরা আমাদের পাকিস্তানি মুসলমান বানাতে চায়, বাঙালি বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। এটা বুঝতে পেরে আমরা আমাদের স্কুলে নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নানা রকম যন্ত্র, রাগসংগীত শুরু করলাম। স্বাধীনতার পরে শুরু করলাম পল্লিগীতি। গণসংগীতেরও চর্চা করতাম। শেখ লুৎফর রহমান (বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার) আমাদের এখানে এসে অনেক গণসংগীত শিখিয়েছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চের পর আমরা তো পালিয়ে ভারতে চলে গেলাম। ওখানে যাওয়ার পর আমরা কিন্তু লুৎফর ভাইয়ের সুর করা গান ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘বিপ্লবের রক্তরাঙা ঝাণ্ডা ওড়ে’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’ ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’ এই গানগুলোর চর্চা করি। তারপর শিল্পী রফিকুল আলম— ওর বড় ভাই সারওয়ার জাহান এল। তখন ওরাও গান করল। এমনি করেই পুরো দেশের রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতিকে মিলিয়ে একটা নতুন জিনিস দাঁড়াল। কলকাতায় আমরা একটা দল করেছিলাম। ‘রূপান্তরের গান’ নামে একটা গীতি আলেখ্য হয়েছিল। লিখেছিল শাহরিয়ার কবীর (খ্যাতনামা লেখক, সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা)। জহির রায়হান (প্রখ্যাত বাংলাদেশি চলচ্চিত্র পরিচালক, কথাসাহিত্যিক) ‘স্টপ জেনোসাইড’ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সে আলেখ্য অনেক পরিবর্তন হয় পরে। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান করি। আমাদের অনুষ্ঠানে এসে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র সবাই গেয়েছেন। এই করে আমরা কিছু টাকা তুলি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেখানেই গান গাইতাম, সে টাকা এনে কেন্দ্রীয়ভাবে জমা দিতাম। এভাবে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে।

ষাটের দশকে রমনার বটমূলে ছায়ানটের পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন।

নববর্ষ পালনের প্রথম ভাবনাটি কীভাবে বা কার কাছ থেকে এল?

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সাল থেকে। তার চার বছর আগে, মানে ১৯৬৩ সালে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন চালু হয়েছিল। প্রথম প্রথম পয়লা বৈশাখের মঞ্চে বিদ্যায়তনের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের প্রায় সবাইকেই জায়গা দেওয়া চলত। আর একক গানের জন্য শিল্পীদের সংগ্রহ করতে হত বাইরে থেকে। কলিম শরাফী, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, মালেকা আজিম খান, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, চৌধুরী আবদুর রহিম, পাকিস্তানের শেষদিকে আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সরকারের বিরাগভাজন আমলা শামসুর রহমানের পত্নী আফসারি খানম-সহ আরও কতজন! তবে প্রথম যখন রমনা বটমূলে অনুষ্ঠান শুরু করি তখন বটমূলের গোড়ায় বাঁধানো একটু বেদিই ছিল সম্বল। পরে চৌকি জুড়ে খানিকটা বাড়িয়ে নেওয়া হত। প্রথম দু’বারের অনুষ্ঠানে গাছ থেকে শুঁয়োপোকা ঝরে পড়েছে যত্রতত্র। গুরুজনদের ভয়ে শিক্ষার্থীরা বসে থেকেছে মাথা গুঁজে। দ্বিতীয়বার ছাত্রছাত্রীদের হাতে পোকা সরানোর জন্য এক একটা কাঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারও ঘাড়ে পোকা লেগে লাল চাকা বেঁধে গিয়েছিল।

বর্তমানে যেভাবে নববর্ষ পালিত হচ্ছে তা কতখানি আপনার ভাবনার সঙ্গে মেলে?

