বৃহস্পতিবার, জুন ২০

মুন্নির রাজনীতি বিপন্ন হবে, হয়তো ভাবেননি প্রণব

শঙ্খদীপ দাস: দোল পূর্ণিমার ঠিক আগের সন্ধ্যা। দিনটা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন কলকাতায়। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে। নয়াদিল্লির ২৪ নম্বর আকবর রোডে কংগ্রেস সদর দফতরে তার কিছুক্ষণ আগেই দলের প্লেনারি অধিবেশনের জন্য খসড়া কমিটি ও অর্গানাইজিং কমিটি ঘোষণা করেছেন এআইসিসি জেনারেল সেক্রেটারি জনার্দন দ্বিবেদী। তার পর ঘণ্টা খানেকও কাটেনি, আট পৃষ্ঠার সেই প্রেস রিলিজের পিডিএফ ফাইল চলে এসেছে কলকাতায়। প্রিন্ট আউট  প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সামনে।

রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার দিন থেকেই রাজনীতির উর্ধ্বে চলে গিয়েছেন প্রণববাবু। কিন্তু ঘনিষ্ঠরা জানেন, তাঁর রাজনৈতিক মন সন্ন্যাস নেয়নি। বরং জাতীয়, আন্তর্জাতিক এমনকি আঞ্চলিক রাজনীতির উপর তাঁর নজর রয়েছে সর্বক্ষণের। ভিতরে ভিতরে বিশ্লেষণও চলছে হয়তো চব্বিশ ঘণ্টা। হয়তো সে সব ব্যাপারে তাঁর ব্যক্তিগত মত লিখে রাখছেন ডায়েরির পাতায়। তবে এআইসিসি প্লেনারি অধিবেশনের ড্রাফ্টিং কমিটি বা অর্গানাইজিং কমিটির ফরমেশন খুঁটিয়ে দেখার কারণ সম্ভবত সে সব নয়। একেবারেই ভিন্ন। প্লেনারি সেশনের কমিটিতে স্পেশাল ইনভাইটি হিসাবে স্থান হয়েছে তাঁর আদরের মেয়ে ‘মুন্নির’,- শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ের। ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের সাব গ্রুপে এ কে অ্যান্টনি, আনন্দ শর্মাদের সঙ্গে নাম রয়েছে তাঁর।

রাজনীতিতে শর্মিষ্ঠার বেড়ে ওঠা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রণববাবুর আগ্রহ ও উৎকণ্ঠা কতটা, সম্ভবত এই ছবিটাতেই পরিষ্কার। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের এ ধরনের অধিবেশনের জন্য এক সময় খসড়া প্রস্তাব লেখার দায়িত্ব থাকত প্রণবের উপর। সেই ইন্দিরা গান্ধীর জমানা থেকে। মেয়েকে সেই জুতোয় পা গলাতে দেখে তিনি যে সে দিন মনে মনে খুশি হয়েছিলেন, বলার অপেক্ষা রাখে না।

বরাবরই বাবার খুব আদরের শর্মিষ্ঠা। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে পরিবারের জন্য হয়তো খুব বেশি সময় কখনওই দিতে পারেননি প্রণববাবু। এমনকী ষাট বছরের দাম্পত্য জীবনে স্ত্রী ছেলেমেয়েকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন কি না জানতে চাইলে খুব স্বাভাবিক স্বরেই জবাব দিয়েছেন, গিয়েছি তো। ওঁরা যখন ছোট ছিল তখন মাঝে সাঝে বদখাল আর কারনাল লেকে বোটিং করাতে নিয়ে যেতাম। তাঁর ব্যক্তিগত ছুটি কাটানো বলতে শর্মিষ্ঠার রানিখেতের বাড়িয়ে গিয়ে এক রাত কাটানো। এবং ওই এক দিনই। ইউ পি এ জমানায় তিনি যখন লোকসভার নেতা এবং মন্ত্রিসভায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তখন বাবা-মেয়ের রোজ দেখাই হত না। সর্বদা কাজে ব্যস্ত প্রণব। তার মাঝেই সময় সুযোগ পেলে তালকাটোরার বাড়িতে বাবার সঙ্গে দেখা করে যেতেন শর্মিষ্ঠা। কিন্তু এত কাজের মধ্যেও কখনও আলোচনায় শর্মিষ্ঠার প্রসঙ্গ এলে আহ্লাদে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত প্রণববাবুর।

