অ্যাটল্যান্টিকে ভাসছে বিতর্কিত ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র ‘সিল্যান্ড’, রক্তাক্ত লড়াই যার অণু-পরমাণুতে

আজও দেশটির নাগরিকদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, অ্যাটল্যান্টিকের হাড়কাঁপানো ঝোড়ো হাওয়া, আক্রমণের আশঙ্কা ও রাইফেল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ইংল্যান্ডের এসেক্সকে ছুঁয়ে থাকা অ্যাটলান্টিকের জলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল অসংখ্য দুর্গ। সমুদ্রের ভেতর দুটি পিলারের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গগুলি তৈরি করা হয়েছিল  শত্রুপক্ষের বোমারু বিমানকে গুলি করে নামানো ও সমুদ্রের জলে মাইন পাতার জন্য। বিশ্বযুদ্ধের পর পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল দুর্গগুলি। হয়ে উঠেছিল অপরাধীদের আখড়া। ষাটের দশকে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দুর্গগুলিতে চালু করেছিলেন অবৈধ রেডিও স্টেশন। ইংল্যান্ডের যুবসম্প্রদায়কে পপ মিউজিক শুনিয়ে বিজ্ঞাপন থেকে বিপুল মুনাফা করত রেডিও স্টেশনগুলি।

অ্যাটলান্টিকের বুকে থাকা ব্রিটেনের দুর্গ।
মেজর রয় বেটস

মেজর রয় বেটস ছিলেন ব্রিটিশ সেনা অফিসার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লড়াই করেছিলেন ইতালি ও আফ্রিকাতে।  বিশ্বযুদ্ধের পর,মেজর বেটস ঠিক করেছিলেন, তাঁর সব ব্যবসা গুটিয়ে রেডিও স্টেশন বানাবেন। তাই মেজর বেটস, ১৯৬৪ সালে দখল করে নিয়েছিলেন, ‘নক জন’ নামে একটি সামুদ্রিক দুর্গ।

সেখানে তিনি চালু করেছিলেন অবৈধ রেডিও স্টেশন ‘রেডিও এসেক্স‘। ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ‘রেডিও সাসেক্স’।দুর্গটির দিকে নজর ছিল অনান্য অবৈধ রেডিও স্টেশনগুলির। তারা প্রায় হামলা চালাতো মেজর বেটসের দুর্গে। গুলি ছুঁড়ে মেজর বেটস সেই সব হামলা প্রতিহত করতেন। একসময় তাঁর নজর পড়েছিল, সমুদ্রের আরও ভেতরে থাকা আর একটি দুর্গের ওপর।

মেজর রয় বেটস।
দখল করেছিলেন ‘রাফস টাওয়ার’ দুর্গ

সাফোক কাউন্টি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রের বুকে ছিল ‘রাফস টাওয়ার’ নামে আর একটি  দুর্গ। বিশ্বযুদ্ধের সময় সময় দুর্গটিতে থাকত শতাধিক ব্রিটিশ সেনা। ব্রিটেনের রয়াল নেভি, ১৯৫৬ সালে দুর্গটিকে পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করেছিল। মেজর বেটস বন্দুকের তেজে, দখলকারীদের হঠিয়ে, ১৯৬৬ সালে দখল করে নিয়েছিলেন ‘রাফস টাওয়ার’ দুর্গটি।

রাফস টাওয়ারে মেজর বেটস মজুত করেছিলেন, রেডিও স্টেশনের যন্ত্রপাতি ও প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। সাসেক্স থেকে পরিবারকে নিয়ে এসেছিলেন রাফস টাওয়ারে। স্ত্রী জোয়ান, মেয়ে পেনি ও চোদ্দ বছরের ছেলে মাইকেলকে বন্দুক ছোঁড়া ও ‘মলোটভ ককটেল’ বোমা বানানো শিখিয়েছিলেন।

কারণ, অনান্য অবৈধ রেডিও স্টেশনের পোষা সামাজবিরোধীরা রাফস টাওয়ার দখলের চেষ্টায় ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই, ব্রিটেনের ওয়ারলেস টেলিগ্রাফি আইন ভাঙায় মেজর বেটসকে ফাইন করা হয়েছিল। রেডিও স্টেশনটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন মেজর বেটস।

রাফস টাওয়ার দুর্গ।
রাফস টাওয়ার হয়েছিল স্বাধীন রাষ্ট্র 

ইংল্যান্ডের ওপর ক্ষোভে, ১৯৬৭ সালে এক অভুতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেজর বেটস। স্ত্রী জোয়ানের জন্মদিন ছিল, ২ সেপ্টেম্বর। ওই দিন, নিজের নকশা করা পতাকা, স্ত্রী জোয়ানকে দিয়ে উত্তোলন করিয়ে, রাফস টাওয়ারকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন মেজর বেটস। পাঁচশো বর্গমিটার এলাকা জুড়ে থাকা রাষ্ট্রটির নাম দিয়েছিলেন  ‘প্রিন্সিপ্যালিটি অফ সিল্যান্ড’। মেজর রয় বেটস হয়ে গিয়েছিলেন সেই দেশটির যুবরাজ ‘প্রিন্স রয়’।

