শনিবার, ডিসেম্বর ৭
TheWall
TheWall

শরিকদের কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে আপত্তি নেই? সনিয়া-রাহুল এতটাই উদার!

 শঙ্খদীপ দাস

মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নতুন হইচই। কী ব্যাপার? কংগ্রেসের শীর্ষ সূত্রে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য ভাবিত নন রাহুল গান্ধী। কারণ, অন্য কিছু না। সহজ। তাঁর লক্ষ্য নরেন্দ্র মোদীকে গদি থেকে সরানো। সে জন্য বিরোধী জোট মজবুত করা। তার পর শরিকদের মধ্যে থেকে যে কেউ প্রধানমন্ত্রী হোক না — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পওয়ার…।

গত ডিসেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিক ভাবে কংগ্রেস সভাপতি পদের দায়িত্ব নিয়েছেন রাজীব- পুত্র। তার পর এপ্রিল মাসে কংগ্রেসের প্লেনারি অধিবেশন হয়েছে। তার পরেও তিন মাস কেটে গিয়েছে রাহুলের নতুন টিম ঘোষণা করতে। অবশেষে গত সপ্তাহে কংগ্রেসের নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করেছেন রাহুল। রবিবার দুপুরে তার প্রথম বৈঠক হয়েছে সংসদের অ্যানেক্স ভবনে।

বলতে গেলে গোটা বিষয়টির সূত্রপাত সেই উইকেন্ড থেকে। বৈঠক হয়েছিল দরজা বন্ধ করে। তার পর ওয়ার্কিং কমিটির এক সদস্যকে ফোন করে জানা গিয়েছিল, সনিয়া ওই বৈঠকেই পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট তৈরির চেষ্টা শুরু করে দিতে হবে। আমরা সবাই ওঁর পাশে থাকব। একই সঙ্গে সদ্য প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খার সময় এটা নয়। বিরোধী জোট পোক্ত করে মোদী সরকারকে ধাক্কা দেওয়াটাই সময়ের দাবি।

এমন মনে করার কোনও কারণ নেই রাহুলের সঙ্গে আলোচনা না করেই এ কথা বলেছেন সনিয়া। সত্তর বছর বয়স হয়ে গেল তাঁর। কিন্তু রাজনৈতিক বুদ্ধিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন তাঁর ধার ক্রমশ বাড়ছে। শুধু শরীরটাই সঙ্গ দিচ্ছে না সব সময়। সে যাক। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সনিয়া ও কথা বললেও, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, সচিন পাইলটের মতো কংগ্রেসের তরুণ ব্রিগেড দাবি করেছিলেন, জোট গড়ার চেষ্টা হোক রাহুলের নেতৃত্বেই। বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা অপেক্ষমান সাংবাদিকদেরও তেমনই মত জানিয়েছিলেন।

কিন্তু তাতেই খেলাটা কিছুটা বিগড়ে যায়। কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পর রাহুল বাঘ-সিংহ মেরেছেন এমন ঘটনা এখনও হয়নি। কর্নাটকে বিজেপি-কে বেকুব বানিয়ে সরকার গড়তে সফল হলেও সামগ্রিক ছবির বিচারে তা বিশাল কিছু নয়। তা হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পওয়ার, তেজস্বী যাদব এখনই তাঁকে জোটের নেতা মানবেন কেন? সুতরাং ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের পর কংগ্রেসের তরুণ ব্রিগেডের বক্তব্য শুনেই, প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায় বিরোধী জোটের মধ্যে। তার পর কখনও মায়াবতী বলেন, আসন সমঝোতা কী হয় তা আগে দেখি, তার পর তো বাকি কথা। আবার লালু পুত্র তেজস্বী যাদব বলেন, রাহুল একা প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পাওয়াররাও সমান দাবিদার। তৃণমূলের নেতাদেরও মত, হক কথা বলেছেন তেজস্বী। বাংলায় শাসক দলের নেতা মন্ত্রীদের অনেকে তো এখন প্রকাশ্য মঞ্চ থেকেই বলতে শুরু করেছেন, প্রধানমন্ত্রী পদে একজন বাঙালিকে তাঁরা দেখতে চান।

