বুধবার, মার্চ ২০

বিশ্বাসটাই তো ভেঙে গেছে

 

রুদ্র প্রসাদ: কথায় বলে বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু। কিন্তু দেখা গেল তা সব সময়ে না। ভারতের আমজনতা নরেন্দ্র মোদীকে বিশ্বাস করেছিল। ধরেই নিয়েছিল, মোদীই হলেন এ দেশের সেই নেতা যাঁর জন্য এতদিন সবাই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন। সবার চোখে তিনি যেন রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছিলেন। রূপকথার গল্পে যেমনটা হয়! এমনকী বিশ্বাস এমন স্তরে পৌঁছেছিল যে অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন আচ্ছে দিন আসবেই।

সাধারণের কাছে মোদীর ভাবমূর্তি ছিল এক শক্তিশালী নেতার। অবতারের মতো যিনি দুর্নীতি, সংশয় আর অচলাবস্থার দৈত্যগুলোকে বধ করবেন। তিনিই পারবেন এ দেশের সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার অবসান ঘটাতে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই বিশ্বাসটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

কেন ?

কারণ বিবিধ। আসলে দেশের মানুষকে পরিষেবা দেওয়ার ব্যর্থতা বা সেক্ষেত্রে কোনও পদ্ধতিগত ত্রুটি কিন্তু বিশ্বাসভঙ্গের নেপথ্যে মূল কারণ নয়। বরং এই হতাশার মূলে রয়েছে প্রতিশ্রুতি পালনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। বিকাশপুরুষ নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীর ইচ্ছে ও অভিপ্রায় নিয়েই এখন জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কেন না উন্নতি, কর্মসংস্থান আর নিরাপত্তার সমস্ত আশ্বাস ক্ষমতায় আসার পরমুহূর্তেই বদলে গিয়েছে স্বচ্ছ ভারত, যোগ, গো-রক্ষা আর ধর্মীয় আধিপত্যের বয়ানে।

যিনি বলেছিলেন, বছরে দু-কোটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবেন, তিনিই এখন সুর বদলে ফেলেছেন। পান পকোড়া বিক্রেতাদেরও তিনি এখন কর্মরত বলে চালানোর অপচেষ্টা শুরু করেছেন। “সবকা কা সাথ সবকা বিকাশ” স্লোগানের গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্বের রাজনীতি। শাসকের ভাষা বদলে গেছে। স্বঘোষিত সেবক সেবার বদলে এখন অত্যাচারী হয়ে ওঠার ভয় দেখাচ্ছেন।

অথচ ভেবে দেখুন চার বছর আগের কথা। চাঁদকে নাগালে এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বোধহয় সে জন্যই ভারতের জাতীয় মননে আশাভঙ্গের অনুভূতি এত তীব্র। মোদীর প্রতিশ্রুতিগুলো প্রথম থেকেই স্বাভাবিক এবং বাস্তবের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হলে হয়ত এই অভিঘাতের তীব্রতা কম হত।

২০১৯, বা খুব তাড়াতাড়ি হলে ২০১৮-এর শেষে কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আবার মানুষের সামনে দাঁড়াতে হবে। চাইতে হবে জনতার আস্থা। তার আগে, আম জনতার মনে এই বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র বোধ কিন্তু রক্তচাপ বাড়াচ্ছে মোদীর।

এখনও হয়ত দেখা যাবে, জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সব থেকে বেশি এগিয়ে তিনিই। কিন্তু সেটা তাঁর সাফল্যের জন্য নয়। তার একমাত্র কারণ শুধুমাত্র যোগ্য প্রতিযোগীর অভাব। এমন কোনও চ্যালেঞ্জার এখনও নেই যিনি সাধারণ মানুষের মনে দাগ কাটতে পারেন।