আমি জানি, যতটা হওয়ার কথা তা হয়নি। বাঙালিত্ব কাকে বলে সেটা বেশিরভাগ মানুষই জানে না এবং বাঙালিত্ব বুঝবার চেষ্টাও কারও নেই। এজন্যই গালে পতাকা এঁকে, বাউলের একতারা এঁকে হুল্লোড় করে তারা মনে করে পয়লা বৈশাখের আনন্দ করছি, বাঙালি হচ্ছি। ওর সঙ্গে বাঙালিত্বের যোগ কোথায়? আসলে বাঙালিত্বের ধারণাটা আমাদের নেই। আমি খুব দুঃখের সঙ্গে বলব, রাষ্ট্রীয়ভাবেও নেই, আমাদের নিজেদের ভেতরও সবার নেই। তবে আমি মনে করি, আমরা হতাশ হব না। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের করতে হবে। আমাদের কাজ হচ্ছে গঠনমূলক কাজ করা। সংস্কৃতিচর্চায় মানুষের মনের উৎকর্ষ সাধন আমাদের উদ্দেশ্য এবং আমরা মনে করি, মনের উৎকর্ষ সাধন হলে মানুষ কাউকে বধ করতে আসবে না। মনটা যদি তৈরি থাকে এবং মনের সঙ্গে সংস্কৃতির সংযোগ হয় তাহলে মানুষ বদলে যায়।

এখন তো সব কিছুতেই ফিউশন হচ্ছে, এমনকি সংগীতেও।

আসলে কী জান, মানুষ একটু হুজুগপ্রিয়। কিন্তু বাঙালিত্ব কাকে বলে সেটা কখনও ভেবে দেখে না। আমি জানি, অনেকে গর্ব করে বলবে, ফিউশন মিউজিক, ওটা তো আমরাই করেছি। কিন্তু ফিউশন মিউজিকে আমরা যাব কেন? আগে তো আমাদের বাঙালি হতে হবে, তারপরই না ফিউশন। আমাদের জানতে হবে, আমাদের সংস্কৃতিটা কী? বাইরের সংস্কৃতিটা কী? তখন আমি দুটোর মধ্যে যদি কোনও মিল করতে চাই, সেটা আমি দেখব। কিন্তু আগে আমাকে বাঙালি হতে হবে। এই কথাটা আমি বলেছি। যেমনটা বলেছেন গুরুসদয় দত্ত। রবীন্দ্রনাথও বারবার বলেছেন। এবং এটাই আদর্শ ধরে আমরা এগুতে চাই। তবে ইদানীং যেটা বুঝি, কেবল বলে, কেবল গান গেয়ে কিছু হয় না। ২০০১ সালে যখন রমনায় বোমা বিস্ফোরণ হল তখন আমরা বুঝেছিলাম, শিক্ষার প্রয়োজন আছে। আমাদের দেশটা শিক্ষা বঞ্চিত এবং সব কাজে যদি রাষ্ট্রের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি তাহলে আমরা ব্যর্থ হব। এগুলো আমাদের নিজেদের দায়িত্ব বটেই এবং সেই শিক্ষার কতটুকু আমরা করতে পারি? একটা-দুইটা স্কুল করতে পারি। কিন্তু শহরের মধ্যে স্কুল করে গ্রামের কোনও উপকার করতে পারছি না! এজন্য আজকাল মনে হয়, ছোট ছোট দলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কথাবার্তা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মানবতা, ধর্মের নামে আমরা যে অন্যায়গুলো করছি সেইসব কথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাক। আমাদের সাধ্য নেই যে আমরা সবাইকে লেখাপড়া শেখাব। সেটা আমরা পারব না। কিন্তু সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে কাজ করার অনেক সুবিধা আছে। সাধারণ মানুষের কাছে সংগীতের কিন্তু একটা অন্য মূল্য আছে। এটা আমরা জানি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তার নাম মোহাম্মদ শাহ আলম বাঙালি। তিনি সবসময় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে গান তৈরি করতেন। গানগুলো গাইতেন রেডিওতে।

আমাদের কয়েকজন বুদ্ধিজীবী একবার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াতে গিয়ে মঞ্চে বক্তৃতা করল। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা, অর্থনৈতিক নানা নিয়মকানুনের কথা। সেই বক্তৃতার সময় অসংখ্য মানুষ সামনে বসে ছিল। কিন্তু তাদের চোখে আলো নেই। সবাই চুপ করে আছে। কিন্তু কিছুই শুনছে না। চোখে আলো জ্বলছে না। সেই সময় ওদের বক্তৃতা শেষে মোহাম্মদ শাহ বাঙালি দাঁড়ালেন এবং কী ক্ষমতা তার! যা কিছু বলা হয়েছে মঞ্চে বক্তৃতায় সেগুলো তিনি গান গেয়ে বুঝিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল, তারা বুঝল, কী বলা হয়েছে এতক্ষণ। এই যে সুরের সম্মোহন, সেটাই আসল।