খবর পেয়ে, অবৈধ রেডিও স্টেশন ‘রেডিও ক্যারোলিন’-এর মালিক ‘রাফস টাওয়ার’ দখল করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বেটস পরিবারের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে এঁটে উঠতে পারেননি। ব্রিটেনের জলসীমায় আরও খুনোখুনির আশঙ্কায়, রাফস টাওয়ারের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজ। দূর থেকে নেভির জাহাজকে আসতে দেখে জলে গুলি ছুঁড়েছিলেন মেজর বেটসের কিশোর পুত্র মাইকেল।

রাফস টাওয়ারে উড়েছিল স্বাধীন দেশ সিল্যান্ডের পতাকা।

নেভির জাহাজের দিকে গুলি ছোঁড়ার দায়ে, মেজর বেটস ও পুত্র মাইকেলকে গ্রেফতার করে তোলা হয়েছিল ব্রিটিশ কোর্টে। মেজর বেটস কোর্টকে জানিয়েছিলেন, রাফস টাওয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ব্রিটেনের জলসীমার তিন মাইল বাইরে আছে দেশটি। মেজর বেটসের দাবার চালে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।

মেজর বেটসের দাবী খতিয়ে দেখে কোর্ট বলেছিল, ব্রিটেনের জলসীমার বাইরে ঘটা অপরাধের বিচার ব্রিটেনের কোর্ট করতে পারে না। সেই প্রথম সিলমোহর পড়েছিল সিল্যান্ডের স্বাধীনতায়। সাত বছর পর, মেজর রয় বেটস ওরফে ‘প্রিন্স রয়’ ঘোষণা করেছিলেন সিল্যান্ডের সংবিধান। তৈরি হয়েছিল জাতীয় সংগীত। 

বিতর্কিত দেশ ‘প্রিন্সিপ্যালিটি অফ সিল্যান্ড’
 ‘সিল্যান্ড’ দখল করতে চেয়েছিল জার্মানরা

সত্তরের দশকে, কিছু জার্মান ও বেলজিয়ান ব্যবসায়ীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন মেজর বেটস। ব্যবসায়ী দলটির নেতা ছিলেন জার্মান হিরে ব্যবসায়ী আলেকজান্ডার আখেনবাখ। ঠিক হয়েছিল, সিল্যান্ডের ওপর বানানো হবে আন্তর্জাতিক মানের ক্যাসিনো, হোটেল ও একটি তৈলশোধনাগার। চুক্তিতে সই করার জন্য, ১৯৭৮ সালের আগস্টে অস্ট্রিয়া গিয়েছিলেন মেজর বেটস ও স্ত্রী জোয়ান। সিল্যান্ডের আকাশে ঘনিয়েছিল দুর্যোগের ঘনঘটা।

বেটস দম্পতির অনুপস্থিতির সুযোগে, সিল্যান্ডের হেলিপ্যাডে নেমেছিল একটি হেলিকপ্টার। কপ্টারটিতে ছিলেন বেশ কয়েকজন জার্মান সমাজবিরোধী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন হিরে ব্যবসায়ী আখেনবাখের আইনজীবী জারনট পুজ। মেজরের পুত্র মাইকেল তখন একা ছিলেন সিল্যান্ডে। বাধা দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

কিন্তু মাইকেলকে হাত পা বেঁধে একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কিছুদিন পর, দখলকারীরা একটি বোটে চাপিয়ে মাইকেলকে পাঠিয়ে দিয়েছিল নেদারল্যান্ড। নেদারল্যান্ড থেকে মাইকেল, মেজর বেটসকে জানিয়েছিলেন, বিশ্বাসঘাতক আখেনবাখ দখল করে নিয়েছেন ‘সিল্যান্ড’।

মেজরের শিরা উপশিরায় ফুটতে শুরু করেছিল বদলার আগুন

জার্মানদের বিশ্বাসঘাতকতার বদলা নেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন মেজর বেটস। কিছু কম্যান্ডো বন্ধুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এক দুঃসাহসী মিশনে। জোগাড় করেছিলেন অত্যাধুনিক রাইফেল ও একটি হেলিকপ্টার। পাইলট হিসেবে নিয়েছিলেন, জেমস বন্ডের ছবিতে স্টান্ট পাইলট হিসেবে কাজ করা এক বন্ধুকে।

কয়েকদিন পর, খুব ভোরে, সিল্যান্ডের আকাশে দেখা দিয়েছিল হেলিকপ্টার। দড়ি বেয়ে একে একে সিল্যান্ডের হেলিপ্যাডে নেমেছিলেন প্রশিক্ষিত কম্যান্ডোরা। অপ্রস্তুত জার্মানরা, কম্যান্ডোদের সাথে বন্দুক যুদ্ধে টিকতে পারেনি। আত্মসমর্পণ করেছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই। মেজর বেটস হাসতে হাসতে জার্মানদের বলেছিলেন, “আমি ঘাস ছিঁড়তে আর্মিতে যাইনি”।

