বই-চিত্রময় বইমেলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    গৌতমকুমার দে

    বই-চিত্রময় বইমেলা। প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এবং লিটল ম্যাগাজিন বের করছে বইমেলা উপলক্ষে তাদের বই বা পত্রিকা। পানপাতিয়া-খ্যাত তপন পণ্ডিতের লেখা ‘অসীম নিঃশব্দে হিমালয়’ বইটি পুনঃপ্রকাশিত হল গতকাল। প্রকাশক: যারা যাযাবর। এতে পড়বেন, হাড়হিম করা রোমাঞ্চকর লুপ্ত-লুপ্তপ্রায় এমনকী সদ্যআবিষ্কৃত ট্রেক রুটের কথা ও কাহিনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সিনেমায় দেহপসারিনীর ভূমিকায় অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেওয়া মিস শেফালি প্রয়াত হয়েছেন গতকাল। সুখের কথা, এই নৃত্যশিল্পী-অভিনেত্রী চলে যাওয়ার আগে অন্তত জানলেন, তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত দ্বিতীয় বইয়ের কথা। ‘কলকাতার ক্যাবারে, বাঙালির যৌনতা এবং মিস শেফালি’– বইয়ের রূপকার ঐশিকা চক্রবর্তী। এ বই নারীর কলমে নারীর অন্তরঙ্গ কথা। সেই সঙ্গে সমকালীন সময়-সমাজের প্রেক্ষাপটেও শেফালিকে ধরার সাধু প্রয়াস। প্রকাশক: গাঙচিল। শেফালির চলে যাওয়া আর ঠিক অব্যবহিত আগে তাঁকে নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী বই প্রকাশ– দু’য়ের কী আশ্চর্য সমাপতন!

    ইনস্টিটিউট অব সোশাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ (কলকাতা) থেকে বেরিয়েছে গৌতম বিশ্বাসের সম্পাদনায় ‘যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ সংকলন’। সুসান অরলিন-এর গবেষণাধর্মী লেখা ‘দ্য লাইব্রেরি বুক’ পাওয়া যাচ্ছে ওয়ানওয়ার্ল্ড-এর স্টলে। ইতিহাস, অপরাধ, জীবনী এবং তুখোড় অন্তর্ভেদী সাংবাদিকতা– এ সবের অনবদ্য মিশেলে লেখা।
    ৯ঋকাল থেকে বেরিয়েছে একগুচ্ছ নতুন বই: সামরান হুদা ও দামু মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘দুই বাংলার পাইস হোটেল’, সামরান হুদা ও সুমেরু মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘বাজার ভ্রমণ’, শ্রাবস্তী ঘোষের সম্পাদনায় অন্য ধরনের জরুরি প্রকাশ ‘লেডিজ টয়লেট’ প্রভৃতি। শেষোক্ত বইটিতে পড়বেন নানান পেশার মহিলাদের কলমে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে টয়লেট-এর সঙ্গে নারীদের সম্পর্কের বয়ান। খাদ্যরসিকদের জন্য সুখবর, চৈতালী চ্যাটার্জীর ‘লাতিন দেশের রসনা’ পাওয়া যাচ্ছে ‘কলিকাতা লেটার প্রেস’-এ।

    কলকাতা বইমেলায় এই প্রথম, সাইকেল আরোহীদের জন্য সাইকেল স্ট্যান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে ১ নম্বর গেটের কাছে। প্রসঙ্গত, কলকাতা সাইকেল সমাজের মুখপত্র ‘সাইকেল ও সমাজ’ আত্মপ্রকাশ করল আজ দুপুরে বইমেলার মাঠে।
    ‘ভাগাড়’! একটি লিটল ম্যাগাজিন। সম্পাদক দীপ হাওলাদার। পত্রিকার বইমেলা সংখ্যাটি অভিনব তার অঙ্গসজ্জা এবং উপস্থাপনার ধরনে। একটা খামের মধ্যে রয়েছে বাঙালি সংক্রান্ত পাঁচটা ফোল্ডার। বিষয়: বাঙালির বিজ্ঞাপন/ রবীন্দ্রনাথ/ আড্ডা/ বিপ্লব এবং লিটল ম্যাগাজিন।
    মেলায় গেলে কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি দেখা মিলবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতি ও গুণীজনদের। যেমন গতকাল দেখলাম বিশিষ্ট অভিযাত্রী বিমানবিহারী কাহালীকে। অসম্ভব প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর মধ্য-সত্তরের এই নিভৃতবাসী মানুষটি ছুটে যান হিমালয়ের জানা-অজানা গিরি-কন্দরে, পথে-প্রান্তরে। সময় পেলেই পৌঁছে যান ছোটদের নেচার ক্যাম্পে।