শর্মিষ্ঠার কত্থক নাচের অনুরাগী প্রণব। নিজের ড্যান্স ট্রুপ নিয়ে শর্মিষ্ঠা যে বিদেশে পারফর্ম করতেন, সে ব্যাপারেও গর্ব করতেন রাশভারী স্বভাবের এই রাজনীতিক। অ্যান্টার্কটিকা সফরে তাঁর সঙ্গে গিয়ে শর্মিষ্ঠা কী ভাবে বরফ নিয়ে খেলা করেছিলেন, সে গল্প শোনানোর সময় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির মধ্যে বেরিয়ে আসে তাঁর পিতার সত্তাটাই। শর্মিষ্ঠা তাঁর কাছে যেন এখনও একরত্তি।

কিন্তু এ সব যেমন ঠিক, তাঁর পারিবারিক সূত্র বলছে, তেমনই এ-ও ঠিক যে নিজের রাজনীতি নিয়ে প্রণববাবু কখনও পরিবারের সঙ্গে বিশেষ আলোচনা করেননি। এমনকী এও আশ্চর্যের নয় যে প্রণববাবু নাগপুরের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সম্মতি দিয়েছেন, তা হয়তো শর্মিষ্ঠা এক বাড়িতে থেকেও জানতেন না। প্রণববাবু হয়তো তাঁকে সিদ্ধান্তটা জানিয়েছেন মাত্র।

প্রণব মুখোপাধ্যায় ও মোহন ভাগবত (ফাইল চিত্র)

বাবার এই সিদ্ধান্তে শর্মিষ্ঠা যে অস্বস্তিতে পড়েছেন এবং যারপরনাই বিরক্ত তা প্রথম দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। তবু প্রণববাবুর অমর্যাদা যাতে না হয় সে জন্য যথাসম্ভব সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়েই চলেছেন। এমনকী হতে পারে সে কারণেই গত কয়েকদিন ধরে ছুটি নিয়ে পাহাড়ে চলে গিয়েছেন শর্মিষ্ঠা। এবং এ সবের মধ্যেই বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তাঁকে নিয়ে বুধবার যে গুজব ছড়িয়েছিল, দিল্লিতে তা স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করেছে। বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন শর্মিষ্ঠা। কারণ, তিনি বুঝতে পারছেন প্রণববাবু নাগপুরে যাওয়ার কারণে তাঁর রাজনীতি বিপন্ন হয়ে পড়ছে। শর্মিষ্ঠার কথায়, আরএসএসের নেতারাও জানেন, প্রণববাবু সঙ্ঘের সদর দফতরে গেলেও তাঁদের মতাদর্শকে কখনও সমর্থন করবেন না। কিন্তু ভয়টা তা নয়। তাঁর আশঙ্কা, প্রণববাবু কী বক্তৃতা দেবেন, তা কেউ মনে রাখবেন না। শুধু নাগপুরে প্রণবের ছবিটাই থেকে যাবে। এবং সেটাকে সামনে রেখে নোংরা রাজনীতি করবে কেউ কেউ।

আসলে ইদানীং রাজনীতিতে যে তাৎক্ষণিকতা তৈরি হয়েছে, বহুলাংশে যে রাজনীতি এখন সোশ্যাল মিডিয়া, পেইড ট্রোল, স্টিং অপারেশন ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল, তার সম্পর্কে প্রণববাবুর সম্যক কোনও ধারণা নেই। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন মতাদর্শ, নীতি ইত্যাদি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কই রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। নাগপুরে তাঁর যাওয়ার সিদ্ধান্ত শর্মিষ্ঠার রাজনীতিকে এ ভাবে বিপন্ন করে তুলতে পারে এমনটা ঘুণাক্ষরেও তাঁর যদি আশঙ্কা থাকত, তা হলে হয়তো মোহন ভাগবতের প্রস্তাব দ্বিতীয় বার ভেবে দেখতেন তিনি।

প্রণববাবুর পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের অবশ্য বিশ্বাস রয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রেশমবাগে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি যে বক্তৃতা দেবেন তা শর্মিষ্ঠার রাজনীতির উপর কখনও বোঝা হবে না। বরং শর্মিষ্ঠার মনে মনে হয়তো গর্ব হবে যে এমনটা আমার বাবাই বলতে পারেন। তবে হ্যাঁ, সঙ্ঘ দফতরে প্রণবের এই ছবি নিয়ে রাজনীতিতে ডার্টি ট্রিক্স ভবিষ্যতে হতেই পারে। বাবার বিরুদ্ধে মুখ খুলে আসলে সেই সব নোংরা খেলাকে বুধবার অঙ্কুরেই বিনাশ করে দিতে চেয়েছিলেন।

Leave A Reply