বুধবার, মার্চ ২০

পয়সা ফেকো, তামাশা দেখো

আজিজুল বিশ্বাস

কী বলিহারি ওদের! নেতাজী ইনডোরে দলের সর্বভারতীয় সভানেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিকের চরম সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তোলাবাজি! কী আস্পর্ধা ওদের নেত্রীর নির্দেশ অমান্য করে দিনের বেলায় ডাকাতি!

পরিণাম যা হওয়ার তাই হয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে হয়েছে তাঁদের। এ কারণেই লালসাহেব গুপ্তা, রীতেশ জয়সওয়াল, সায়ন মুখোপাধ্যায়, জাহির আহমেদরা এখন গারদে। অভিযোগ, কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার নাম করে মোটা অঙ্কের তোলা আদায়। মজার ব্যাপার হল, এরা কেউ বহিরাগত নয়। প্রত্যেকেই পড়ুয়া। উত্তর কলকাতার মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজের সান্ধ্যকালীন মহারাজা শ্রীশচন্দ্র কলেজ হোক কিংবা দক্ষিণ কলকাতার সাউথ সিটি কলেজের সান্ধ্যকালীন প্রফুল্লচন্দ্র কলেজই হোক—উভয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স পাইয়ে দেবার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে নিরীহ ছাত্র-ছাত্রী-অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অসাধু চক্রের হদিস পেতেই এই গ্রেফতার।

তবে শুধু এই দু’টি কলেজেই নয়, কলকাতার অন্য নামী কলেজগুলিতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক যে, রাজ্য সরকারের নির্দেশে কলকাতার ৭২টি থানার অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলির গেটের সামনে পুলিশি প্রহরার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এটা সত্যিই খুব হতাশার। কোনও চাকরি বা আর্থিক বরাত পাওয়ার বিষয় নয়, ব্যাপারটি কলেজে ভর্তির। সেখানেও এমন টাকার খেলা! বেশ কিছু কলেজে নাকি ছাত্র নেতাদের বিরুদ্ধে ভর্তির নামে টাকা আদায়ের সিন্ডিকেট খোলার অভিযোগ এসেছে বলে খবর। খবর যদি সত্যি হয়, তবে তা শুধু বিস্ময়েরই নয়, তীব্র মানসিক যন্ত্রণারও। শিক্ষার পবিত্র মন্দিরে প্রবেশকে কেন্দ্র করে এই ধরনের দুর্নীতি বড় বড় মন্দিরে দর্শনার্থীদের অযথা হয়রানকারী পান্ডাদের কীর্তির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বৈ কি! আর তোলাবাজেরা যদি আবার কলেজের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী হন, তবে তো বলার মতো কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।

কলেজে স্নাতক স্তরে ভর্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কয়েক বছর ধরে রাজ্যের প্রায় সব কলেজের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ভর্তির আবেদন পত্র জমা দেওয়া, মেধাতালিকা প্রকাশ, ভর্তির খুঁটিনাটির বিবরণ, ভর্তিবাবদ অর্থ জমা—সবই অনলাইনের মাধ্যমে হয়। বিভিন্ন বিষয়ের অনার্স বিভাগে কলেজের নির্ধারিত আসন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কলেজগুলি পর্যায়ক্রমে অনলাইন মেধাতালিকা প্রকাশ করে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু রাখে। এই ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে স্বচ্ছতার দাবি রাখে। কিন্তু আপাত-স্বচ্ছ এই ভর্তি প্রক্রিয়ায় ছাত্রনেতারা কিংবা ছাত্র সংসদের দাদারা কী করে ঢুকে গেল, তা মাথায় ঢুকেও ঢুকছে না। তবে কি এর পিছনে বড় কোনও সংঘটিত চক্র আছে, নাকি সর্ষের মধ্যেই ভূত? উত্তরটা জানা খুব দরকার।

একটা সময় ছিল, যখন কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। অসহায় ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্রনেতারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। এই সহযোগিতার বিনিময়ে ভর্তির পরে তাঁরা সংগঠনের পতাকাতলে পড়ুয়াদের নিয়ে আসার চেষ্টা চালাত। ছাত্র-রাজনীতির অলিন্দ থেকে স্থানীয় জেলা, রাজ্য এমনকী জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনেও আবির্ভূত হতে দেখেছি বহু ছাত্রনেতাকে।

বর্তমান রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী-সহ বেশির ভাগ প্রথম সারির মন্ত্রীদের ছাত্র রাজনীতির আঙিনায় প্রথম হাতেখড়ি হয়েছিল। তাই কোর কমিটির মিটিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী বর্তমান শাসক দলের ছাত্র নেতাদের ছাত্রদরদী ভাবমূর্তি গড়ে তোলার কড়া পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরেও ছাত্র রাজনীতির নামে এক শ্রেণির স্বঘোষিত ছাত্রনেতার তোলাবাজির নমুনা বেশ লজ্জার এবং ঔদ্ধত্যের। বলতে দ্বিধা নেই, আজ আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ভর্তি ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ছাত্র নেতাদের সেই পূর্বতন ভূমিকা পালনের তেমন সুযোগ ছাত্রদের আর নেই। কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর বহু সুযোগ আছে। সেগুলির দিকে দৃষ্টি না দিয়ে আজকের কতিপয় ছাত্রনেতা সিন্ডিকেট রাজনীতির দালালি করে চলেছে। ফলে শিক্ষার মন্দিরের পরিবেশ কলুষিত হচ্ছে।