    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যর অনুবাদে ফিলিপ মিডোজ টেইলর-এর অধুনা দুষ্প্রাপ্য ডায়েরি বেরিয়েছে বাংলায় ‘বন বন্দুকের ডায়েরি’ নামে, সুচেতনা থেকে। বইমেলা টানা পাঁচদিন প্রাণভরে উপভোগ করলেন বিশিষ্ট রুশ লেখক ইউজিন ভোডোলাজকিন।
    বইমেলার এসবিআই অডিটোরিয়ামে চলছে সাহিত্য উৎসব। গতকাল সন্ধ্যায় নবনীতা দেবসেন স্মারক বক্তৃতা দিলেন নন্দনা দেবসেন। বিষয় ছিল শিশুসাহিত্য। প্রসঙ্গত, এ বার বইমেলায় দু’টি হলের মধ্যে একটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। অপরটির নাম গিরীশ কারনাড।
    ভানু-জহরের শতবর্ষ উদযাপন হল একই মঞ্চে। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়।

    বইমেলায় গিল্ড অফিসের সামনে এবং অন্যত্রও প্রতিদিনই লক্ষণীয়ভাবে চোখে পড়ছে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী মিছিল, পোস্টার প্রদর্শন, স্লোগান। হোক না বইমেলা, অস্তিত্বের সঙ্কট বলে কথা। সুতরাং, তাকে চেপে রাখা যায় না কোনও বিধিনিষেধেই। এই নিয়ে যে দু’টি উগ্র হিন্দুত্ববাদী বলে পরিচিত স্টল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদেরই একটি স্টল থেকে ‘গীতা’ বিক্রি হচ্ছিল এক কিশোরীকে রাধা সাজিয়ে! এক্কেরে প্যাকেজ-সার্কাস!!

    গত দু’-তিনদিন ধরেই গিল্ডের তরফে মেলার স্টলহোল্ডারদের উদ্দেশে জানানো হচ্ছিল, আগাম বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, অতএব আপনারা আপনাদের স্টলকে সুরক্ষিত রাখতে আগাম ব্যবস্থা নিন। হায়! এ তো অনেকটা সে রকম– যে গৃহস্থকে সাবধান করে চোরকে চুরি করতে বলে! টাকা নিয়ে, হিসেব বুঝে নিলে স্টলহোল্ডারদের থেকে আর স্টলগুলোকে বানালে এমন কায়দায়, যাতে স্টলে বসেই আকাশ পর্যবেক্ষণ করা যায়। আর, বৃষ্টি হতে পারে বলে এখন সাবধান করছ। তা এই বারিধারা-রোধে বাড়তি টাকাটা কোত্থেকে পাবেন প্রকাশক-বইবিক্রেতারা? সে কথা ভেবেছেন একবার গিল্ডের কর্তারা? আসলে, ওনাদের নজরটা সর্বদা উঁচুর দিকে কিনা। এ সব ছোটখাট ব্যাপার ওনাদের বিচারে ‘তুশ্চু’। গিল্ডের তরফে আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তাতে খুব একটা ভরসা পাচ্ছেন না স্টলমালিকরা।

    বইমেলায় আপনমনে কখনও পাঠক-পাঠিকা পরিবৃত হয়ে ঘুরতে দেখা গেল সাহিত্যিক অমর মিত্র, জয়ন্ত দে, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিমন্যু ঘোষ, সুবোধ সরকার, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি প্রমুখকে।
    গতকাল ‘আই লাভ কলকাতা বুক ফেয়ার’ মঞ্চে হল বাম্পার লটারি। লটারিতে প্রথম পাঁচজনের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ২৫,০০০ টাকা বই উপহার কুপন। সেখানে প্রথম ও শেষ দু’টি কুপন তোলেন লন্ডন প্রবাসী সাহিত্যিক ড. নবকুমার বসু এবং তাঁর স্ত্রী রাখী বসু। মজার ব্যাপার, প্রথম ও পঞ্চম লটারি-বিজেতা একই ব্যক্তি– দেবব্রত চট্টোপাধ্যায়। নিঃসন্দেহে, তিনিই এ দিনের লটারির বাম্পার হিরো। যদিও নামঘোষণার সময় তাঁকে পাওয়া গেল না। হয়তো তখন কোনও স্টলের কোনায় বইয়ের পাতায় নিবদ্ধ ছিল এই গ্রন্থকীটের চোখ-মন।

    মেলার সহনীয় ভিড়ে গতকাল দেখা গেল এক অভাবনীয় দৃশ্য। অশীতিপর এক পাঠক-দাদু কমলসুন্দর সরখেল এসেছেন তাঁর কলেজপড়ুয়া নাতনির সঙ্গে। বাড়ি বনগাঁয়। ঘনঘন ইনহেলার নিতে হচ্ছিল। এই অবস্থাতেও তাঁর কাঁধের ব্যাগটি নুয়ে পড়ছিল বইয়ের ভারে। সঙ্গী নাতনির পিঠের ব্যাগটিও ঠাসা বইয়ে! দাদু কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। নাতনি বললেন, যাই হোক না কেন, দাদু বইমেলায় আসবেই। সঙ্গের সব বইয়ের ক্রেতাই দাদু একলা। এ বারেই বাংলা-সংস্কৃত-ইংরেজি মিলিয়ে কিনেছেন প্রায় আট হাজার টাকার বই!!!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More