যারা সব তোমার কাছে অদরকারি…

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

কণিষ্ক ভট্টাচার্য

আপাত অর্থে একটা অপ্রয়োজনীয় লড়াই লড়তে হল ছাত্রদের।

কেন আপাত অর্থে অপ্রয়োজনীয় বলছি, সেটা আগে বলে নিলে বোধ হয় আমাদের গভীরতর অর্থে যাওয়ার পথটা তৈরি হবে।

গত তিন বছরে মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল কাউন্সিলিং হয়নি। নতুন হস্টেল তৈরি হওয়ার পর এবছর ছাত্রেরা হস্টেল পাবে, এটা একটা কলেজের স্বাভাবিক অভ্যন্তরীণ বিষয়। এর জন্য দাবি জানানো বা সেই দাবি আদায়ে আন্দোলনের কোনও প্রয়োজন ছিল না। অধ্যক্ষ অবধি বিষয়টা যাওয়ারও কোনও প্রয়োজন ছিল না। কারণ সাধারণ ভাবে মান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে যে, সিনিয়রিটি এবং বাড়ির দুরত্ব অনুসারে ছাত্ররা হস্টেল পাবে এবং সেটা হস্টেল কমিটিই ঠিক করে দেবে।

ছাত্রদের বক্তব্য, গত মাসের ২০ তারিখ থেকে এই নিয়ে অধ্যক্ষকে জানানো, ডেপুটেশন দেওয়া শুরু হয়। তাতে অধ্যক্ষের থেকে ‘ধাতানি’ শুনতে হয় ছাত্রদের। ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করার পর ৫ তারিখে ক্যাম্পাসে পুলিশ ডেকে তাদের পেটানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদে ১০ তারিখ থেকে তারা অনশনে বসে। তাদের বাড়িতে ফোন করে অভিভাবকদের চাপ দেওয়া হয় তাদের সন্তানদের তোলার জন্য। বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়। এসব কথাই ছাত্ররা লিখেছেন। প্রথম পাঁচ-ছয়দিন ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ছাড়া বিষয়টা সকলে জানতেন না তেমন করে। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় সাড়া পড়ে। বহু মানুষ যুক্ত হন এই আন্দোলনের সঙ্গে। চাপ বাড়তে থাকে নানা দিক থেকে। কর্তৃপক্ষ অনড় থাকেন। এক সপ্তাহের মধ্যে তিন বার অধ্যক্ষ বদল হয় কলেজের। গণ কনভেনশন হয় অনশনের তখন ১৩ তম দিনে। সেইদিন কর্তৃপক্ষ এই অনশনকে প্রতীকি বলে চিহ্নিত করেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্যে। ১৪ তম দিনে সেই অজ্ঞাত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দাবি মেনে নেন। অস্থায়ী ভাবে নতুন হস্টেলে ছাত্রদের জায়গা দেওয়া হবে বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলে অনশন ওঠে। আর শিক্ষা প্রশাসনে রদবদল হয়।

এবার গভীরতর অর্থের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা যাক। ছাত্রদের বাসযোগ্য হস্টেল নেই, জায়গা থাকা সত্ত্বেও তাদের দেওয়া হচ্ছে না, ওরা পড়াশোনা করবে কী করে—এই আশঙ্কায় বহু মানুষ যুক্ত হন এই আন্দোলনে। যেন এই সব দাবি মিটে গেলেই তারা নতুন হস্টেলে গিয়ে কেবল পড়াশোনা নিয়ে থাকতে পারবে। সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু নীচের তলায় আরও একটা স্তর আছে। সেটা বিভাজনের স্তর আর সেই বিভাজনের সুযোগে মগজ দখলের স্তর। সে কথা ছাত্রেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন।

উপরের স্তরের ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ ও বৃহত্তর জনসমাজের যে সমর্থন এই ছাত্রেরা পেয়েছেন নীচের স্তরের ক্ষেত্রেও কী তা পাবেন? এক দখলীকৃত মগজ নির্মাণের জন্যই প্রাথমিক স্তর থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলের সিলেবাস তৈরি হচ্ছে যেখানে! যেখানে ছাত্রসমাজের সচেতনতাকে গলা টিপে মারতে তাদের অরাজনীতির রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়ার জন্য জনসম্মতি নির্মাণ করতে চাইছে শাসকেরা! যেখানে কোনও প্রতিষ্ঠানের ছাত্রেরা ব্যবস্থার প্রতি কোনও প্রশ্ন তুললেই তাদের কালো দাগে চিহ্নিত করছে শাসক। আর সেই চিহ্নিতকরণকে মান্যতা দিতে আর এক রকম জনসম্মতি নির্মাণ করা হচ্ছে। সে প্রতিষ্ঠান রোহিত ভেমুলার হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় হোক, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা ঘরের কাছের প্রেসিডেন্সি বা যাদবপুর হোক। এই কলঙ্কিতকরণের খেলায় শাসক কিন্তু অনেকটাই সফল। সেখানে কিন্তু ন্যায্য প্রশ্নেও সেই জনসম্মতি থাকে না। জনসম্মতি দূরের কথা এমনকি ছাত্রসমাজের বৃহদাংশের সমর্থনও বিরল হয় সেখানে। গড় মানসিকতা ‘ওখানে শুধু আন্দোলন হয়।’

এখানে এলে আমাদের মনে হয় গভীরতর অর্থে একটা প্রয়োজনীয় লড়াই করলেন ছাত্ররা। বশংবদ, মূক, মেনে নেওয়ার দখলীকৃত মগজের বিরুদ্ধে একটা প্রশ্ন করার লড়াই। আর এখানে এসেই আমাদের মনে হয়, শিক্ষাক্ষেত্রে কি বশংবদ আর প্রশ্নের একটা বেদনাদায়ক স্তর বিভাজন ঘটে গেছে? তাই কি কেবল প্রশ্ন-সংকুল প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল উঠছে বারবার? তাহলে কি শিক্ষার সঙ্গে ব্যবস্থার একটা দ্বন্দ্ব হচ্ছে কোথাও? সেই দ্বন্দ্বকে সমূলে বিনাশ করতে প্রশ্নকেই নিষিদ্ধ করা হচ্ছে? আর সেই লক্ষ্যেই কি কর্পোরেটের প্রশাসনের আওতায় আনার চেষ্টা হচ্ছে শিক্ষাকে? যেখানে শাসক আর কর্পোরেটের প্রয়োজন মাফিক বশংবদ, মূক, মেনে নেওয়ার আর দখলকরা-মগজের কর্মী উৎপাদিত হবে শুধু?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কিন্তু দিতে পারবে এই ছাত্ররাই।

লেখক শিক্ষক ও সাহিত্যকর্মী। মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More