সঙ্ঘের মঞ্চে সহিষ্ণুতার রাজনীতি আর বহুত্ববাদের সংস্কৃতি শেখালেন প্রণব

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শমীক ঘোষ ও শোভন চক্রবর্তী: ‘এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম নয়। ভারতবর্ষের অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে রয়েছে বহুত্ববাদেই।’

    আরএসএসের সদর দফতরে দাঁড়িয়ে, সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত ও অসংখ্য স্বয়ং সেবকের কুচকাওয়াজের মধ্যে দাঁড়িয়েও, প্রকারন্তরে সঙ্ঘের মূল মতাদর্শকেই প্রশ্ন করে বসলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।

    যা আন্দাজ করা হয়েছিল, তাই মিলে গেল অক্ষরে অক্ষরে। প্রণব মুখোপাধ্যায় আজও ধর্মনিরপেক্ষতারই পক্ষে। তবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তুলে ধরতে, রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতার কাঁটাতার নয়। তিনি বিশ্বাস করেন আলোচনার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যে।

    কৌটিল্য থেকে রবীন্দ্রনাথ, ফা-হিয়েন, হিউয়েন-সাঙ, মেঘাস্থিনিস, বাছা বাছা শব্দ চয়ন আর ভারতের ইতিহাসের গতিধারা উল্লেখ করে নাগপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে এ দিনের বিদগ্ধ বক্তৃতায় প্রণব বাবু পরিষ্কার করে দিলেন যে, দিকভ্রান্ত হয়ে নয় সচেতন ভাবেই সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

    বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের তৃতীয় বর্ষ বর্গের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলতে ওঠার আগে সেখানে বক্তৃতা করেছিলেন সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত। তিনিও তাঁর বক্তৃতায় বৈচিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কচ্ছ থেকে কোহিমার উল্লেখ করেছিলেন। বলেছিলেন, সঙ্ঘ বহুত্বের মধ্যে একতাতেই বিশ্বাস করে। কিন্তু একতা বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন গোটা দেশের মানুষের একযোগে, একসঙ্গে কাজ করা। পরোক্ষে দেশের হিতের জন্য একরৈখিক একটা মতকেই মেনে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। জানিয়েছিলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, বিরোধিতার একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। যা লঙ্ঘন করা যায় না।

    ভাগবতের সেই মতকে উড়িয়ে দিয়ে প্রণববাবু পাল্টা তুলে আনেন দেশের ১২২টা ভাষা, সাতটা প্রধান ধর্ম ও তিন প্রধান জনজাতির কথা। বলেন, আমাদের দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ‘বসুধৈব কুটুম্বম’ নীতির ভিত্তিতে। কোনও গোঁড়ামি, অসহিষ্ণুতা আমাদের সেই জাতীয় পরিচয়কেই বিপন্ন করে তুলবে। স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয়তাবাদ মানে কারোর সংস্কৃতি ধ্বংস করা নয়। এক সংবিধানের মধ্যে, এক পতাকার নীচে থেকেই বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দেওয়াই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ।

    আরএসএসের এই অনুষ্ঠানে প্রণববাবুর যাওয়া নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল দেশ জুড়ে। কংগ্রেসের অনেক নেতা স্পষ্টই বিরোধিতা করেছিলেন তাঁর। বারণ করেছিলেন যেতে। এমনকি তাঁর মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ও ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন বাবার বিরুদ্ধে। প্রসঙ্গত, বুধবারই দিল্লি কংগ্রেসের মুখপত্র প্রণব কন্যা ছুটি কাটাতে রানিখেতে চলে গিয়েছিলেন। এর মধ্যেই কেউ বা কারা রটিয়ে দিয়েছিল, বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন শর্মিষ্ঠা। এতেই যার পর নাই অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন প্রণববাবুর আদরের ‘মুন্নি’। নিজের টুইটার হ্যান্ডেল থেকে লেখেন, ‘আরএসএসের লোকেরাও মনে করে না যে আপনি ওঁদের মতাদর্শকে সমর্থন করবেন। কিন্তু আপনার বক্তৃতা কেউ মনে রাখবে না। শুধু ছবিটা থেকে যাবে। আর সেই ছবি সামনে রেখেই নোংরা রাজনীতি চালিয়ে যাবে বিজেপি ও আরএসএস।’

    আজ সেই কংগ্রেসের নেতারাই প্রেস রিলিজ জারি করে বলছেন, প্রণব মুখোপাধ্যায় আরএসএসকে ভারতের বহুত্ববাদ, সহনশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সবাইকে নিয়ে চলতে পারার শিক্ষা দিয়ে এলেন আরএসএসকে।

    প্রণবের আরএসএসের সদর দফতরে যাওয়া নিয়ে উল্লসিত ছিল বিজেপির একাংশও। তাঁরা ভেবেছিলেন, বোধহয় ভোল পাল্টাচ্ছেন প্রণব।

    গোটা দেশের নজর ছিল নাগপুরে। কী বলবেন একদা ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত সেনানী। যে প্রণব মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের সাংগঠনিক দলিলে আরএসএস-কে ধর্ম নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় বিপদ বলে উল্লেখ করেছিলেন সেই প্রণব মুখপাধ্যায়ই আরএসএস-এর মঞ্চে! গোটা দেশ দেখল, কীর্ণাহারের ব্রাহ্মণ সন্তান সঙ্ঘের শীর্ষ নেতাদের সামনে রেখে জীবনের অন্যতম সেরা বক্তৃতায় জিতিয়ে দিলেন সহিষ্ণুতার রাজনীতি আর বহুত্ববাদের সংস্কৃতিকেই।

    ভাষণের আগেই, আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সরসঙ্ঘচালক কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারকে সম্মানও জানান প্রণব। ভিজিটরস বুকে লেখেন, ‘ভারত মাতার এই শ্রেষ্ঠ সন্তান হেডগেওয়ারকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন তিনি।’

    আরও পড়ুন: রাইসিনা-সমান চ্যালেঞ্জ সামনে, নাগপুরে কী বলবেন প্রণব

    বক্তৃতার পর স্পষ্ট যে, প্রণব আসলে প্রবল মেরুকৃত এই দেশের রাজনৈতিক মহলকে বুঝিয়ে দিলেন, বিরোধীকে সম্মান দেওয়াই আসলে এই দেশের ঐতিহ্য। আর ভারতীয় গণতন্ত্রের বহুত্ববাদের ঐতিহ্যের মূলে হল মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আলোচনার পরিসর। তাই প্রবল বিরোধী মতের মানুষদের মধ্যে দাঁড়িয়ে, তাঁদের সম্মান দিয়েও, আসলে তিনি তুলে ধরতে পারেন তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস ও মূল্যবোধ।

    রাজনৈতিকভাবে কাউকে অচ্ছুত না রেখে, কাউকে আক্রমণ না করে, নিজের মত প্রকাশ করাই হল গণতন্ত্রের ভিত্তি।

    ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, চিরকাল প্রবল প্রোটোকল মেনে চলা প্রণব মুখোপাধ্যায় আসলে সেই শিক্ষাটাই দিয়ে গেলেন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের। আর তাঁকে বলতে ডেকে, মঞ্চ দিয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন মোহন ভাগবতও।

    মোহন ভাগবত আর প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি দাঁড়ানোর ছবিটাই বোধহয় তাই হয়ে দাঁড়াল ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম সেরা ফ্রেম। রাজনৈতিক বহুত্ববাদই যে ভিত এই দেশের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More