রাজ্য কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কেন্দ্রীয় অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করা না গেলেও স্নাতক স্তরে কলেজে কলেজে পৃথক ভাবে ছাত্র ভর্তির কাজ অনলাইনে করার ফলে এ রাজ্যে সামগ্রিক ভাবে স্বচ্ছতা এসেছে—এমন সিদ্ধান্ত টানলে খুব একটা অন্যায় হবে না বোধ হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার বিগত কয়েক বছর ধরে এই মারকাটারি ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, বহু কলেজে বহু বিষয়ে নির্ধারিত আসন খালি থেকে যায়। রাজ্যের এলিট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই ধরনের উদাহরণ তৈরি হয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে আবার বিশেষ কিছু বিষয়ে ভর্তির জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। তা নিয়ে ইতিমধ্যে গোল বেঁধেছে। এখন প্রশ্ন হল, বছরের মাঝখানে কলেজে কলেজে খালি থাকা আসনগুলিতে ভর্তির আর কোনও সুযোগ থাকে না। অথচ বহু পড়ুয়া নিজেদের পছন্দের প্রিয় বিষয়ে অনার্স পড়ার সুযোগ না পেয়ে অন্য বিষয় নিয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া এক একটি বিষয়ে ভর্তির জন্য কলেজ অনুযায়ী ভর্তির ‘কাট-অফ’ নম্বর থাকে আলাদা। কেন্দ্রীয় ভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করা গেলে স্নাতক স্তরে আসন খালি থাকার সমস্যা এবং ভর্তির ‘কাট-অফ’ নম্বরের বৈষম্য এড়ানো যেত। পড়ুয়ার অভাবে রক্তাল্পতায় ভুগতে থাকা বহু কলেজ বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেত।

বছর চারেক আগে অধ্যাপক স্মৃতিকুমার সরকার উপাচার্য থাকাকালীন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়া সফল ভাবে চালু করেছিল। কিন্তু সেটাকে রাজ্য কিংবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসারিত করা তো গেলই না, উল্টে অর্জিত সাফল্যটুকু ধরে রাখা গেল না। মেডিক্যাল সায়েন্সে ভর্তির জন্য গোটা দেশে সেন্ট্রাল অনলাইন সিস্টেম চালু করা গেল, অথচ সমস্ত পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও আমরা রাজ্যে ডিগ্রি কলেজগুলিতে তা প্রয়োগ করার সাহস দেখাতে পারছি না। এটা বেশ পরিতাপের বিষয়।

এখানে এই অব্যবস্থার সব দোষ কেবল সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে আত্মসমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি দেখা দরকার। নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, আমরা অভিভাবকেরা কি কেবল ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’ নীতি নিয়েই চলব? নাকি স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে যেতে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করব, সেটা ঠিক করতে হবে আমাদের। কার্যসিদ্ধির জন্য তোলা আদায়কে উৎসাহ দেওয়া সামাজিক অপরাধ। মনে রাখতে হবে, সব কলেজে এ সব অসাধু কাজ হচ্ছে না। বরং কলকাতা ও শহরতলির কিছু কলেজ ছাড়া রাজ্যের বাকি কলেজগুলিতে মোটের উপর স্বচ্ছতার সঙ্গেই ভর্তি প্রক্রিয়া চলছে। কলকাতা ছাড়া রাজ্যের মফস্সল শহরে এমন কিছু কলেজ আছে, যারা কলকাতার বিতর্কিত ও অভিযুক্ত এলিট কলেজগুলিকে পঠন-পাঠন এবং গুণগত উৎকর্ষে যে কোনো সময় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। আর যে পরীক্ষায় পাশ করে ছাত্র-ছাত্রীরা পাশ করে কলেজের দরজায় নাড়া দিচ্ছে, সেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মেধাতালিকায় এই মফস্সলের ছেলে-মেয়েরাই প্রথম দিকের স্থানগুলি দখল করে।

তাই পুলিশি প্রহরা দিয়ে আজকের দিনে সমাজের সর্বক্ষেত্রে প্রকট হওয়া মানসিক ও নৈতিক দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সুস্থ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক মানসিকতা। এই কঠিন কাজটা শুরু হোক আজই, এখনই।

(লেখক ‘সরোজিনী নায়ডু কলেজ ফর উইমেন’-এর ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক)

Shares

Leave A Reply