তবে ভোটের ময়দানে পালাবদল হওয়ার জন্য আগে থেকেই প্রতিযোগীর খুব দরকার পড়ে না সবসময়। পরিস্থিতির নিজস্ব যৌক্তিকতায় উপযুক্ত বিকল্প খুঁজে নেয় সাধারণ মানুষ। আর বর্তমান পরিস্থিতির সব যুক্তিই মোদীর বিরুদ্ধে সওয়াল করছে। তার কারণ একটাই, ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির মানুষটার উপরে আস্থা ও বিশ্বাসটাই হারাতে বসেছে জনতা। বড় কথা হল, এই অবস্থা কিন্তু এক দিনে হয়নি। বরং মোদীর একাধিক সিদ্ধান্ত গোড়ায় সহনশীলতার সঙ্গেই মেনে নিয়েছিল বিপুল সংখ্যক মানুষ। এমনকী নোটবন্দীর শককেও! তারা ভেবেছিলেন, হয়ত এভাবেই আসবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা আর সামাজিক ন্যায়ের আচ্ছে দিন। এদেশের ধনী ও ক্ষমতাবানরাও বিশ্বাস রেখেছিলেন মোদির ওপর। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন কোনও অসাধারণ নীতির। এমন কোনও শক্তিশালী নীতি যা তাদের ব্যবসা বানিজ্যকে নতুন উচ্চতায় তুলে দেবে।

এই আশাবাদ নিহত হয়েছে। ভারতের গরিবদের চোখে বাস্তব এখন স্পষ্ট। গ্রাম্য অর্থনীতির হাল ভয়াবহ। ক্রমশ হ্রাসমান কর্মসংস্থানের সুযোগ। বড়লোকদের মোহও আর নেই। কারণ শুধুই খারাপ হয়েছে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ। মন্দা এসেছে অর্থনীতিতে। গোটা বিশ্বের অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করছে, ঠিক সেই সময়েই জিএসটির স্বল্পমেয়াদি অথচ শক্তিশালী ধাক্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা। কর-সন্ত্রাসের নতুন এই যুগে, তাদের মুনাফা করার সব আশা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

শুধু একটাই রূপোলি রেখা এখন তাঁর সামনে। মোদীর মূল চ্যালেঞ্জার রাহুল গান্ধী এখনও বড়লোকদের সঙ্গে তেমন কোনও সখ্য স্থাপন করে উঠতে পারেননি। ফলে, হয়ত আরো কিছুদিন দেশের বণিকশ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা পাবেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু দেশের গরিবরা আর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না তাঁর ওপর। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের এই আস্থাহীনতা নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তাঁকে।

আসলে চার বছর আগে ভারতবর্ষের তামাম প্রান্তরের মানুষ নিঃসংকোচে এক সামাজিক চুক্তি করেছিল নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। তারা একজোটে ভোট দেবে মোদীকে। বদলে তিনি প্রভূত অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাবেন তাদের। সাধারণ মানুষ কথা রেখেছে। কিন্তু ভোটের এই চুক্তির মূল শর্তটাই এখনও তেমন ভাবে পালন করে উঠতে পারেনি মোদীর সরকার। ফলে, পরের ভোটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই চুক্তির নবীকরণ মোটেও সহজ হবে না তাঁর পক্ষে।

বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা ভোটগুলোতে অবশ্য জিতেছে বিজেপি। প্রচারের প্রধান মুখ সেই মোদীই। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ চিনে ফেলেছে এক নতুন নরেন্দ্র মোদীকে। রাজনীতির কূটকৌশলে যিনি বুলডোজারের মতো পিষে ফেলতে পারেন এবং পর্যদুস্ত করতে পারেন বিরোধীদের। কিন্তু প্রচারের স্বার্থে দেওয়া একের পর এক প্রতিশ্রুতির একটাও রক্ষা করতে পারেন না। মানুষ বুঝে গিয়েছে তাঁর দেওয়া উন্নয়নের, আচ্ছে দিন-এর সমস্ত আশ্বাসই আসলে কথার কথা। জুমলা মাত্র।

পরবর্তী লোকসভা ভোটের আগে মোদী যতই নতুন প্রতিশ্রুতি দিন, সাধারণ মানুষ কিন্তু তাকে সন্দেহের চোখেই দেখবে। তার হাতে নাতে প্রমাণ এরই মধ্যে পেয়েছেন তিনি। মোদী ঝড় যে ক্রমশ স্তিমিত হয়েছে তা জানান দিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর নিজ রাজ্য গুজরাতও। ফলে গুজরাতে জিততে তার হাতের সব তাসকে ব্যবহার করতে হয়েছে।

