বুধবার, জানুয়ারি ২৯
TheWall
TheWall

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এই রাজনীতি কেন?

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

আমাদের কবি স্বদেশের বন্দনা গেয়ে লিখেছেন, ‘চির কল্যাণময়ী তুমি ধন্য, দেশে-বিদেশে বিতরিছ অন্ন।’

এ হল কাব্যের কথা। দেশে অন্নসংস্থানের প্রকৃত ছবিটা কী, সেকথা জানেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলছেন, বিদেশে তো নয়ই এমনকি দেশেও সকলকে বিতরণ করার মতো অন্ন নেই আমাদের ভাণ্ডারে। ভারত রাষ্ট্র যেখানে নিজেরই কোটি কোটি নাগরিকের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করতে পারে না, সেখানে প্রতিবেশী দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে এলে কী হবে? উত্তরটা সহজ। অভাব-অভিযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং যাঁরা চুপিসারে ভিন দেশ থেকে ভারতে ঢুকেছেন, তাঁদের বিদায় করে দেওয়া প্রয়োজন। সেজন্যই জাতীয় নাগরিকপঞ্জি এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের প্রয়োজন আছে।

সোমবার বেলা ১২ টার কিছু পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি লোকসভায় পেশ করেন। তাতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ছ’টি ধর্মের মানুষ যদি ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ভারতে চলে আসেন, তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন। ছ’টি ধর্ম হল — হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে যাঁরা ভারতে এসেছেন, কেবল তাঁরাই নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

প্রত্যাশিতভাবেই বিলটি পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে লোকসভায় তুমুল বিতর্ক তথা হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। বিরোধীরা একবাক্যে বলতে থাকেন, ওই বিল সংখ্যালঘুদের বিরোধী। এতে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সাম্যের অধিকারও মান্য করা হয়নি।

লোকসভায় বিজেপির একারই সাংসদ রয়েছেন ৩০০ জনের বেশি। এছাড়া এনডিএ জোটের অন্যান্য শরিকও রয়েছেন। সেখানে এই বিল পাশ হয়ে যাবে অনায়াসে। কিন্তু রাজ্যসভায় বিজেপির গরিষ্ঠতা নেই। ২০১৬ সালে সংসদের উচ্চকক্ষে নাগরিকত্ব বিল পাশ করানো যায়নি। এবার গুজব ছড়িয়েছে, সেখানেও নাকি ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাবে।

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে। অসমে আগুন জ্বলছে। বন্‌ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। অসমীয়ারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৮৫ সালের চুক্তি নাকচ করে দিতে চায়। রাজীব গান্ধীর আমলে হওয়া অসম চুক্তিতে ‘কাট অব ডেট’ ধরা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ। বলা হয়েছিল, ওই দিনটির আগে যাঁরা ভারতে এসেছেন, তাঁরা যে ধর্মেরই হোন না কেন, নাগরিকত্ব পাবেন। নতুন বিলে ‘কাট অব ডেট’ এগিয়ে আনা হয়েছে। অসমের মানুষ আশঙ্কা করছেন, তাঁদের রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে।

অশান্তি যে হবে, জানাই ছিল। অমিত শাহ কয়েকবার উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। কিন্তু লাভ যে হয়নি তা দেখাই যাচ্ছে।

নাগরিকত্ব আইনের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েও কয়েকটি প্রশ্ন তোলা যায়। প্রথমত, ধরে নেওয়া হয়েছে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কেবল ছ’টি ধর্মের মানুষই ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হন। তা ঠিক নয়। পাকিস্তানে আহমদি গোষ্ঠীর মুসলিমরাও ধারাবাহিকভাবে অত্যাচারিত হয়ে আসছেন। দ্বিতীয়ত, যে প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে আসা সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দিতে চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে শ্রীলঙ্কার নাম নেই। সেদেশে তামিল হিন্দুরা অত্যাচারিত হন। পালিয়েও আসেন ভারতে। তাঁদের বেলায় কী হবে? তৃতীয়ত, প্রতিবেশী দেশ থেকে পালিয়ে আসা সংখ্যালঘুকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়েছিলেন। তাই স্বদেশ ছেড়ে এসেছেন। তবে নাগরিকত্ব পাবেন। কীভাবে তিনি একথা প্রমাণ করবেন? সেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়নি।

মনে হয়, এই বিল নিয়ে বিজেপি তাড়াহুড়ো করছে। তাই নানা ফাঁক রয়ে গিয়েছে। সামনে ঝাড়খণ্ডের ভোট। তার আগে দেখাতে চায়, হিন্দুদের জন্য তাদের কত দরদ। বিরোধীরা বলছেন, মেরুকরণের নতুন ফন্দি। খুব একটা ভুল বলছেন না।

বিরোধীরাও কি ধোয়া তুলসীপাতা? মনে হচ্ছে, তাঁরা যে কোনও উপায়ে বিলটি আটকাতে চান। পারলে অনন্তকাল তর্কবিতর্ক চালিয়ে যাবেন। প্রশ্ন হল, তাঁরা কি জানেন না, বিদেশ থেকে লাখে লাখে মানুষ পালিয়ে এলে অর্থনীতির ওপরে কেমন চাপ পড়ে? এমনিতেই অর্থনীতির হাল শোচনীয়। তার ওপরে অনুপ্রবেশকারীদের খাওয়াপরার দায়িত্ব নেওয়া কি সম্ভব? আমেরিকার মতো দেশও অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে নাজেহাল। বাধ্য হয়ে মেক্সিকো সীমান্তে পাঁচিল দিচ্ছে। আমরা কি তাদের চেয়েও ধনী যে, বিদেশিদের আদর করে স্থান দেব?

নাগরিকত্ব আইন পাশ হোক, জাতীয় নাগরিকপঞ্জিও তৈরি হোক, কিন্তু তার পিছনে যেন রাজনীতি না থাকে। শাসক ও বিরোধী, উভয় পক্ষই রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে কাজ করুন। তবে অনুপ্রবেশের সমস্যা দূর হবে।

Share.

Comments are closed.