বৃহস্পতিবার, জুন ২০

জাতক্রোধে বিপন্ন একরত্তির প্রাণ, বাঁচালেন পুলিশবাবা

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: অসময়ে স্কুল থেকে হঠাৎ ফোন পেয়ে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলেন তিনি। বাইক বার করেই এক ছুট্টে স্কুলে পৌঁছে দেখেন দোরগোড়ায় পড়ে রয়েছে একরত্তি শিশু। লাল পিঁপড়েয় ছেঁকে ধরছে ছোট্ট শরীরটাকে। পাশেই পাগলের মতো করছেন এক তরুণী। কাঁদছেন, মাথা ঠুকছেন। আর বিড়বিড় করছেন, “হয় একে রাখ, নয় আমি একে মারব! এখুনি মারব!”

চার পাশে তখন ভিড়, কিন্তু কেউ পৌঁছতে পারছে না শিশুর কাছে, পৌঁছতে দিচ্ছেন না মা। তত ক্ষণে জানা গিয়েছে, ওই পাগলিনীর মতো আচরণ করা তরুণীই শিশুটির মা। তাঁর সাফ কথা। হয় বাচ্চাকে এখানে রাখা হোক, নয়তো তিনি নিজে হাতে খুন করবেন সন্তানকে! জানা গিয়েছে, অন্য জাতের যুবকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভালবাসার পরিণাম এই কন্যাসন্তান। এ দিকে তিনি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই ছেড়ে গিয়েছে সে প্রেমিক যুবক। বাড়িতে আর ফেরার উপায় নেই, সন্তানকে নিয়ে। পরিবারের নিদান, মেরে ফেলতে হবে এই ‘পাপের ফসল’কে! নইলে ফেরা যাবে না গ্রামে! এই অবস্থায়, খর রোদে পুড়ে, দুধের শিশুকে বুকে নিয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেরিয়েছেন সে তরুণী! আশ্রয় খুঁজেছেন গ্রামে গ্রামে। তখনই জেনেছেন, এই অবস্থায় তাঁকে আর তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে পারেন একমাত্র এক জনই!

খুদে পড়ুয়ার কোলে ছোট্ট ভূমি

ধাক্কা মেরে সকলকে সরিয়ে বাচ্চাটিকে বুকে তুলে নিতেই সেই ‘এক জনের’ চকিতে মনে পড়ে গিয়েছিল, বছর দুয়েক আগের একটা দিন। সে দিনও এমন অসহ্য গরম ছিল। লোকমুখে একটা উড়ো খবর শুনে, সময় নষ্ট না করে ছুটে গিয়েছিলেন বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে। গিয়ে দেখেছিলেন, খবর উড়ো হলেও, মিথ্যে নয়। অবিশ্বাস্য ঘটনাটাই ঘটতে চলেছিল চোখের সামনে। বছর খানেকের এক ছোট্ট মেয়েকে চট দিয়ে জড়িয়েছেন মা। তার উপরে ঢেলেছেন কেরোসিন তেল। দেশলাই ঘষছেন উন্মাদের মতো। কানে যাচ্ছে না চটে মোড়া মেয়ের চিল-চিৎকার, কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না জড়ো হওয়া পাড়া-প্রতিবেশীকে। নিজের মেয়েকে জ্বালিয়ে দেবেন এভাবে!

পুলিশবাবার কোলে কাজল

সময় নষ্ট না করে ছোঁ মেরে শিশুটিকে তুলে নেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে জলে ধুয়ে তাকে নিয়ে পাড়ি দেন বাইকে। কোনও কথাবার্তার তোয়াক্কা না করেই। বাধাও দেননি কেউ। দেবেনই বা কেন! সকলেই তো জানতেন, তাঁর, অর্থাৎ ‘পুলিশবাবা’ অরূপ মুখোপাধ্যায়ের হাতে পড়লে আর চিন্তা নেই সে শিশুকে নিয়ে। খেয়ে-পরে, পড়াশোনা শিখে, দিব্য বড় হবে সে! সেই থেকে তাঁর কাছেই আছে সেই আগুনের মুখ থেকে ফিরে আসা ছোট্ট কাজল। বড় বড় উজ্জ্বল চোখ আর কচি-কচি হাত-পা নিয়ে দিব্যি হাসে, খেলে, নাচে, অ-আ-ক-খ পড়ে। চেনা-অচেনা নির্বিশেষে মানুষের কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে ডাকে বাবা অথবা মায়ি (মা) বলে। কিন্তু তার নিজের মা দেখা করতে এলে, কোনও এক তীব্র অভিমানে মুখ ফিরিয়ে থাকে সকলের আদরের কাজলরানি!