তাই কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের ভোটেও মোদী-ফ্যাক্টরের উপরেই পুরোপুরি ভরসা করা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রদেশ আর ছত্তিশগড়ে ক্রমশ বাড়ছে সরকার বিরোধী হাওয়া। এক মেয়াদের মধ্যেই বিজেপির ওপর আস্থা হারিয়েছেন রাজস্থানের মানুষও। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী-বিএসপির পিসি ভাইপোর জোটের মুখে নাজেহাল বিজেপি। বিহারেও কমছে নীতিশের জনপ্রিয়তা। বরং জেলে যাওয়া লালুর প্রতিই এখন সহানুভূতির হাওয়া। আরেক বড় রাজ্য মহারাষ্ট্রে বহুদিনের শরিক শিবসেনাও প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। শিবসেনা একাই নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলে, আর কংগ্রেস-এনসিপি জোট শেষ পর্যন্ত হলে, বিপাকে পড়বে বিজেপি।

মোদীর হিন্দুত্বের ইমেজ অবশ্য এখনও অটুট। বলা চলে এই একটা ব্যাপারে তার ভাবমূর্তি এখন আগের থেকেও ভালো। এ জন্য অবশ্য কিছু লোক তাঁকে এখনও ভোট দেবে। তবে মনে রাখতে হবে মোদীর এই ভাবমূর্তি, হিন্দুত্বপ্রীতি, সাধারণ মানুষের মনে তৈরি করা হয়েছিল দেড় দশক আগে থেকে। ফলে সেই এক পাঁচন মানুষ আর খেতে চাইবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে ভরপুর।

তা ছাড়া গত লোকসভা ভোটে গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, দিল্লি, ছত্তিশগড়, হরিয়ানায় প্রায় সব আসন জিতে নিয়েছিল বিজেপি। এ বার এই সমস্ত রাজ্যেই তাদের উল্লেখযোগ্য আসন হারানোর সম্ভাবনা। এ সব অঞ্চলে সব মিলিয়ে একশোরও বেশি আসন হারাতে পারে বিজেপি। মহারাষ্ট্র, অসম, কর্নাটকের মতো যে সব রাজ্যে বিজেপির যথেষ্ট শক্তি আছে, সে খানেও বাড়ছে সরকার বিরোধী হাওয়া। সব মিলিয়ে বিজেপি-র দখলে থাকা দেড়শরও বেশি আসনে তাদের সম্ভাবনা এখন অনিশ্চিত।

নতুন যে সমস্ত রাজ্যে নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে চাইছে বিজেপি, তার মধ্যে একমাত্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য গুলো ছাড়া কোথাও তেমন আশার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে অতিমাত্রায় মোদী নির্ভরতার ফলে ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গনা আর কেরলের মতো রাজ্যে বিজেপির প্রভাব বাড়াতে পারছে না।

এখনও অবধি বিরোধীরা তেমন ভাবে এককাট্টা হতে পারেননি। কোন একজন নেতাকে পরবর্তী মুখ হিসাবে দেখাতেও পারেননি তাঁরা। তাতেই বিজেপির এই ভয়ংকর হাল স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যদি মধ্যপ্রদেশ আর রাজস্থানে সরকার গড়তে পারে কংগ্রেস, আর রাহুল গান্ধীকে মোদীর প্রকৃত চ্যালেঞ্জার হিসাবে দেখাতে সফল হয়, তাহলে বিজেপির অবস্থা আরো খারাপ হতে বাধ্য।

একটা কথা এখনই স্পষ্ট। বিজেপি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। ২০০ আসন জেতা মোদীকে তখন কিছুতেই আর শক্তিশালী মোদী বলে মনে হবে না। বিজেপি-র পক্ষে মুশকিল হল, আসন সংখ্যার এই ঘাটতি মেটানো যেমন সহজ নয়, মোদীকে সরিয়ে অন্য কাউকে আনাও প্রায় অসম্ভব।

তবে ভোটের এই পাটিগণিত যতই সহজ মনে হোক, নরেন্দ্র মোদীকে একদম হারিয়ে দেওয়াটা সহজ নয়। তিনি এত সহজে হার মেনে নেওয়ার লোকও নন। তিনি প্রাণপনে চেষ্টা করবেন ভোটের অঙ্কের এই স্বাভাবিকতা যে কোনও মূল্যে নষ্ট করতে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করা হবে যেখানে ভোট আর সহজ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হবে না। বরং বাড়বে উত্তেজনার পারদ এবং চাপ।

সব হিসাব বদলে দেওয়ার ক্ষমতা মোদী নোটবন্দীর মাধ্যমেই প্রমাণ করে দিয়েছেন। আর এখন তো তাঁর মরিয়া অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

(লেখক দিল্লির প্রবীণ সাংবাদিক )

 

Shares

Leave A Reply