বুধবার, মার্চ ২০

রাহুল ফার্স্ট, মোদী সেকেন্ড, জনতা লাস্ট

শঙ্খদীপ দাস: বছর তিনেক আগের ঘটনা। মার্চ মাসের এক সন্ধ্যা। লুটিয়েন দিল্লির ৬-এ কৃষ্ণমেনন মার্গ সে দিন সাজো সাজো। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারত রত্ন সম্মানে ভূষিত করবেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। চল্লিশ মিনিটের অনুষ্ঠান। কিন্তু ভিতরে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ। বাজপেয়ীর পরিবার ছাড়া ভিতরে রয়েছেন শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ কয়েক জন নেতা।

পরে রাষ্ট্রপতির এক এডিসি-র (এইড কি ক্যাম্পের) কাছেই শুনেছিলাম, শোওয়ার ঘর থেকে বাজপেয়ীকে হুইল চেয়ারে করে আনা হয়েছিল বৈঠকখানায়। উনি সম্ভবত কাউকে চিনতে পর্যন্ত পারেননি (উপস্থিতদের তেমনই ধারণা হয়েছিল)। হুইল চেয়ারে যেন পাথরের মতো বসে একটা অশীতিপর অসুস্থ শরীর। প্রণববাবু বাজপেয়ীর গায়ে একটি উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে ভারত রত্ন পুরস্কার ও তাঁর কোলে রেখে দিয়েছিলেন মাত্র।

রাজনৈতিক ভাবে ক্ষুরধার, বাগ্মী এবং বিরোধী শিবিরের কাছেও গ্রহণযোগ্য বাজপেয়ীর শারীরিক অবস্থা গত সাত আট বছর ধরে এমনই। প্রশ্ন হল, ২০১৫ সালের ওই দিনটি এবং ফি বছর ২৫ ডিসেম্বর বাজপেয়ীর জন্মদিন ছাড়া প্রণববাবু, নরেন্দ্র মোদী, সনিয়া গান্ধী বা লালকৃষ্ণ আডবাণীরা কে কতবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হল না অবনতি কেই বা নিয়মিত খোঁজ রাখেন। এঁদের প্রত্যেকের বাড়ি থেকেই বাজপেয়ীর বাসভবন গাড়িতে মেরেকেটে দেড় দু’মিনিটের পথ মাত্র। সংসদ ভবনে বা সাউথ ব্লকে যাওয়ার সময় আকছার তো এই বাড়ির সামনে দিয়েই যান।

আরও পড়ুন :  কলিম খান নেই, তাঁর ভাবধারা আছে

অথচ সোমবার সকালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শরীর একটু বেশিই খারাপ হওয়ায় তাঁকে যেই না অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে ভর্তি করা হয়, বদলে যায় ছবিটা। বিকেলে এইমসে গিয়ে সবার আগে বাজপেয়ীকে দেখে আসেন রাহুল গান্ধী। অমনি সংবাদমাধ্যমে ব্রেকিং খবর চলতে শুরু করে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগে বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা করলেন কংগ্রেস সভাপতি। হি ইজ ফার্স্ট। তার পর ঘন্টাকে দুয়েকও কাটেনি এইমসে বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা করতে চলে যান প্রধানমন্ত্রী। তিনি যে ডাক্তারদের সঙ্গে সবিস্তারে কথা বলেছেন, এবং পঞ্চাশ মিনিট সেখানে ছিলেন সে খবর টুইট করে দেওয়া হয় তারপরই। একে একে এর পর লালকৃষ্ণ আডবাণী, স্বাস্থ্য মন্ত্রী জেপি নাড্ডা থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের লাইন লেগে যায় এইমসে। মিডিয়ার হুড়োহুড়ি তো ছিলই।