কিন্তু কে এই অরূপবাবু? কেনই বা তাঁর কাছে এমন নিশ্চিত শিশুরা? আর কেনই বা এই শিশুদের জীবন সব চেয়ে বিপন্ন হয়েছে তাদের মায়েদের কাছেই! এ গল্পের পটভূমি দীর্ঘ এবং গভীর।

পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার সীমান্তে শাল-পলাশ-মহুয়ার সাম্রাজ্য, পুঞ্চা। আশপাশের অনেকটা এলাকা শবর জনজাতি অধ্যুষিত। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দ্বিতীয় পিছিয়ে পড়া এই জনজাতির মধ্যে জীবনযাত্রা এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। দু’মুঠো ভাত, গায়ে দেওয়ার মতো পোশাক, মাথার ওপর একটু চালা—এটুকু চাহিদাও পূরণ হয় না সকলের। আধুনিকতার হাওয়া এখনও পৌঁছয়নি এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতম গ্রামগুলিতে। শহর থেকে ২০-৩০-৫০ কিলোমিটার দূরে দূরে অবস্থিত সে সব গ্রামে না জ্বলেছে শিক্ষার আলো, না পৌঁছেছে স্বাস্থ্য পরিষেবা।

বছর দশেক আগে এদের উন্নতির জন্য কাজ করতে শুরু করেন পুঞ্চার বাসিন্দা, কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল পদের কর্মচারী অরূপ মুখোপাধ্যায়। প্রথম প্রথম সহজ ছিল না মোটেই। তথাকথিত আধুনিকতায় মোড়া সমাজের মূলস্রোতে আসতে না চাওয়া এই দূরের মানুষগুলোর কাছে পৌঁছতেই বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তাঁদের ভাল-খারাপ নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা! কথা বললে তবে তো পরিষ্কার হবে সমস্যা, তবে তো সমাধান হবে তার! “পেটে ভাত না থাকলে কথা বলবে কীসে! দিন রাত মহুয়ার নেশা করে পড়ে থাকত সারা গ্রামের লোক। বাচ্চারা খিদেতে কাঁদে বলে তাদেরও মহুয়া ফল সেদ্ধ করে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখত। খিদের জ্বালা অসহ্য হলে মেঠো ইঁদুরের মাংস, পিঁপড়ের ডিম দিয়ে ভাত মেখে খেত!”—বলছিলেন অরূপবাবু।

আরও জানালেন, শবর মানুষদের এক বৈশিষ্ট্য হল, অন্ধ রাগ। রাগের মাথায় যে এঁরা কী করে বসতে পারেন, তা কেউ জানে না! বছর দুয়েক আগে, সেই রাগেরই শিকার হতে বসেছিল ছোট্ট কাজল। ঘরে চাল নেই, মায়ের বুকে দুধ নেই। কাঁহাতক সহ্য হয় শিশুর একটানা কান্না! এই অসহায় অবস্থা থেকেই তুমুল রাগে খেপে উঠেছিলেন মা। জ্বালিয়ে দিতে বসেছিলেন সন্তানকে।

অত দিন আগে, গ্রামের মানুষদের অনেক ধৈর্য্য ধরে, বুঝিয়ে, আশ্বাস দিয়ে, শবর জনজাতির ছোট-ছোট বাচ্চাদের নিয়ে একটি স্কুল খোলেন অরূপবাবু। পুঞ্চার সেই ‘নবদিশা’ স্কুলে চারবেলা খাবার জুটবে —এই বিশ্বাসেই একটু একটু করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পাঠাতে শুরু করেন বাবা-মায়েরা। পড়াশোনা নিয়ে আশা দূরের কথা, কোনও আগ্রহও ছিল না কারও। অরূপবাবু অবশ্য কর্তব্যে ফাঁকি  দেননি। তাই তো গত বছরেই তাঁর স্কুলের ছাত্রী রোপিতা শবর, সারা এলাকার মধ্যে প্রথম পাশ করে যান মাধ্যমিক পরীক্ষায়!