আর একটি কথা। আমাদের ভাষায় কথা বললে গ্রামের মানুষ বোঝে না। আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। সেই জন্য রাঙ্গুনিয়ায় যখন মোহাম্মদ শাহ বাঙালি এইসব তত্ত্ব তুলে ধরলেন তখন কিন্তু তারা সব বুঝতে পারে। এজন্য বলি, আমরা যদি ওইভাবে কিছু করতে পারতাম!

রমনার বটমূলে সাম্প্রতিক সময়ে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান।

পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন? এটা নিয়ে ইদানীং বেশ বিতর্ক হচ্ছেএটা তো বাঙালি সংস্কৃতি নয়বরং দরিদ্রদের একরকম উপহাসের শামিল

তোমার সঙ্গে একমত। বিষয়টি একটু পেছন ফিরে বলা যাক। রমনা বটমূলের কাছ ঘেঁষে আমাদের অনুষ্ঠান এবং দর্শকদের প্রায় ঠেলে অনেক দোকান বসত। সেই দোকানগুলোতে পান্তা-ইলিশ খাওয়ানো হত। বিক্রি করা হত। এই ব্যবসাটা করত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ব্যবসাটা আমাদের ঘাড়ে দোষ হিসেবে এসেছে। আমরা নাকি গ্রামের মানুষকে বিদ্রূপ করতে এসব করি। আমরা এটা করিওনি এবং এই বিদ্রূপ করবার কোনও বাসনাও আমাদের নেই। আমরা সেটা করব না। কারণ গ্রামের মানুষের নববর্ষ কিংবা হালখাতার নববর্ষ আর শহরের এই নববর্ষের একটা পার্থক্য আছে। এটা সবাইকে বুঝতে হবে। আমরা যে পয়লা বৈশাখ করছি, এটা বাঙালি জাতির জাগরণের ব্যাপার। আমরা সেটাকে বড় করে তুলে ধরেছি। আমাদের স্বাধিকার চেতনাকে আমরা মানুষের কাছে জানিয়েছি। এগুলো কিন্তু ছোট কথা নয় এবং এগুলোর সঙ্গে হালখাতা এবং গ্রামের যে মেলা হয় নববর্ষ উপলক্ষে তার সঙ্গে কোনও মিল নেই। এটা একেবারেই নতুন একটা বিষয়। যারা বোঝে না তারাই বিদ্রূপ করে। অনেকেই লিখেছে, পোস্ট এডিটরিয়াল ছেপেছে, এরা সব ঢং করে। এই কথাগুলো আমাদের শুনতে হয়েছে। কিন্তু এসব কথায় আমরা কান দেইনি এবং যেটা বুঝেছি, ভেতরে দোকান বসলে দর্শকদের অসুবিধা হচ্ছে। দোকান বসলে ওখানে যে বাজারটা তৈরি হচ্ছে, সেই বাজার আমাদের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। সেজন্য আমরা যেটা করেছিলাম, সরকারের কাছে গিয়ে বলেছিলাম যে ভেতরের দোকান বসার অনুমতি কিছুতেই দেওয়া যাবে না। সরকার মেনে নিয়েছিল এবং তারপর বাইরে চলে গেল দোকান। বাইরে চলে গেল পান্তা-ইলিশ। আর একটা প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে অনুষ্ঠান করত। তারা ভেতরে নিজেদের জায়গা করে সেখানে পান্তা-ইলিশ করত। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল না। পান্তা-ইলিশ নববর্ষে খায়, এই কথা আমরা কখনও শুনিনি।

আবার  রবীন্দ্রনাথের গান প্রসঙ্গে আসা যাকএই সংগীতকে কী করে আপনারা গণমানুষের সংগীতে পরিণত করেছেন?