বন্ধু পরিজনের চিকিৎসার জন্য এক সময় ঘন ঘন যাতায়াত ছিল এইমসে। গোটা দেশের কয়েক হাজার মানুষ দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য রোজ সেখানে হত্যে দিয়ে থাকেন দেখেছি। আউট পেশেন্ট ডিপার্টমেন্ট তথা বর্হিবিভাগে ডাক্তার দেখিয়ে এইমসে বেড পাওয়া লটারিতে ভাগ্য খুলে যাওয়ারই সামিল। অপারেশনের ডেট পাওয়া আরও কঠিন ব্যাপার। ফলে দেশের দূর দূরান্তের রাজ্য থেকে যাঁরা চিকিৎসা করাতে আসেন, তাঁরা কেউ হাসপাতাল চত্বরেই বসে ঠায় অপেক্ষা করেন, কেউ বা বোরিয়া-বিস্তর নিয়ে শুয়ে পড়েন ফুটপাতে। ওষুধ স্যালাইন রক্ত পরীক্ষা হাসপাতালের ফি জমা দেওয়া নিয়ে রোগীর পরিবারের মানুষগুলোর ছোটাছুটি দেখলে বোঝা যায় চাহিদার তুলনায় দেশের এক নম্বর সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো কতটা অপর্যাপ্ত।

এ হেন হাসপাতালে এসপিজি নিরাপত্তা ও কনভয় নিয়ে রাহুল গান্ধী বা প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার অর্থ কী তা বোধগম্য। রোগী ও রোগীর পরিবারের লোকজনকে হাসপাতাল চত্বরের একটা অংশে যে তখন ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি তা এইমসের কর্মীদের থেকেই জানা গেল। প্রশ্ন হল, যে রোগীরা গতকাল এ জন্য অসুবিধায় পড়লেন তাঁদের শারীরিক কষ্ট কি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় কম। তাঁদের শারীরিক কষ্ট নিয়ে তাঁদের পরিবারের উদ্বেগ কি বাজপেয়ীর জন্য রাহুল-মোদীর উৎকণ্ঠার কাছে খাটো? এমনও তো হতে পারে ওয়ার্ডে ভর্তি কোনও পরিজনের জন্য তখনই ওষুধ বা খাবার পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল কারও।

এই প্রশ্ন তুলতে গিয়েই ভিড় করে এলো আরও কিছু ঘটনা। গত দু-তিন বছরে বেশ কয়েক বার নয়াদিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সনিয়া গান্ধী। তখন কিন্তু গঙ্গারাম হাসপাতালে রাহুলকে একবারও দেখা যায়নি। সেই ফটো বা ফুটেজ কোনও সংবাদমাধ্যমের কাছেও নেই। কেন  না রাহুল মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন অনেক রাতে বা খুব ভোরে। সংবাদমাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

এখানে শেষ নয়, প্রাক্তন কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও যখন মৃত্যু শয্যায় তার আগেও রাহুল-সনিয়া কেন কংগ্রেসের কোনও বড় নেতাকে দেখা যায়নি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতে।

কিন্তু এ বার হয়তো ফার্স্ট হওয়াই লক্ষ্য ছিল রাহুলের। তাও লোক দেখিয়ে। কেননা রাহুল এইমসে যাওয়ার পরেই কংগ্রেস মুখপাত্ররা বলতে শুরু করেছিলেন, মোদীর আগেই কিন্তু উনি গিয়েছেন। সেই চাপ রাখতে পারেননি মোদী বা আডবাণীরা। এবং তাঁদের পিছু দলের বড় ও মাঝারি মাপের অন্য কয়েক জন মন্ত্রী। সুতরাং লাস্ট কারা হলেন?

আমরা। এইমসে চিকিৎসা করাতে গিয়ে যাঁরা ওপিডি-র বাইরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকি। ওয়ার্ড পরের কথা, ইমার্জেন্সিতে বেড না পেয়ে মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে রোদ, বর্ষা, শীতে ঠায় অপেক্ষায় থাকি হাসপাতালের উঠোনে।

ডাক্তাররা কিন্তু জানিয়েছেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শরীরে যে সংক্রমণ হয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। ওঁকে অ্যান্টি বায়োটিক দেওয়া হয়েছে। উনি চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন।

Shares

Leave A Reply