শুরুর পরে, বছর খানেকের মধ্যেই ভরে ওঠে ‘পুলিশবাবা’ অরূপবাবুর স্কুল। হ্যাঁ, এই নামেই পরিচিত তিনি জোরগোড়া, কুলাবহাল, আদাবোনা, ফুলঝোর ইত্যাদি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। বাচ্চাদের মতোই, তাদের বাবা-মায়েরাও এই নামেই ডাকেন তাঁকে। এখন জুটেছে সরকারি স্বীকৃতি। ক্লাস ফোর পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করে উঁচু স্কুলে ভর্তি হওয়া যায়। শ’খানেক বাচ্চাকে নিয়ে এখন ভরা সংসার অরূপবাবুর। সকলের জন্যই ভাত-ডাল-মুড়ি-সব্জির ব্যবস্থা হয়ে যায় চার বেলা। নিয়ম করে পড়াতেও আসেন কয়েক জন শিক্ষক। এখন বিভিন্ন মানুষের ও সংগঠনের সাহায্যের হাত এগিয়ে এসেছে তাঁর এই উদ্যোগে। ফলে গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটে গিয়েছে, অরূপবাবুর কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই নিশ্চিত পেট ভরবে সন্তানের, পড়াশোনা করে বড়ও হবে সে।

মঙ্গলবারেও এই ভাবেই এসে পৌঁছেছে দু’মাস বয়সের ছোট্ট শিশুকন্যাটি। অরূপবাবু জানালেন, ওই শিশুর মা শবর জনজাতির নন, অন্য এক আদিবাসী গোষ্ঠীর। এখনও জাতিভেদের প্রখর প্রতাপ রয়েছে সেখানে। অন্য জাতে সম্পর্ক গড়লে তার শাস্তি পেতে হয় তরুণ-তরুণীকে। আর এ ক্ষেত্রে তো শুধু সম্পর্ক নয়, সন্তানও! তাই তরুণীর বাড়ির লোকজন হুমকি দিয়েছিল, এ সন্তান মেরে না ফেললে ঘরে ঢুকতে পারবে না মেয়ে! আর মেরে না ফেললে তাঁরাই মারবেন! এই অবস্থায় কী করে ঘরে ফিরতেন মেয়েটি! তাই আশ্রয় নিয়েছিলেন নিজের গ্রাম থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে শবর-গ্রাম আদাবোনায়। সেখানেই খোঁজ পান অরূপবাবুর স্কুলের। আর দেরি না করে এসে পৌঁছন সেখানে।

এখন স্কুলের পড়ুয়াদের কোলে-কোলেই ঘুরছে ছোট্ট ভূমি অথবা ভাগ্যশ্রী। দু’মাসের একরত্তিকে ভূমি বলেই ডেকেছেন অরূপবাবুর বাবা, পঙ্কজ মুখোপাধ্যায়। স্কুলের ছেলেমেয়েরা আবার বলছে, এত ছোটতেই যে এমন সৌভাগ্যের জোরে বেঁচে গেল, তার নাম ভাগ্যশ্রীই মানায়। আপাতত খুদের যত্নের পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়েছেন অরূপবাবুর স্ত্রী, এষা। আর সে-ও দিব্যি আছে তার এই নতুন পরিবারে।

এষাদেবীর আদরে ভূমি

সপ্তাহ খানেক আগেই পেরিয়েছে পিতৃদিবস। বাবাদের গল্পে ভরে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খবরের কাগজের পাতা। তার ক’দিন পরেই পিতৃত্বের এমন অনন্য নজির গড়ে সকলের মন জয় করে নিয়েছেন পুঞ্চার পুলিশবাবা।

Leave A Reply