সেই ৬৫ সালে যখন যুদ্ধ হয়েছিল পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে, সেই সময়ে— যুদ্ধের আগে আমরা শিলাইদহে গিয়ে গান করেছিলাম। ২২শে শ্রাবণ পালন করেছিলাম। আমরা জানতাম গ্রামের লোকে রবীন্দ্রসংগীত শোনে না, পছন্দ করে না। কিন্তু পাগলের মতো এসেছিল সেদিন হাটের লোক। সেদিন হাটবার ছিল। এসে গান শুনেছিল তারা। এই পরিস্থিতিটা আমাদের দিনে দিনে বুঝিয়ে দিয়েছিল, রবীন্দ্রসংগীত কেবল উচ্চবিত্তের গান নয়। সেটা সবাই নিতে পারে। কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের সুরে এমন কিছু আছে, এমন লোক উপাদান আছে এবং আরও কিছু আছে, তার ভাষা এত সরল যে সাধারণ মানুষ তা নিতে পারে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রবীন্দ্রসংগীতচর্চার ক্ষেত্রে যেন বাঁধ ভেঙে যায়। তখন কোনও ঝুঁকি নেই, কোনও মানা নেই। আছে গাওয়ার সুযোগ এবং গানের কদর। ফলে গায়ক-গায়িকার দল ভারী হতে লাগল। গান থাকল, কিন্তু মান বোধহয় থাকল না।

সেটা কেমন?

বাংলাদেশ হবার পরে যে-না-সে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে আরম্ভ করেছিল। রবীন্দ্রসংগীত গাইলে বুঝি খুব আদৃত হব— এই একটা বিশ্রী জিনিস হয়েছিল যাতে রবীন্দ্রসংগীতের গুণের কোনও প্রকাশ পেত না। তারপর আস্তে আস্তে চর্চা বেড়েছে। অনেকে শান্তিনিকেতনে গিয়ে শিখেছে। এখানে যারা থেকেছে তারাও যথেষ্ট যত্ন দিয়ে গান গেয়েছে। যেমন প্রয়াত বিলকিস নাসিরুদ্দিন কিংবা মালেকা আজিম খান, আব্দুল আহাদ, কলিম শরাফী। এঁরা যেসব গান গেয়েছেন তার মধ্যে যে দরদ, তার মধ্যে যে রবীন্দ্র ভাবনার, রবীন্দ্র অনুভূতির যে গভীরতার প্রকাশ তার তো কোনও তুলনা নেই। তার পরে যারা নতুন এল, যেমন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, অত্যন্ত আদৃত শিল্পী। পাপিয়া সারওয়ার তার আগের। কিন্তু সবার গান যে আমরা ভালো বলতে পারি, তা নয়।

রবীন্দ্রসংগীতের একধরনের আধুনিকীকরণও চলছে ব্যান্ড-সংগীত আর বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রের দৌলতে৷ এই নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

অদ্ভুত একটা আধুনিকতা ভর করেছে কলকাতার গানকে। মাথা নেড়ে নেড়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বিশ্রী করে গান গায়। সেজন্য সবার গান যে পছন্দ করতে পারি, তা না। কিন্তু অনেকেই রবীন্দ্রসংগীত ভালো গাইত। এখনও বন্যা গায়, মিতা হক আছে, লাইসা আহমদ লিসা আছে। এরকম অনেকেই এখন ভালো গাইছে। কিন্তু সবাই যে নির্বিশেষে ভালো গাইছে এমন বলা আমার পক্ষে কঠিন হবে। কারণ আমি শিক্ষক মানুষ তো, সব কিছুকে নিতে পারি না। রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় যেহেতু এখন বিশ্বভারতীর যে নিষেধাজ্ঞাটা ছিল— যে যা খুশি তাই করবে না, সেটা উঠে গেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এখন অনেকেই অনেক কিছু করে ফেলতে চেষ্টা করবে— কি ভারতে, কি বাংলাদেশে। এই জিনিসগুলো আসবে একটা স্রোতের মতো। সেই স্রোতটা চলে যাবে। আমাদের চারপাশে যারা সাধনা করছে তারা কিন্তু ঠিক জিনিসটাকে ধরে রাখবে। এটাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। খারাপটা বয়ে চলে যাবে স্রোতের মতো। এটা আমার বিশ্বাস।

আপনার ব্যস্ততম সময়ের মধ্যেও যে সময়টুকু আমাদের দিলেন, তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ

তোমাকেও ধন্যবাদ। দ্য ওয়াল-এর জন্য শুভ কামনা।