সিল্যান্ড দখলে নিয়েছিলেন মেজর বেটস ও তাঁর সঙ্গীরা। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতক জার্মান আইনজীবী পুজ।

সিল্যান্ডে বসেছিল বিচার সভা। সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, প্রতারনার অভিযোগে আটকে রাখা হয়েছিল বিশ্বাসঘাতক আখেনবাখের আইনজীবী পুজকে। ফাইন করা হয়েছিল ৭৫০০০ ডয়েশ মার্ক। আটক থাকা অবস্থায় জার্মান আইনজীবীকে  দেওয়া হয়েছিল টয়লেট সাফ ও কফি বানানোর কাজ।

সিল্যান্ডে বন্দি থাকা নাগরিককে উদ্ধারের জন্য জার্মানি অনুরোধ করেছিল ব্রিটেনকে। ব্রিটেন জানিয়েছিল সিল্যান্ড তাদের এলাকার মধ্যে নয়। তাই ব্রিটেন কিছু করতে পারবে না। এরপর জার্মানি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সিল্যান্ডে পাঠিয়েছিল ডঃ নেইমোলারকে। সিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল জার্মানি। 

বন্দি হওয়ার ছ’সপ্তাহ পরে ছাড়া পেয়েছিলেন আইনজীবী পুজ। সেই প্রথম ‘সিল্যান্ড’, একটি বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক চুক্তিতে সই করেছিল। এর পর, সর্বক্ষণের নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করেছিলেন মেজর বেটস। সিল্যান্ড পাহারা দেওয়ার জন্য।

সিল্যান্ডে মেজর বেটস ও স্ত্রী জোয়ান।

জলসীমা বাড়িয়েছিল ইংল্যান্ড

 ইংল্যান্ড দেশের জলসীমা ৯ মাইল বাড়িয়ে দিয়েছিল ১৯৮৭ সালে। ইংল্যান্ডের জলসীমার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল ‘সিল্যান্ড’। চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন মেজর বেটস। সিল্যান্ডের জলসীমা, চার দিকে ১২ মাইল করে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ইংল্যান্ডের জলসীমা, এমনকি ইপসউইচ শহর ঢুকে গিয়েছিল সিল্যান্ডের সীমানার ভেতর। তাই মেজর বেটসকে আর ঘাঁটায়নি ইংল্যান্ড। নিজের মতো থাকতে দিয়েছিল রাফস টাওয়ারে।

সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাবী করলেও, বিশ্বের কোনও সার্বভৌম রাষ্ট্র সিল্যান্ডকে রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়নি। ২০১২ সালে প্রয়াত হয়েছিলেন রয় বেটস, ২০১৬ সালে চলে গিয়েছিলেন স্ত্রী জোয়ানও। তবে দেশটি আজও রয়ে গিয়েছে বেটস পরিবারের দখলে। সিল্যান্ডের বর্তমান যুবরাজ, মেজর বেটসের পুত্র মাইকেল।

আজ সিল্যান্ডের আছে নিজস্ব ডলার ও স্ট্যাম্প। ছিল পাসপোর্টও, কিন্তু বিভিন্ন দেশের বিরোধিতার কারণে, ১৯৯৭ সালে পাসপোর্ট উঠিয়ে দিতে হয়েছিল। সিল্যান্ডের আছে নিজস্ব ফুটবল টিম। দেশ যেহেতু জলে ভাসে, তাই ফুটবল টিমটি খেলে ডেনমার্কের লিগে।

সিল্যান্ডের বর্তমান যুবরাজ মাইকেল বেটস।
 ট্যুরিস্ট ভিসা দেয় সিল্যান্ড

ভিসা পাওয়ার পর, হারউইচ বন্দর থেকে সিল্যান্ডের নিজস্ব বোটে চেপে, পৌঁছাতে হবে রাফস টাওয়ারের নীচে। ওপর থেকে নেমে আসবে দড়ি বাঁধা দোলনা। দোলনা চেপে উঠতে হবে সিল্যান্ড দেশে। ডেকের ওপর থাকা বাড়িটি, বাইরে থেকে দেখতে ভালো না হলেও, ভেতরটা বেশ সাজানো গোছানো। বাড়িটিতে আছে অনেকগুলি কক্ষ, মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, কফি-শপ ও স্মারক বিক্রির দোকান।

সিল্যান্ডে অতিথিরা।

বর্তমানে, সিল্যান্ডে বাস করেন ২৭ জন নাগরিক। টিনের খাবারের ওপরই ভরসা করতে হয় তাঁদের। আজও সিল্যান্ড ও তার নাগরিকদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, অ্যাটল্যান্টিকের হাড়কাঁপানো ঝোড়ো হাওয়া, আক্রমণের আশঙ্কা ও রাইফেল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তিপান্ন বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে স্বীকৃতিহীন ‘সিল্যান্ড’। তাই হয়তো বৃটিশ পর্বতারোহী কেন্টন কুল, এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণ করার পর উড়িয়ে দিয়েছিলেন সিল্যান্ডের জাতীয় পতাকা। সিল্যান্ডের লড়াইকে কুর্নিশ জানাতে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More