স্বাভাবিক ভাবেই এই সব সোরগোল শোনার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে কংগ্রেস ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমেছে। মঙ্গলবার বিকেলে দিল্লিতে মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডা দেন রাহুল। আগে থেকেই বলা ছিল, আড্ডার সময় রাহুল যা বলবেন তা লেখা যাবে না। তবে ওই আড্ডা শেষ হতেই ব্রেকিং নিউজ চলতে শুরু করে, – “কংগ্রেস শীর্ষ সূত্র জানাচ্ছে, রাহুল বলেছেন শরিকদের কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে আপত্তি নেই।”

এখন প্রশ্ন, সনিয়া-রাহুল কি এতটাই উদার?

না। সবটাই মা-ছেলের কৌশল। সেটা কী?

সময়ে ভোট হলে লোকসভা নির্বাচনের এখনও আট মাস বাকি। ফলে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল! সনিয়া ভালোমতই জানেন, রাহুলের নেতৃত্ব এখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পওয়াররা মেনে নেবেন না। রাহুলের অনেক আগে থেকে তাঁরা রাজনীতি করছেন। তাঁদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রাহুলের থেকে ঢের বেশি। তা ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি গত লোকসভা নির্বাচনের মতই উনিশের ভোটে একা ৩৪ টি লোকসভা আসনে জিততে পারেন তা হলে তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসাবে উঠে আসবে তৃণমূলই। ফলে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তৃণমূলের আশাও সঙ্গত।

সুতরাং রাহুলকে এখনই প্রধানমন্ত্রী পদ প্রার্থী হিসাবে তুলে ধরলে বিরোধী জোটই দানা পাকবে না। বিরোধী দলগুলির মধ্যে আকচাআকচি শুরু হয়ে যাবে সেই বিষয়টি নিয়েই। তাই সেই প্রসঙ্গ এখন না তোলাই বুদ্ধিমত্তা।

দ্বিতীয়ত, রাহুলের যা মনোভাব তাতে লোকসভা ভোটে কংগ্রেস দেড়শ-র কম আসন পেলে এমনিতেই প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন না। ১৪৫ টি আসন জিতে প্রথম ইউ পি এ জমানায় যে ভাবে মনমোহন সিংহ সরকার তৈরি হয়েছিল এবং টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে পাঁচ বছর চলেছিল- তার পুনরাবৃত্তি করা রাহুলের কম্ম নয়। তা ছাড়া রাহুলের টিমে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো ক্ষুরধার বুদ্ধির বর্ষীয়াণ নেতা নেই যে এ কাজে রাহুলকে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু দেড়শ-র বেশি বা তুলনামূলক স্বস্তিজনক আসন জিতলে স্বাভাবিক নিয়মে রাহুলই হয়ে উঠবেন প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার। এবং তখন কংগ্রেসের সংখ্যার তাকতই রাহুলের হয়ে গলা ফাটাবে। জোট শরিকদের দাবি তখন এমনিই লঘু হয়ে যাবে।

এবং তাই যদি হয়, এখন থেকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য ইট পেতে রেখে কী লাভ! সনিয়া-রাহুল তাই উদার। প্রধানমন্ত্রীর পদ তাঁরা এখন অকাতরে শরিকদের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন। মন্ত্রিসভাও ছেড়ে দিতে পারেন। তাঁদের এখন কিছু চাই না। তাঁরা শুধু মোদীকে হারাতে চান। সেই কারণেই চান অখিলেশ, মায়াবতী, মমতা, শরদ পওয়ার, স্ট্যালিন, তেজস্বী তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকুন।

হাত ধরে, প্রতিজ্ঞা করে।

ফাইল চিত্র

Leave A Reply